ভারতের বাংলাদেশ-যুদ্ধ - জনতার আওয়াজ
  • আজ বিকাল ৫:৪৬, শুক্রবার, ১৫ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১লা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৮শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

ভারতের বাংলাদেশ-যুদ্ধ

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: সোমবার, ডিসেম্বর ৯, ২০২৪ ৮:৫৭ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: সোমবার, ডিসেম্বর ৯, ২০২৪ ৮:৫৮ অপরাহ্ণ

 

মারুফ কামাল খান

লম্বা মোছঅলা ও দেখতে ভয়ঙ্কর সৈন্যদের বন্দুক হাতে গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে এগুতে থাকা কিংবা আকাশে বোমারু বিমানের গর্জন এবং সাগরে রণতরীর ছোটাছুটিই কেবল যুদ্ধ নয় আধুনিক কালে। যুদ্ধের এখন অনেক ফ্রন্ট এবং সে-সব রণাঙ্গনের সংখ্যা ও বৈচিত্র ক্রমেই বাড়ছে। সীমান্তে বাংলাদেশের নিরস্ত্র নাগরিকদের হত্যা ছাড়া ভারত এখনো আমাদের দেশের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক আক্রমণ পরিচালনা করছে না। তবে আর প্রায় সকল ফ্রন্টেই তারা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে তুমুল আক্রমণাত্মক যুদ্ধ শুরু করেছে এবং তা’ চালিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশে ভারতের অধীনতামূলক মিত্র শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসন সেনাসমর্থিত ছাত্র-গণঅভ্যত্থানে উৎখাতের পর থেকেই ভারত বহুমুখী এ যুদ্ধ শুরু করেছে। বাংলাদেশের পটপরিবর্তনের প্রতি দুনিয়ার প্রায় সব দেশ কেউ উল্লাসে এবং কেউ নীরবে সমর্থন দিলেও ভারতের পক্ষে তা’ কোনোক্রমেই মেনে নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ভারত হাসিনাকে প্রকাশ্যে তাদের দেশে আশ্রয় দিয়েছে এবং তার অপশাসনের দোসরদের এক বড়ো অংশকে নিভৃতে থাকতে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, এদেরকে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অপপ্রচার, চক্রান্ত ও তৎপরতা চালাতে ভারত তাদের ভূখণ্ডকে ব্যবহারের সুযোগ দিচ্ছে। ক্ষমতাচ্যুত এই রাজনৈতিক পক্ষের সমর্থনে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ব্যাপক বৈরী প্রচারণা চালাতে দিচ্ছে ভারত। একই ব্যাপারে তারা কূটনৈতিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পদক্ষেপও জোরদার করেছে।

ভারতীয় শাসকদল সীমান্তে এসে প্রতিবাদ-বিক্ষোভের মহড়া দিচ্ছে, বাংলাদেশের দুটি কূটনৈতিক মিশনে হামলা হয়েছে, তাদের প্রধানমন্ত্রী, অন্যান্য রাজনীতিবিদ ও ফরেন অফিস বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির অতিরঞ্জিত ব্যাখ্যার ভিত্তিতে উদ্বেগ প্রকাশের নামে চাপ বাড়িয়েছে, বিভিন্ন প্রভাবশালী রাষ্ট্রে ভারতীয় ডায়াসপোরা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে এন্তার অভিযোগ এনে নালিশ করছে, ভারতে বাংলাদেশীদের জন্য ভিসাও প্রায় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারতের এই অঘোষিত যুদ্ধ চালিয়ে তারা কী অর্জন করতে চায়? এই যুদ্ধে বাংলাদেশের যে কোনো লাভ নেই তা’ তো নিশ্চিত। কিন্তু ভারতের লাভটা কী? আমি লাভের কোনো সম্ভাবনাই দেখিনা। ভারতের পক্ষে বাংলাদেশ দখল করে নেয়া যেমন সম্ভব নয়, তেমনই একতরফা ভাবে ভারতের স্বার্থ রক্ষাকারী হাসিনাকেও ফের ক্ষমতাসীন করাটাও অসম্ভব। বর্তমান যে বাস্তবতা বিরাজ করছে তাতে বাংলাদেশ ও ভারত উভয় দেশের স্বার্থ রক্ষা একমাত্র সম্ভব এদেশে ক্ষমতাসীন সরকারের সঙ্গে দ্রুত সহযোগিতামূলক সুসম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে। এই বাধ্যবাধকতার কারণে নিজেদের স্বার্থের ব্যাপারে অতি সচেতন ও স্পর্শকাতর ভারত হাসিনার অপ্রত্যাশিত পতনে এলোমেলো হয়ে যাওয়া তাদের বাংলাদেশ-নীতিকে দ্রুত গুছিয়ে নেবে বলেই আমার বিশ্বাস।

বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে কোনো পালটা আক্রমণাত্মক ব্যবস্থা নেবে বলে আমার মনে হয় না। বাংলাদেশের ভূমিকা মূলতঃ ভারতীয় কার্যব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার মধ্যেই হয়তো সীমাবদ্ধ থাকবে। তাতে বাংলাদেশের খুব একটা ক্ষতিগ্রস্ত হবার সম্ভাবনাও নেই। আগের মতো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশকে একঘরে করা বা চাপের মুখে ফেলার সাধ্য ভারতের নেই। পরিবর্তিত বাস্তবতার কারণে কেউ নয়াদিল্লীর চোখ দিয়ে এখন আর বাংলাদেশকে দেখে না। ঢাকার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক রাখতে হয় পরাশক্তিগুলোর স্বার্থেই। তা’ছাড়া সংখ্যালঘু ও মানবাধিকার এই দুই ইস্যুতেই আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ভারতের অবস্থান বেশ নাজুক। এ নিয়ে বেশি জল ঘোলা করতে গেলে তা’ ভারতের জন্যই হিতে বিপরীত হয়ে দেখা দিতে পারে।

