বেগম খালেদা জিয়া: গণতন্ত্রের অপরিহার্য শক্তি - জনতার আওয়াজ
  • আজ রাত ১০:১৪, শুক্রবার, ১৫ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১লা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৮শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

বেগম খালেদা জিয়া: গণতন্ত্রের অপরিহার্য শক্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: শুক্রবার, অক্টোবর ২৭, ২০২৩ ১২:৩৭ পূর্বাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: শুক্রবার, অক্টোবর ২৭, ২০২৩ ১২:৪০ পূর্বাহ্ণ

 

মো: হারুন-অর-রশিদ

বেগম খালেদা জিয়া একটি নাম। একটি প্রতিষ্ঠান। আজকের বাস্তবতায় খালেদা জিয়া এক লাখ ৪৭ হাজার ৫৭০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের কাছে জীবন্ত ইতিহাস। ১৯৬০ সালে ব্যবসায়ী পিতার কন্যা ১৫ বছর বয়সী কিশোরী খালেদা খানম সেনাকর্মকর্তা জিয়াউর রহমানের সাথে বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার মধ্য দিয়ে জড়িয়ে পড়েছেন বাংলাদেশের ইতিহাসের নানা ঘটনা প্রবাহের সাথে। দেশের নানা ক্রান্তিকালে বারবার সারথির ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন।

কিশোরী খালেদা খানমের যখন বিয়ে হয় তখন হয়তো তিনি স্বপ্ন বুনতেন একজন আদর্শ গৃহবধূ হওয়ার। স্বপ্নের বীজ বুনতেই পরিণয়ের পাঁচ বছর পর ১৯৬৫ সালে স্বামীর সাথে পশ্চিম পাকিস্তানে চলে যান। ১৯৬৯ সালের মার্চ পর্যন্ত করাচিতে ছিলেন। এরপর ঢাকায় আসেন। কিছু দিন জয়দেবপুর থাকার পর জিয়াউর রহমানের পোস্টিং হলে চট্টগ্রামের ষোলশহর এলাকায় চলে যান। দেশে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। সেই যুদ্ধে রাজনৈতিক নেতৃত্ব যখন ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে পালিয়ে গেছেন, তখন সেনাবাহিনীর একজন মেজর হয়েও জিয়াউর রহমান স্ত্রী, সন্তানদের ভূতভবিষ্যৎ না ভেবে, এক প্রকার অসহায় অবস্থায় রেখে রাজনৈতিক নেতৃত্বের শূন্যতা পূরণ করার জন্য নিজেই স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে পাকিস্তানি হায়েনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে রণাঙ্গনে অস্ত্র হাতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। মুক্তিযুদ্ধের সেই বিভীষিকাময় দিনগুলোতে বেগম খালেদা জিয়া তার দুই শিশুপুত্রকে নিয়ে পালিয়ে না গিয়ে কিছু দিন আত্মগোপনে ছিলেন। তারপর ঢাকায় চলে আসেন। কিছু দিনের মধ্যেই দুই ছেলেসহ বন্দী হন পাকসেনাদের হাতে। ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলে তিনি মুক্তি পান। একজন যুদ্ধবন্দী নারী হিসেবে তিনি যেমন মুক্তিযোদ্ধা এবং তার দুই শিশুপুত্রও যুদ্ধবন্দী থাকার কারণে অবশ্যই শিশু মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযুদ্ধে জিয়া পরিবারের বিরল অবদান ইতিহাসের সোনালি অক্ষরে নিবন্ধিত হয়ে থাকবে অনন্তকাল।

