যুগপৎ আন্দোলনের শরিক জোটের ডজনখানেক নেতাকে সন্দেহের চোখে রেখেছে বিএনপি - জনতার আওয়াজ
  • আজ রাত ১২:১২, শুক্রবার, ১৫ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১লা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৮শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

যুগপৎ আন্দোলনের শরিক জোটের ডজনখানেক নেতাকে সন্দেহের চোখে রেখেছে বিএনপি

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: বুধবার, মার্চ ২২, ২০২৩ ২:২০ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: বুধবার, মার্চ ২২, ২০২৩ ২:২০ অপরাহ্ণ

 

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দল ও যুগপৎ আন্দোলনের শরিক জোটের ডজনখানেক নেতাকে সন্দেহের চোখে রেখেছে বিএনপি। তাদের মধ্যে জোটের দুইজন শীর্ষ নেতা এবং বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিবসহ মধ্যমসারির নেতারা রয়েছেন। জাতীয় সরকার ইস্যুতে মতভিন্নতার কারণে এ সন্দেহ। যুগপৎ আন্দোলনে থাকা বিএনপি জানিয়েছে, নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের পর গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে থাকা সবাইকে নিয়ে জাতীয় সরকার গঠন করা হবে। অন্যদিকে দল ও জোটের কিছু নেতা চলমান সংকট নিরসনে নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তীকালীন একটি জাতীয় সরকার চান। তাদের সঙ্গে বিভিন্ন পেশাজীবী নেতা, অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তারা রয়েছেন। তবে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে কিছু নেতার এমন উদ্যোগকে সন্দেহের চোখে দেখছে বিএনপি। সে কারণে দলে শৃঙ্খলা রক্ষায় এক নেতার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থাও নিয়েছে হাইকমান্ড। এর মধ্য দিয়ে হাইকমান্ড অন্যদেরও এই বার্তা দিতে চায় যে, দলবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না, তাদের বিরুদ্ধেও অনুরূপ সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সর্বশেষ গত ১৬ মার্চ রাজধানীর এক হোটেলে ‘ন্যাশনাল কমিটি ফর সিভিল রাইটস জাতীয় ইনসাফ কায়েম কমিটি’ নামে একটি সংগঠনের ব্যানারে এক সুধী সমাবেশে নির্বাচনের আগে অন্তর্বর্তীকালীন একটি জাতীয় সরকার গঠনের দাবি করা হয়। এ ছাড়া ওই অনুষ্ঠান থেকে জাতীয় সরকার গঠনের পর সেই সরকারকে বাংলাদেশের নতুন সংবিধান প্রণয়ন এবং তার অধীনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি জানানো হয়। এই সংগঠনটির আহ্বায়ক কবি ও প্রাবন্ধিক ফরহাদ মজহার এবং সদস্য সচিব সাংবাদিক শওকত মাহমুদ, যিনি বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান। ৩৮ দলের সরকারবিরোধী যুগপৎ আন্দোলন চলাকালীন আগামী নির্বাচন সামনে রেখে এ সংগঠনের হঠাৎ ওই সুধী সমাবেশ নিয়ে বিএনপিতে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়, দলটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন করে নড়াচড়া শুরু হয়। আর এই পটভূমিতেই শওকত মাহমুদকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হলো।

সুধী সমাবেশ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সিনিয়র সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, একেক গ্রুপের একেক মত থাকতে পারে। ওই সুধী সমাবেশে বিএনপির যিনি ছিলেন দলের পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তাকে দল থেকে বাদ দিয়ে দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আগামী নির্বাচন নিয়ে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এরই মধ্যে দলের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। আমরা নির্বাচন চাই নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে। সেই নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনে বিজয়ী হলে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের আন্দোলনে থাকা দলগুলোকে নিয়ে একটি জাতীয় সরকার গঠন করতে চাই।

বিএনপির অনেক শীর্ষ নেতা মনে করছেন, বিএনপির মূল নেতৃত্বকে বাদ দিয়ে দলে ভাঙন এবং জাতীয়তাবাদী শক্তির মধ্যে অবিশ্বাস ও বিভাজন বাড়াতে অনেক দিন ধরে একটি মহল চেষ্টা চালাচ্ছে। এতে নানা কারণে ক্ষুব্ধ ও হতাশ নেতাদের যুক্ত করার চেষ্টা চলছে। তাদের নানা টোপও দেওয়া হচ্ছে। দল ও জোটের এমন দুই ডজনের বেশি নেতার সঙ্গে বিভিন্ন সময় দেশে-বিদেশে বৈঠক হয় এই মহলের সঙ্গে। ২০১৯ সাল থেকে ওই তৎপরতা শুরু হয়।

