ইসিকে লাল কার্ড : আমিরুল ইসলাম কাগজী
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
বৃহস্পতিবার, জুলাই ২০, ২০২৩ ২:২২ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
বৃহস্পতিবার, জুলাই ২০, ২০২৩ ২:২২ অপরাহ্ণ

১।
জাতীয় সংসদের ঢাকা ১৭ আসনের নির্বাচনে অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী হিরো আলম নৌকার পাণ্ডাদের হাতে বেদম প্রহারে আহত হয়ে এখন নগরীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। তাৎক্ষণিকভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও পত্রিকাগুলোর খবর থেকে জানা গেল,আশরাফুল হোসেন ওরফে হিরো আলমকে ভোটকেন্দ্রের ভেতর থেকে ধাওয়া দিয়ে বাইরে আনার পরে রাস্তায় ফেলে পিটিয়েছে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর সমর্থকেরা। হামলাকারীদের বুকে ছিলো নৌকা প্রতীকের ব্যাজ । সোমবার, জুলাই ১৭, ২০২৩, বেলা সোয়া তিনটার দিকে রাজধানীর বনানী বিদ্যানিকেতন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ভোটকেন্দ্র পরিদর্শনে গেলে হিরো আলমের ওপর এ হামলা হয়।
তার ওপর হামলার পুরো ঘটনা দেখে মনে হয় না, অতি উৎসাহী কর্মীদের আকস্মিক প্রতিক্রিয়া। কিংবা কোনো কথা কাটাকাটির কারণে তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাটি ঘটে গেছে। কিন্তু মোটেই না। এটিকে পরিকল্পিত বলে মনে হয়েছে। এটি আগামী নির্বাচনের সম্ভাব্য পরিবেশ নিয়ে যে পূর্বাভাস দিচ্ছে তা হিরো আলমের কথাতে খানিকটা বোঝা যাবে। মার খাওয়ার পর হিরো আলম বলেছেন ‘এ রকম পরিবেশ হলে নির্বাচন করার দরকারই নেই’। তার এই উক্তি নির্বাচন কমিশনকে প্রকাশ্য লাল কার্ড বলে মনে করেন দেশের জনগণ।
হিরো আলমের ওপর এই পরিকল্পিত হামলার পাশাপাশি এই নির্বাচনের আরেকটি নেতিবাচক দিক হলো ভোটারদের ভোটদানে অনীহা। এই সরকার এবং তাদের তস্কর নির্বাচন কমিশন, পুলিশ বাহিনী ও রিটার্নিং (ডিসি) অফিসারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে না তার একটা মহড়া হয়ে গেল সোমবার । যে নির্বাচনে কমিশন একজন প্রার্থীর নিরাপত্তা দিতে পারে না তাদের কোনো মেরুদণ্ড নেই। এদের বিরুদ্ধে আমেরিকার ভিসা নীতি আসবে নাতো কাদের বিরুদ্ধে আসবে? আর পুলিশ বাহিনী -সে তো দেখি কথার ফুলঝুরিতে ওস্তাদ। ৪ঠা জুলাই পুলিশ কমিশনার খন্দকার ফারুক কি বলেছিলেন? উপনির্বাচনে পুলিশের ভূমিকা শতভাগ নিরপেক্ষ থাকবে বলে নিশ্চয়তা দিয়েছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার। তিনি বলেছিলেন, ‘এক শ ভাগ গ্যারান্টি দিলাম। আপনারা ১৭ তারিখের নির্বাচন দেখেন। নিরপেক্ষতার প্রমাণ পান কি না। যদি না পান, বলবেন, ডিএমপি কমিশনার হিসেবে নাকে খত দিয়ে চলে যাব।’
জুলাই ৪, ২০২৩, ঢাকা-১৭ সংসদীয় আসনের উপনির্বাচনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নির্বাচন কমিশনে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে ডিএমপি কমিশনার সাংবাদিকদের এই বচন দিয়েছিলেন । নির্বাচন ভবনের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল।অর্থাৎ এবং পুলিশ কমিশনার দুজনই সরকারের দাসানুদাসের উত্তম উদাহরণ উপস্থাপন করেছেন।
২।
এই উপনির্বাচনে দুটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে গেল। প্রথমত, নির্বাচনের প্রতি ভোটারদের আস্থাহীনতা এবং হিরো আলমের ওপর হামলা। এই নির্বাচনে মাত্র ১১ শতাংশ ভোট পড়েছে। ফলে পৃথিবীর মানুষের কাছে বাংলাদেশ একটি উদাহরণ যে, এখানে মানুষ ভোট দিতে যায় না এবং ভোটের প্রতি আস্থা নেই। কারণ মানুষের মনে এই ধারণা তৈরি হয়েছে, এখানে ভোটের নামে তামাশা হয়। এ অবস্থা হলে কে ভোট দিতে যাবে। দ্বিতীয়ত, ভোটের দিনে একজন প্রার্থীর ওপর ন্যক্কারজনক হামলা। বিদেশিরা এসব নজরদারি করছে। ইতোমধ্যে তারা বুঝে গেছে আগামীতে কী নির্বাচন হবে।
ঢাকা-১৭ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ২৫ হাজার ২০৫ জন্য। আওয়ামী লীগের প্রার্থী পেয়েছেন ২৮ হাজার ৮১৬। হিরো আলম পেয়েছেন ৫ হাজার ৬০৯। আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ এনে ভোট চলাকালেই বর্জনের ডাক দিয়েছেন। তিনি আগেভাগে সরে গিয়ে মার খাওয়া থেকে রেহাই পেয়েছেন। এর আগে বরিশাল সিটি নির্বাচনেও ইসলামী আন্দোলনের মেয়র প্রার্থী নৌকার সমর্থকদের হাতে মার খেয়েছিলেন। সেদিন সিইসি হাবিবুল আউয়াল সাংবাদিকদের কাছে জানতে চেয়েছিলেন উনি কি ইন্তেকাল করেছেন? তাঁর সেদিনের কথায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা যে উৎসাহ পেয়েছিল তার প্রমান পাওয়া গেলো হিরো আলমের ওপর ন্যাক্কারজনক হামলা। আগে নির্বাচনে দুই দলের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে মারামারি হতো। এখন সরাসরি প্রার্থীরা আক্রান্ত হচ্ছেন। এটা আমাদের সুষ্ঠু নির্বাচনব্যবস্থার উন্নতিই বটে!