বেগম খালেদা জিয়ার পুরো জীবনটাই সংগ্রামের। দেশ স্বাধীনতা লাভের কয়েক বছর পরই তিনি দেশের সেনাপ্রধান ও প্রেসিডেন্টের স্ত্রী হিসেবে বর্ণাঢ্য জীবনের অভিজ্ঞতা লাভ করেন। সিনিয়র সাংবাদিক শফিক রেহমান তার ‘সংগ্রামী নেত্রী খালেদা জিয়া’ শীর্ষক লেখায় তাকে বর্ণনা করেছেন, ‘জিয়াউর রহমান ক্ষমতাসীন হলেও লাজুক গৃহবধূরূপে তার দুই ছেলে তারেক রহমান (পিনো) এবং আরাফাত রহমানকে (কোকো) নিয়ে সাংসারিক কাজে ব্যস্ত ছিলেন।’ আবার অল্প বয়সে বিধবা হয়ে দুই সন্তানকে নিয়ে জীবন সংগ্রাম শুরু করতে না করতেই ঘরকন্নার স্বপ্ন ভেঙে দেশের প্রয়োজনে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। তেমন কোনো রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা না থাকলেও দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির হাল ধরেন তিনি। রাজনীতির ইতিহাসে কখনোই পরাজয়বরণ না করে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনবার দেশ পরিচালনায় নেতৃত্ব দেন। নীতি ও আদর্শে অটুট থাকায় তিনি আপসহীন নেত্রী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। বিএনপির চেয়ারপারসন হিসেবে তিনি একটানা ৩৯ বছর দায়িত্ব পালন করে আসছেন, যার শুরু হয়েছিল, ১৯৮২ সালের ২ জানুয়ারি বিএনপির প্রাথমিক সদস্য হিসেবে যোগদানের মধ্য দিয়ে। বিএনপির দায়িত্ব নেয়ার পরই নানা প্রতিকূলতার মুখে পড়েন তিনি। মওদুদ আহমদ তার ‘চলমান ইতিহাস: জীবনের কিছু সময় কিছু কথা’ বইতে লিখেছেন, সামরিক এবং শাসকচক্রের জন্য সবচেয়ে বড় ভয় ছিল খালেদা জিয়া। কারণ প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হওয়ার জন্য খালেদা জিয়াই সে সময় সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যক্তি হতে পারতেন।’ কিন্তু বেগম খালেদা জিয়ার কাছে ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে দলকে ঐক্যবদ্ধ রেখে এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলাই ছিল প্রধান কাজ। সেই লক্ষ্যে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত পাঁচ দফায় আন্দোলন চলতে থাকে। ওই বছর ২১ মার্চ রাতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা নিজের ওয়াদা নিজেই ভঙ্গ করে এরশাদের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু তাতেও এরশাদবিরোধী আন্দোলনে দমে যাননি বেগম খালেদা জিয়া। এরশাদের শাসনের বিরুদ্ধে কোনো রকম সমঝোতা না করেই আপসহীন আন্দোলন করে গেছেন। ১৯৮৭ সাল থেকে খালেদা জিয়া ‘এরশাদ হটাও’ একদফার আন্দোলন শুরু করেন। একটানা নিরলস ও আপসহীন সংগ্রামের পর স্বৈরশাসক এরশাদকে হটিয়ে ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা আসন পেয়ে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সরকার গঠন করে বিএনপি। ১৯৯৬ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয়বার ও ২০০১ সালে তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন তিনি। নির্বাচনের ইতিহাসে খালেদা জিয়ার একটি অনন্য রেকর্ড হচ্ছে, পাঁচটি সংসদ নির্বাচনে ২৩ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে কখনোই পরাজয়বরণ করেননি।

রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের বিষবাষ্পের কারণে ২০০৭ সালের ১ জানুয়ারি দেশের রাজনীতিতে কালোমেঘ ঘনিয়ে আসে। ক্ষমতা দখল করে ফখরুদ্দীনের নেতৃত্বে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর গ্রেফতার করা হয় বেগম খালেদা জিয়াকে। রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেয়ার জন্য বিদেশে নির্বাসনে পাঠানোর চেষ্টা করা হলেও তার আপসহীনতার কারণে ব্যর্থ হয় ষড়যন্ত্রকারীদের পরিকল্পনা। তিনি চলে যেতে পারতেন। রাজসিক জীবন কাটাতে পারতেন। কিন্তু সেটা তিনি করেননি। কারণ গৃহবধূত্বের আঁচল ছেড়ে যেদিন তিনি দেশ ও জনগণের সুখ-দুঃখের দায়িত্ব নিজ স্কন্ধে চাপিয়ে নিয়েছেন, সেদিন থেকেই তিনি শপথ নিয়েছেন আমৃত্যু দেশ ও মানুষের জন্য প্রয়োজনে নিজের জীবন বিসর্জন দেবেন। এ কারণেই তো তিনি কুশীলবদের জবাব দিয়েছিলেন, ‘বিদেশে আমার কোনো ঠিকানা নেই। এই দেশ ও দেশের জনগণই আমার ঠিকানা। আমি এই দেশ ছেড়ে কোথাও যাব না।’

১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি একজন সাধারণ গৃহবধূ থেকে রাজনীতিতে এসেছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। ১৯৮২ সালের ৮ জানুয়ারি সংবাদপত্রে এক বিবৃতিতে তিনি বলেছিলেন, ‘প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে সমগ্র জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে একটি শোষণহীন, দুর্নীতিমুক্ত, আত্মনির্ভরশীল দেশ গঠনের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল গঠন করেছিলেন। বিগত কিছুকাল যাবৎ আমি বিএনপির কার্যক্রম গভীরভাবে লক্ষ করেছি। দলের ঐক্য ও সংহতি বিপন্ন হতে পারে, এমন মনে করে আমাকে দলের দায়িত্ব নেয়ার অনুরোধ করা হয়েছে। তাই দলের বৃহত্তর স্বার্থে বিএনপিতে যোগ দিয়েছি ও দলের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী হয়েছি। দেশ ও জাতির স্বার্থে এবং শহীদ জিয়ার গড়া দলে ঐক্য ও সংহতির স্বার্থে নিঃস্বার্থভাবে কাজ করে যাওয়া আমার লক্ষ্য।’