২০২৩ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন বা এর আগে কোনো প্রেক্ষাপট তৈরির পরিকল্পনা থেকে বিশেষ কোনো মহল এই তৎপরতায় পৃষ্ঠপোষকতা দিচ্ছে বলে বিএনপির নেতাদের ধারণা। বিষয়টি নিয়ে বিএনপির ভেতরে কানাঘুষা আছে। সরকার পরিবর্তন এবং এমপি-মন্ত্রী হওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকে এই তৎপরতায় শুরুতে বিএনপির কেউ কেউ আগ্রহী ছিলেন, পরে সন্দেহ-অবিশ্বাস তৈরি হওয়ায় অনেকে নিজেদের গুটিয়ে নেন। তবে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব এখনো মনে করেন, বিএনপিকে বাইরে রেখে ক্ষমতার পটপরিবর্তন হতে পারে—কোনো কোনো মহলের এমন আশ্বাসে দলের অনেকে নানামুখী তৎপরতায় যুক্ত হয়েছেন। আগামী নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় তারা আবারও তৎপর হয়ে উঠেছেন। সর্বশেষ সুধী সমাবেশ সেই প্রক্রিয়ারই অংশ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, গত বৃহস্পতিবারের বনানীর ওই সুধী সমাবেশে যাতে দল ও জোটের কেউ না যান, সেজন্য তৎপর ছিলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা। অনেককে ফোন করে যেতে নিষেধ করা হয়েছে। আবার কেউ কেউ নিজে থেকেই যাননি। ‘ইনসাফ কমিটি’র ভোজে যোগ দিয়েছিলেন সাবেক কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা, শিক্ষক ও রাজনীতিক। সেখানে বিএনপির অন্য কোনো নেতা উপস্থিত না হলেও যুগপৎ আন্দোলনের শরিক এলডিপির সভাপতি কর্নেল (অব.) ড. অলি আহমদ, নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না, গণঅধিকার পরিষদের আহ্বায়ক ড. রেজা কিবরিয়া, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান উপস্থিত ছিলেন। অবশ্য অনুষ্ঠানস্থলে এলেও নৈশভোজে অংশ নেননি অলি আহমদ। তবে এলডিপির পক্ষ থেকে পরে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে দাবি করা হয়, ওই সুধী সমাবেশে অলি আহমদ অংশগ্রহণ করেননি।

এদিকে ওই সুধী সমাবেশে অংশগ্রহণ করায় মোস্তাফিজুর রহমান ইরানকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেয় ১২ দলীয় জোট। তবে তার আগেই গত ১৯ মার্চ জোটের প্রধান সমন্বয়কারী জাতীয় পার্টির (জাফর) চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দারকে চিঠি দিয়ে জোট থেকে বেরিয়ে যায় লেবার পার্টি। দলটি এখন এককভাবে যুগপৎ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করবে।

লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান বলেন, যে হোটেলে জাতীয় ইনসাফ কায়েম কমিটির সুধী সমাবেশ হয়েছে, ওই একই হোটেলে বেসরকারি টেলিভিশনের একটি অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। সেখান থেকে ওপরে দেখতে গিয়েছিলাম। ওই সংগঠনের সদস্য সচিব শওকত মাহমুদ আমার দীর্ঘদিনের পরিচিত, আর আহ্বায়ক কবি ফরহাদ মজহার খেতে বলেছিলেন, তাই খেয়েছি। ওখানে যে কী অনুষ্ঠান তাও জানতাম না, আর আমন্ত্রিতও ছিলাম না।

জানা যায়, বছরখানেক ধরে ওই মহলটি তাদের তৎপরতা চালাচ্ছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে ২০২২ সালের মার্চ মাসে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এক সমাবেশ হয়। ‘পেশাজীবী সমাজের’ ব্যানারে ওই সমাবেশ থেকে সরকার পতনের ডাক দেন আয়োজক শওকত মাহমুদ। রাজনীতিবিদরা যদি ব্যর্থ হন, তাহলে পেশাজীবীরা গণঅভ্যুত্থানের দায়িত্ব নেবেন বলে বক্তব্য দেন তিনি। শিগগির পরবর্তী কর্মসূচির ঘোষণা দেবেন জানিয়ে নেতাকর্মীদের প্রস্তুত থাকারও আহ্বান জানান। ওই সমাবেশের পর এপ্রিলে শওকত মাহমুদকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছিল বিএনপি। তখনো দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ তোলা হয়েছিল। তখন ওই সমাবেশের সঙ্গে বিএনপির কোনো সম্পর্ক ছিল না বলে দলটির নেতারা বলেছিলেন।

এর আগে ২০১৯ ও ২০২০ সালের ডিসেম্বরেও ঢাকায় এ ধরনের দুটি বড় জমায়েত করে রাস্তায় নেমেছিল জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দল ও পেশাজীবী পরিষদ। ২০১৯ সালের ৫ ডিসেম্বর হাইকোর্টের সামনের বিক্ষোভে খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি জানানো হয়। পরের বছরের ১৩ ডিসেম্বর ‘সরকারের পতনের’ লক্ষ্যে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বিক্ষোভ ও জমায়েত করা হয়। ওই দুটি কর্মসূচিতে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান হাফিজউদ্দিন আহমেদ, আবদুল্লাহ আল নোমান, শওকত মাহমুদ, মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতি ইশতিয়াক আজিজ উলফাতসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা ছিলেন। দুটি কর্মসূচিতেই হঠাৎ রাস্তা অবরোধ করে কয়েক হাজার লোক বিক্ষোভ শুরু করেন। ওই দুটি ঘটনার জের ধরে ‘দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডের’ অভিযোগ এনে হাফিজউদ্দিন আহমেদ ও শওকত মাহমুদকে তখন কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। তবে নোটিশের জবাবে হাইকমান্ড সন্তুষ্ট হওয়ায় তখন বিষয়টির সুরাহা হয়ে যায়।

সর্বশেষ গত ১৬ মার্চ ‘ন্যাশনাল কমিটি ফর সিভিল রাইটস জাতীয় ইনসাফ কায়েম কমিটি’ নামের একটি সংগঠনের ব্যানারে সুধী সমাবেশে অন্তর্বর্তীকালীন একটি জাতীয় সরকার গঠনের দাবি করা হয়। এই পটভূমিতে শওকত মাহমুদকে এবার বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হলো। তবে শওকত মাহমুদ তাকে বহিষ্কারের এই ঘটনাকে দুঃখজনক বলে বর্ণনা করেছেন।

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