১২ বছর পূর্তি উপলক্ষে মানববন্ধন কর্মসূচিনা’গঞ্জে আলোচিত সাতখুন বিচারেরঅপেক্ষায় এক যুগ বাড়ছে হতাশা
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
সোমবার, এপ্রিল ২৭, ২০২৬ ৬:১৮ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
সোমবার, এপ্রিল ২৭, ২০২৬ ৬:১৮ অপরাহ্ণ

এম আর কামাল, নিজস্ব প্রতিবেদক, নারায়ণগঞ্জ
ছবি প্রতিনিধি
নারায়ণগঞ্জসহ সারাদেশে আলোচিত সাত খুনের এক যুগ পার হয়ে গেলেও বিচার পায়নি সাতটি পরিবারের স্বজনরা। বিচার না পেয়ে তার চরম হতাশায় ভুগছে। সোমবার (২৭ এপ্রিল) জেলা ও দায়রা জজ আদালত প্রাঙ্গণে নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির উদ্যোগে আলোচিত সাত খুন মামলার ১২ বছর পূর্তি উপলক্ষে মানববন্ধন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়।
মানববন্ধনে প্রধান অতিথি সাত খুন মামলার বাদী পক্ষের আইনজীবী ও নাসিক প্রশাসক এডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, সাত খুনের পরে ডিসি এসপিসহ সকল অফিসারদের প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছিল। নারায়ণগঞ্জে গডফাদার শামীম ওসমান পরিবারের রাজত্বে তৎকালীন প্রশাসনের ভূমিকার জন্য তাদের প্রত্যাহার করা হয়েছে। পরবর্তী এক ব্রিমান্ডেই এই হত্যাকান্ডের রহস্য উদঘাটন হয়।
তিনি আরও বলেন, তৎকালীন জেলা ও দায়রা জজ এনায়েত হোসেন সপ্তাহে দুই তিনদিন করে শর্ট ডেট দিয়ে এই মামলায় ছাব্বিশজনকে মৃত্যুদন্ড ও বাকিদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়। আসামিরা উচ্চ আদালতে আপিল করেন। আদালত অতি অল্প সময়ে ছাব্বিশ জনের মধ্যে পনেরো জনের মৃত্যুদন্ড বহাল রাখেন ও বাকিদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করেন। বাকিদের সাজা বহাল রাখা হয়েছিল, তারা সাজা খেটে জেল থেকে বেরিয়েছে।
তিনি বলেন, এই বিচারের পরে বাংলাদেশে গুম খুন অনেকটা কমে গিয়েছিল। এই হত্যাকান্ডের রায় হলে যারা খুন গুম করে তাদের জন্য এটা শিক্ষনীয় বিষয় হিসেবে পরিগনিত হবে।
বিশেষ অতিথি নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল আমিন অতীতের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, বিগত সময়ে দেশে এক ধরনের অপসংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, যেখানে মানুষ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়েছে। আমরা সেই জায়গা থেকে বের হয়ে আসতে চাই।
সাত খুনের ঘটনায় নিহত আইনজীবী চন্দন কুমার সরকার-এর প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, চন্দন কুমার সরকার নিজের বিবেকের তাড়নায়, পেশাগত দায়িত্ব থেকে অপরাধের প্রমাণ রাখতে চেয়েছিলেন। অত্যন্ত দুঃখজনক যে, এই সততা ও সাহসিকতার কারণেই তাকে প্রাণ দিতে হয়েছে।
আইনজীবীদের ভূমিকাও তুলে ধরে তিনি বলেন, অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেনের নেতৃত্বে আইনজীবীরা তৎকালীন রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ভিকটিমদের পরিবারকে আইনি সহায়তা দিয়েছেন। নারায়ণগঞ্জের আইনজীবীরা যেভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন, তা একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভাঙতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। অতীতের মতো ভবিষ্যতেও ন্যায়বিচারের দাবিতে আইনজীবীদের পাশে থাকবো।
সড়কের উপর থেকে অপহরণ করা হয়েছিল স্থানীয় এক কাউন্সিলর, জ্যেষ্ঠ এক আইনজীবী ও তাদের গাড়িচালকসহ সাতজনকে। তিনদিন পর তাদের মরদেহ ভেসে ওঠে শীতলক্ষ্যা নদীতে, যা সারাদেশে তখন চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে।
এই ঘটনার ১২ বছর পেরিয়ে গেলেও সাতখুন মামলার রায় এখনো কার্যকর হয়নি। রাষ্ট্রীয় আইন কর্মকর্তারা বলছেন, মামলাটির রায়ে র্যা ব কর্মকর্তাসহ কয়েকজনকে মৃত্যুদণ্ড ও বাকিদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজার রায় আপিল বিভাগে বহাল থাকলেও তা এখন সুপ্রিম কোর্টের অ্যাপিলেট ডিভিশনে ‘লিভ টু আপিল’ কার্যক্রমে আটকে আছে। ফলে, দীর্ঘ সময়েও রায় কার্যকর না হওয়াতে ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের।
