হাত-পা-চোখ বাঁধা: বুকের ওপর বন্দুকের নল ঠেকিয়ে বলল, ‘শেষ দোয়া পড়ে নে’ - জনতার আওয়াজ
  • আজ দুপুর ১২:৩০, শুক্রবার, ১৫ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১লা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৮শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

হাত-পা-চোখ বাঁধা: বুকের ওপর বন্দুকের নল ঠেকিয়ে বলল, ‘শেষ দোয়া পড়ে নে’

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: বৃহস্পতিবার, মার্চ ৭, ২০২৪ ১১:০০ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: বৃহস্পতিবার, মার্চ ৭, ২০২৪ ১১:০০ অপরাহ্ণ

 

জনতার আওয়াজ ডেস্ক
আমাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, ‘তোর শেষ ইচ্ছাটা কী?’ আমি বললাম, আমার বাবা-মা দুজনই দেশের বাইরে থাকে, শেষবারের মতো মায়ের সাথে কথা বলতে চাই। বললো, না তোকে-তো বাঁচিয়ে রাখা যাবে না, তোর মায়ের সাথে কথা বলতে দেওয়া যাবে না। তুই দোয়া পড়ে নে, এখনি শেষ করে ফেলব। বলেই বন্দুকের নল আমার বুকের মাঝখানে ঠেকিয়ে দিল। প্রচণ্ড ব্যথা পাই, ওই আঘাতেই মনে হয়েছিল মরে যাব। আমাকে চিৎ করে শুইয়ে পায়ের ওপর বুট দিয়ে চেপে ধরে ছিল, চোখ-হাত-পা বাঁধা। আমার গলা, দুই হাতের সবই ওরা বুট দিয়ে চেপে ধরেছিল। এভাবে আর কিছু সময় চেপে রাখলে, আমি মরেই যেতাম। মা বলে চিৎকার দিলাম। ওরা মাতাল ছিল, মুখ থেকে মদের গন্ধ পাচ্ছিলাম। বন্দুকের ট্রিগার টানবে, এমন সময় একজন বলল, না; ওকে এখনি গুলি করা যাবে না। ওর সাথে কথা আছে। বলল, ‘তোকে যা বলব স্বীকার করে নিবি, তাহলে তোকে মারব না।’ শুধুমাত্র বাঁচার আশায় বললাম, ‘আপনারা যা বলবেন, আমি সব মেনে নেব।’ কথাগুলো বলছিলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সহ-সভাপতি ওমর ফারুক কাওসার।

১৯৮৭ সালে লক্ষীপুর জেলার সদর উপজেলার বকশিপুরে জন্ম ওমর ফারুক কাওসারের। ব্যবসায়ী নূরুল আনোয়ার ও কোহিনূর বেগমের চার সন্তানের মধ্যে একমাত্র ছেলে কাওসার। ২০০১ সালে এসএসসি ও ২০০৩ সালে এইচএসসি পাস করে ২০০৩-০৪ সেশনে ভর্তি হন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করলেও রাজনৈতিক হয়রানির কারণে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করতে পারেননি এখনও। ছাত্রদলের রাজনীতি করতে গিয়ে ২০টিরও বেশি মামলা, অজস্র হামলার শিকার হয়েছেন। নিজের সাথে ঘটে যাওয়া নিপীড়ন-নির্যাতন নিয়ে কথা বলেছেন বাংলা আউটলুকের সাথে। সাক্ষাতকারটি নিয়েছেন বাংলা আউটলুকের ঢাকা প্রতিনিধি।

রাজনীতিতে জড়ালেন কীভাবে?

