বাংলার আকাশ থেকে খসে পড়া এক নক্ষত্র ডা. জাফরুল্লাহ - জনতার আওয়াজ
  • আজ ভোর ৫:১৩, শুক্রবার, ১৫ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১লা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৮শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

বাংলার আকাশ থেকে খসে পড়া এক নক্ষত্র ডা. জাফরুল্লাহ

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: বুধবার, এপ্রিল ১২, ২০২৩ ৬:২৬ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: বুধবার, এপ্রিল ১২, ২০২৩ ৬:২৬ অপরাহ্ণ

 

আবদুল্লাহ কাফি

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। খুব পরিচিত, জানাশোনা এক নাম। পত্রিকা, টিভি চ্যানেলে চোখ রাখেন কিন্তু ডা. জাফরুল্লাহকে চেনেন না, এমন মানুষ পাওয়া দুষ্কর। কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না থেকেও দেশের মানুষের জন্য নানা সময়ে নানা কারণে শিরোনাম হয়েছেন তিনি। মানুষের জন্য তিনি বার বার হাজির হয়েছেন শাহবাগে, মিছিলে, হাইকোর্টে। হয়রানিসহ নানা ঝুট ঝামেলাতেও পড়তে হয়েছে তাকে। কিন্তু কখনও পিছ পা হননি তিনি। ‘গরীবের ডাক্তার’ জাফরুল্লাহ সব সময় অনড় থেকেছেন মজলুমের পক্ষে।

এই পরিচয়ের বাইরে জাফরুল্লাহ চৌধুরীর আরো বড় পরিচয় আছে। তিনি একজন ডাক্তার। গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্টি। বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। এতো পরিচয়ের পরও সহজ, সরল, সৎ এবং নির্লোভী একটা জীবন কাটিয়েছেন ডা. জাফরুল্লাহ। সাহসী, আপোষহীন এই সংগঠক মারা গেছেন গতকাল। মঙ্গলবার রাত এগারোটায় রাজধানীর ধানমন্ডিতে নিজের গড়া প্রতিষ্ঠান গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

৮১ বছর বয়সে মৃত্যু বরণ করা জাফরুল্লাহ চৌধুরী জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪১ সালের ২৭ ডিসেম্বর। চট্টগ্রামের রাউজানে তার জন্ম। পরিবারের দশ ভাই বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। ঢাকার বকশীবাজারের নবকুমার স্কুল থেকে তিনি মেট্রিকুলেশন এবং ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট শেষ করেন। ১৯৬৪ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস শেষ করে লন্ডনের রয়্যাল কলেজ অব সার্জসে যান এফআরসিএস পড়তে।

রয়্যাল কলেজ অব সার্জনস-এ তখন পড়াশোনা করছেন জাফরুল্লাহ। আর কিছুদিন পর ফাইনাল পরীক্ষা। তখনই শরু হলো বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ। তিনি পড়াশোনার চূড়ান্ত পর্ব শেষ না করে ভারতে ফিরে আসেন। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে আগরতলার মেলাঘর প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে নেন গেরিলা প্রশিক্ষণ। প্রশিক্ষণ শেষে ডা. এম এ মবিনের সাথে মিলে সেখানেই গড়ে তুলেন ৪৮০ শয্যাবিশিষ্ট বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল।

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর স্কুল জীবনের সহপাঠী ও পরবর্তীকালে ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালের পরিচালনা পর্ষদের প্রধান ডা: মাহমুদুর রহমান বলেন, চিন্তায় সৎ থেকে দেশের জন্য যেটা ভালো মনে হতো সেটাই করেছেন জাফরুল্লাহ চৌধুরী। ঢাকা মেডিকেল কলেজে পড়াকালীন কলেজের দুর্নীতি নিয়ে সোচ্চার হয়ে আলোচনায় আসেন জাফরুল্লাহ। পরে কলেজ ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি।

