স্বাধীন সাংবাদিকতার বিকল্প নেই - জনতার আওয়াজ
  • আজ দুপুর ২:০২, বৃহস্পতিবার, ১৪ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩১শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৭শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

স্বাধীন সাংবাদিকতার বিকল্প নেই

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ২৭, ২০২২ ১১:১৫ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ২৭, ২০২২ ১১:১৫ অপরাহ্ণ

 

মাহবুবউদ্দিন চৌধুরী

দেশের সংবাদপত্র শিল্প নানা কারণে গভীর সঙ্কটে। অনেক গণমাধ্যমকর্মী নিয়মিত বেতনও পান না। এ শিল্পে ব্যয় যেমন বেড়েছে তেমনই কমেছে ছাপানো পত্রিকার পাঠক। মানুষ এখন ইন্টারনেটে দেশ-বিদেশের পত্রিকা পড়তে অভ্যস্ত। জীবন ও সংসারের তাগিদে অনেক গণমাধ্যমকর্মী পেশা পাল্টাতে বাধ্য হচ্ছেন। দেশটির ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কিছু কিছু ধারার অপব্যবহারের কারণে অনেক লেখক, সাংবাদিক, শিল্পী, বুদ্ধিজীব ও গণমাধ্যমকর্মী অহরহ হয়রানির শিকার হচ্ছেন। অথচ এই আইনের কয়েকটি ধারা পরিবর্তন বা সংশোধনের দাবি পদে পদে উপেক্ষিত হওয়ায় সাংবাদিক সমাজ উদ্বিগ্ন। দেশে ডিজিটাল আইনের অপব্যবহারের বিষয়টি সরকারকে সহানুভ‚তির সাথে বিবেচনা করতে হবে। মনে রাখতে হবে, সাংবাদিকরা জাতির বিবেক। তারা যেকোনো অন্যায়-অপরাধ করবেন এমন নয়। সাংবাদিকরা তাদের লেখনীর মাধ্যমে জাতির কাছে ভুলত্রুটি তুলে ধরেন। এজন্যে মত প্রকাশের এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা জরুরি। তার পরও যেখানে প্রেস কাউন্সিল আছে সেখানে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন কতটুকু যুক্তিযুক্ত তা ভেবে দেখা দরকার।

জাতিসঙ্ঘ বলছে, তথ্য হচ্ছে একটি গণসম্পদ। জাতিসঙ্ঘ এও বলেছে ভুল তথ্য এবং অপপ্রচার রোধে মুক্ত এবং স্বাধীন সাংবাদিকতা আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। বিশ্বের অনেক দেশেই সাংবাদিকরা নিজেদের কর্মকাণ্ডের জন্য নতুন নতুন আইন, বিধিনিষেধ, সেন্সরশিপ, অপব্যবহার, হয়রানি, আটক এবং এমনকি মৃত্যুসহ অনেক বড় ব্যক্তিগত ঝুঁকিতে থাকে। কোভিড-১৯ শুরু থেকে সাংবাদিক সমাজ এবং সংবাদপত্র শিল্পের বেহাল অবস্থা সত্ত্বেও গণমাধ্যমকর্মীরা অনেক রিস্ক নিয়ে প্রকাশনা অব্যাহত রেখেছেন। ইতোমধ্যে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অনেক সাংবাদিক ও গণমাধ্যকর্মী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। এ অবস্থায় সাংবাদিকদের পরিবার-পরিজন অত্যন্ত দুঃসহ পরিস্থিতিতে পড়েছেন। সংবাদপত্রের আয় কমে যাওয়ায় বেতন ভাতার সমস্যায় অনেক সাংবাদিক ও ইলেকট্রনিক মিডিয়াকর্মী জর্জরিত। অনেকে চাকরি হারিয়েছেন আবার অন্যরা চাকরি হারানোর ভয়ে উদ্বিগ্ন।

খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে খোদ সচিবালয়ে একজন নারী সাংবাদিককে যে হেনস্তা, মানসিক নিপীড়ন, দুর্ব্যবহারের মুখে পড়তে হয়েছে সেটা সবাই কমবেশি জানেন। এটি স্বাধীন সাংবাদিকতা ও গণতন্ত্রের জন্য স্পষ্টতই হুমকিস্বরূপ। দেশের একজন সাংবাদিক বা গণমাধ্যমকর্মীর প্রতি এ ধরনের অশ্রদ্ধাবোধ সত্যিই দুঃখজনক ও বেদনাদায়ক। কেননা নারীর প্রতি সহিংসতা শুধু নারীর অধিকারকেই ক্ষুন্ন করে না, বরং মানবতা, অর্থনীতি, সমাজসহ দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতিকেই বাধাগ্রস্ত করে। সভ্যতার ক্রমবিকাশ এবং যখন শিক্ষার হার ক্রমেই বাড়ছে সেই পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার ও বিরোধী দলীয় নেত্রী নারী হওয়া সত্তে¡ও সে দেশের একজন নারী সাংবাদিককে নির্যাতন, নিপীড়ন ও সহিংসতার শিকার হতে হয় এটি কোনো সভ্য দেশের মানুষ মেনে নিতে পারে না। এ ধরনের আক্রোশ, হামলা, আক্রমণ ও নিপীড়ন রোধে সম্মিলিত প্রচেষ্টা জাতিসঙ্ঘের ভাষায় খুবই জরুরি। বলে রাখা ভালো, সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা না থাকলে দেশে জনগণের রাজত্বের পরিবর্তে দুর্বৃত্তদের রাজত্ব কায়েম হতে বাধ্য। এ ক্ষেত্রে সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীরা যদি সঠিক দায়িত্ব পালন না করে তাহলে বাংলাদেশের অবস্থা আরো খারাপ হয়ে পড়বে। কারণ সংবাদপত্র হচ্ছে গণদেবতার বিচারালয়।

বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য আইনি, অর্থনৈতিক ও সামাজিক নিরাপত্তা জরুরি। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী জনগণের ট্যাক্সের টাকায় বেতন পেলেও সাধারণ মানুষের প্রতি তাদের আচরণ এত নিষ্ঠুর যা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। আজকাল কর্মক্ষেত্রে সাংবাদিকরা কোনোভাবেই নিরাপদ নয়। রাষ্ট্রও সাংবাদিকদের সুরক্ষা দেয়ার পরিবর্তে ভিন্নটাই করছে। এটা প্রত্যাশিত নয়।

এ কথা বলার অবকাশ রাখে না যে, বাংলাদেশ, মিয়ানমার, পাকিস্তান, আফগানিস্তানসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর ক্রমশ এক ধরনের চাপ বাড়ছে, যা গণতন্ত্রের জন্য কখনই সুখকর নয়। তবে নিজেদের প্রতিষ্ঠার জন্য সাংবাদিক সমাজকে সাহসী ভ‚মিকা রাখতে হবে। গণমাধ্যমের ঝুঁকি বিশ্বজুড়েই বেড়ে চলছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান তেমন ভালো নয়। এ বছরের মুক্ত গণমাধ্যম সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান পাকিস্তান-আফগানিস্তান বা মিয়ানমারের থেকে নিচে নেমে গেছে যা উদ্বেগজনক।

