তারেক রহমানের প্রত‍্যাশিত রাজনীতির একশ দিন - জনতার আওয়াজ
  • আজ রাত ৩:২১, সোমবার, ১৫ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১লা আষাঢ়, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৯শে জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

তারেক রহমানের প্রত‍্যাশিত রাজনীতির একশ দিন

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: রবিবার, জুন ১৪, ২০২৬ ৩:১৭ পূর্বাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: রবিবার, জুন ১৪, ২০২৬ ৩:১৭ পূর্বাহ্ণ

 

এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের নবযাত্রায় বাংলাদেশ

আমার পূর্ববর্তী লেখায় জনাব তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ও রাজনৈতিক ক্ষমতা গ্রহণের একশ দিনকে সম্রাট নেপোলিয়ন বেনাপোর্টের একশো দিনের পরিকল্পনার সাথে তুলনা করে বলেছিলাম দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে সরকারের রুপরেখা কেমন হবে, তা পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। কেননা আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘদিন লন্ডনে থাকার পর তার রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতা, শিক্ষা ও বাস্তবিক দেশ পরিচালনার অভিজ্ঞতা থেকে তার আগামী দিনের জাতীয় জীবনের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নয়া দিক পরিবর্তনের কৌশলগত অবস্থান সম্পর্কে বিশ্লেষণ ও জনগণের আস্থা অর্জনে সরকারের প্রতি জনগণের সাড়াপ্রদানমূলক ভূমিকা পর্যবেক্ষণ করা দরকার। সার্বজনীন দৃষ্টিকোণ থেকে সরকারের একশ দিনের কার্যক্রমকে যেভাবে পর্যবেক্ষণ করা যায় তা হলো;

রাষ্ট্র বিজ্ঞানের জনক তার বিখ্যাত দি পলিটিক্স গ্রন্থে গণতন্ত্রের (Democracy বিকৃত রূপ কে বলেছেন ভন্ড/ উচ্ছৃঙ্খলতন্ত্র (Mobocracy)।সদ্য বিদায়ী ফ‍্যাসিবাদী সরকার তেমনি গোটা বাংলাদেশকে একটি ভন্ডতন্ত্রে পরিণত করেছিল। যেখানে জনগণের ভোটাধিকার হরণ করা হয়েছিল এবং গণতন্ত্রের বিকৃত রূপের প্রতিফলন স্পষ্ট হয়েছিল।কিন্তু একটি দেশ পরিচালনা করার জন্য গণতান্ত্রিক ও জনপ্রতিধিত্বমূলক সরকারের কোন বিকল্প নাই এবং এটিই হলো দেশ পরিচালনার বৈধপন্হা । বর্তমান সরকারের বড় সাফল্য হলো বাংলাদেশকে একটি তথাকথিত গণতান্ত্রিক সরকার বিদায়ের কার্যকর ভূমিকা পালন করেছে এবং সেই সাথে একটি অনির্বাচিত সরকার থেকে দেশকে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সাংবিধানিক সরকার গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। কারণ গ্রহণযোগ্য, অংশগ্রহণমূলক ও নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার ছাড়া কোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থা স্হিতিশীল থাকতে পারে না। তবে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে সরকার ভবিষ্যতে কোন ধরনের পদক্ষেপ ও নীতি গ্রহণ করবে, তার ওপর সরকারের স্হিতিশীলতা ও ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে।

