নাগিনীরা চারিদিকে ফেলিতেছে বিষাক্ত নিঃশ্বাস
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
মঙ্গলবার, আগস্ট ১৩, ২০২৪ ১২:৪৯ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
মঙ্গলবার, আগস্ট ১৩, ২০২৪ ১২:৪৯ অপরাহ্ণ

মোবায়েদুর রহমান
প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের ভাষায় বাংলাদেশ দ্বিতীয়বার স্বাধীনতা লাভ করলো গত ৫ আগস্ট সোমবার। ড. ইউনূস এই দ্বিতীয় স্বাধীনতাকে বাংলাদেশের পুনর্জন্ম বলেও আখ্যায়িত করেছেন। শেখ হাসিনার পলায়নের পর বাংলাদেশের ১৭ কোটি লোকের বিজয় অর্জিত হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সেই বিজয় সেই সময় সংহত এবং সুরক্ষিত ছিল না। জেনারেল এরশাদের সময় জেনারেল নূর উদ্দিন যেমন নিরস্ত্র জনতার ওপরে গুলি বর্ষণে অস্বীকার করেছিলেন এবং এই কারণে পদত্যাগ ছাড়া এরশাদের আর কোনো বিকল্প ছিল না। অনুরূপভাবে জেনারেল ওয়াকারও গণভবন ঘেরাওয়ের জন্য আগুয়ান এক কোটি লোকের ওপর গুলি বর্ষণে অস্বীকার করেছিলেন। এখন সকলেই জানেন যে একটি সামরিক হেলিকপ্টারে চড়ে পালানোর এক ঘণ্টা আগেও শেখ হাসিনা আর্মি, র্যাব এবং পুলিশকে বিপ্লবী জনতার ওপর গুলিবর্ষণের হুকুম দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, যদি এর ফলে কয়েক হাজার লোকও মারা যায় তাহলেও সেটি করতেই হবে। ঐ ক্রুশিয়াল এক ঘণ্টা সময়ে শেখ হাসিনার সামনে ছিলেন নৌ, সেনা ও বিমান বাহিনীর প্রধান এবং বিজিবি, র্যাব ও পুলিশ প্রধান। প্রধানমন্ত্রীর এই সর্বশেষ হুকুম, অর্থাৎ হাজার হাজার লোক মেরে ফেলে বিপ্লব দমনের আদেশ মানতে অস্বীকার করেন সামরিক বাহিনীর তিন প্রধান। এই পর্যায়ে নীরবে উপবিষ্ট তার বোন শেখ রেহানা তার বড় বোনকে পদত্যাগের অনুরোধ করেন। তাতেও তিনি রাজি হচ্ছিলেন না। অবশেষে আমেরিকায় অবস্থানরত শেখ হাসিনার ছেলে জয়ের সাথে মিলিটারি কমান্ডাররা যোগাযোগ করেন। জয় যখন তার মাকে বলে যে পদত্যাগ না করলে তাকে বাঁচানো সম্ভব হবে না, একমাত্র তখনই শেখ হাসিনা পদত্যাগে রাজি হন। পরের ঘটনাবলী সকলেই জানেন।
শেখ হাসিনা পালিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু তার পতনে সবচেয়ে বেশি বিচলিত হয় ভারত। মঙ্গলবার রাতে আর্মির প্রো ইন্ডিয়ান কয়েকজন সিনিয়র অফিসার এই গণবিপ্লবকে ব্যর্থ করার ষড়যন্ত্র করে। কিন্তু কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সেই ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়। তারপরেও কিন্তু পরিস্থিতি স্থিতিশীল ছিল না। কারণ, শেখ হাসিনা পালিয়ে গেছেন ঠিকই, কিন্তু তিনি তো জাতীয় সংসদ বাতিল করার জন্য প্রেসিডেন্টকে পরামর্শ দিয়ে যাননি। অতঃপর প্রেসিডেন্ট কর্তৃক জাতীয় সংসদ বাতিল করার মাধ্যমে সেই জটিলতারও অবসান হয়। তারপর প্রশ্ন ওঠে, সংবিধান তো বাতিল হয়নি। আর সংবিধানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বলেও কিছু নেই। এই জটিলতা নিরসনের জন্য সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ মোতাবেক সুপ্রিম কোর্টে রেফারেন্স পাঠানো হয়। সুপ্রিম কোর্ট রায় দেন যে বিদ্যমান পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বৈধ।
