দেশের জন্য নয়, আওয়ামী লীগের জন্য সফরটি সফল তো? – জনতার আওয়াজ
  • আজ রাত ২:১০, বুধবার, ৫ই অক্টোবর, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, ২০শে আশ্বিন, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ৯ই রবিউল আউয়াল, ১৪৪৪ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

দেশের জন্য নয়, আওয়ামী লীগের জন্য সফরটি সফল তো?

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৯, ২০২২ ৮:২৩ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ৯, ২০২২ ৮:২৩ অপরাহ্ণ

 

রুমিন ফারহানা

বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক কেমন? আমি জানি এর খুব সহজ উত্তর কারও কাছে নেই। দুটি দেশের মধ্যে আসলে সম্পর্ক হয় দুই স্তরে। একটি সরকারের সঙ্গে সরকারের, অন্যটি দুই দেশের জনগণের মধ্যে। সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে যাওয়ার আগে একটু দেখে নিই দুই দেশের জনগণের মধ্যে আস্থা, বিশ্বাস, সম্প্রীতির সম্পর্ক কতটা। কয়েক বছর আগে সিএনএন, আইবিএন এবং দ্য হিন্দু যৌথভাবে একটি জরিপ পরিচালনা করেছিল, যার প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল অন্যান্য দেশ সম্পর্কে ভারতের নাগরিকদের মনোভাব। সেই জরিপে একটি প্রশ্ন ছিল, ভারত কোন কোন দেশকে তার বিশ্বস্ত বন্ধু ভাবতে পারে। এর উত্তরে সর্বাধিক অর্থাৎ ৪৮ শতাংশ ভারতীয় জানিয়েছিল তাদের বিশ্বস্ত বন্ধু বাংলাদেশ। আমি ভাবছিলাম, এই একই প্রশ্নের উত্তরে ঠিক কত ভাগ বাংলাদেশি ভারতের নাম বলবে?

বাংলাদেশের মানুষের চোখে ভারত আমাদের যেমনই বন্ধু হোক, একটি বিষয় তো কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না। আর তা হলো, ভারত আমাদের তিনদিক বেষ্টন করে রাখা প্রতিবেশী রাষ্ট্র। সব পরিবর্তন সম্ভব, কিন্তু প্রতিবেশী? ‘নৈব নৈব চ’।

আওয়ামী লীগ সরকারে থাকলে বাংলাদেশে সবসময়ই ভারত নিয়ে চোখে পড়ার মতো এক ধরনের আহ্লাদি আদিখ্যেতা সরকারি পর্যায়ে লক্ষ করা যায়। সেটা ভালো লাগতো যদি আহ্লাদের কারণে দেশের স্বার্থ রক্ষা হতো। কখনও বলা হয় ‘স্মরণকালের সবচেয়ে ভালো বন্ধু’, ‘স্বামী-স্ত্রীর মতো সম্পর্ক’, ‘রক্তের রাঁখিবন্ধনে আবদ্ধ’, আবার কখনও বলা হয় ‘প্রতিবেশীদের জন্য শিক্ষণীয় মডেল সম্পর্ক’, কিংবা ‘দুই ভাই’। এই ধরনের কথা স্বাভাবিকভাবেই দেশের মানুষের ভেতর এক ধরনের প্রত্যাশা তৈরি করে, যেটি পূরণ না হলে বৈরিতা বাড়ে শতগুণ।