মাহমুদুর রহমান বলেন, ঢাকা মেডিকেলে পড়ার সময় থেকেই স্বাস্থ্যখাতের জন্য ভালো কিছু করতে সবসময় একরোখা ছিলেন তিনি। ছিলেন নিজ আদর্শে অটল। ডাক্তারি পাশের পর আমরা দুজনই যুক্তরাজ্যে যাই। সেখানে থাকা অবস্থায় সার্জারিতে কাজ করে সার্জন হিসেবে বেশ সুনাম অর্জন করে সে। যুদ্ধের আগের সময়টাতে আমরা দেশ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ি। পরে সে সক্রিয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেয়।

১৯৬৪ সালে এমবিবিএস পাস করে জাফরুল্লাহ চৌধুরী যখন লন্ডন যান, তখন তার জীবনযাপন ছিল রাজকীয়। প্রাইভেট জেট চালানোর লাইসেন্স ছিল। দামি স্যুট, টাই, শার্ট, জুতা পরতেন। দেশের গরীব মানুষ তো না-ই, দেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ের ভাবার প্রয়োজন ছিলো না তার। তিনি লন্ডনেই থেকে যেতে পারতেন। গড়তে পারতেন বিরাট অট্রালিকা। কিন্ত জাফরুল্লাহ চলে আসলেন এই গরীবের দেশে, যুদ্ধের মাঠে।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ঢাকার ইস্কাটনে পুনঃস্থাপিত হয় বাংলাদেশ ফিল্ড হাসপাতাল। পরবর্তীতে ১৯৭২ সালে গ্রামকে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু রূপে গড়ে তোলার জন্য ‘চল গ্রামে যাই’ স্লোগানে হাসপাতালটি স্থানান্তরিত করা হয় সভারে। তখন এর নামকরণ করা হয় ‘গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র’। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পছন্দে এই দেওয়া হয়। এই হাসপাতালটি মোট ২৮ একর জমির ওপর স্থাপন করা হয়। এর মধ্যে ২৩ একর জমি জাতির পিতা সরকারি খাস জমি থেকে দান করেন। বাকি অংশ জাফরুল্লাহ চৌধুরীর বন্ধু ডা. মাহমুদুর রহমানের মা জহুরা বেগম দান করেন।

ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বাংলাদেশের নায়ক, আইকন। সারাটা জীবন কাটিয়েছেন কারো তোয়াক্কা না করে। দেশের গরিব মানুষের জন্যে যে হাসপাতাল নিজে গড়েছেন, মৃত্যু পর্যন্ত তিনি সে হাসপাতালেই চিকিৎসা নিয়েছেন। অন্য কোনো হাসপাতালে যাননি। চিকিৎসার জন্য তাকে যেন বিদেশে নেওয়া না হয়, জ্ঞান থাকাবস্থায় এই নির্দেশনাও দিয়ে গেছেন।

এর আগে করোনা মহামারিতে কোভিড আক্রান্ত হন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। তখন গণস্বাস্থ্য নগর হাসপাতালে চিকিৎসা চলছিল তার। আরো ভালো চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেলে তার জন্য ভিআইপি রুম প্রস্তুত করা হয়। কিন্তু তিনি যেতে রাজি হননি। তিনি যুক্তি দিয়ে বলেন, যে হাসপাতাল তৈরি করলাম, সেখানে যদি নিজে আস্থা না রাখি, সাধারণ মানুষও আস্থা রাখবে না।

