ময়মনসিংহ-১১ তৎপর বিএনপি, অন্যরাও আশাবাদী
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
সোমবার, ডিসেম্বর ১৫, ২০২৫ ৩:৫১ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
সোমবার, ডিসেম্বর ১৫, ২০২৫ ৩:৫১ অপরাহ্ণ

জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
ভালুকার শিল্প ও বনাঞ্চল অধ্যুষিত লাল মাটির পাহাড়িয়া জনপদ নিয়ে ময়মনসিংহ-১১ আসনটি গঠিত। ৩০০-এর বেশি শিল্পপ্রতিষ্ঠান নিয়ে গড়ে ওঠা ভালুকা বাংলাদেশের বার্ষিক জিডিপিতে (মোট দেশজ উৎপাদন) উল্লেখযোগ্য অবদান রেখে আসছে। বাংলাদেশে উৎপাদিত মিঠাপানির মাছ উৎপাদনেও বিশেষ ভূমিকা রয়েছে ভালুকার। শিল্পাঞ্চল হওয়ায় দেশের বিভিন্ন স্থানের প্রায় ২০ লাখ মানুষ ভালুকায় বসবাস করেন।
আওয়ামী লীগের ঘাঁটি এবং মুক্তিযুদ্ধকালের মেজর আফসার বাহিনীর সুরক্ষিত দুর্গ হিসেবে পরিচিত এই আসনে বরাবরই শক্ত অবস্থানে ছিল বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ। আসন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বিএনপি কোন্দলে জর্জরিত।
বিএনপি থেকে এখানে ভালুকা উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চু, উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মোর্শেদ আলম, স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদের সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান মামুন, জিয়া ব্রিগেড কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ব্যারিস্টার আবুল হোসেন ও উপজেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট আনোয়ারুল আজিজ টুটুল মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন। গত ৩ নভেম্বর বিএনপির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চুর নাম ঘোষণা করেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
এর পর থেকে বিএনপির গ্রুপিং আরও প্রকাশ্যে আসে। উপজেলা বিএনপির কর্মসূচি পালিত হয় আলাদা আলাদাভাবে। মোর্শেদ আলমের বলয়ে রাজনীতি করা নেতা-কর্মীরা ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চুকে মেনে নিতে পারছেন না। মোর্শেদ আলমের অনুসারীরা ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে বিক্ষোভ ও মশাল মিছিল করে ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চুর মনোনয়ন বাতিলের দাবি তুলছেন জোরেশোরে। স্থানীয় বিএনপির একাংশের নেতা-কর্মী ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চুর পক্ষে না থাকলেও তিনি আসনটি পুনরুদ্ধার করতে তৎপর রয়েছেন। দিন-রাত সভা-সমাবেশ, উঠান বৈঠকসহ বিভিন্ন কর্মসূচি দিয়ে ভোটের মাঠে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। আসনটি দখলে নিতে আদাজল খেয়ে মাঠে রয়েছে জামায়াতও। এনসিপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরাও নিজেদের মতো প্রচার-প্রচারণায় ব্যস্ত।
এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৫৪ হাজার ৩৯০। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৭৫ হাজার ৪৫৫ জন, মহিলা ভোটার ১ লাখ ৭৮ হাজার ৯৩৩ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ২ জন।