তবে ভারতের চাপিয়ে দেওয়া এ যুদ্ধ না লড়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকারও জো নেই। ভারতের প্রতিটি অপপ্রচারণার মোক্ষম জবাব বাংলাদেশকে সঙ্গে সঙ্গেই দিতে হবে। মিডিয়া ও কুটনীতি উভয় চ্যানেলকেই সদা সতর্ক, তৎপর ও ক্ষিপ্রগতিসম্পন্ন রাখতে হবে। আর সবচে বড়ো কাজটা করতে হবে দেশের অভ্যন্তরে। শান্তিশৃঙ্খলা অটুট রাখতে হবে। বজায় রাখতে হবে নাগরিকদের ঐক্য। দেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘু, বিশেষ করে সনাতন ধর্মাবলম্বী নাগরিকদের দাবার ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহারের যে চক্রান্ত চলছে তা অকেজো করে দিতে হবে। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারতের যে অঘোষিত যুদ্ধ সেই যুদ্ধের বিরুদ্ধে যদি হিন্দু নাগরিকদের দৃশ্যমান ভাবে সোচ্চার করা যায় তাহলে প্রতিপক্ষকে দ্রুতই রণে ভঙ্গ দিতে হবে।

এখন বাংলাদেশে, দক্ষিণ এশিয়ায় এবং বিশ্বে যে বাস্তবতা তাতে আমার মনে হয়, বাংলাদেশে যত দ্রুত সম্ভব একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের বিদায়ের মধ্যেই ভারতের সর্বোচ্চ স্বস্তি নিহিত রয়েছে। এই নির্বাচনে জাতীয়তাবাদী দল – বিএনপির জয়ের ব্যাপারটাও প্রায় অনিবার্য মনে হচ্ছে। এই বাস্তবতার আলোকে বিএনপির সঙ্গে একটি ভালো সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টাই এখন ভারতের সর্বোচ্চ কূটনৈতিক অগ্রাধিকার বলে আমার ধারণা এবং ভারত তাদের দিক থেকে নেপথ্যে সে উদ্যোগ ইতোমধ্যে শুরু করেছে বলেও মনে হয়।

বিএনপির সঙ্গে ভারতের আদপেই যদি একটা আপসরফা ও ‘ওয়ার্কিং রিলেশন’ স্থাপিত হয়ে যায় তবে সেটা সকলের জন্যই হবে কল্যাণপ্রদ। বিশাল দেশ হওয়া সত্বেও ভারতীয় নেতৃত্বের সংকীর্ণ মানসিকতার কারণে দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক সহযোগিতা আজও কার্যকর হতে পারে নি। সার্ক-কে তারা কার্যকর হতে দেয় নি। এ অঞ্চলের কোনো একটা দেশের সঙ্গেই তাদের স্বাভাবিক সুসম্পর্ক নেই। একমাত্র বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত যে নিবিড় সম্পর্ক স্থাপন করেছিল তা’ ছিল একতরফাভাবে ভারতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক এবং এর অপরপ্রান্তে ছিলেন কেবল শেখ হাসিনা। এই সম্পর্কও বাংলাদেশে হাসিনার জনবিচ্ছিন্নতার অন্যতম কারণ। হাসিনার গণবিরোধী ফ্যাসিস্ট রেজিমকে টিকিয়ে রাখতে নিঃশর্ত মদতের কারণে এদেশে ভারত-বিরোধী জনমত ক্রমেই প্রবল হয়েছে এবং হাসিনার পতনের মাধ্যমে ভারতীয় স্বার্থ পুরো বিপন্ন হতে চলেছে। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারতের অবিমৃষ্যকারী যুদ্ধ পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটিয়েছে। ইতোমধ্যে ভারত সেটা অনুধাবন করতে শুরু করেছে বলেই আমার বিশ্বাস।

ভারত এই অঞ্চল থেকে আন্তর্জাতিক মঞ্চে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে চায়। এক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে তাকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হয়। এই প্রতিযোগিতা পাশ্চাত্যের সমর্থন ছাড়া স্বাধীনভাবে করার সাধ্য তার নেই। এছাড়া প্রতিবেশীদের প্রতি সৌহার্দের বদলে বলদর্পী ভঙ্গিও তার সে স্বপ্ন পূরণের পথে এক বড় বাধা। চীন এ শতাব্দিতে হয়ে উঠেছে অর্থনৈতিক পরাশক্তি। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলিতে লগ্নি করার মতো দেদার অর্থ রয়েছে তাদের হাতে। এই অর্থশক্তির প্রতিযোগিতায় সে ভারতকে খুব সহজেই কুপোকাত করে ফেলতে পারে। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত বৈরিতা বাড়ালে তা চীন এবং ভারতের চিরশত্রু পাকিস্তানের জন্যই বেশি স্বস্তিকর হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও পাশ্চাত্য এ অনাবশ্যক লড়াইয়ে খুব একটা উৎসাহিত হবে বলেও মনে হয় না।

মারুফ কামাল খান : সিনিয়র সাংবাদিক ও লেখক, বিএনপি চেয়ারপারসনের সাবেক প্রেসসচিব।
ই-মেইল : mrfshl@gmail.com

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