আইন মানুষকে সভ্য করতে পারে না। তবে সমাজের শৃঙ্খলা রক্ষা করতে আইনের বিকল্প নাই। রাষ্ট্র বিজ্ঞানী এরিস্টটল তাই সমাজ ও রাষ্ট্রের শৃঙ্খলার জন্য শুধু আইন প্রণয়ন করার উপরেই গুরুত্বারোপ করেননি। বরং আইনের শাসন (Rule of Law) বাস্তবায়ন করতে না পারলে সমাজ ও রাষ্ট্রে শৃঙ্খলা রক্ষা করা সম্ভব নয়। যেখানে এরিস্টটলের শিক্ষা গুরু প্লেটোর মতামত ছিল ভালো শাসকের উপর গুরুত্বারোপ। তাই তিনি তার দি রিপাবলিক গ্রন্হে বলেন, “When the Prince is virtue laws are unnecessary, when the Prince is not virtue laws are useless.”(শাসক যদি সৎগুনের অধিকারী হন তাহলে আইনের দরকার নেই, আর শাসক যদি অসৎ হন তাহলে আইন অকার্যকর)। সুতরাং রাষ্ট্র বিজ্ঞানী ও রাষ্ট্র দার্শনিকদের বক্তব্য সংশ্লেষণ করে বলা যায়, বর্তমানে শাসক হিসেবে আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে অবশ্যই একজন সৎশাসক হিসেবে বিবেচনা করতে পারি, তবে রাষ্ট্রের মধ্যে বিভিন্ন অপরাধের আইনের শাসন বাস্তবায়ন ও কার্যকর করার উপর সরকারের তথা আমাদের প্রধানমন্ত্রীর সার্বিক উন্নয়ন মূল‍্যায়িত হবে। সম্প্রতি সামাজিক অবক্ষয়ের যে চিত্র শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, তা আইনের শাসন বাস্তবায়নের মাধ্যমে সরকারের সৎ ইচ্ছা প্রকাশ পেয়েছে বটে কিন্তু তা দ্রুত কার্যকর করতে হবে।তাছাড়া বিগত দুই দশক রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার যে অপব্যবহার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তা আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনের পরিবেশের উপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। এমনকি চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা, মব সংস্কৃতি এবং আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উপর মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। ফলশ্রুতিতে পুলিশের মানসিক মনোবল এই শৃঙ্খলা রক্ষায় ওতপ্রোতভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তাই পর্যবেক্ষণীয় দৃষ্টিতে বলা যায়, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সেই অকার্যকর ও বিশৃঙ্খলা থেকে তা উন্নতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। যদিও গত একশ দিনে খুনের সংখ্যা ৬০৫, ছিনতাই সংখ্যা ২৯৪, অপহরণ ১৯৬ নারী ও শিশু নির্যাতন ২০৯ এবং মব সহিংসতা ৬৯-৮০ ঘটনা ঘটেছে (টিআইবি, ৭ জুন)। তবে তারা তুলনামূলক চিত্র বিশ্লেষণ করে দেখেছে এই অপরাধের সংখ্যা ২০২৫ সালের তুলনায় অনেক উন্নতি হয়েছে। এমতাবস্থায় আইনশৃঙ্খলার পরিস্থিতি আশানুরূপ পরিসংখ্যান না থাকলেও তা পুলিশের মনোবল ও পরিস্থিতি আগামী একশ দিনে অবশ্য উন্নতি হতে হবে।তবে সরকারকে গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণের লক্ষ্যে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত ও গ্রেফতারের পাশাপাশি আইনের শাসন বাস্তবায়নে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করার বিকল্প নেই ।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে প্রধান স্বস্তির বিষয় হলো মূল‍্যস্ফীতি যা ২০ মে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ৮.৭১% ছিল, যেখানে ফেব্রুয়ারিতে ছিল প্রায় ৯.১৩%। সুতরাং সরকারের বিগত একশ দিনের দ্রব্য মূল্যের বাজার ব‍্যবস্হা মোটামুটিভাবে স্বাভাবিক হিসেবে বিবেচনা করতে পারি। তুলনামূলক বিশ্লেষণে বলা যায় ২০২৪ সালে মূল‍্যস্ফীতি ছিল ১০.৪৭%। তবে এ মূল‍্যস্ফীতি ৬% মধ্যে সীমাবদ্ধ বা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে সরকারের সার্বিক সাফল্য নিশ্চিত হবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অন‍্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে প্রায় ৩৪.৩৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এমনকি বৈদেশিক বিনিয়োগের পরিসংখ্যানের চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় তা বিগত বছরের তুলনায় উন্নতির দিকে যাচ্ছে।সামগ্রিকভাবে বলা যায় সরকারের একশ দিন অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে নির্দেশ করে। এক্ষেত্রে সরকারের বড় ঝুঁকি হচ্ছে বিগত সরকারের বড় বড় প্রকল্পের অর্থনৈতিক রিপেমেন্ট ২০২৬ সাল থেকে শুরু হবে। সুতরাং অর্থের যোগান অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে । এ বিষয়ে সরকারের অর্থনৈতিক কৃচ্ছ সাধনের পাশাপাশি কৌশলগত পরিকল্পনা প্রণয়ন জরুরি। এক্ষেত্রে সরকারের কর ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে এ বছর বাজেটে কর বৃদ্ধি না করে, করের আওতা বাড়ানো বেশি কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে ।