এর আগে যখন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর কিডনি রোগ ধরা পড়ে, তার আমেরিকান ডাক্তার বন্ধুরা তাকে আমেরিকায় নিয়ে ট্রান্সপ্লান্ট করে দেওয়ার উদ্যোগ নিলেন। তাতেও তিনি রাজি হননি। কারণ বাংলাদেশে কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট আইন পরিবর্তনের জন্য তিনি আন্দোলন করছিলেন। বাংলাদেশের আইন বলে, আত্মীয় ছাড়া কেউ কিডনি দান করতে পারবে না। কিন্তু জাফরুল্লাহ চৌধুরী ভাবনা সব সময়ই আলাদা। তিনি বলেন, এই আইন পরিবর্তন না করলে অনাত্মীয়কে আত্মীয়ের মিথ্যা পরিচয়ে কিডনি নিতে হয়। এতে গরিব মানুষ সেবা থেকে বঞ্চিত হয়। দেশের সাধারণ মানুষ কিডনি ট্রান্সপ্লান্টের সুযোগ পাবে না, আর আমি আমেরিকা থেকে করে আসব বা দেশে মিথ্যা কথা বলে করতে হবে, তা হয় না। আমি ট্রান্সপ্লান্ট করব না। ডায়ালাইসিস করব, যে সেবা গরিব মানুষকেও দিতে পারব।

এমনই মানুষ ছিলেন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই তার নেতৃত্বে দেশের কল্যাণে কাজ করে আসছে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র। স্বল্প মূল্যে সারাদেশে সেবা দেওয়ার পাশাপাশি সর্বাধিক যে বিষয়ে অবদান রাখছে, তা হলো কিডনি রোগীদের ডায়ালাইসিস সেবা। উপমহাদেশের সবচেয়ে বড় ডায়ালাইসিস সেন্টারটি গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের। রাজধানীর ধানমন্ডিতে স্থাপিত এই সেন্টারে রয়েছে ৩০০টি বেড। আর ডায়ালাইসিস মেশিন রয়েছে ১৩৫টি।

সারাদেশে বর্তমানে গণস্বাস্থ্যের ৪০টি মেডিকেল সেন্টার রয়েছে। এর অধীনে রয়েছে ৭টি হাসপাতাল, ডেন্টাল কলেজ, গণ বিশ্ববিদ্যালয়, প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিকেশন্স, মাসিক গণস্বাস্থ্য ম্যাগাজিন, বেসিক কেমিক্যাল কারখানা (দেশের সবচেয়ে বড় প্যারাসিটামল কাঁচামাল উৎপাদক প্রতিষ্ঠান) গণস্বাস্থ্য ফার্মাসিউটিক্যালস, অ্যান্টিবায়োটিকের কাঁচামালের ফ্যাক্টরি। এছাড়াও সারাদেশে রয়েছে ৪৩টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র, মেয়েদের ড্রাইভিং স্কুল, ভেটেরিনারি ফার্ম, রোহিঙ্গাদের জন্য ১৫টা মেডিকেল ক্যাম্প, এগ্রিকালচারাল ফার্ম ও ওয়েল্ডিং অ্যান্ড ইলেকট্রিক্যাল ফার্ম।

১৯৭৭ সালে সর্বোচ্চ জাতীয় পুরস্কার ‘স্বাধীনতা পদক’ লাভ করে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে। এছাড়া ১৯৮৫ সালে ম্যাগসাসে পুরস্কার, ১৯৯২ সালে সুইডেন থেকে রাইট লাইভহুড পুরস্কার ও ২০০২ সালে বার্কলি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইন্টারন্যাশনাল হেলথ হিরো পুরস্কার লাভ করে।

তবে বাস্তবতা বড় কঠিন। কিডনি রোগীর ভরসাস্থল গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র। এখান থেকে কিডনি রোগ থেকে মুক্তি পেয়েছেন হাজার হাজার মানুষ। সবসময় সাশ্রয়ী মূল্যে স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হয় সেই গণস্বাস্থ্য হাসপাতালের প্রতিষ্ঠাতাই মারা গেলেন কিডনি জটিলতায় ভুগে!

মহান এই নক্ষত্রের বিদায়ে দেশের যে ক্ষতি হলো, তা গুচবে না কোনোদিন। আজীবন এই ক্ষতির ক্ষত বয়ে বেড়াবে দেশ। বাংলার আকাশ থেকে খসে পড়া হে নক্ষত্র! ভালো থাকুন ওপাড়ে।

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