রাজনীতি ও কূটনীতির ভাষা ভিন্ন এবং আলাদা: দেরি হবার আগে কূটনীতিকদের ভাষা বুঝুন - জনতার আওয়াজ
  • আজ বিকাল ৫:০৭, রবিবার, ৩রা ডিসেম্বর, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ, ১৮ই অগ্রহায়ণ, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ, ১৯শে জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৫ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

রাজনীতি ও কূটনীতির ভাষা ভিন্ন এবং আলাদা: দেরি হবার আগে কূটনীতিকদের ভাষা বুঝুন

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: সোমবার, নভেম্বর ১৩, ২০২৩ ২:২২ পূর্বাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: সোমবার, নভেম্বর ১৩, ২০২৩ ২:২২ পূর্বাহ্ণ

 

ব্যারিস্টার নাজির আহমদ

যে কোনো দেশের রাজনীতি পরিচালিত হয় মূলত: রাজনীতিবিদ দ্বারা আর অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক কূটনীতি পরিচালিত হয় দক্ষ ও চৌকশ আমলা তথা কূটনীতিক দ্বারা। রাজনীতি করতে হলে শিক্ষাগত যোগ্যতার তেমন কোনো প্রয়োজন না হলেও কূটনীতিতে ঢুকতে হলে প্রতিভা লাগে, থাকতে হয় প্রখর মেধা। দেশের প্রতিযোগীতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পাশাপাশি কূটনীতিকরা নিজ দেশের সেরা বা বিশ্বের নামীদামি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে ডিগ্রী ও প্রশিক্ষণ নিয়ে থাকেন। রাজনীতিবিদদের ও কূটনীতিকদের ব্যাকগ্রাউন্ড ও আপব্রিংগিং-এর ভিন্নতা প্রতিফলিত হয় তাদের কথায়, কাজে, বক্তৃতায় ও বিবৃতিতে।

রাজনীতিবিদরা মেঠো বক্তৃতা করেন দরাজ গলায় ও রগ চেটিয়ে। অনেক সময় মুখে যা আসে তা-ই বলে ফেলেন। আবার অনেক সময় যা বলেন তা মিন্ করেন না। কখনও রাজনীতিবিদরা বলেন ডানে কিন্তু যান তারা বামে। জনগণকে আশ্বস্ত করতে বা আস্থায় নিতে রাজনীতিবিদরা অহরহ মিথ্যা আশ্বাস দেন বা ওয়াদা করেও তার বরখেলাপ করেন। প্রত্যেক দেশের রাজনীতিবিদদের কিছু কমন গুণ ও নেতিবাচক দিক আছে। তবে তা দেশ ভেদে অনেকটা হেরফের হয় – উন্নত বিশ্বে একটি স্ট্যান্ডার্ড থাকে এর নীচে রাজনীতিবিদরা নামেন না আর তৃতীয় বিশ্বে রাজনীতিবিদরা অনেক নীচে নামতে পারেন।

রাজনীতিবিদদের কমন চরিত্র সম্পর্কে রাজনীতিবিদ Nikita Khrushchev বলেছেন “Politicians tend to promise to build a bridge even where there is no river”. (অর্থাৎ “যেখানে নদী নেই সেখানেও সেতু নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেন রাজনীতিবিদরা”)।
অপরদিকে কূটনীতিকদের কথা ও ভাষা হয় সাধারণত: সংক্ষিপ্ত, সুনির্দিষ্ট ও যথাযথ (Short, precise and to the point)। তারা স্মার্ট ও আর্টিকুলেট। কথা বলেন চিন্তা করে ধীরে স্থীরে। তাদের কথা বা বিবৃতি হয় গভীর অর্থবোধক। অনেক সময় লুকায়িত থাকে অনেক অন্তর্নিহিত তাৎপর্য যা বুঝে নিতে হয় বা হৃদয়াঙ্গম করতে হয়। আর এটাকে বলে read between the lines. রাজনীতিবিদদের মতো কুটনীতিকরা কথায় কথায় রেসপোন্স করেন না। বরং তারা তাদের স্ব স্ব দেশের পলিসির আলোকে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে নীরবে ও ধীরে ধীরে, কিন্তু ধারাবাহিকভাবে কাজ করতে থাকেন। তাই রাজনীতি ও কূটনীতির ভাষা ভিন্ন ও আলাদা। রাজনীতিবিদদের ভাষাকে যদি “প্রত্যক্ষ আঘাতে মারা’র সাথে তুলনা করা হয় তবে কূটনীতিকদের ভাষাকে “ধুঁকে ধুঁকে মারা”র সাথে তুলনা করা য়ায। কূটনীতির গতি ধীর (slow) বা ধুঁকে ধুঁকে হলেও এর ইম্পেক্ট লাগসই (Sustainable) এবং এর গুরুত্ব আধুনিক সভ্যতায় অপরিসীম। তাই দেরি হবার আগে একটা জাতির কূটনীতিকদের ভাষা বুঝা দরকার। কূটনীতির ব্যর্থতা যেমন যুদ্ধের কারণ হতে পারে, ঠিক তেমনি কূটনীতির সফলতায় যুদ্ধ এড়ানো যায় বা যুদ্ধ লেগে গেলেও তা থামিয়ে দেয়া যায়।