শেখ হাসিনার পুত্র সজিব ওয়াজেদ জয় গত ৯ আগস্ট রয়টার্সে প্রদত্ত এক সাক্ষাৎকারে বলেন যে, তার মা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দেননি। সুতরাং তিনি এখনো সাংবিধানিকভাবে বৈধ প্রধানমন্ত্রী। এই খবর প্রচারিত হওয়ার পর ১০ আগস্ট সকাল ১০ টার মধ্যে এই মর্মে একটি কথা দাবানলের মতো প্রচারিত হয় যে, প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে সুপ্রিম কোর্টের ফুল কোর্ট বেলা ১১ টায় বসবে এবং সেই ফুল কোর্টে রায় দেওয়া হবে যে শেখ হাসিনা পদত্যাগ না করায় এখনো তিনিই প্রধানমন্ত্রী রয়েছেন এবং ড. ইউনূসের সরকার অবৈধ। এটিকে অনেকে জুডিসিয়াল ক্যু বলে বিবেচনা করেন। বেলা ১১টার কিছু আগে বৈষম্যবিরোধী প্ল্যাটফর্মের অন্যতম সমন্বয়ক এবং বর্তমান সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ ফুল কোর্ট বাতিল করে ১০ আগস্ট দুপুর ১টার মধ্যে প্রধান বিচারপতিকে পদত্যাগ করার আল্টিমেটাম দেন। সেই আল্টিমেটাম মোতাবেক রাত ৮টা পর্যন্ত প্রাপ্ত খবরে প্রকাশ, প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান এবং সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আরো ৫ বিচারপতি পদত্যাগ করেছেন।
॥দুই॥
দৈনিক ইত্তেফাক ও দৈনিক ইনকিলাবের খবর থেকে জানা যায় যে, গোয়েন্দা বাহিনীর কাছে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির ষড়যন্ত্রের এই খবর আগে ভাগেই পৌঁছে যায় এবং তারা সরকারকে জানায়। একদিকে জুডিশিয়াল ক্যু, অন্যদিকে সামরিক বাহিনীতে অস্থিরতা সৃষ্টি করারও পরিকল্পনা ছিল তাদের। সেনাবাহিনীর মধ্যম ও নিচের স্তরের অন্তত ২৫ জন অফিসারা ১০ আগস্ট দিবাগত রাতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে বলে পরিকল্পনা ছিল। গোয়েন্দা বিভাগের রিপোর্ট পেয়ে অন্যতম সমন্বয়ক ও উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সকাল ৮টার মধ্যেই ঢাকার বিভিন্ন প্রান্তে এবং সন্নিহিত জেলাসমূহে এই ষড়যন্ত্রের বার্তা দেন। অতঃপর সকাল ১০টার আগেই হাজার হাজার ছাত্র সুপ্রিম কোর্ট ঘেরাও করে, ফুল কোর্ট সভা বানচাল করে এবং প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও চেম্বার জজ এনায়েতুর রহিমসহ সুপ্রিম কোর্টের ৬ বিচারপতিকে পদত্যাগে বাধ্য করে। এভাবে ছাত্ররা দ্বিতীয়বার বাংলাদেশকে মহা বিপর্যয় থেকে রক্ষা করেন।
এছাড়া বাংলাদেশে সর্বক্ষণ অস্থিরতা সৃষ্টি ও সেটি বজায় রাখার জন্য শেখ হাসিনাকে আপাতত ভারতে রাখা হয়েছে। ভারত ইতোমধ্যেই তাদের সেই পুরানা সংখ্যালঘু নির্যাতনের কার্ড খেলতে শুরু করেছে। কিন্তু এবার ঐ বহুবার বাজানো রেকর্ড আর জনগণকে আকৃষ্ট করতে পারছে না। তারপরেও ভারত সারাক্ষণ এই সরকারকে উৎখাতের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। সবকিছু যদি ঠিকঠাক থাকে তাহলে আগামীতে এ সম্পর্কে কিছু লেখার আশা রাখি।
