প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে তারেক রহমান: দ্য ইকোনমিস্ট
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
মঙ্গলবার, ফেব্রুয়ারি ৩, ২০২৬ ১০:৫৩ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
মঙ্গলবার, ফেব্রুয়ারি ৩, ২০২৬ ১০:৫৪ অপরাহ্ণ

জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান শীর্ষ অবস্থানে রয়েছেন বলে উল্লেখ করেছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রভাবশালী সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন দ্য ইকোনমিস্ট।
সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) প্রকাশিত ম্যাগাজিনটির সর্বশেষ সংখ্যায় ছাপা এক বিশ্লেষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, খ্যাতনামা রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান ৬০ বছর বয়সী তারেক রহমান আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া সাধারণ নির্বাচনের পর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সবচেয়ে শক্ত দাবিদার।
বিশ্লেষণে বলা হয়, ১৮ মাস আগে সংঘটিত একটি ‘বিপ্লব’-এর পর এই নির্বাচন হতে যাচ্ছে দেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচন। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ওই সময় ‘জেনারেশন জেড’-এর নেতৃত্বে আন্দোলনের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটে, যা হত্যাযজ্ঞ ও দুর্নীতিতে পরিপূর্ণ ছিল।
দ্য ইকোনমিস্ট লিখেছে, এই নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরবে এবং ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের টানাপোড়েনপূর্ণ সম্পর্কের মেরামত শুরু হতে পারে।
তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে এই পূর্বাভাস এসেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক টাইম ম্যাগাজিন ও ব্লুমবার্গসহ একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত অনুরূপ বিশ্লেষণের পর।
ম্যাগাজিনটি গত ২৫ ডিসেম্বর তারেক রহমানের দেশে ফেরার ঘটনার বর্ণনা দিয়ে লিখেছে, বুলেটপ্রুফ বাসে করে ফেরার সময় উচ্ছ্বসিত সমর্থকেরা রাস্তায় নেমে আসেন। ফলে বাসটি কয়েক মাইল পথ ধীরে চলছিল, যেন অপেক্ষমাণ সমর্থকেরা তাকে ভালোভাবে দেখতে পারেন।
দ্য ইকোনমিস্ট মন্তব্য করেছে, ২০০৮ সালের পর বাংলাদেশে আর কোনো ‘যথাযথ’ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়নি। প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের প্রায় ১২ কোটি ৮০ লাখ ভোটারের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ কখনো প্রকৃত অর্থে ভোট দেওয়ার সুযোগ পায়নি।
নিরাপত্তা বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইপিএসএস-এর শাফকাত মুনিরকে উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়, তার জীবনের প্রায় দুই দশক ধরে তার ভোটের কোনো মূল্য ছিল না। তিনি আরও বলেন, বর্তমানে রাজধানীর রাস্তাঘাটজুড়ে নির্বাচনী ব্যানার দেখা যাচ্ছে, যা অতীতে ছিল না।
বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়, নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্র্বর্তী সরকারের জন্য এই নির্বাচন তত্ত্বাবধান করাই হবে শেষ বড় দায়িত্ব। তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অধিকাংশ মানুষ একমত যে এই সরকার দেশের অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করতে সক্ষম হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অন্তর্র্বর্তী সরকার রাজনীতিকদের সঙ্গে সমন্বয় করে এমন কিছু সংস্কার প্রস্তাব তৈরি করেছে, যা ভবিষ্যতে স্বৈরতন্ত্রে পতন ঠেকাতে সহায়ক হতে পারে। এসব প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে নতুন একটি উচ্চকক্ষ গঠন এবং প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছরে সীমিত করা।
জামায়াতে ইসলামী প্রসঙ্গে দ্য ইকোনমিস্ট লিখেছে, দলটি নির্বাচিত হলে ‘সব বাংলাদেশির জন্য সংযতভাবে শাসন করবে’ বলে দাবি করলেও তাদের অগ্রগতি শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেণির মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে।
বিশ্লেষণে আরও বলা হয়, দলটি এবারের নির্বাচনে একজনও নারী প্রার্থী দেয়নি। পাশাপাশি, যে দলটি অতীতে কখনও সংসদে ১৮টির বেশি আসন পায়নি, তারা দেশ পরিচালনার জন্য যথেষ্ট অভিজ্ঞ কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়, এসব পরিস্থিতি তারেক রহমানের জন্য একটি বড় সুযোগ তৈরি করেছে, কারণ জনমত জরিপে তার নেতৃত্বাধীন বিএনপি এগিয়ে রয়েছে।
দ্য ইকোনমিস্ট স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, দীর্ঘ সময় ধরে দলটি পরিচালিত হয়েছে তার প্রয়াত মা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মাধ্যমে। তার আগে বিএনপির নেতৃত্বে ছিলেন তার বাবা, বাংলাদেশের একজন সাবেক প্রেসিডেন্ট, যিনি ১৯৮১ সালে নিহত হন। খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি ১৯৯০ ও ২০০০-এর দশকে তিন দফা রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে।
ম্যাগাজিনটি লিখেছে, তারেক রহমান বিস্তারিত পরিকল্পনা প্রকাশ না করলেও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, নির্বাচিত হলে তার সরকার বিনিয়োগকারীদের সহায়তা করবে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে। একই সঙ্গে আরও বেশি তরুণ বাংলাদেশিকে প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরির উপযোগী করে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি পানির সংকট মোকাবিলায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন এবং প্রতিবছর ৫ কোটি গাছ লাগানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তিনি ভালোভাবে কাজ করতে পারবেন। তার ভাষায়, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট দক্ষ ও বাস্তববাদী এবং একজন ব্যবসায়ী।
দ্য ইকোনমিস্ট আরও লিখেছে, তারেক রহমান বলেছেন, তার সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ২০২৪ সালে বিক্ষোভকারীদের হত্যার সঙ্গে জড়িতদের বিচার হতে হবে। তবে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার তিনি করবেন না।
প্রতিবেদনে বলা হয়, তারেক রহমানের যুক্তি হলো, ২০২৪ সালের বিপ্লব দেখিয়েছে যে যেসব সরকার জনগণের জন্য কার্যকর কোনো কর্মসূচি রাখে না, তাদের পরিণতি কী হতে পারে। তিনি বলেন, প্রতিশোধপরায়ণ মনোভাব কারও জন্যই ভালো ফল বয়ে আনে না।
দেশে ফেরার পর থেকে তিনি জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী অনেক কথাই বলছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তবে এখনো অনেকেই ‘অফ দ্য রেকর্ড’ কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, কারণ যদি অন্য পক্ষ ক্ষমতায় আসে, সেই আশঙ্কা তাদের মধ্যে রয়েছে।
সবশেষে দ্য ইকোনমিস্ট লিখেছে, পর্যবেক্ষকদের মতে, লন্ডন থেকে ফিরে আসা এই তারেক রহমানকে আগের তুলনায় অনেকটাই ভিন্ন মনে হচ্ছে।
সূত্র: বাসস
জনতার আওয়াজ/আ আ