রণক্ষেত্র ঢাকা, হরতালের ডাক - জনতার আওয়াজ
  • আজ রাত ৯:০৪, শুক্রবার, ১৫ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১লা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৮শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

রণক্ষেত্র ঢাকা, হরতালের ডাক

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: রবিবার, অক্টোবর ২৯, ২০২৩ ১২:৩৬ পূর্বাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: রবিবার, অক্টোবর ২৯, ২০২৩ ১২:৩৬ পূর্বাহ্ণ

 

নিউজ ডেস্ক
পুলিশ ও আওয়ামী লীগের সঙ্গে বিএনপি নেতাকর্মীদের সংঘর্ষে দলটির মহাসমাবেশ পণ্ড হয়ে গেছে। তিন ঘণ্টাব্যাপী সংঘর্ষে নয়াপল্টন, কাকরাইল, বিজয়নগর, আরামবাগ, দৈনিক বাংলাসহ আশপাশের এলাকা রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। সংঘর্ষে দৈনিক বাংলা মোড়ে আরিফুল রহমান নামে একজন পুলিশ সদস্য নিহত হন। এ ছাড়া পুলিশের গুলিতে যুবদল নেতা শামীম মোল্লা নিহত হয়েছেন বলে বিএনপি জানিয়েছে। সংঘর্ষের সময় সাংবাদিকসহ বিএনপি’র শতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। সংঘর্ষের পর বিভিন্ন ভবনে অবস্থান নেয়া অর্ধ শতাধিক বিএনপি নেতাকর্মীকে আটক করা হয়। মহাসমাবেশকে ঘিরে গত ২৪ ঘণ্টায় গ্রেপ্তার হওয়া বিএনপি-জামায়াতের ৮ শতাধিক নেতকর্মীকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। সংঘর্ষ চলাকালে মহাসমাবেশে হামলার প্রতিবাদে রোববার সারা দেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডেকেছে বিএনপি। সমাবেশে বাধা ও নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে হরতাল ডেকেছে জামায়াতে ইসলামী। এ ছাড়া গণতন্ত্রমঞ্চসহ বিএনপি’র সমমনা দলগুলোও রোববার হরতাল আহ্বান করেছে।

ওদিকে সকালের দিকে শাপলা চত্বরে জামায়াতের সমাবেশকে ঘিরে উত্তেজনা দেখা দেয়।

তবে শেষপর্যন্ত আরামবাগে অবস্থান নিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে সমাবেশ করেছে দলটি। সন্ধ্যার পর জামায়াত রোববার সারা দেশে সকাল-সন্ধ্যা হরতাল ডাকে।