কাওসার: স্কুলের গন্ডি পেড়িয়েই মূলত রাজনীতিতে জড়াই। লক্ষীপুর মূলত বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় বশিকপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজে একাদশ শ্রেণিতে পড়ার সময়ই ছাত্রদলের সাথে মিছিল-মিটিং করতে করতে কখন যে রাজনীতির ভেতরে ঢুকে যাই তা টের পাইনি। আমার পরিবার ও আত্মীয় স্বজনদের মধ্যে অধিকাংশই বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত। সেটিও মূলত আমাকে অনেক বেশি প্রভাবিত করেছে জাতীয়তাবাদী আদর্শে ঝুঁকতে। আর ছোটবেলা থেকেই জিয়াউর রহমানের দেশপ্রেম, বেগম খালেদা জিয়ার আপোষহীনতার আদর্শ আমার কাছে ভালো লাগতো। আর কলেজ জীবনের শুরুতেই তারেক রহমানের দেশের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে ছুটে চলা, মানুষের সাথে মিশে যাওয়া, সব মিলিয়ে আমার মনে হতো বিএনপির রাজনৈতিক মত ও পথ- দুটোই উত্তম। সেই ভাবনা থেকেই ছাত্রদলে সক্রিয় হই। আর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির প্রথম দিনই ওই সময়ের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাভাপতি আব্দুস সাত্তার ও সাধারণ সম্পাদক পারভেজ রেজা ডিপার্টমেন্টে গিয়ে বললেন, ‘কে কে স্বেচ্ছায় ছাত্রদল করতে চাও।’ আমি হাত তুলে বললাম, আমি করব। সেই থেকে চলতে চলতে এই সংগঠনে ২৪ বছর পার করে দিলাম। বহুবার নির্যাতন ও হামলার মুখে পড়েছি, কিন্তু উদ্যম হারাইনি।

কতবার হামলার মুখে পড়েছেন?

কাওসার: মূলত এক-এগারোর সময়টাতেই বেশি চ্যলেঞ্জের মধ্যে পড়তে হয়েছে। ওই সময় সব ধরনের রাজনীতিতে এক ধরনের নিষেধাজ্ঞা চলছিল। আমরা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল ওই সময় প্রায় প্রতিদিনই মিছিল করেছি। ওই সময়ের মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার, হান্নান শাহ এদের নির্দেশেই আমরা কর্মসূচি চালিয়ে গেছি। এসময় আমাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে পুলিশ রাস্তায় ফেলে বেশ কয়েকবার পিটিয়েছে। কিন্তু গ্রেপ্তার করতে পারেনি। সহকর্মীরা কয়েকবার ছিনিয়ে নিয়েছে পুলিশের হাত থেকে।

এক-এগারোর পরিস্থিতিতে পরিবারের একমাত্র ছেলে হওয়ায় কোনো বাঁধার মুখে পড়তে হয়নি?

কাওসার: না। তবে, আমি পারতাম। আমার বাবা-মা এবং বোনেরা পরিবারসহ আমেরিকায় সেটেল্ড ছিল। তারা আমেরিকান নাগরিক। আমাকেও দেশের বাইরে চলে যাওয়ার জন্য বলেছিল। কিন্তু দলের ভেতরে এমনভাবে ডুবে ছিলাম যে, ক্যারিয়ারের চেয়ে দলকেই প্রাধান্য দিয়েছি। দেশ ছাড়তে পারিনি। থেকে গেলাম। ইচ্ছা ছিল দেশের সেবা করব, মানুষের সেবা করব। আমি ২৪ ঘণ্টা রাজনীতি করছি। এর বাইরে কিছুই ভাবিনি, এখনো ভাবি না। এখন রাজনীতির পাশাপাশি কিছু একটা করার চেষ্টা করছি। তবে রাজনীতি বাদ দিয়ে নয়। আর চাইলেও রাজনীতি আমি ছাড়তে পারব না। কারণ এই রাজনীতি করতে গিয়েই আমি অন্তত পাঁচবার হামলার শিকার হয়েছি। অনার্স ফাইনাল পরীক্ষা দিতে হয়েছে জেলাখানায় বসে। এখনও ২০টার বেশি মামলা চলছে। একবার গুমও হয়েছি।