দেশে সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ রয়েছে কিনা তা পর্যবেক্ষণে বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করছে। সংস্থাটির এই সফরের উদ্দেশ্য হলো আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারা পর্যবেক্ষক পাঠাবে কিনা এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে। অর্থাৎ আগামী নির্বাচনে পর্যবেক্ষক পাঠানোর বিষয়টি এই সফরের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু তাদের চোখের সামনেই হিরো আলমের ওপর হামলা হয়েছে। এটি তাদের কাছে পরিষ্কার একটি বার্তা। তারা বিভিন্ন জায়গা থেকে তথ্য সংগ্রহ করছেন। এখানে কিছু বলবে না। এই তথ্য তারা তাদের প্রধান কার্যালয়ে রিপোর্ট জমা দেবে। সেই অনুসারে পরবর্তী ব্যবস্থা নেবে।
মাত্র দুদিন আগে ঢাকা ঘুরে গেলেন যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ ক্ষমতাধর দুজন মন্ত্রী উজরা জেয়া ও ডোনাল্ড লু যারা বাংলাদেশে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও সকলের অংশ গ্রহণে একটি নির্বাচনের জোর তাগিদ দিয়েছেন। কোনো ছবকই সরকার ও নির্বাচন কমিশনের আচরণে প্রভাব ফেলতে পারে নাই। ফলে এটি পরিষ্কার যে,এখানে ভোট কীভাবে হয় এবং ভোটের নামে কী হয় সেটা তারা আরেকবার দেখিয়ে দিলো। এটি বাংলাদেশের জন্য ভালো কোনো খবর নয়।
৩।
হিরো আলমের ওপর হামলার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতিসংঘ। ঢাকায় নিযুক্ত সংস্থাটির আবাসিক প্রতিনিধি গোয়েন লুইস এক টুইট বার্তায় এই উদ্বেগের কথা জানান। তিনি বলেন, সহিংসতামুক্ত নির্বাচনে অংশগ্রহণ সবার মৌলিক অধিকার। সেটিকে রক্ষা করা উচিত।
এর আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে সাংবাদিক মুশফিকুল ফজল আনসারীর প্রশ্নের জবাবে ম্যাথু মিলার বলেন, গণতান্ত্রিক নির্বাচনে এ ধরনের রাজনৈতিক সহিংসতার কোনো স্থান নেই। যে কোনো ধরনের সহিংসতার পুঙ্খানুপুঙ্খ, স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য আমরা বাংলাদেশ সরকারকে আহ্বান জানাই। আমরা বাংলাদেশের পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছি।
হিরো আলমের ওপর হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। মঙ্গলবার লন্ডনভিত্তিক সংস্থাটির দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের টুইটার একাউন্ট থেকে এক বার্তার মাধ্যমে এ নিন্দা প্রকাশ করা হয়। এতে বলা হয়, ‘এ ধরনের হামলা ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় সাধারণ নির্বাচনের আগে একটি আতঙ্কের বার্তা দিচ্ছে। কর্তৃপক্ষকে অবশ্যই অবিলম্বে এ হামলার নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
জুলাই ১৯, ২০২৩, হিরো আলমের ওপর হামলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ঢাকায় ১৩ দেশের দূতাবাস। তারা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছে।
৪.
বাংলাদেশে অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে জাতীয় নির্বাচন নিশ্চিতের লক্ষ্যে গত ২৪ মে নতুন ভিসানীতি ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এই নীতির আওতায় বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য দায়ী বা জড়িতদের ভিসা দেবে না দেশটি। এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ন্যাশনালিটি অ্যাক্টের কয়েকটি ধারায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য দায়ী বা জড়িত ব্যক্তিদের মধ্যে বাংলাদেশ সরকারের বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তা, সরকার সমর্থক এবং বিরোধী রাজনৈতিক দলের সদস্য, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, বিচার বিভাগ ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।
গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে এমন কাজের মধ্যে রয়েছে ভোট কারচুপি, ভোটারদের ভয় দেখানো, জনগণকে সংগঠিত হওয়ার স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার চর্চাকে সহিংসতার মাধ্যমে বাধাদান। পাশাপাশি রাজনৈতিক দল, ভোটার, নাগরিক সমাজ এবং গণমাধ্যমকে তাদের মতামত প্রচার করা থেকে বিরত রাখতে বিভিন্ন ধরনের কর্মকাণ্ড নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করার পদক্ষেপের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। এসব বিষয়ে বার্তা দিতে গত সপ্তাহে বাংলাদেশ সফর করে গেলেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের বেসামরিক নিরাপত্তা, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি উজরা জেয়া এবং মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক মার্কিন অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি ডোনাল্ড লু। এরপরই একটি উপনির্বাচনে একজন প্রার্থীর ওপর এই হামলার ঘটনা ঘটল। পরিস্থিতি পর্যালোচনায় নির্বাচনি ও রাজনৈতিক সংঘাত-সহিংসতা আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আমিরুল ইসলাম কাগজী সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
জনতার আওয়াজ/আ আ