এদিকে শুক্রবার রাতে মহাসমাবেশের অনুমতি পাওয়ার পরপরই নয়াপল্টনে জড়ো হতে থাকেন বিএনপি নেতাকর্মীরা। ভোর হতেই সারা দেশ থেকে আসা বিএনপি নেতাকর্মীদের স্রোত শুরু হয়। রাজধানীর চারপাশ থেকে হাজার হাজার নেতাকর্মীর মিছিল আসতে থাকে নয়াপল্টনে। সকাল ১০টা বাজতেই জনসমুদ্র হয়ে যায় নয়াপল্টন, ফকিরাপুল, কাকরাইল, বিজয়নগর এলাকা। সরকারবিরোধী নানা স্লোগানে মুখর হয়ে উঠে পুরো এলাকা। নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করতে সকাল থেকেই মঞ্চে জাসাসের শিল্পীরা প্রতিবাদী গান পরিবেশন করেন। দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটে কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় বিএনপি’র মহাসমাবেশ। এ সময় বিএনপি’র অঙ্গ সংগঠনের নেতারা বক্তব্য রাখেন। সকাল থেকেই নয়াপল্টন এলাকার বিভিন্ন পয়েন্টে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন থাকলেও কাউকে বাধা দেয়নি। বিএনপি নেতাকর্মীরা শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান করে উৎসবের আমেজে সমাবেশ করতে থাকেন। বেলা সাড়ে ১২টার দিকে হঠাৎ বদলে যায় পরিস্থিতি। কাকরাইল মসজিদের সামনে পিকআপে করে শান্তি সমাবেশে যাওয়ার সময় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে বিএনপি নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ বেঁধে যায়। দ্রুত ঘটনাস্থলে এসে অ্যাকশনে যায় পুলিশ। বিএনপি নেতাকর্মীদের দিকে সাউন্ড গ্রেনেড, গুলি ও টিয়ারশেল ছুড়তে থাকে তারা। বিএনপি নেতাকর্মীরাও ইটপাটকেল ছুড়ে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলে। কাকরাইল মসজিদ এলাকায় প্রায় আধা ঘণ্টাব্যাপী চলে সংঘর্ষ। এ সময় প্রধান বিচারপতির বাসভবনে হামলার ঘটনা ঘটে। কাকরাইল চার্চের কাছে একটি পুলিশ বক্সে অগ্নিসংযোগ ও আরেকটি পুলিশ বক্স ভাঙচুর করা হয়। সাজোয়া যান, এপিসি, জলকামান নিয়ে অতিরিক্ত পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে। ঢাকা মহানগর ডিবি প্রধান হারুন অর রশিদও তার টিম নিয়ে আসেন ঘটনাস্থলে। একপর্যায়ে সংঘর্ষ একযোগে নাইটিংগেল মোড়, বিজয়নগর সড়ক ও পানির ট্যাংকির গলি পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। বৃষ্টির মতো সাউন্ড গ্রেনেড, গুলি ও টিয়ারশেল ছুড়তে থাকে পুলিশ। বিএনপিকর্মীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে অলিগলিতে অবস্থান নিয়ে ইটপাটকেল ছুড়তে থাকেন। নয়াপল্টন সড়কে অবস্থান নেয়া বিএনপি নেতাকর্মীদের সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ারশেল ছুড়তে থাকে পুলিশ। বিএনপি নেতাকর্মীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে আশপাশের গলিতে অবস্থান নেন। সমাবেশ সমাপ্ত ঘোষণা করে নয়াপল্টন কার্যালয়ে অবস্থান নেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ কেন্দ্রীয় নেতারা। ওদিকে সংঘর্ষ ফকিরাপুল, দৈনিক বাংলা মোড়েও ছড়িয়ে পড়ে। থেমে থেমে চলে সংঘর্ষ। বিকাল ৪টার পর বিএনপিকর্মীরা নয়াপল্টন এলাকা ত্যাগ করেন। পুরো নয়াপল্টন সড়কের দখল নেয় পুলিশ।
সংঘর্ষ চলার সময় সমাবেশ স্থলের কাছে টিয়ার গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেডের শব্দ ছড়াতে শুরু করলে সমাবেশের কার্যক্রম বন্ধ করা হয়। পরে সংঘর্ষ মাত্রা ছড়ালে সমাবেশ পণ্ড হয়ে যায়। কর্মীরা মঞ্চের মধ্যে ঘিরে রাখেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ শতাধিক নেতাদের। টিয়ার গ্যাসের ঝাঁজ বাড়তে থাকলে মির্জা ফখরুল হ্যান্ড মাইকে হরতালের ঘোষণা দেন।

এরপর অন্য নেতাকর্মীরা জ্যেষ্ঠ নেতাদের নিরাপত্তা দিয়ে মঞ্চ থেকে নামিয়ে আনেন। ধোঁয়ায় চারিদিক ছেয়ে গেলে তাদের সমাবেশস্থল ছেড়ে যেতে দেখা যায়। বিকাল পৌনে তিনটার দিকে কাকরাইল ও ফকিরাপুল থেকে পুলিশ নয়াপল্টনের দিকে এগোতে থাকে। তখন নেতাকর্মীদের বড় অংশ বিভিন্ন গলি দিয়ে সমাবেশস্থল ত্যাগ করেন। তবে অনেকে পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় জড়িয়ে যান। এলোপাতাড়ি ইটপাটকেল ছুড়তে থাকেন পুলিশের দিকে। পুলিশও অ্যাকশন চালায়।