গুম হলেন কীভাবে?
কাওসার: ২০১৫ সালের ৫ মার্চ, সকাল সাড়ে ৮টা বা ৯টা হবে। নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে ও একতরফা নির্বাচন বাতিল ও প্রতিবাদে বিএনপির অবরোধ চলছিল। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন লক্ষীবাজারে আমরা মিছিল শুরু করি। হঠাৎ করেই সিভিল পোশাকে কারা যেন মিছিলে হামলা করল। আমি আর সরতে পারলাম না। আমাকে আটক করে ফেলে। আমার হাতে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে ফেলল। চোখ বেঁধে ফেলল। একটু পরে একটা গাড়ি এলো। আমাকে গাড়িতে তুলে নিয়ে ২০ থেকে ৩০ মিনিটের মধ্যে একটি স্থানে নিয়ে যাওয়া হলো। গাড়ি থেকে নামিয়ে একটি কক্ষে নিয়ে হাত-চোখ বাঁধা অবস্থাতেই পেটানো শুরু করল। আমি মাটিতে পড়ে গেলাম। আমার দুই পায়ের ওপর ও গলার ওপর বুট দিয়ে চেপে ধরে মারতে থাকল। কিছুই দেখতে পারছিলাম না। মনে হয়েছে, বন্দুকের বাট বা মোটা লাঠি দিয়ে পিটিয়েছে। আমি যখন আর নিতে পারছিলাম না, তখন পানি চাইলাম। কারণ সকালে নাস্তাও করিনি। তারা বলল, পানি দেওয়া যাবে না। হাত-পা ছড়িয়ে মাটিতে পড়ে রইলাম। আমি সম্ভবত জ্ঞান হারিয়েছিলাম। আমাকে তারা এক ঘণ্টা পর পর পেটাল। জ্ঞান ফিরলে আবারও মারল। তাদের হাতে নির্যাতনের যতগুলো পদ্ধতি ছিল তার সবই আমার ওপর চালাল।

এরপর কি আদালতে পাঠাল?
কাওসার: না। পালাক্রমে নির্যাতন চলতে থাকল, দুই দিন চালাল। বিকেলের দিকে আমার পায়ে রশি দিয়ে কিছু একটার সাথে ঝুলিয়ে ফেলল। কোনো কথাবার্তা নেই। পায়ের পাতা থেকে কোমড় পর্যন্ত কোথাও বাকি রাখল না। আমার শরীর অবশ হয়ে গিয়েছিল। আমি আর নিতে পারছিলাম না। কিছুক্ষণ পরপরই জ্ঞান হারিয়ে ফেলছিলাম। এভাবেই চলল। দুই দিন এভাবে নির্যাতনের পর তারা আমাকে আদালতে দিল।

শুধুই কি পিটিয়েছে, আপনাকে কিছু বলেনি বা জানতে চায়নি? একটু ভেঙে বলুন ?
কাওসার: পোটানোর বর্ণনা শুধুই পেটানো। পালা করে পিটিয়েছে। এক পর্যায়ে মনে হয়েছে, আমি মরে গেলেই হয়তো বেঁচে যাব। তাই মৃত্যুও কামনা করেছি বহুবার। সঠিক সময় বলতে পারব না। দ্বিতীয় দিন দুপুরের দিকে আমার হাতে পেছন দিক দিয়ে হ্যান্ডকাফ দিয়ে বাঁধা, চোখেও শক্ত কাপড় দিয়ে আটকানো। আঘাতে আমার পা দুটো নড়ানোর মতোও শক্তি ছিল না। আমাকে প্রস্রাব করতে বলা হলো, আমি করতে চাইনি। অমনি হাতের দুই বাহুতে, পায়ের উরুতে বেদম পেটানো শুরু করল। ভয়ে রাজি হলাম। প্রস্রাব করলাম, অমনি মনে হলো আমি ছিটকে পড়ে গেলাম। এরপর আর কিছু মনে নেই। মনে হয়েছে আমাকে কেউ একজন উঁচু করে ছুঁড়ে মেরেছে। অজ্ঞান হয়ে গেলাম। কোমরের নিচের দিক থেকে সবটুকু অংশ নিথর হয়ে গেল। কতক্ষণ পর জ্ঞান ফিরেছে, আমি জানি না। এরপর আমি তাদের কাছে যতক্ষণ ছিলাম, আমি প্রস্রাব করার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। এক দিন পর প্রস্রাব করতে গিয়ে দেখলাম পারছি না, রক্ত বের হচ্ছে। এরপরও অন্তত তিন চার দফা আমাকে পিটিয়েছে। আমার সমস্ত শরীর ফেটে কালো হয়ে গিয়েছিল। দুই হাতের বাহুর চামড়া লাঠির সাথে উঠে গিয়েছিল। পায়ের পাতা ফেটে গিয়েছিল। দুই উরু ফুলেছিল, ফেটে গিয়েছিল বিভিন্ন স্থান।