২০১৪ সালেল ২৭ এপ্রিল ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সংযোগ সড়ক (লিংক রোড) থেকে অপহরণের পর হত্যার শিকার হন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, আইনজীবী চন্দন সরকার, নজরুলের সহযোগী তাজুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম লিটন, মনিরুজ্জামান স্বপন, স্বপনের গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম ও আইনজীবী চন্দনের গাড়িচালক ইব্রাহিম।

রায় কার্যকরের দীর্ঘসূত্রতায় আসামিরা শাস্তি পাবে কিনা তা নিয়ে সন্দিহান সাবেক কাউন্সিলর নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা আক্তার বিউটিও। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও সারাদেশ তোলপাড় করে তোলা মামলাটির নিষ্পত্তি হয়নি। কিন্তু এখন তিনি আশা করছেন অন্তত বিএনপি সরকার এ বিষয়টি নিয়ে উদ্যোগী হবে।
সবকিছু চাক্ষুস প্রমাণিত, এখানে তো কোনো লুকোচুরি নেই। ঘটনার পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াও বলছিলেন, তারা সরকারে আসলে বিচারটি করবেন। এখন আমরা সেই আশায় আছি”, বলেন বিউটি।
গাড়িচালক জাহাঙ্গীর খুন হওয়ার একমাস পর জন্ম নেওয়া তার একমাত্র সন্তান রোজা আক্তার জান্নাতের বয়সও তার বাবার মৃত্যুদিবসের সমান। বাবার আদর থেকে বঞ্চিত এ শিশুর কাছে বাবার স্মৃতি মানে কেবল পুরোনো ছবি।
জাহাঙ্গীরের স্ত্রী শামসুন্নাহার আক্তার নুপুর চুক্তিভিত্তিতে চাকরি করেন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনে। তার একার উপার্জনেই কোনোমতে সংসার টানছেন। থাকেন শ্বশুরবাড়ির একটি ঘরে। সন্তানকে পড়াচ্ছেন একটি স্থানীয় মাদরাসায়।
আমার মেয়ে তো জন্মের পর থেকে বাবাকে দেখেনি। মাদরাসায় অন্যদের বাবাকে দেখলে তার মনেও খুব কষ্ট হয়, বাসায় এসে কান্নাকাটি করে। কিন্তু তার বাবাকে যারা নির্মমভাবে খুন করলো, মেয়েটাকে এতিম করলো, তাদের কোনো শাস্তি এখনো দেখলাম না। এই শাস্তি কবে নিজের চোখে দেখতে পাবো, তাও জানি না। খালি দিন গুনছি আমরা। বলছিলেন নুপুর।
বিচারের আশায় দিন গুনছেন নিহত তাজুলের বৃদ্ধ বাবা আবুল খায়েরও। জীবদ্দশায় বিচার দেখে যেতে পারবো কিনা, সেইটাও সন্দেহ রয়েছে বলে জানান।
২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালত এই মামলার রায়ে সাবেক কাউন্সিলর নূর হোসেন ও র্যা বের সাবেক তিন কর্মকর্তাসহ ২৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেন। ওই রায়ের বিরুদ্ধে আসামিরা উচ্চ আদালতে যান।
মামলার নথিসূত্রে জানা যায়, নিহত নজরুল ইসলামের সঙ্গে দন্ডিত নূর হোসেনের পুরোনো দ্বন্দ্ব ছিল। দু’জনই ছিলেন নাসিকের কাউন্সিলর। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এই দ্বন্দ্ব পরে লোমহর্ষক সাতখুনের ঘটনায় রূপ নেয়। ঘটনার দিন আদালতে একটি মামলায় হাজিরা দিয়ে ফিরছিলেন নজরুল। যদিও তার বাড়ি ফেরা আর হয়নি।
এদিকে ২০১৮ সালের আগস্টে উচ্চ আদালত ১৫ আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে বাকিদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেন। এরপর আপিল করা হয়। কিন্তু গত আট বছর ধরেই মামলাটি শুনানির অপেক্ষায় আছে বলে জানিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি (পিপি) আবুল কালাম আজাদ জাকির।
তিনি বলেন, আপিল বিভাগেও মামলাটি নিষ্পপ্তি হয়ে গেছে। কিন্তু পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টে ‘লিভ টু আপিল’ প্রসিডিংসে আটকে আছে বিষয়টি। এই কার্যক্রমে যদিও সময় লাগে, কিন্তু এক্ষেত্রে বেশি লাগছে। আমরা অ্যাটর্নি জেনারেল স্যারের সঙ্গে কথা বলেছি। অ্যাজ সুন অ্যাজ পসিবল, এটি নিষ্পত্তির চেষ্টা করছি।
জনতার আওয়াজ/আ আ