২০১৮ সালে একবার প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ভারতকে যা দিয়েছি সেটি তারা মনে রাখবে আজীবন। এই কথার পিঠে অবধারিতভাবে প্রশ্ন ওঠে, এই দেওয়ার বিনিময়ে বাংলাদেশ পেলো কি? ২০১৮ সালের ২৬ মে দুই দিনের ভারত সফরের সময় ভারতের আনন্দবাজার পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয় ‘বাংলাদেশ ভারতের কাছে প্রতিদান চায়’। এই সফর শেষে দেশে ফিরে প্রধানমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলন করলে সেখানে তাকে প্রশ্ন করা হয় তিনি কোনও প্রতিদান চেয়েছেন কিনা। এর উত্তরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি কোনও প্রতিদান চাই না। প্রতিদানের কী আছে? আর কারও কাছে পাওয়ার অভ্যাস আমার কম। দেওয়ার অভ্যাস বেশি।’ কথাগুলো ব্যক্তিগত পর্যায়ে শুনতে যত মধুরই লাগুক না কেন, দুই রাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্ক আদতে নির্ধারিত হয় বাণিজ্যিক, রাজনৈতিক, কৌশলগত, ভূ-রাজনৈতিক নানা দেনা-পাওনার নিরিখে। দুই রাষ্ট্রের সম্পর্ক কোনও চ্যারিটি নয় যে ‘আমার এই দিয়ে যাওয়াতেই আনন্দ’ রীতিতে চলবে। সুতরাং প্রতিবার দুই দেশের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সফর শেষে যখন বাংলাদেশের মানুষ দেনা-পাওনার হিসাবের খাতা খুলে বসে, তখন হতাশ না হয়ে পারে না।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর এবারের ভারত সফরটিও এর কোনও ব্যতিক্রম হবে এমনটি কেউ আশা করেনি। এবার স্বাক্ষরিত হয়েছে ৭টি সমঝোতা স্মারক। এরমধ্যে আছে কুশিয়ারা নদীর পানি প্রত্যাহার, রেলের আধুনিকায়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি, বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা, বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের সঙ্গে ভোপাল জুডিসিয়াল অ্যাকাডেমির মধ্যে একটি সমঝোতা এবং মহাকাশ গবেষণাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়া। সত্যি বলতে গত ১৪ বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশের মানুষের প্রত্যাশাও এর বেশি কিছু ছিল না। দেশের মানুষের জন্য সত্যিকার অর্থে এই সরকার ভারত থেকে কিছু আনতে পারবে বা দেশের মানুষের উদ্বেগের জায়গাগুলো সঠিকভাবে অন্তত তুলে ধরবে, সেই আশা দেশের মানুষ করে না।

এই সরকার বিভিন্ন সময় দাবি করেছে ভারতের সঙ্গে অনেক চুক্তি তারা করেছে। চুক্তি আসলে তিন রকম হতে পারে। এক–দেশের স্বার্থ রক্ষা করে, দুই–ভারতের স্বার্থে দেশের মানুষের বিপক্ষে এবং তিন–যে চুক্তি আসলে পক্ষে বা বিপক্ষে কোনোটাই নয়। এ পর্যন্ত যত চুক্তি হয়েছে তার অধিকাংশই হয় ভারতের স্বার্থে কিংবা দেশের পক্ষ-বিপক্ষের কোনোটাই নয়, অর্থাৎ ‘নিরামিষ’ চুক্তি।

এবারে যেসব সমঝোতা সই হলো সেটাও ‘নিরামিষ চুক্তি’র এক অনন্য উদাহরণ। এর আগে শেষ তিন শীর্ষ বৈঠকে বাংলাদেশের প্রাপ্তি ছিল দুই দেশের সীমান্ত হাট স্থাপনে সমঝোতা, বিচার বিভাগের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা বৃদ্ধি, নেভিগেশন সহায়তা, গণমাধ্যমের ক্ষেত্রে সহায়তা, অডিও-ভিজুয়াল কো-প্রডাকশন, সাংস্কৃতিক কার্যক্রম বিনিময়, বিবেকানন্দ ভবন, বরিশালে সুয়ারেজ প্রকল্পের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, লাস্ট বাট নট দ্য লিস্ট হাতি সুরক্ষায় অভয়ারণ্য নিশ্চিত করা।

ক্ষমতাসীনদের বয়ান প্রতিষ্ঠার দায়িত্বপ্রাপ্ত বাংলাদেশের কিছু তথাকথিত বুদ্ধিজীবী আর ‘সুশীল’ সমাজের বাইরে সাধারণ মানুষের কেউ প্রত্যাশা করেনি যে এই সরকার মাথা উঁচু করে তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা আদায় করবে, সীমান্ত হত্যা বন্ধের জন্য শক্ত চাপ দেবে, রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের পক্ষে থাকার জন্য ভারতকে বলবে, বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনার জন্য কোনও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করবে, শুল্ক অশুল্ক বাধা দূরীকরণের প্রস্তাব দেবে কিংবা লাইন অব ক্রেডিট থেকে অর্থ ছাড়ের চাপ দেবে। বাংলাদেশের মানুষের মূল উদ্বেগের একটি বিষয়ও জায়গা করতে পারবে সমঝোতায়, এমনটি কেউ মুহূর্তের জন্যও চিন্তা করেনি।

মজার বিষয় হলো, কিছু না পেয়েও আমাদের দেশের গণমাধ্যম যেমন অস্থির হয়ে এই সফর নিয়ে লিড নিউজ করেছে, ভারতের গণমাধ্যমে কিন্তু তেমনটি দেখা যায়নি। ভারতের আনন্দবাজার, দ্য হিন্দু মাপের কোনও পত্রিকার প্রথম পাতায় লিড নিউজ হওয়ার সৌভাগ্য হয়নি এই সফরের। তবে একেবারে কিছুই কি পায়নি ৪ দিনের এই সফর? কিছু পায়নি বললে ভুল হবে।

