জুলাই জাতীয় সনদ : সংকট নিরসনে সরকারের আলোচনা শিগগিরই - জনতার আওয়াজ
  • আজ রাত ১:০৭, শুক্রবার, ১৫ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১লা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৮শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

জুলাই জাতীয় সনদ : সংকট নিরসনে সরকারের আলোচনা শিগগিরই

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: রবিবার, নভেম্বর ৯, ২০২৫ ৩:৪৭ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: রবিবার, নভেম্বর ৯, ২০২৫ ৩:৪৭ অপরাহ্ণ

 

জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত

জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া ও গণভোটের দিনক্ষণ- এই দুই ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলোকে সমঝোতার জন্য সরকারের বেঁধে দেওয়া সময় শেষ হচ্ছে আগামীকাল সোমবার। কিন্তু বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী আগের অবস্থানে অনড় থাকায় সমঝোতার আলোচনার ইতিবাচক কোনো অগ্রগতি নেই। বিএনপিকে আলোচনার জন্য জামায়াতে ইসলামী আহ্বান জানালেও দলটি সাড়া দেয়নি। এমন পরিস্থিতিতে এই দুই ইস্যুতে সৃষ্ট সংকট নিরসনে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) কয়েকটি দলের সঙ্গে পৃথকভাবে আবারও আলোচনায় বসতে যাচ্ছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস। এই আলোচনা শিগগিরই হতে পারে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।

সূত্র জানায়, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নেওয়া সব দলের সঙ্গে এর আগে একাধিকবার বৈঠক করেছেন প্রধান উপদেষ্টা। কিন্তু জুলাই সনদ ইস্যুতে এবারের বৈঠকে সব দলকে না-ও ডাকতে পারেন সরকারপ্রধান। শুধু বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ কয়েকটি দলকে বৈঠকে ডাকা হতে পারে। সরকারের আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলসহ চারজন উপদেষ্টা বিএনপি-জামায়াতের মতভেদ দূর করতে লিয়াজোঁ করছেন। আগামীকাল সোমবার সরকারের বেঁধে দেওয়া সময় শেষ হলেও সরকারকে আরও দুই-তিন দিন অপেক্ষা করতে দলগুলোর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে। এর মধ্যে যদি সমঝোতা না হয় তাহলে সরকারপ্রধান দলগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বসবেন।

জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া ও গণভোটের সময় নিয়ে এখন দুই ভাগে বিভক্ত ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়া দলগুলো। বিএনপি ও তাদের সমমনা দলগুলো জাতীয় নির্বাচনের দিনেই গণভোট চায়। এছাড়া দলগুলো চায় সনদে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ থাকতে হবে। অপর দিকে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের সমমনা ৮টি দল জাতীয় নির্বাচনের দিন গণভোট অনুষ্ঠানের বিপক্ষে। তাদের দাবি, আগামী নভেম্বরেই গণভোট হতে হবে। আর গণভোটের দিনক্ষণ নিয়ে নমনীয় থাকলেও জুলাই সনদে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ রাখা যাবে না বলে শর্তজুড়ে দিয়েছে এনসিপি। জাতীয় নির্বাচনের দিনে গণভোট হলেও আপত্তি নেই এনসিপির।

এমনই পরিস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকার, বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি- চার পক্ষের মধ্যেই এক ধরনের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে বলে একটি সূত্র জানিয়েছে। লন্ডন থেকে এই উদ্যোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও। পাশাপাশি প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় থেকেও সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। সব দলকে এক ছাতার নিচে আনার চেষ্টা চলছে। দলগুলোর মধ্যে সমঝোতার জন্য আবারও আলোচনায় বসতে যাচ্ছেন প্রধান উপদেষ্টা।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু খবরের কাগজকে বলেন, ‘অন্তবর্তী সরকার ডাকলে সাড়া দেবে বিএনপি। উনি (প্রধান উপদেষ্টা) ডাকলে বিএনপি বৈঠকে অংশ নেবে। সরকারকে সব ধরনের সহযোগিতা করব।’

তিনি আরও বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামী ডাকলে আমরা কেন যাব? জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বিএনপি যথেষ্ট আন্তরিক ছিল বলেই আমরা স্বাক্ষর করেছি। কিন্তু এরপর নতুন নতুন সমস্যা কারা তৈরি করছে?’

প্রধান উপদেষ্টা আহ্বান জানালে আলোচনায় বসতে রাজি আছে বিএনপি বলে জানিয়েছেন দলটির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ। গতকাল এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা যদি আমাদের আহ্বান জানায় কোনো বিষয়ে আলোচনা করার জন্য, যেকোনো ইস্যুতে, আমরা সব সময় আলোচনায় আগ্রহী, যাব। কিন্তু অন্য কোনো একটি রাজনৈতিক দল দিয়ে আমাদের আহ্বান জানানো হচ্ছে কেন?’