কূটনীতিকরা তাদের স্ব স্ব দেশের নীতি ও পলিসি অনুসরণ ও প্রমোট করেন। চলেন তাদের নিজ দেশের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের গাইডলাইন অনুযায়ী অনেকটা চেইন অব কমান্ডের আওতায়। এক দেশের কূটনীতিকরা অপর দেশে আন্তর্জাতিক আইন দ্বারা প্রটেক্টেড, ভিয়েনা কনভেনশন তাদের বেশ কিছু রাইটস তথা অধিকার সংরক্ষণ করেছে। অনেক কিছু থেকে তারা দ্বায়মুক্ত। স্বাগতিক দেশ কূটনীতিবিদদের নিরাপত্তা দিতে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বাধ্য।

বাংলাদেশে যেসব দেশের রাষ্ট্রদূত (নন-কমনওয়েলথ দেশগুলোর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য) বা হাইকমিশনার (কমনওয়েলথ দেশগুলোর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য) আছেন তারা তাদের স্ব স্ব দেশকে প্রতিনিধিত্ব করেন। তাদের কথা ও বক্তব্য তাদের নিজ দেশের নীতি ও পলিসির প্রতিফলন। রাষ্ট্রদূত বা হাইকমিশনারের অবস্থানকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। রাষ্ট্রদূত বা হাইকমিশনারের কথা, বক্তব্য ও অবস্থানকে ডীল ও মোকাবেলা করতে হয় এবং করা উচিৎ কূটনৈতিকভাবে ও যথাযথ প্রক্রিয়ায়। এটা কোনোভাবেই রাজনীতিবিদদের হাতে, বিশেষ করে মাঠ পর্যায়ের পাতিনেতাদের হাতে ছেড়ে দেয়া কোনোভাবেই ঠিক নয়।

বৃটেনের রাজধানী লন্ডনে পৃথিবীর প্রায় সব দেশের হাইকমিশন বা দূতাবাস আছে। এমন অনেক দেশের হাইকমিশন বা দূতাবাস আছে যাদের সাথে বৃটেনের সম্পর্ক মোটেই ভালো নয় বা অতীতে ছিল না (যেমন ইরান, উত্তর কোরিয়া) অথবা অতীতে যুদ্ধ পর্যন্ত করেছে (যেমন ইরাক, আফগানিস্তান, আর্জেন্টিনা)। যে কোনো কূটনৈতিক টানাপোড়ন এখানে রাজনীতিবিদরা তাদের দক্ষ কূটনীতিক দিয়ে কূটনৈতিকভাবে সমাধান করেন। প্রায় ৩৫ বছর ধরে বৃটেন বসবাস করছি। দেখেছি প্রধান দুটি রাজনৈতিক দল তথা কনজারভেটিভ পার্টি ও লেবার পার্টির বহু টার্মের শাসনকাল। কোনোদিন দেখিনি এই দুই প্রধান পার্টির কোনো নেতা বা কর্মী রাস্তায় বা মেঠো বক্তৃতায় কোনো হাইকমিশনার বা রাষ্ট্রদূতকে গালাগালি করতে বা হেয় করে কথা বলতে। বাংলাদেশে আমরা কি দেখছি?

ইউনিয়ন পর্যায়ের পাতিনেতা যখন বিশ্বের একক পরাশক্তিধর দেশের রাষ্ট্রদূতকে প্রকাশ্যে পিটানোর হুমকি দেয় অথবা ক্ষমতাধর মন্ত্রী যখন হেয় করে একক পরাশক্তিধর দেশের কূটনীতিককে কাজের মেয়ের সাথে তুলনা করেন অথবা দায়িত্বপূর্ণ মন্ত্রী যখন তাদের রাষ্ট্রদূতের ব্যাপারে অবমাননাকর বক্তব্য দেন তখন এগুলো কিসের ঈঙ্গিত বহন করে? বহির্বিশ্বে আমাদের ভাবমূর্তি, অবস্থান বা মানমর্যাদা কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? এগুলোর সুদূর প্রসারী পরিণাম (Far-reaching consequences) কি হবে বা হতে পারে তা কি ভেবে দেখা হচ্ছে?