বেশিদিন আগের কথা না, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন সারা দেশে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন। চট্টগ্রাম শহরের জে এম সেন হলে জন্মাষ্টমী উৎসবের এক অনুষ্ঠানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমাদের জানান, ভারত সফরে গিয়ে তিনি তাদের অনুরোধ করেছেন– ‘শেখ হাসিনাকে টিকিয়ে রাখতে হবে। শেখ হাসিনা আমাদের আদর্শ। তাকে টিকিয়ে রাখতে পারলে আমাদের দেশ উন্নয়নের দিকে যাবে এবং সত্যিকারের সাম্প্রদায়িকতামুক্ত, অসাম্প্রদায়িক একটা দেশ হবে। শেখ হাসিনার সরকারকে টিকিয়ে রাখার জন্য যা যা করা দরকার, আমি ভারতবর্ষের সরকারকে সেটা করতে অনুরোধ করেছি।’ তার এই বক্তব্যে চারপাশে ঢিঢি পড়ে গেলে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য আব্দুর রহমান আমাদের জানান যে বিদেশমন্ত্রী আওয়ামী লীগের কেউ নন। পরে আব্দুল মোমেনকে তার এ বক্তব্য সরল মনে বা মুখ ফসকে দেওয়া হয়েছে নাকি তিনি দায়িত্ব নিয়ে বলেছেন-এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি ঢাকা টাইমসকে বলেন, “আমি জেনে বুঝেই বলেছি। আমি আমার বক্তব্য থেকে সরছি না। আমি ভুল কিছু বলিনি।” সঙ্গে তিনি আরও যুক্ত করেন “আমি আরও বলবো।”

ড. মোমেনকে তাঁর এই সত্য ভাষণের জন্য ধন্যবাদ দিয়ে কলাম লিখেছিলাম আমি। যে অপ্রিয় সত্য সকলেই জানেন কিন্তু স্বীকার করতে পারেন না, সেই সত্য অকপটে বলেছেন তিনি। এমনকি সেই বক্তব্যে নিজেকে ‘ভারতের দালাল’ বলতেও একমুহূর্ত দ্বিধা করেননি তিনি। একেই বলে সৎ, সাহসী, সত্য উচ্চারণে অকুতোভয়। অবশ্য এই সত্য বলার মাশুলস্বরূপ পদ না হারালেও প্রধানমন্ত্রীর এবারের ভারত সফরসঙ্গী হওয়া থেকে শেষ মুহূর্তে বাদ পড়ে যান তিনি।

২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে আগে ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিংয়ের দৌড়ঝাঁপ, জাতীয় পার্টিকে নির্বাচনে আসতে বাধ্য করা এবং বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় হওয়া একটা নির্বাচনকে জায়েজ করার চেষ্টা খুব ভালোভাবে নেয়নি এ দেশের মানুষ। এছাড়াও পররাষ্ট্রমন্ত্রী সালমান খুরশিদের বই ‘The Other side of the Mountain’ কিংবা রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির বই ‘The Qualiation Years’ সাক্ষ্য দেয় ওই সময় বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকারকে টিকিয়ে রাখার জন্য ভারত ঠিক কি কি করেছে।

জনভিত্তি খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোনও সরকারের যখন সেটা থাকে না তখন আন্তরাষ্ট্রীয় স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দরকষাকষির জায়গায় তার অবস্থা এমনিতেই দুর্বল থাকে। তার ওপর দরকষাকষির ক্ষেত্রটি যদি হয় এমন, কোনও দেশ যেটি খোলাখুলিভাবে একটি বিশেষ সরকারকে বারবার ক্ষমতায় আনার এবং রাখার ব্যাপারে মুখ্য ভূমিকা পালন করে তবে তো কথাই নেই। তাই এবারের ভারত সফরে ৭টি অনুল্লেখযোগ্য সমঝোতার বাইরে গিয়ে পর্দার আড়ালে আওয়ামী লীগ সরকার যদি ভারত থেকে তাদের জন্য অতি উল্লেখযোগ্য কোনও আশ্বাস নিয়ে ফিরতে পারে, তবে দেশের জন্য এই সফর যতই বিফল হোক, আওয়ামী লীগের জন্য কি অতি সফল এক সফর নয়?

লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট। সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপি দলীয় হুইপ।

Print Friendly, PDF & Email
 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