সমাবেশ পণ্ডের আধা ঘণ্টা আগে থেকে কাকরাইলে বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ছোড়ে। সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে সংঘর্ষে জড়িতদের পিছু হটতে বাধ্য করে। এ সময় নয়াপল্টনে সমাবেশস্থলে থাকা নেতাকর্মীরা উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। রাস্তায় বসে নেতাদের বক্তব্য শুনতে থাকা নেতাকর্মীদের বড় অংশ দাঁড়িয়ে যান।

এ সময় মঞ্চ থেকে বিএনপি’র মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মাইক নিয়ে তাদের শান্ত হতে বলেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের মহাসমাবেশের লোকসমাগম দেখে ওদের মাথা খারাপ হয়ে গেছে। আমাদের শান্তিপূর্ণ সমাবেশ পণ্ড করতে চায়। আপনারা শান্ত থাকুন, বক্তব্য শুনুন।

এর ৫/৬ মিনিট পরই স্কাউট ভবনের কাছে পুলিশের ছোড়া কাঁদানে গ্যাস এসে পড়ে। কিছু সময় পর পুলিশের ছোড়া কাঁদানে গ্যাস মঞ্চের কাছে আসতে থাকে। একের পর এক সাউন্ড গ্রেনেডের শব্দে পুরো এলাকা কেঁপে ওঠে। তখন নেতাকর্মীরা এদিক-ওদিক দৌড়াতে থাকেন। মঞ্চ একেবারে নেতাকর্মী শূন্য হয়ে সমাবেশ পণ্ড হয়ে যায়।

কার্যালয়ের সামনে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে বিএনপি’র যুগ্ম মহাসচিব মজিবুর রহমান সারোয়ার ও সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, সাংগঠনিক সম্পাদক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক রকিবুল ইসলাম বকুল, যুবদলের সভাপতি সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি এসএম জিলানি, ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক সাইফ মাহমুদ জুয়েল আহত হন বলে বিএনপি’র পক্ষ থেকে দাবি করা হয়।