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার খবরের কাগজকে বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার সব দলের সঙ্গে আবারও আলোচনায় বসতে পারে। সরকারপ্রধান সমঝোতার উদ্যোগ নিলে আমরা সব ধরনের সহযোগিতা করব।’ তিনি বলেন, সব দলের মধ্যে সমঝোতা আমরা চাই। এ ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকারকে আন্তরিক হতে হবে।’

জাতীয় নাগরিক পার্টির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘আলোচনার প্রস্তাব এলে আমরা অবশ্যই ইতিবাচকভাবে দেখব। কারণ অতীতে রাজনীতির সব সংকটই আলোচনার মধ্য দিয়েই সমাধান হয়েছে। অতীতে আমরা সরকারকে সব ধরনের সহযোগিতা করেছি, আগামী দিনেও করব।’

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও গণভোটের বিষয়ে সমঝোতার লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার জন্য দুই সদস্যের কমিটি গঠন করেছে জামায়াত। কমিটির সদস্যরা হলেন- নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মো. তাহের ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ।

হামিদুর রহমান আযাদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার এখনো আলোচনার জন্য ডাকেনি। তবে আগামী দিনে আলোচনার আহ্বান জানালে আমরা সাড়া দেবে। তবে নির্বাচনের আগে গণভোট হতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘বিএনপিকে আলোচনার জন্য আহ্বান জানালেও তারা সাড়া দেয়নি। তবে আমাদের (জামায়াত) ডাকলে অবশ্যই সাড়া দেব। আমরা যাব।’

সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে নির্বাচনের দিনেই গণভোট করার পক্ষে অন্তর্বর্তী সরকার। এছাড়া গণভোটে সনদের প্রস্তাবগুলোর ওপর বিভিন্ন দলের দেওয়া ‘নোট অব ডিসেন্ট’ (ভিন্নমত) উল্লেখ থাকবে না। সনদ বাস্তবায়নে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের ২৭০ দিনের বাধ্যবাধকতার সুপারিশ তুলে দেওয়া হবে। পিআর (সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব) পদ্ধতিতে গঠিত হবে সংসদের উচ্চকক্ষ। অর্থাৎ এর মধ্য দিয়ে জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপি ও জামায়াত দাবির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা চলেছে।

জানা গেছে, আগামী ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে এর আগে গণভোট করার সক্ষমতা অন্তর্বর্তী সরকারের নেই।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও নির্বাচন কমিশনের সেই ধরনের কোনো প্রস্তুতিও নেই। এ ছাড়া প্রশাসনকে নির্বাচন করার জন্য তৈরি করা হয়নি। জামায়াতের পক্ষ থেকে আলোচনায় বসার আহ্বান জানালেও তাতে সাড়া দেয়নি বিএনপি। দলটি বলছে, সনদ বাস্তবায়নে সরকার আলোচনার উদ্যোগ নিলে বিএনপি সাড়ে দেবে এবং বৈঠকেও অংশ নেবে। একই দিনে গণভোট এবং জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের স্বার্থে অন্তর্বর্তী সরকারকে সব ধরনের সহযোগিতাও করবে বিএনপি।

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে সৃষ্ট সংকট নিরসন করতে জাতীয় নাগরিক পার্টি, এবি পার্টি, গণঅধিকার পরিষদ ও গণতন্ত্র মঞ্চের ছয় দল নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেছে। দলগুলোর আলোচনায় জুলাই সনদ বাস্তবায়নের একটা ফর্মুলা উঠে এসেছে। ফর্মুলা হলো- জাতীয় নির্বাচনের দিনই গণভোট অনুষ্ঠিত হতে পারে। এ ক্ষেত্রে বিএনপিকে কিছুটা ছাড় দিতে হবে। বিশেষ করে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের প্রস্তাবিত উচ্চকক্ষে পিআর পদ্ধতি (ভোটের সংখ্যানুপাতিক হারে আসন বণ্টন) বিএনপিকে মেনে নিতে হবে। তাহলেই কেবল গণভোট প্রশ্নে অন্য দলগুলো ছাড় দিতে পারে। এতে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর দাবির মধ্যে ভারসাম্য আসবে।

গণতন্ত্র মঞ্চের অন্যতম নেতা ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক খবরের কাগজকে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারকে সংকট নিরসনে আলোচনার উদ্যোগ নিতে হবে। যেসব বিষয়ে বেশির ভাগ দল ঐকমত্য হয়েছে তার ভিত্তিতে পদক্ষেপ নিতে হবে। নির্বাচনের দিনেই গণভোট চায় বেশির ভাগ দল। যেহেতু নির্বাচনের দিনে গণভোটের পক্ষে বেশি দল, তাই এটা সরকার বাস্তবায়ন করতে পারে। তিনি বলেন, হুমকি-ধমকি ও চাপ- এটা কোনো আলোচনার ভাষা হতে পারে না। জুলাই সনদের আদেশ এমনভাবে জারি করতে হবে যাতে এটা সংবিধানের ওপরে স্থান না পায়। এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকার সংবিধান সংশোধন করতে পারে কি না, ভবিষ্যতে এমন প্রশ্ন যাতে কেউ তুলতে না পারে। অটোপাসের বিষয়টি তুলে দিয়ে পরবর্তী সংসদের তিন বা চার মাসের মধ্যে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করার বিধান রাখা যেতে পারে।

একাধিক দলের জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোটের দিনক্ষণ নিয়ে বিরোধের সূত্র ধরে ফ্যাসিবাদবিরোধী দলগুলোর মতবিরোধ সহিংসতায় রূপ নিলে আওয়ামী লীগই বেশি লাভবান হবে বলে রাজনীতিতে আলোচনা আছে। অনেকের মতে, এমনকি তারা রাজনীতিতে ফিরেও আসতে পারে। তারা দেশকে অস্থিতিশীল করতে চাইবে। যদি রাজনীতিতে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় তাহলে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া সব দলেরই বিপদে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অবশ্য দলগুলোর নেতারা এও বলছেন, জাতীয় নির্বাচনের দিনেই গণভোটের বিষয়টি মেনে নেবে জামায়াত। মূলত বিএনপিকে চাপে রাখার কৌশল হিসেবে নির্বাচনের আগে গণভোটের দাবি তুলছে তারা।

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