আপনাকে চিকিৎসা করায়নি?
কাওসার: করেছে। পিটিয়েছে। উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ব্যাথানাশক ইঞ্জেকশন দিয়েছে। ব্যাথার জন্য ট্যবলেট খাইয়েছে। ইঞ্জেকশন দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই ব্যথা কমে গেছে। আবারো পিটিয়েছে। মাঝেমধ্যে আবার তারা আমাকে খাবারও দিয়েছে। তবে খুবই সামান্য। খাবারের সময় এক হাতের হ্যান্ডকাফ খুলে দেয়। তবে জায়গাটি কোথায় সেটা বুঝতে পারিনি।

ওই রাতগুলো কেমন ছিল?
কাওসার: রাতেও মারতো। রাতে দুই-তিন ঘণ্টা ঘুমানোর সুযোগ দিত। দুই রাতের মধ্যে প্রথম রাতে কিছুটা ঘুমানোর সুযোগ দিয়েছে। ব্যথায় ঘুম হয়নি। শুধু যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলাম। ভয়ংকর ছিল দ্বিতীয় রাত। ওই রাতটিই হয়তো আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর রাত। এর চেয়ে ভয়ংকর সময়ের মুখে হয়তো খুব বেশি মানুষ পড়েনি। রাত আনুমানিক দুইটা বা তিনটা হবে। আগে থেকেই চোখ বাঁধা ছিল। হাতকড়া সামনের দিক থেকে পেছনের দিকে দিয়ে বেঁধে দিল। বলল, চল তোকে নিয়ে যাই।