সত্যিই তিনি যে ওয়াদা নিয়ে রাজনীতিতে এসেছেন আজ মৃত্যুর সাথে যুদ্ধ করা অবস্থায়ও সেই জায়গা থেকে বিন্দু পরিমাণও নিজেকে সরিয়ে নেননি।
বেগম খালেদা জিয়া আপসহীনতার এক বিরল দৃষ্টান্ত। তিনি ধর্মকে পুঁজি করে দেশের ধর্মপ্রাণ নিরীহ জনগণের সাথে প্রতারণা করেননি। শঠতার ছলে মাথায় হিজাব দিয়ে তসবি হাতে মানুষের হৃদয়ে মিথ্যা ও ছলনার আশ্রয় খোঁজেননি। কিন্তু ধর্মের প্রতি কি এক অসাধারণ আনুগত্যশীল মহিলা তিনি। লোভ-লালসা যেমন তাকে বশীভূত করতে পারেনি, তেমনি কোনো অন্যায়-অবিচার, জেল-জুলুম, নির্যাতন, নিপীড়ন তাকে গণতন্ত্রের পথ থেকে নিবারণ করতে পারেনি। এ কারণেই তিনি গণতন্ত্রের ‘মা’ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন। অগণতান্ত্রিক শক্তির সাথে আপস করলে তিনি হয়তো উন্নত চিকিৎসার জন্য যেখানে ইচ্ছা যেতে পারতেন কিন্তু তিনি তো খালেদা জিয়া। ফ্যাসিবাদী শক্তির সাথে আপসহীনতাই তাকে গণতন্ত্রের লৌহমানবী হিসেবে তৈরি করেছে। আজ তিনি গণতন্ত্রের এক অপরিহার্য শক্তি হিসেবে মূর্তিমান।

অপশক্তির সাথে আপস না করার কারণে কী হারাননি তিনি? স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে ১৯৮৩ সালের ২৮ নভেম্বর, ১৯৮৪ সালের ৩ মে, ১৯৮৭ সালের ১১ নভেম্বর তিনি গ্রেফতার হয়েছিলেন। ২০০৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর গ্রেফতার হয়ে দীর্ঘদিন কারাবন্দী ছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর আদালতকে ব্যবহার করে ২৮ বছরের স্মৃতিবিজড়িত ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে বলপ্রয়োগে বের করে দিয়েছে। অথচ জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আব্দুস সাত্তার সেনানিবাসের বাড়িটি তার নামে বরাদ্দ দিয়েছিলেন। বেঈমানী শক্তির নির্যাতনে বিদেশের মাটিতে ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো শহীদ হন। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার মামলায় সাজা দিয়ে পরিত্যক্ত কারাগারের নির্জন কক্ষে দীর্ঘদিন একাকী বন্দী থাকলেও কোনো অন্যায়ের সাথে আপস করেননি। কার্যত তিনি এখনো বন্দী অবস্থাতেই আছেন। বড় ছেলে তারেক রহমান দেশের মাটিতে আসতে পারছেন না। নিজে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে পারছেন না। তবুও গণতন্ত্রের স্বার্থে, মানুষের অধিকার আদায়ের স্বার্থে তিনি একচুলও আপস করতে নারাজ।

মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ একটি দেশে নারীনেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করা খুব সহজ ছিল না। এই কাজটি বেগম খালেদা জিয়া করতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি মানুষের হৃদয়ে অকৃত্রিমভাবে প্রবেশ করতে পেরেছেন, নিজ নেতৃত্বগুণে। তিনি কখনো পরাস্ত হননি। কিন্তু তার কর্মী সমর্থকরা পরাস্ত হয়েছে, পরাস্ত হয়েছে দেশের জনগণ। এরই মাঝে জনগণ হারিয়েছে গণতন্ত্র। বঞ্চিত হয়েছে সাংবিধানিক অধিকার থেকে, হারিয়েছে ভোটের অধিকার। ১৫ বছর মানুষ অধিকারের পেছনে ঘুরছে কিন্তু অধিকার ফেরৎ পাচ্ছে না। চালকের আসনে ফ্যাসিবাদ থাকলে কোনো দিনও তা পাওয়ার সম্ভাবনা থাকবে না। খালেদা জিয়ার স্বপ্ন দেশের সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র, দেশের মানুষের সাংবিধানিক সার্বভৌমত্ব। খালেদা জিয়ার এই স্বপ্ন রূপায়নে প্রয়োজনে জীবন দিয়ে হলেও আরেকটি স্বাধীনতা যুদ্ধ করতে হবে। সেই যুদ্ধে জয়ী হলেই সফল হবে বেগম খালেদা জিয়ার আপসহীনতা। মুক্তি পাবে দেশের মানুষ। গড়ে উঠবে জিয়াউর রহমানের আত্ম মর্যাদাশীল বাংলাদেশ।

harun_980@yahoo.com

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