এখন বলা যায় যে ড. ইউনূসের সরকার বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে মোটামুটি সিকিওরড। তিনি এবং তার মন্ত্রিসভা অবিশ্বাস্য রকম জনপ্রিয়। কিন্তু কথায় বলে না, খ্যাতির বিড়ম্বনা? এই সরকারের নিকট থেকে কোটি কোটি মানুষের প্রত্যাশা বিপুল। তাই দেখা যায় যে, বিএনপি অত্যন্ত জনপ্রিয় এবং বৃহত্তম দল হওয়া সত্ত্বেও তারা যখন তিন মাসের মধ্যে নির্বাচনের দাবি করেন তখন মানুষ সেটিকে ভালভাবে গ্রহণ করেনি। না করার কারণও আছে। শেখ হাসিনা এবং তার আওয়ামী সরকার বিগত সাড়ে ১৫ বছরে আবর্জনা এবং জঞ্জালের পাহাড় রচনা করেছেন। এই সরকারের হাত প্রথম রক্তে রঞ্জিত হয়েছে ২০০৯ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি, যখন পিলখানা বিডিআর ক্যাম্পে ৫৭ জন চৌকস আর্মি অফিসারকে হত্যা করা হয়। ঐ পিলখানায় অনেক অফিসারের পত্নীগণকে ধর্ষণ করা হয়। সেই থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণবিপ্লব বা গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত অসংখ্য মানুষকে হত্যা করেছে হাসিনার সরকার। শুধুমাত্র এই ২১ দিনে অফিসিয়াল কাউন্ট মোতাবেক ৪৭৪ জন বিপ্লবীকে হত্যা করা হয়েছে। অন্যেরা বলেন যে, আন অফিসিয়াল কাউন্টে এই মৃত্যুর সংখ্যা ১ হাজার ছাড়িয়ে গেছে।
সুতরাং এই সরকারের প্রথম কাজ হবে প্রতিটি হত্যা রেকর্ড করা। এছাড়া ৬ হাজারেরও বেশি মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। ৩৬৫ জন মানুষের চোখের দৃষ্টি চিরতরে হারিয়ে গেছে। এই আহতদের প্রত্যেকের নাম ঠিকানা রেকর্ড করতে হবে। মৃত এবং আহতদের পাশে সরকারকে দাঁড়াতে হবে এবং আহতদের চিকিৎসা খরচ দিতে হবে। এছাড়া ফাইনাল কাউন্টে মৃত্যুর যে সংখ্যা দাঁড়াবে তাদের সকলকে জাতীয় বীর ঘোষণা করে তাদের পরিবারকে মাসিক ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে এবং প্রত্যেক পরিবার থেকে অন্তত এক জনকে চাকরি দিতে হবে।
এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ১৯৭১ সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে যে ৩০ লাখ শহীদ হয়েছেন তাদের কোনো তালিকা কোনো সরকার বিগত ৫৪ বছরে প্রণয়ন করতে পারেননি। এমনকি মুক্তিযোদ্ধাদের সংখ্যা নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। মুক্তিযোদ্ধারা সরকারি ভাতা পেয়েছেন তাতে সকলেই আনন্দিত। কিন্তু যে ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছেন তাদের খোঁজ-খবর আওয়ামী লীগ রাখেনি। মুক্তিযুদ্ধে যদি কারো কোনো ত্যাগ থেকে থাকে তাহলে এই ৩০ লাখ মানুষের কোরবানি সবার প্রথমে থাকবে।