কোথায় নিয়ে গেল?
কাওসার: আমি দেখিনি। আমাকে যখনই গাড়িতে তোলা হচ্ছিল, আমি ভয় পেয়ে গেছিলাম। কারণ ২০১৪-১৫ সালের আন্দোলনের সময় যাদেরই ধরেছে, অনেককেই মেরে ফেলেছে। আমার শরীরের অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল, আমি প্রতিবাদ করতে পারিনি। আমাকে ধরে গাড়িতে উঠাল। গাড়ি ২০ থেকে ২৫ মিনিট চলার পর নামাল। একটু হাটিয়ে মাটিতে শোয়াল। আমাকে বলল, তোকে কোথায় নিয়ে এসেছি বুঝতে পারছিস? পানির আওয়াজ শুনতে পাও। নদী বা কোনো জলাধারের পাশে হবে। আমি বললাম হ্যাঁ, পানির আওয়াজ পাচ্ছি। তারা সবাই মাতাল ছিল। মুখ থেকে বাজে গন্ধ বের হচ্ছিল। আমাকে বলল, কাওসার সাহেব দোয়া পড়ো। আমি বুঝে ফেললাম, আমাকে মেরে ফেলবে। আমি শেষ দোয়াটা পড়ে নিলাম- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রসুলুল্লাহ। কেউ একজন বলল, তোর শেষ ইচ্ছাটা কী? আমার বাবা-মা দুজনই তখন আমেরিকায়। আমি একা ছিলাম বাংলাদেশে। আমি বললাম, আমার বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে আমি। বললাম, আমার মাকে আমি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসি। মায়ের সাথে কথা বলতে চাই। বলল, না তোকে তোর মায়ের সাথে কথা বলতে দেওয়া যাবে না। আমাকে বলল, না সে সুযোগ নেই। দোয়া পড়ে নে। আমি আবারও দোয়া পড়লাম। আবারও আমার হাত-পা বুট দিয়ে চেপে ধরল। বুকের ওপর ওদের বুট। রাইফেল লোড করার আওয়াজ পেলাম। মুহূর্তেই আমার বুকের ঠিক মাঝ বরাবর রাইফেলের নল ঠেকিয়ে দিল। এত জোরে নল ঠেকাল, আমি প্রচন্ড ব্যথা পেয়েছিলাম। ব্যথায় আমি চিৎকার দিয়েছি। ওই ব্যথাটা আমার তিনমাস ছিল। আমাকে বলা হলো- কাওসার সাহেব তাহলে, এখানেই তুমি শেষ; আমি নিশ্চিত হয়ে গেলাম। এটাই শেষ। এরই মধ্যে ওদের মধ্যে কেউ একজন বলল, দাঁড়াও ওর সাথে কথা আছে।

কি কথা বলল?

কাওসার: ওই অবস্থায়ই আমাকে বলল, এক শর্তে তোকে মারব না। আমরা যা বলব, তুই সেটা স্বীকার করবি। শুধুমাত্র বাঁচার এতটুকু সম্ভাবনাও হাতছাড়া করতে চাইনি। বললাম, বলেন। তারা বললো কদিন আগে কবি নজরুল কলেজে ককটেল বিস্ফোরণে একটি মেয়ে আহত হয়েছে, সেই ঘটনার দায় স্বীকার করলেই তোকে ছেড়ে দেব। আমি রাজি হলাম। বলল, না তুই বলবি না। বলেই আমাকে সেই শোয়ানো অবস্থায়ই আবারও মারল। যতক্ষণ ইচ্ছা পেটাল তারা। মারতে আমার শরীরের আর কোনো স্থান বাকি রাখেনি তারা। আমি বললাম, রাজি, আপনারা যা বলতে বলবেন আমি তাতেই রাজি। তারা বলল, আচ্ছা ঠিক আছে। যদি পরে না বলো আবারো নিয়ে আসব। তখন তোকে মেরেই ফেলব। এরপর তারা চারজন আমাকে ধরে তুলল। গাড়িতে উঠিয়ে নিয়ে আসলো সূত্রাপুর থানায়। সেখানে নিয়ে আমার হাত-পা-চোখ খুলে দিয়েছিল। তখন ভোর হয়ে গেছে।

থানায় কী হয়েছিল?
কাওসার: সকাল ৭টা বা সাড়ে ৭টার দিকে আমাকে থানার ওসি-ডিসি যারা ছিল তাদের কাছে নিয়ে গেল। তখন আবার হাত চোখ বাঁধল। ওসির কক্ষে নিয়ে গিয়ে আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করল। বলল, রাতের কথা মনে আছেতো। আমি বললাম হ্যাঁ। তখন তারা আবারও আমাকে মারতে শুরু করল। এবার চার থেকে পাঁচজন আমার দুই গালে এলোপাতাড়ি চড় মারা শুরু করল। আমার মনে হয়েছে, এত চড় একবারে কোনদিন কেউ কাউকে দেয়নি। আমাকে থানার গারদে রাখা হলো।