যেভাবে সংঘর্ষের সূত্রপাত: বেলা সাড়ে ১০টা। বিএনপি’র শতাধিক নেতাকর্মী কাকরাইল মোড়ে অবস্থান নেয়। দুটো সাজোয়া যান নিয়ে এ সময় পুলিশ প্রধান বিচারপতির বাসভবনের সামনে অবস্থান নেয়। হঠাৎ মাঝ বয়সী এক কর্মী তার গায়ে থাকা গেঞ্জি খুলে পুলিশের সামনে বুক পেতে দেয়। বলেন, গুলি করবেন? করেন। বুক পেতে দিলাম। আর কতো রক্ত লাগবে। খালি গায়ে থাকা ব্যক্তিটি পশ্চিমমুখী হয়ে মাটিতে সিজদা করেন। এরপর হাত জোড় করে পুলিশের সামনে এগিয়ে এসে বলেন, আমরা কোনো বিশৃঙ্খলা করবো না। আল্লাহর ওয়াস্তে আমাদের সমাবেশ সফল করতে দিন। কাকরাইল মসজিদের সামনের এলাকায় অনেক সময় ধরেই বিএনপি নেতাকর্মী ও পুলিশের মধ্যে উত্তেজনা চলছিল। একপর্যায়ে এ পথে যাওয়ার সময় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের সঙ্গে বিএনপি নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ বাধে। দুই পক্ষের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার মধ্যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। চলে পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। বেলা পৌনে ১টায় হঠাৎ ঘটনাস্থলে পুলিশের সাপোর্টিভ ফোর্স হিসেবে আরেক দল পুলিশ আসে। এ সময় বিএনপি’র নেতাকর্মীরা পুলিশের দিকে গাছের ডাল ও ইটের টুকরো ছোড়েন। হঠাৎ করেই মুহুর্মুহু সাউন্ড গ্রেনেডের শব্দে যেন পুরো এলাকা কেঁপে ওঠে। সঙ্গে কাঁদানে গ্যাস, রাবার বুলেট, জল কামান দাগানো হয়। এ সময় বিএনপি’র নেতাকর্মীরা পিছু না হটে তারা ইট-পাটকেলসহ পুলিশকে প্রতিহত করার চেষ্টা করেন। এরপরই বাড়তে থাকে সংঘর্ষ। চলতে থাকে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। মুহূর্তেই রণক্ষেত্রে পরিণত হয় ওই এলাকা। এ সময় বিএনপি নেতাকর্মীদের প্রতিরোধের মুখে প্রধান বিচারপতির বাসভবন হয়ে মন্ত্রীপাড়ার দিকে পিছু হটে পুলিশ। পুনরায় সাউন্ড গ্রেনেড, গুলি, জল কামান দিয়ে নেতাকর্মীদের পেছনের দিকে ধাওয়া করে। এ সময় প্রধান বিচারপতির বাসার দেয়াল ও ফটকের কাছে কিছু লোককে ঢিল ছুড়তে দেখা যায়। তাদের হাতে লাঠিসোটাও ছিল।
সংঘর্ষের একপর্যায়ে কাকরাইল মসজিদের সামনে বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড (বিজিবি) সদস্যদের দেখা গেছে। ৪টি গাড়িতে করে তারা সাপোর্টিভ ফোর্স হিসেবে অংশ নেয়। এর কিছুক্ষণের মধ্যে আনসার ব্যাটালিয়ান এর বিপুলসংখক সদস্য ঘটনাস্থলে আসেন। বিএনপি’র নেতাকর্মীরা মিন্টোরোড, নাইটিঙ্গেল মোড়, কাকরাইলসহ বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। এ সময় বিএনপি’র একাধিক কর্মী রাবার বুলেটে গুরুতর আহত হন। নেতাকর্মীদের পিছু হটিয়ে নয়াপল্টনের দিকে এগোতে থাকে পুলিশ। এভাবে বেলা ১২টা থেকে শুরু হওয়া সংঘর্ষ কাকরাইল মোড় থেকে শান্তিনগর, বিজয়নগর, পানির ট্যাঙ্কি ও আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।

কাকরাইল, পুরানা পল্টন, আরামবাগ, দৈনিক বাংলা মোড়, শান্তিনগর, সেগুনবাগিচা, বিজয়নগর, আরামবাগ এলাকা সংঘর্ষে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। স্থানে স্থানে সড়কে আগুন জ্বালানো হয় টিয়ার শেল থেকে বাঁচতে।

বেলা ৩টার দিকে পুলিশ নাইটিঙ্গেল মোড়ে অবস্থান নেয়। এ সময় নয়াপল্টন ও শান্তিনগরের দিকে সাউন্ড গ্রেনেড ও টিয়ার শেল ছোড়া হয়। একপর্যায়ে নয়াপল্টন ও শান্তিনগরের দিক থেকে বিএনপি’র কর্মীরা ইটপাটকেল ছুড়লে পুলিশ ও বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যে আবার ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পুলিশের ধাওয়ায় বিজয়নগর পানির ট্যাংক এলাকা থেকেও বিএনপি’র লোকজন সরে যায়। ৩টার দিকে পুরান পল্টনে পুলিশ অবস্থান নেয়। এ সময় কাকরাইল, নাইটিঙ্গেল মোড়, শান্তিনগর, পল্টন, বিজয়নগর সর্বত্রই পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাব, আনসার, গোয়েন্দা পুলিশ রাজপথ দখলে নেয়। এ সময় পুলিশের সঙ্গে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অংশ নিতে দেখা গেছে। বিএনপির নেতাকর্মীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে আশপাশের বিভিন্ন গলিতে প্রবেশ করেন। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা পুলিশের সঙ্গে যোগ দিয়ে বিএনপি নেতাকর্মীদের ধাওয়া দিয়ে সেখান থেকে সরানোর চেষ্টা করে। সংঘর্ষের একপর্যায়ে রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালের ভেতরে রাখা কয়েকটি এম্বুলেন্সে অগ্নিসংযোগ করা হয়। সেখানে থাকা বেশ কয়েকটি মোটরসাইকেলেও আগুন দেয়া হয়। সংঘর্ষ শেষ হলে আসলে বিকালে সেগুন বাগিচা এলাকায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মহড়া দিতে দেখা যায়। এ সময় অনেক বাসা বাড়িতে তাদের ঢিল ছুড়তে দেখা যায়। পথচারীদের মারধর করারও অভিযোগ পাওয়া যায়।