একটা কথা ক্ষমতাসীনরা প্রায় সময় অভিযোগ করেন যে বিদেশীরা দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলান বা হস্তক্ষেপ করেন। লক্ষণীয় যে, কথিত নাক গলানো বা হস্তক্ষেপ তাদের বিপক্ষে গেলে তারা সাধারণত: এই অভিযোগ করেন। কিন্তু যখন বিদেশীদের হস্তক্ষেপ বা নাক গলানো তাদের পক্ষে থাকে বা যায় তখন তারা কোনো অভিযোগ করা তো দূরের কথা বরং তারা তখন কম্ফোর্ট জোনে থাকেন বা আত্মতৃপ্তিতে ভুগেন। অতীতে একাধিকবার এর নজীর দেখা গেছে। এটা এক ধরনের ডাবল স্টেন্ডার্ড।

জাতীয়ভাবে আমাদের সাধারণ একটা অভ্যাস বা প্রবণতা হচ্ছে আমরা কোনো সমস্যার গভীরে যাই না। আমরা যা চোখে দেখি তা নিয়েই মাতা-মাতি, তর্কা-তর্কী ও গালা-গালি করি। এ যেন কঠিন এক রোগের কারণ ও উপর্সগ নির্ণয় না করে সাধারণ প্যারাসিটামল দিয়ে তার প্রতিকারের চেষ্টা করা। এতে হিতে বিপরীত হয়। কঠিন রোগটি আরও মারাত্মক আকার ধারণ করে রোগীর মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তখন আর কারো তেমন কিছুই করার থাকে না। তাই রোগ বা সমস্যার মূল কারণে বা গভীরে না গিয়ে যদি ভাসাভাসা (Superficially) সমস্যার সমাধানের চেষ্টা করা হয় তাতে সমস্যা না কমে বরং তা প্রকট আকার ধারণ করতে পারে। তখন তা সমাধান ক্ষমতার বাহিরে চলে যেতে পারে।

যখন কোনো ঘরের মধ্যে ঝগড়া, ফ্যাসাদ ও মারামারি হয় এবং তা নিজেরা নিজেদের মধ্যে সমাধান করতে পারে না তখনই কেবল বাহিরের লোকেরা এসে নাক গলাতে পারে, আসতে পারে হস্তক্ষেপ করতে। ঠিক এ কথা প্রযোজ্য দেশ ও রাজনীতির ক্ষেত্রে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও নির্বাচন সংক্রান্ত সমস্যা যদি দেশের রাজনীতিবিদরা সমাধান করতে পারতেন তাহলে বিদেশীদের নাক গলানো বা হস্তক্ষেপের প্রশ্নই আসতো না। বৃটেনের রাজধানী লন্ডনে তো বাংলাদেশের full-fledged High Commission আছে কিন্তু পারবে বৃটেনে নির্বাচনের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে বা নাক গলাতে? প্রশ্নই উঠে না।

উন্নত গণতান্ত্রিক দেশ বৃটেনের কথা বাদই দিলাম, প্রায় আমাদের মতো অর্থনীতির দেশ ভারত বা মালয়েশিয়ার নির্বাচনের ব্যাপারে বৃটেন বা আমেরিকা হস্তক্ষেপ বা নাক গলাতে পারে বা পারবে? মোটেই না। কেননা তারা নিজেরাই নিজেদের সমস্যার সমাধান করতে পারে। গড়ে তুলেছে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করার জন্য প্রতিষ্ঠান, সিস্টেম, লোকবল ও পরিবেশ। কিন্তু ৫২ বছরের ইতিহাসে আমরা সেটার দিকে নজরই দেইনি। বরং নজর দিয়েছি কিভাবে আমরা ক্ষমতায় যাবো এবং ক্ষমতায় গিয়ে কিভাবে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করে রাখবো যেন আর ক্ষমতা থেকে নামতে না হয়। বিদেশীদের দোষ দেয়ার আগে সত্যিকার অর্থে আমাদের রাজনীতিবিদদের নিজেদের আত্মসমালোচনা করা দরকার।

নাজির আহমদ: বিশিষ্ট আইনজীবী, বিশ্লেষক, সংবিধান বিশেষজ্ঞ এবং ইংল্যান্ডের প্র্যাকটিসিং ব্যারিস্টার।

Email:
ahmedlaw2002@yahoo.co.uk

Print Friendly, PDF & Email
 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