একটি কথা স্মরণ রাখা দরকার। শেখ হাসিনার সরকার বিগত সাড়ে ১৫ বছরে ছিল বিশ্বের নিকৃষ্টতম স্বৈরাচার। বিগত সাড়ে ১৫ বছরে দৈনিক ইনকিলাবের ভাষায়, লেডি ফেরাউন শেখ হাসিনা রাষ্ট্র, সমাজ ও প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে, প্রতিটি রন্ধ্রে স্বৈরাচারের অসংখ্য স্তাবক গড়ে তুলেছেন। এরা সচিবালয়ের সচিব থেকে উচ্চ আদালতের বিচারপতি, পুলিশ, র্যাব, বিজিবিসহ সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের সর্বোচ্চ পদ থেকে মধ্যম স্তর পর্যন্ত দখল করে আছেন। স্বৈরাচারের প্রশাসন দিয়ে গণবিপ্লব বা গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত সরকারের প্রশাসন চালানো সম্ভব নয়।
॥তিন॥
এর আগেই বলেছি, এই সাড়ে ১৫ বছরে অনেক আবর্জনা ও জঞ্জালের পাহাড় সৃষ্টি হয়েছে। শুধুমাত্র গণতন্ত্রকে যে হত্যা করা হয়েছে তাই নয়, আয়নাঘরসহ অসংখ্য বন্দিশালায় হাজার হাজার মানুষকে বছরের পর বছর বিনা বিচারে আটকে রাখা হয়েছে এবং ভয়াবহ নির্যাতন করা হয়েছে। ৬০০ মানুষকে গুম করে খুন করা হয়েছে। একটি মাত্র লেখায় সেই ফিরিস্তি দেওয়া যাবে না। লক্ষ কোটি টাকা পাচার, লক্ষাধিক কোটি টাকার ঋণ খেলাপ, লক্ষ লক্ষ টাকার দুর্নীতির বিচার করতে হবে এবং ঐ সব টাকা উদ্ধার করতে এবং ফেরত আনতে হবে। অস্যংখ্য মানুষকে জেল দেওয়া হয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার খোদ ব্রিটিশ সুপ্রিম কোর্টেই প্রশ্নবিদ্ধ। বাংলাদেশে ঐসব বিচারের রিট্রায়ালের প্রশ্নও উঠতে পারে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, কোটি কোটি সাধারণ মানুষ চায় রকেটের গতিতে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি শুধুমাত্র রুখে দেওয়া নয়, সেই দ্রব্যমূল্য হ্রাস করা এবং সিন্ডিকেট ভেঙ্গে দেওয়া। এস আলমদের মতো মানুষদের ইসলামী ব্যাংক গ্রাস করার এবং সেই গ্রাস থেকে ইসলামী ব্যাংকসহ অন্তত ৬টি ব্যাংককে বের করে আনা।
আজকের একটি মাত্র লেখায় সাড়ে ১৫ বছরের জঞ্জালের ফিরিস্তি দেওয়া সম্ভব নয়। অবিলম্বে এই সরকারকে দুইটি কাজ করতে হবে। একটি হলো সাম্প্রতিক গণবিপ্লব বা গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের খতিয়ানসহ বিষয়টির ওপর একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করা। আরেকটি হলো ২০০৯ সালের ৫ জানুয়ারি শেখ হাসিনার ক্ষমতাগ্রহণ থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত মোট ১৫ বছর ৭ মাস সময়ে আওয়ামী সরকার তথা হাসিনা শাহীর সব ধরনের অপকীর্তি, দুঃশাসন, হত্যাকাণ্ড, লুণ্ঠন, অর্থপাচার, বাক ও ব্যক্তি স্বাধীনতার টুটি চেপে ধরা, ভারতের কাছে সার্বভৌমত্ব বিসর্জনসহ সব ধরনের দুষ্কৃতির ওপর আরেকটি শ্বেতপত্র প্রকাশ।
পতিত স্বৈরাচার ইতোমধ্যেই অশুভ মাথা তোলা শুরু করেছে। তাই দেখা যায় যে, এই ২১ দিনের গণঅভ্যুত্থানে হাসিনার সংঘঠিত জুলুম এবং রক্তপাতকে পাশ কাটিয়ে শুধুমাত্র ৫ আগস্টের পরের কয়েকটি ঘটনা নিয়ে শোরগোল তোলা হচ্ছে। সেই শোরগোলের উৎপত্তি কোথা থেকে হচ্ছে সেটি বোঝা কঠিন নয়। ভারতীয় গণমাধ্যমে একবার নজর বুলান। বুঝবেন সবকিছু। এদের সম্পর্কে হুঁশিয়ার। এদেরকে লক্ষ করেই রবীন্দ্রনাথ বলেছেন,
নাগিনীরা চারি দিকে ফেলিতেছে বিষাক্ত নিঃশ্বাস,
শান্তির ললিত বাণী শোনাইবে ব্যর্থ পরিহাস।
journalist15@gmail.com
জনতার আওয়াজ/আ আ