১৯৭০ ও ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রয়াত ভাষাসংগ্রামী অ্যাডভোকেট মোস্তফা এম এ মতিন এই আসনে এমপি নির্বাচিত হন। ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে এখানে এমপি নির্বাচিত হন মুসলিম লীগের প্রার্থী আফতাব উদ্দিন চৌধুরী চাঁন মিয়া। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে এমপি নির্বাচিত হন সাবেক এমপি আফতাব উদ্দিন চৌধুরী চাঁন মিয়ার পুত্র মুসলিম লীগের প্রার্থী আমান উল্লাহ চৌধুরী। ১৯৮৮ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী অবসরপ্রাপ্ত মেজর আবদুল হামিদ নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগ থেকে বিএনপিতে যোগ দিয়ে এমপি হন আমান উল্লাহ চৌধুরী। এরপর ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৮ ও ২০১৪ সালের নির্বাচনে টানা চারবার এই আসনে এমপি নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের প্রার্থী অধ্যাপক ডা. এম আমানুল্লাহ। ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে এমপি হন আওয়ামী লীগ প্রার্থী কাজিম উদ্দিন আহম্মেদ ধনু।
স্থানীয়রা জানান, এখানকার বেশির ভাগ ভোটার মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি। মহান মুক্তিযুদ্ধে মেজর আফসার উদ্দিন আহম্মেদের নেতৃত্বে সাড়ে চার হাজার সশস্ত্র এবং ২ হাজার ৫০০ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা ভালুকায় মুক্তিযুদ্ধ করেছেন এবং এলাকাকে আগলে রেখেছেন। এ কারণেই মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী এই এলাকার মানুষ আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক বলে পরিচিত। তবে দলীয় কোন্দলের কারণে স্বাধীনতার পর চারবার এই আসন আওয়ামী লীগের হাতছাড়া হয়ে যায়। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এবারের নির্বাচিন পরিস্থিতি একেবারে ভিন্ন।
এ আসনে জামায়াতের মনোনীত প্রার্থী উপজেলা জামায়াতের আমির ছাইফ উল্ল্যাহ পাঠান ফজলু, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মনোনীত প্রার্থী তানহা শান্তা, ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মুফতি মুস্তফা কামাল কাসেমী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী হাফেজ মামুনুর রশিদ খান, গণঅধিকার পরিষদের প্রার্থী অধ্যাপক আনোয়ারুল ইসলাম, গণসংহতি আন্দোলনের প্রার্থী মো. খালেদ হোসাইন। অন্য কোনো দল থেকে এ আসনে কারও নাম শোনা যায়নি।
বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চু বলেন, ‘মানুষের আপদে-বিপদে, সুখে-দুঃখে পাশে থাকি। করোনাকালে দলের নেতা-কর্মী ও সমর্থক ছাড়াও নানা শ্রেণি-পেশার মানুষকে সাধ্যমতো সহায়তা দিয়ে পাশে থেকেছি। ফলে দল আমাকে মূল্যায়ন করে মনোনয়ন দিয়েছে। জয়ের ব্যাপারে আমি শতভাগ আশাবাদী।’
জামায়াত মনোনীত প্রার্থী উপজেলা আমির ছাইফ উল্ল্যাহ পাঠান ফজলু বলেন, ‘প্রতিটি ওয়ার্ড, ইউনিয়নসহ স্থানীয় হাটবাজার, মাদ্রাসা, মসজিদ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে গণসংযোগ করছি। মানুষ সমর্থন জানাচ্ছে। সবাই পরিবর্তনের পক্ষে। জয়ী হব বলে আশা করছি।’
এনসিপি মনোনীত প্রার্থী তানহা শান্তা বলেন, ‘যে এলাকাতেই ভোট চাওয়ার জন্য যাচ্ছি, সেখানেই সাড়া পাচ্ছি। গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গড়ে ওঠা এনসিপির প্রার্থী হিসেবে মানুষ শাপলা কলি প্রতীকে ভোট দেওয়ার আগ্রহ দেখাচ্ছে।’
ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী মুফতি মুস্তফা কামাল কাসেমী বলেন, ‘মানুষ অতীতে অনেক দলকে ক্ষমতায় বসিয়ে তাদের শাসন দেখেছেন। এবারের নির্বাচনে অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে মানুষ মুক্তির আশায় বের হতে চাচ্ছেন। সে জন্য আমি মনে করি আশানুরূপ ভোট পেয়ে আমি নির্বাচিত হব।’
জনতার আওয়াজ/আ আ