২০২১ সালের জাতিসঙ্ঘের সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৫২তম। বর্তমান বিশ্বে সংবাদমাধ্যমের গুরুত্ব অপরিসীম। চলতি ঘটনা, জ্ঞান-বিজ্ঞান আর তথ্যের ভাণ্ডার এই সংবাদমাধ্যমগুলো দাঁড়িয়ে আছে বহু ত্যাগ আর পরিশ্রমের ওপর। গুরুত্বপূর্ণ সব খবর সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছে অনেক সাংবাদিক। ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব জার্নালিস্টস (আইএফজে) সম্প্রতি এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, চলতি বছর সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে বিশ্বব্যাপী ৬৭ জন সাংবাদিক নিহত হয়েছেন। আইএফজের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ, হাইতিতে বিশৃঙ্খলা এবং মেক্সিকোতে অপরাধী গোষ্ঠীগুলোর ক্রমবর্ধমান সহিংসতার তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে বেড়েছে নিহত সাংবাদিকের সংখ্যা। চলতি বছরের এ পর্যন্ত সারা বিশ্বে ৬৭ জন সাংবাদিক এবং গণমাধ্যমকর্মী নিহত হয়েছে। ২০২১ সালে নিহত হয়েছিল ৪৭ জন। সবচেয়ে বেশি গণমাধ্যমকর্মী নিহত হয়েছে ইউক্রেনে যুদ্ধ কভার করতে গিয়ে। মোট ১২ জন এখানে নিহত হয়েছেন। নিহতদের বেশির ভাগই ছিল ইউক্রেনীয় সাংবাদিক। তবে বেশ কয়েকজন বিদেশী সাংবাদিকও মারা গেছেন। যুদ্ধের প্রথম বিশৃঙ্খল সপ্তাহগুলোতে অনেক মৃত্যু ঘটেছিল। জাতিসংঘের মানবাধিকার দিবসের প্রাক্কালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ২০২২ সালে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে রাজনৈতিক দমন-পীড়ন। এ বছর কমপক্ষে ৩৭৫ জন গণমাধ্যমকর্মী কাজ করতে গিয়ে কারাবন্দী হয়েছেন। এদের মধ্যে বেশির ভাগই চীন, মিয়ানমার, তুরস্ক, ইরান ও বেলারুশের। আইএফআইজে মূলত ব্রাসেলসভিত্তিক সংগঠন যা ১৪০টির বেশি দেশে ট্রেড ইউনিয়ন এবং অ্যাসোসিয়েশনের ৬ লাখ মিডিয়া পেশাদারের প্রতিনিধিত্ব করে। সংগঠনটি পাকিস্তানে চলতি বছরের রাজনৈতিক সঙ্কটের মধ্যেও পাঁচ সাংবাদিকের মৃত্যুর ঘটনার রেকর্ড করেছে। এ ছাড়া কলম্বিয়ার সাংবাদিকদের জন্য নতুন হুমকি এবং ফিলিপাইনে নতুন নেতৃত্ব আসার পরও সাংবাদিকদের জন্য অব্যাহত বিপদের বিষয়ে সতর্ক করেছে। বৈশ্বিক মহামারী করোনাভাইরাস সঙ্কট চলাকালে বাংলাদেশেও সাংবাদিকের ওপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বেসামরিক সহিংসতা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছিল তা এখন নেই বললেই চলে। এ সময় মহামারী ও সমাজে তার প্রভাব নিয়ে অনেক ব্লগার ও কার্টুনিস্ট, লেখক ও মুক্ত চিন্তার লোকদের আটক হতে দেখা যায়। মুক্ত সাংবাদিকতা ও টেকসই উন্নয়ন একে অপরের পরিপূরক। সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমের যেকোনো অনিয়ম-দুর্নীতি হলে তা সাংবাদিক বা গণমাধ্যমকর্মীরা দেশের স্বার্থে তুলে ধরা মানে সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলা নয় বরং সরকারকে সহায়তাই করছেন। গুজব, মিথ্যা অপ্রচার ইত্যাদির বিরুদ্ধে কার্যকর বস্তুই হচ্ছে মুক্ত গণমাধ্যম। বর্তমানে দেশের সংবাদপত্র শিল্পের অবস্থা বেহাল। করোনা ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্বের এই ক্রান্তিলগ্নে এ শিল্পকে বাঁচাতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর কমাতে হবে। এ শিল্প আজ অস্তিতের হুমকির মধ্যে পড়েছে। বর্তমানে আমদানিকৃত নিউজপ্রিন্টের ওপর ১৫ শতাংশ ভ্যাট, আমদানি শুল্ক ৫ শতাংশ, অগ্রিম কর ৫ শতাংশসহ প্রতিটন নিউজপ্রিন্টের ওপর মোট কর-ভ্যাট বাবদ ৩১ শতাংশ পরিশোধ করতে গিয়ে সংবাদপত্র শিল্প আজ রুগ্ণ শিল্পে পরিণত হয়েছে দেশের অনেক সংবাদপত্র শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া আর্থিক সংকটে পড়েছে। এ থেকে পরিত্রাণ পেতে সরকারের সহযোগিতা প্রত্যাশা করছে সাংবাদিক ও সংবাদপত্র মালিক সমাজ। আসুন সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীদের সুরক্ষা প্রদান এবং সংবাদপত্র শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে সচেষ্ট হই।

লেখক : সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