শান্তিনগর ও মালিবাগে সংঘর্ষ:
সংঘর্ষ শুরু হলে পল্টন এলাকা থেকে শান্তিনগর, মালিবাগসহ বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েন নেতাকর্মীরা। এদিকে মালিবাগ মোড় থেকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ‘জয়বাংলা স্লোগানে‘ লাঠি মিছিল নিয়ে শোডাউন করেন এই এলাকায়। লাঠিসোটা হাতে চলে তাদের মহড়া। শান্তিনগর মোড়ে অবস্থান করে বিএনপি’র নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ করছিলেন। এ সময় বিএনপি’র নেতাকর্মীদের ছত্রভঙ্গ করে দিতে ফাঁকা গুলি ও কাঁদানে গ্যাসের শেল ছোড়ে পুলিশ। ব্যবহার করে সাউন্ড গ্রেনেড। ঘটে দফায় দফায় ককটেল বিস্ফোরণ। উভয় পক্ষের পাল্টাপাল্টি ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া চলে। ছোড়া হয় ইট-পাটকেল। ঘটে সংঘর্ষ ও ভাঙচুরের ঘটনাও। শান্তিনগর মোড়ে একটি পুলিশ বক্সে দেয়া হয় আগুন। মুহূর্তেই তৈরি হয় শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি। একটার পর একটা ছোড়া হয় পুলিশের ফাঁকা গুলি। কিছুক্ষণ পরে এই উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে মালিবাগ মোড়ে। প্রায় দেড় ঘণ্টা ধরে সংঘর্ষ চলে শান্তিনগর ও মালিবাগ মোড়ে। এ সময় চারিদিকে বন্ধ হয়ে যায় দোকানপাট। ভয়ে-আতঙ্কে এলাকা ছাড়ে সাধারণ মানুষ। এ সকল মানুষের মধ্যে দেখা দেয় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। ছড়িয়ে পড়ে বিভিন্ন গলিতে সংঘর্ষ, ইট-পাটকেল নিক্ষেপ। ইট-পাটকেলে ভরে যায় রাস্তা। শান্তিনগর এলাকায় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ চালাকালে কাঁদানে গ্যাস ছোড়ে পুলিশ। বিকালে সাড়ে ৪টার দিকে বিএনপি’র নেতাকর্মীদের হটিয়ে শান্তিনগর ও মালিবাগ মোড়ে আবারো কঠোর অবস্থান নেয় পুলিশ। পুলিশের সঙ্গে বিএনপি নেতাকর্মীদের সংঘর্ষ চলাকালে কাঁদানে গ্যাসের ধোঁয়া থেকে বাঁচতে রাস্তায় বিভিন্ন জিনিসপত্রে আগুন জ্বালান। মালিবাগের মৌচাক ফ্লাইওভারে বলাকা পরিবহনের একটি বাসে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। আগুনে বাসটি সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়ে যায়।