কৃষি ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের ক্ষেত্রে সরকার বৈপ্লবিক পরিবর্তনের পথে অগ্রসর হচ্ছে । সরকার ইতোমধ্যেই ৬৬৬ টি খাল খনন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে ।কৃষি ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন হিসেবে নিজস্ব অর্থায়নে ২.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের পদ্মা ব‍্যারেজ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে ।তাতে করে কৃষি উৎপাদন যেমন বৃদ্ধি পাবে তেমনি লবণাক্ততা, খরা এবং ভারতের অপ্রথাগত কৃষি উৎপাদনের হুমকি থেকে বাংলাদেশের কৃষি পরিবেশ অনেকটা রক্ষা পাবে। পরিসংখ্যান বলছে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে ২.৮৮ মিলিয়ন হেক্টর জমিতে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে এবং জনসংখ্যার প্রায় ৩৭ শতাংশ মানুষ প্রত‍্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে লাভবান হবে ।এমনকি কৃষি ক্ষেত্রে কৃষকদের সহযোগিতা বৃদ্ধি কল্পে সরকার ইতোমধ্যে কৃষি কার্ড চালু করেছে । সুতরাং বলা যায় সরকারের এই একশ দিনের মধ্যে এতগুলো পরিকল্পনা সত‍্যিই প্রশংসনীয় উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে ।

দুর্নীতি যেখানে জীবিত সুশাসন সেখানে মৃত! এখানে শুধু মাত্রাগত ক্রিয়াশীলতা তুলনীয়।গত ৭ জুন ২০২৬ প্রকাশিত টিআইবি দুর্নীতির প্রতিবেদন থেকে সরকারের একশ দিনের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, জবাবদিহিতার অভাব, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং দুর্নীতি বিরোধী অভিযানের অপ্রতুলতা এখনও বিদ্যমান । তবে সরকারের ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, সংসদ সদস্যদের সুবিধা সীমিতকরণ, যেমন টেক্স ফ্রি গাড়ি, প্লট সুবিধা রহিতকরণ, ভিভিআইপি প্রটোকল নিয়ন্ত্রন এবং পাচারকৃত অর্থ উদ্ধারের সরকারের ভূমিকা ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।পাশাপাশি সংসদীয় গণতন্ত্রের কার্যক্রমের ও প্রশংসা করা হয়েছে ।তবে দুর্নীতি প্রতিরোধ কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, মানবাধিকার, এবং প্রশাসনিক ও বিচারবিভাগীয় নিয়োগের ক্ষেত্রে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। এমতাবস্থায় বলা যায়, টাকার অংকে দুর্নীতি বেড়েছে এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি যদিও সরকারের এ বিষয়ে উন্নতি করার অনেক দিক বাকি রয়েছে । সুশাসনের অংশ হিসেবে সরকার প্রধান নিজে এবং তার দল, এমনকি বিরোধীদলসহ পূর্বের সংসদ সদস্যদের তুলনায় বর্তমান সাংসদদের সুযোগ-সুবিধা সীমিতকরণের উদ্যোগকে সুশাসনের জন্য একটি বড় মাইলফলক হিসেবে উল্লেখ করা যায় ।অতি সম্প্রতি ফিফা বিশ্বকাপের প্রচার স্বত্ব সরকারের উদ্যোগের কারণে ২০০ কোটি টাকার বদলে মাত্র ৪০ কোটি টাকায় তা সম্ভব হয়েছে ।তাছাড়াও এস আলম গ্রুপের ৪২৬৪ কোটি টাকার সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত সরকারের দুর্নীতির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থানকে প্রতিনিধিত্ব করে।সুতরাং এ জাতীয় উদ্যোগ সরকারের সুশাসন ও দুর্নীতি বিরোধী মনোভাবের পরিচয় বহন করেছে।