এরপর কী হলো?
কাওসার: এরপর আমাকে দুপুর ১২টা কিংবা সাড়ে ১২টার দিকে কোর্টে নিয়ে যাওয়া হলো। কারও সাথে কথা বলতে দেওয়া হলো না। সিএমএম কোর্টের সপ্তম তলায় তোলা হলো। তিন দিন পর আলো-বাতাস পেয়ে কিছুটা ভালো লাগছিল। বিচারকের সামনে তোলার পর বিচারক বললেন, কী বলবেন বলেন। আমি এতটাই বিদ্ধস্ত ছিলাম, আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না। মনে মনে ভাবলাম- জীবনে বাঁচার জন্য একবার রিস্ক নিই। মারলে মারুক। বললাম, আমি এ ঘটনার সাথে জড়িত নই। আমি শার্ট খুলে ফেললাম, আমার ওপর নির্যাতনের কথা বিচারককে বললাম। আমার সমস্ত শরীর কালো হয়ে গিয়েছিল। বিচারক পুলিশকে বললেন, ও তো এ ঘটনার সাথে জড়িত নয়, কী কথা বলেছেন। ওর সাথে আবার কথা বলেন। আদালতের কাঠগড়ার পাশে দাঁড়িয়ে আমাকে অশ্লীল ভাষায় গালাগাল দিতে থাকল। আর বলল, তোর বিরুদ্ধে আরো মামলা আনতেছি। রিমান্ডে নিয়ে মেরেই ফেলব। তুই শেষ। মনে হলো জীবনে আবরো বড় কোনো ভুল করে ফেলেছি। পরে বিচারকের সামনে আবারো পাঠানো হলো। আমি চিন্তা করলাম, ভুল করলে করেছি। সত্য কথাই বলব। আমি বিচারককে বললাম, আমি এ ঘটনার সাথে জড়িত নই। বিচারক বাধ্য হয়েই, আমাকে কারাগারে পাঠিয়ে দিলেন। এরই মধ্যে অপর কোর্টে আরো একটি মামলা ওরা নিয়ে আসলো। কিন্তু আমার ভাগ্য ভালো। সেই আদালত ওই মামলার শুনানি করল না। পরবর্তী রবিবার শুনানির দিন ধার্য করল। আমি বেঁচে গেলাম।

এরপর কি কারাগারে পাঠিয়ে দিল?

কাওসার: হ্যাঁ। সন্ধ্যার কিছু পূর্বে আমাকে কারাগারে নেওয়া হলো। কারাগারের ভেতরে পা দিয়েই মনে হয়েছে, আমি বেহেশতে চলে এসেছি। এটা পৃথীবীর বেহেশত। আমি নিঃশ্বাস নিচ্ছি। আমি স্বাধীন, আমি মুক্ত। মনে হলো আমি বেঁচে গেলাম, বাঁচব।

কারাগারে নিয়ে চিকিৎসা করিয়েছে?
কাওসার: করিয়েছে। কিন্তু তাতে কোনো লাভ হয়নি। এরপর দীর্ঘ দিন কারাভোগের পর আমি মুক্ত হয়েছি। সেই মামলা এখনও চলছে।

এখন কী অবস্থা?
কাওসার: বাইরে এসে দীর্ঘ চিকিৎসা করাতে হয়েছে। আমার প্রস্রাবে ইনফেকশন ছিল। কিডনিতে সমস্যা হয়েছিল। কোমড়ে সমস্যা হয়েছিল। এখন অনেকটাই সুস্থ্য। তবে দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকতে পারি না।

এতো নির্যাতনের পরও কিসের আশায় রাজনীতিতে আছেন?

কাওসার: মুক্তির আশায়। রাজনীতিতে আসলে প্রাপ্তির হিসেব করলে মিলবে না। তবে আমি যতদিন বেঁচে আছি এই রাজনীতির সাথেই থাকব। মানুষের মুক্তির জন্য লড়ে যাব।

আপনাকে ধন্যবাদ।

কাওসার: ধন্যবাদ।
সূত্রঃ বাংলা আউটলুক

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