পুলিশের সঙ্গে যোগ দেয় আওয়ামী লীগও:
সকাল থেকেই পুরানা পল্টন মোড়ে সতর্ক অবস্থানে ছিল পুলিশ। ছিল ব্যারিকেড। বারবার উত্তেজনা সৃষ্টি হয় মোড়টিতে। একদিক দিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে আসছিলেন অন্যদিকে বিএনপি। পাল্টাপাল্টি স্লোগানে মুখরিত ছিল এই মোড়টি। একপক্ষ অন্য পক্ষকের উদ্দেশ্যে কটাক্ষ করে স্লোগান দিতে থাকে। বেলা গড়াতে থাকে যত ততই বাড়তে থাকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সংখ্যা। একপর্যায়ে পল্টনমোড় থেকে নাইটঙ্গেল মোড়ের মাঝামাঝি স্থানে একত্র হয়ে সরকার বিরোধী স্লোগান দিতে থাকেন বিএনপি’র নেতাকর্মীরা। তাদের ছত্রভঙ্গ করে দেয় পুলিশ। একসময় পুলিশ তাদের ফের ছত্রভঙ্গ করতে ছোড়ে টিয়ারশেল। এ সময় টিয়ার সেলের ঝাঁজ থেকে বাঁচতে রাস্তায় পড়ে থাকা বিভিন্ন পণ্য, ব্যানারে আগুন ধরায়। সেখানে দীর্ঘ সময় পুলিশ ও বিএনপি কর্মীদের সংঘর্ষ চলতে থাকে।
দুপুরের পর আওয়ামী লীগের কয়েকশ’ নেতাকর্মী সমাবেশস্থল ছেড়ে লাঠিসোটা, ইট-পাটকেল নিয়ে পল্টন মোড়ের দিকে এগিয়ে যায়। এই সময়ে শান্তি সমাবেশের স্থানে ব্যারিকেড দিয়ে দেয় পুলিশ। শান্তি সমাবেশ থেকে কয়েকশ’ নেতাকর্মী এগিয়ে এলেও শ’খানেক নেতাকর্মী এগিয়ে যান সংঘর্ষের স্থানে। এরপর তারা ধাওয়া দেন বিএনপি নেতাকর্মীদের। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ফের টিয়ারসেল নিক্ষেপ করে। সঙ্গে চলতে থাকে সাউন্ড গ্রেনেড, রাবার বুলেট নিক্ষেপ। টিয়ারসেলের কারণে পিছু হটে বিএনপি। কিছু সময় শান্ত থাকার পর ফের ক্ষণে ক্ষণে চলতে থাকে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের পাশে ছিলেন পুলিশ সদস্যরা। ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে দু’পক্ষই। বেশ কয়েকজন ঢিলের আঘাতে আহত হন। উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে সবার মাঝে। এরপর পুলিশ তৎপরতা আরও বাড়িয়ে দেয়। পিছু হটিয়ে দেয় বিএনপি’র নেতাকর্মীদের। এরপর হামলা শুরু করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। গণঅধিকার পরিষদের আয়োজন ভন্ডুল করে দেয় তারা। পুড়িয়ে দেয়া হয় তাদের মঞ্চ। ঢিল ছোড়া হয় আশপাশের বাড়িতেও। বেশ কয়েকটি বাড়ির জানালার কাঁচ ভাঙেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। কয়েকটি বাড়ির সদর দরজা, দোকান ভাঙচুর করতে দেখা যায়।