সরকারের একশ দিনের কাজের মূল্যায়নে বলা যায় নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের জন্য কতকগুলো সীমিত কিন্তু কার্যকর উদ্যোগ উদ্বোধন করা হয়েছে । যাতে সামাজিক কল‍্যাণ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা যায় । উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, সরকার ইতোমধ্যে ৫৩,০৯৬ পরিবারের মধ্যে ফ‍্যামিলি কার্ড, ২০,৭৪৮ কৃষক কার্ড, ৫.৫ মিলিয়ন পরিবারের মধ্যে ১৫ কেজি চাল বিতরণে খাদ্যে ভর্তুকি এবং বয়স্ক ও প্রতিবন্ধীদের ২৫% পর্যন্ত ভাড়া ছাড়ের এক প্রশংসনীয় উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা শুরু করেছে।তাছাড়াও বিভিন্ন ধর্মের ইমাম, মুয়াজ্জিন, পুরোহিতদের জন্য ভাতা চালু সরকারের একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। তবে এসব বিষয়ে প্রধান বাধা হলো সঠিক বন্টন ব্যবস্থা। এবিষয়ে সরকারের তদারকি ও মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে, যতক্ষণ না পর্যন্ত সবার জন্য এ সুবিধাগুলো নিশ্চিত করা যায় । যদিও এই বিষয়ে বিরোধী দলের নেতাদের নেতিবাচক বক্তব্য রয়েছে, কিন্তু মনে রাখতে হবে যে কোনো কল্যাণমূলক রাষ্ট্রে সরকারের সুবিধা সম্বলিত এ জাতীয় ব‍্যবস্তার বিকল্প নেই ।

সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা আধুনিক রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব । আর প্রতিবেশী যদি দুষ্ট ও শক্তিশালী হয়, তাহলে সরকারের তো উপায়ই নেই তা এড়িয়ে যাওয়ার! সুতরাং রাষ্ট্রের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সুরক্ষার জন্য সরকারের সাম্প্রতিক পদক্ষেপের প্রশংসার দাবি রাখে । উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ভারতের অবৈধভাবে পুশইন কৌশলের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর সদস্যরা জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে। আমাদের বিজিবি ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে বুঝিয়ে দিয়েছে তোমরা যে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছো, তা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন । সুতরাং সার্বভৌমত্ব রক্ষার সরকারের শক্তিশালী অবস্থান বাংলাদেশের জনগণের কাছে অত্যন্ত গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।তাছাড়া বাংলাদেশের অখণ্ডতা রক্ষার জন্য তুরস্ক, পাকিস্তান এবং চীনের সাথে কৌশলগত সামরিক সহযোগিতা জোরদার সরকারের দূরদর্শিতার পরিচয় বহন করে । বাংলাদেশ তার নিজস্ব আকাশসীমা রক্ষার জন্য রাডার সংযোজনের কাজ সম্পন্ন করেছে এবং বাংলাদেশের পাসপোর্টে আবার ও ইসরাইল ব‍্যতিত পৃথিবীর সকল দেশ ভ্রমণের বিষয়টি সংযোজন হয়েছে যা নিজস্ব সার্বভৌমত্বের সক্ষমতার প্রমাণ বহন করে ।

সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতি বলতে আলাদা কোনো পলিসি আমাদের ছিল না । তারপরও শেখ মুজিবর রহমানের একটি ঐতিহাসিক কৌশলগত উক্তিই পররাষ্ট্র নীতির মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয় । আর তা হলো “Friendship to all, malice towards none”(সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে শত্রুতা নয়)। কিন্তু কালের পরিক্রমায় সেই উদারতাপূর্ন নীতি আমাদের সার্বভৌমত্বকে ঝুঁকিতে ফেলেছে । আমরা দেখেছি পররাষ্ট্রনীতি কিভাবে বন্ধুত্ব থেকে স্বামী-স্ত্রীর মত সম্পর্কে গড়ায়। আর তার অন্তরালে দেশের নিরাপত্তা এবং ক্ষমতার করায়ত্ত ও সম্প্রসারণের জন্য ভৌগোলিক অখণ্ডতার সাথে কিভাবে আপোষ করা হয়েছে। তাই বর্তমান সরকার “Malice towards none” (কারো সাথে শত্রুতা নয়) নীতি অনুসরণ করছে ঠিকই কিন্তু বন্ধুত্বের সম্পর্কে কৌশলগত পরিবর্তন ও সংস্কার নীতি গ্রহণ করেছে। অর্থাৎ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে কৌশলগত বহুমাত্রিক আন্তর্জাতিক স্টেকহোল্ডার এবং পশ্চিমা বড় শক্তিগুলোর সাথে একধরণের ভারসাম্যের নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। যার মোদ্দা কথা হলো, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সবার আগে বাংলাদেশ, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কূটনীতি, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে ভৌগোলিক ভারসাম্য রক্ষার কৌশল হিসেবে বহুমাত্রিক সামরিক, কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত বন্ধুত্বের বলয় তৈরি করা অত‍্যাবশ‍্যক।এ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির বহুমাত্রিক কৌশলগত দিক দেশের সার্বিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ টেকসই অগ্রগতি উন্নয়ন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব আরোপ করবে। সুতরাং পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রে মডারেট পলিসি গ্রহণের মাধ্যমে সরকারের একশ দিনের কার্যক্রমে অগ্রগতি হিসেবে মূল্যায়ন করা যায় ।যার উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলো সম্প্রতি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১ তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী নির্বাচিত হন। আগামী ভবিষ্যতই বাংলাদেশের এ অগ্রযাত্রাকে আরো সমৃদ্ধ ও মূল্যায়ন করবে।

স্বাস্থ্য খাতে হামের টিকার অপ্রতুলতার বিষয়টি জাতীয় থেকে আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে প্রকাশ পেয়েছে।যার ক্ষতিকারক প্রভাব হিসেবে প্রায় ৫০০ অধিক শিশু মারা গেছে এবং ৮০ হাজারের অধিক শিশু আক্রান্ত হয়েছে । যদিও এই টিকার অপ্রতুলতার জন‍্য পূর্ববর্তী সরকার গুলোর অবহেলা দায়ী। তার সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের আমলারা ও এদায় এড়াতে পারেন না। আশংকার বিষয় হলো নতুন সরকার গঠনের প্রথম মাসেই হাম আক্রান্ত শিশুদের সংখ্যা বাড়তে থাকে যা ইউনিসেফ কর্তৃক পূর্ববর্তী সরকারগুলোকে সতর্ক করা হয়েছিল।এ বিষয়ে সরকারের উচিত ছিল তাদের সক্ষমতা ও করণীয় সম্পর্কে জনগণকে আরো দ্রুত সচেতন ও অবগত করা ।

যেখানে শতফুল ফুটবে না সেখানে জাতি বিকশিত হবে না বরং বিভাজিত হবে । প্রতিটি দেশেই শিশু কিশোরদের মেধা ও মননের বিকাশের জন্য জাতীয় পর্যায়ের পদক্ষেপ নেয়া হয়। কিন্তু গত দুদশক এ জাতীয় উদ্যোগ হারিয়ে গেছে। বর্তমানে সরকার শিশু কিশোরদের জাতীয় পর্যায়ে ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে উৎসাহ উদ্দীপনা জোগাতে নতুন কুঁড়ি অনুষ্ঠানের পুনঃউদ্যোগ নিয়েছে। সরকারের একশ দিনের এ জাতীয় পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে শিশু কিশোরদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা অনেকটাই কমে আসবে ।

তাছাড়া ট্রাফিক ব‍্যবস্হাপনায় এ. আই. প্রযুক্তির ব্যবহার সরকারের এ উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে ।এমনকি জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহত ব্যক্তিদের জন্য সরকারি সহায়তা আগামী বাজেটে বরাদ্দ থাকবে । তাতে করে সরকারের দায়িত্বশীল পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব হবে ।

উপরিউক্ত পর্যালোচনায় বলা যায়, সম্রাট নেপোলিয়নের একশ দিনের পরিকল্পনা ২০ মার্চ থেকে ৮ জুলাই ১৮১৫ সালের একটি বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যেই বিদায় ঘটে । অপরদিকে জনাব তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকারের একশ দিনকে অন্ধকারের মধ্যে আলোর আধার হিসেবে মূল্যায়ন করা যায় । তবে একশ দিনের কর্মপরিকল্পনাকে সোয়াট বিশ্লেষণের (SWOT Analysis) মাধ্যমে মূল্যায়ন করতে পারি।বর্তমান বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ শক্তিশালী (Strengths) দিক হলো প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বের ওপর জনগণের আস্থার প্রতিফলন তৈরি হয়েছে, সামরিক বাহিনী, রেমিট্যান্স প্রবাহ ও জনগণের মনোবল। অভ‍্যন্তরীণ দুর্বল (Weaknesses) দিক হলো আইন শৃঙ্খলার দ্রুত উন্নতি ঘটানো, মব সংস্কৃতি, নারী ও শিশু নির্যাতন, মানবাধিকার সুরক্ষা, সরকারি অনুদানের সুষম বণ্টন, আইনের শাসন বাস্তবায়ন ও কার্যকর করা, ডিপ ফেইক, স‍্যাবোটেজ, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, সামরিক বাহিনীর আধুনিকায়ন এবং ব‍্যাংকিং ও আর্থিক খাত। অপরদিকে নেতৃত্বের বাহ্যিক প্রভাবের ফলে যে সুশাসন ও সুযোগ (Opportunities) সৃষ্টি হয়েছে তা হলো, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, দ্রব্য মূল্যের নিয়ন্ত্রন, সরকারের মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা, রিসেট বৈদেশিক নীতি, বৈদেশিক রিজার্ভ এবং বৈদেশিক বিনিয়োগে, আঞ্চলিক সংযোগ স্হাপন এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতের উন্নয়নে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। তবে বাহ্যিকভাবে যে হুমকি ( Threats) রয়েছে তা হলো সীমান্ত ইস্যু ও জাতীয় নিরাপত্তা, জ্বালানি নিরাপত্তা, ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক দুর্বলতা ইত্যাদি।

পরিসমাপ্তিতে বলা যায়, মূলত এ বিশ্লেষণের বাংলাদেশের সার্বজনীন একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে যাতে সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ এ জাতীয় বিষয়সমূহ বিবেচনায় নেয়া যায়। কারণ সরকারের পরিকল্পনার সাথে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ভারসাম্য থাকাও জরুরি । শেষত বলা যায় জনাব তারেক রহমানের নেতৃত্বে ১০০ দিনকে পুরোপুরি সফল না বললেও ব‍্যর্থ বলারও অবকাশ নেই । সেই অর্থে নানা প্রতিবন্ধকতা ও প্রতিকূলতার মধ্যেও সরকার সফল! কেননা এই সময়ের মধ্যেই আগামী ভবিষ্যতের মেগা পরিবর্তনের পরিকল্পনা রয়েছে, কূটনৈতিক সাফল্য রচিত হয়েছে, সুশাসনের পথ প্রশস্ত হয়েছে। আমাদের মনে রাখতে হবে এই সরকার ব‍্যর্থ হলে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতির কালো অধ্যায় শুরু হবে কোন সন্দেহ নেই ।দূর হোক দুঃশাসন, উন্মোচিত হোক জনপ্রত‍্যাশা এবং নব যাত্রায় উদ্ভাসিত হোক আমার একটি পরিকল্পনা আছে (I have a plan)!

মোঃ শাহজাহান মিয়া
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাবেক জাতীয় বিতার্কিক
(বর্তমানে লন্ডনে বসবাসরত)
ই-মেইলঃ shahjahanau.bd@gmail.com

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