গুলিবিদ্ধ অর্ধশতাধিক বিএনপি নেতাকর্মী
সংঘর্ষে আহত হন বিএনপি’র যুগ্ম মহাসচিব মজিবুর রহমান সরোয়ার, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসোন আলাল, সাংগঠনিক সম্পাদক এমরান সালেহ প্রিন্স, ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক রকিবুল ইসলাম বকুল যুবদলের সভাপতি সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক সাঈফ মাহমুদ জুয়েলসহ অর্ধশতাকি নেতাকর্মী। এদিকে বিএনপি’র ঢাকা মহানগর দক্ষিণের নেতাকর্মীদের মধ্যে গুলিবিদ্ধ হন, মহানগর দক্ষিণ বিএনপি’র সদস্য হাজী মোহাম্মদ নাজিম, বিএনপি’র দক্ষিণের রোকাইয়া হক রুকু, মো. সুমন, মো. হাসান, মো. রফিক, মো. আমির, মো. মোস্তফা, মো. সুলতান, মো. জসিম, ৭৪নং ওয়ার্ড বিএনপি’র সহ-সভাপতি মোরশেদ আলম টিয়ারশেল মাথায় লেগে গুরুতর আহত হয়েছেন। গুলিস্তান ইউনিট বিএনপি’র কর্মী মো. নবীকে সন্ত্রাসীরা অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করে বলে অভিযোগ করা হয়। ৭৪ নং ওয়ার্ড বিএনপি’র সাংগঠনিক সম্পাদক মো. হানিফ পুলিশে লাঠির আঘাতে পায়ে গুরুতর আহত হয়েছে। স্বেচ্ছাসেবক দল কেন্দ্রীয় কমিটির প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক আর এ গনি মোস্তফা আহত হন। নিউ মার্কেট থানাধীন ১৮নং ওয়ার্ড বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক রাজ্জাক, জসিম, মালেক, সাগর, গনি, সনি, শরীফ, সুমন, সাত্তার, ৪৮নং ওয়ার্ড বিএনপি’র আহ্বায়ক মিজানুর রহমান ভাণ্ডারী, জাসাস ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য সাগর দেওয়ান ফারহান, ৪৮ নং ওয়ার্ড বিএনপিকর্মী রুবেল, বাছির, রিপন, ৩৩নং ওয়ার্ডের চাঁনখাঁরপুল ইউনিটের পাপ্পু পুরা শরীরে ছিটা গুলি নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। রমনা থানা বিএনপি নেতা কমিশনার চৌধুরী আলমের ছেলে শাওন চৌধুরী গুলিবিদ্ধ হন।

সংঘর্ষে যুবদল নেতা নিহত
রাজধানীর নয়াপল্টনে সংঘর্ষ চলাকালে পুলিশের গুলিতে শামীম মোল্লা নামের একজন যুবদল নেতা নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে বিএনপি। শনিবার দুপুরে নয়াপল্টনে পুলিশের সঙ্গে বিএনপি নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের সময় তিনি গুলিবিদ্ধ হন। নিহত শামীম মোল্লা মুগদা থানা যুবদলের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের এক নম্বর ইউনিটের সভাপতি। তার বাবার নাম ইউসুফ মোল্লা। সংঘর্ষে আহত হলে তাকে রাজারবাগ পুলিশ লাইন হাসপাতালে নেয়া হয়। সেখানে সন্ধ্যার দিকে শামীম মোল্লা মারা যান বলে নিশ্চিত করেছেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত সদস্য সচিব লিটন মাহমুদ।

সংঘর্ষের পর ফাঁকা নয়াপল্টন কার্যালয়
পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের পর নয়াপল্টনে বিএনপি’র কেন্দ্রীয় কার্যালয় কার্যত ফাঁকা হয়ে যায়। কার্যালয়ে সামনের এলাকাসহ আশপাশের সব মোড়ে রায়ট কার (দাঙ্গা দমনে ব্যবহৃত গাড়ি) নিয়ে অবস্থান নেয় পুলিশসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। সন্ধ্যার পর বিএনপি’র কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন বিএনপি’র জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। তিনি বলেন, পুলিশের অনুমতি নিয়ে সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছিল। সেই অনুমতির ভিত্তিতেই আইনসম্মতভাবে সমাবেশ করা হচ্ছিল। কিন্তু এই সমাবেশে পরিকল্পনা করে বেআইনিভাবে হামলা চালানো হয়েছে। এই বেআইনি সরকার, অবৈধ সরকার সব জায়গায় এমন বেআইনি কাজ করছে। সন্ধ্যা ৭টায় শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত রুহুল কবির রিজভীর সঙ্গে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ৪/৫ জন নেতা অবস্থান করছিলেন। সন্ধ্যার আগে কাকরাইল মোড় এলাকায় একটি বাসে আগুন দেয়া হয়। অদূরেই ছিলেন পুলিশ সদস্যরা। বাসে আগুনের পর কাকরাইল মোড়, পল্টন মোড়, দৈনিক বাংলা মোড়, নটর ডেম কলেজের সামনের সড়কসহ আশপাশের বিভিন্ন সড়কে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্যকে অবস্থান নিয়ে থাকতে দেখা যায়।

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