এবার আরও কঠোর অ্যাকশনে যাচ্ছে দলটির হাইকমান্ড
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
সোমবার, জুলাই ১৪, ২০২৫ ১:৫০ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
সোমবার, জুলাই ১৪, ২০২৫ ১:৫০ অপরাহ্ণ

জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ফাইল ছবি
টানা তিন মেয়াদে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকার সময় রাজনৈতিকভাবে পুরোপুরি কোণঠাসা ছিল বিএনপি। হামলা-মামলা, গ্রেপ্তারের ঘানি টানতে হয়েছে দলটির নেতাকর্মীদের। গত জুলাই-আগস্টের অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের পর স্বস্তিতে থাকা বিএনপি আবারও চাপের মধ্যে পড়েছে। অন্যায়-অপরাধে জড়ানো নেতাকর্মীদের কারণে রীতিমতো বেকায়দায় পড়েছে দলটির হাইকমান্ড। নিজেদের মধ্যে কোন্দলে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে।
গত (৫ আগস্ট) এরপর থেকে দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে এ পর্যন্ত সারা দেশে দল এবং এর অঙ্গসহযোগী সংগঠনের সাড়ে চার হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়েছে বিএনপি। জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকেই সারা দেশে দখল, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করেছে দলটি। অনিয়ম ও সংগঠনবিরোধী কার্যকলাপ সংগঠিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সাংগঠনিক ব্যবস্থাও নিচ্ছে। তার পরও দলটিতে এখনও শৃঙ্খলা ফেরেনি পুরোপুরি।
সবশেষ পুরান ঢাকায় পুরোনো তামার তার ব্যবসায়ী সোহাগ হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে তোলপাড় ফেলে দিয়েছে। প্রকাশ্যে নৃশংসভাবে তাকে হত্যার ঘটনায় পুরো দায় বিএনপির ঘাড়ে দিচ্ছেন এই ইস্যুতে মাঠে নামা রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীরা। অবশ্য ঘটনা সামনে আসার পর যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের বহিষ্কার করা হয়েছে। বিএনপির পক্ষ থেকে দ্রুত জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করা হয়েছে।
শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে এখন পর্যন্ত চাঁদাবাজি বা অন্যায়-অনিয়মে না জড়াতে নেতাকর্মীদের বারবার কঠোর বার্তা দেওয়া হয়েছে বিএনপির পক্ষ থেকে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত সাড়ে ৪ হাজার নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের পক্ষ থেকেও অপরাধে জড়ানো নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। প্রশ্ন উঠেছে— এত বহিষ্কার, কড়া বার্তার পরও কেন নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না বিএনপি নেতাকর্মীদের? তাই এবার আরও কঠোর অ্যাকশনে যাচ্ছে দলটির হাইকমান্ড। অপরাধী যেই হোক, তার পরিচয় ‘অপরাধী’; সে যত বড় নেতাই হোক, কাউকেই ছাড় দেবে না দলটি।
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা জয়নুল আবদিন ফারুক ব্রেকিংনিউজকে বলেন, ‘বিএনপি বড় দল, অনেক সুযোগসন্ধানী এখন দলে ঢোকার চেষ্টা করছে। দলের পক্ষ থেকে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। কেউ এদের দলে নিলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। অপরাধে জড়ানোর অভিযোগ পেলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এরপরও কিছু ঘটনা যে ঘটছে না, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।’
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী বলেন, দলের নামে যারা দুর্বৃত্তপনা করছে, অনৈতিক কর্মকাণ্ড করছে, মানুষকে বিরক্ত করছে, মানুষের মধ্যে ভীতি সঞ্চার করছে— তাদের বিএনপি রেহাই দেয়নি, আগামীতেও দেবে না। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রতিনিয়ত, প্রতিটি সময় সারা দেশে কোথায় কী ঘটছে দলের নামে, কারা কী করছে— সবকিছুর খবর নিচ্ছেন। এসব ঘটনায় আমরা সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নিচ্ছি।
এদিকে সোহাগ হত্যার ঘটনা সামনে আসার পর দলের ভেতর থেকে চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠলে সংশ্লিষ্ট কমিটির শীর্ষ নেতাদেরও বাদ দেওয়ার দাবি উঠেছে সামাজিক মাধ্যমসহ নানা জায়গায়। অনেকেই বলছেন, অযোগ্য নেতৃত্বের কারণেই এমন ঘটনা ঘটছে।
রাজনৈতিক সহিংসতার মোট ঘটনার মধ্যে বিএনপির অন্তর্কোন্দলের ঘটনা ৩০২টি। এতে নিহত হয়েছেন ৪৬ জন, আহত হয়েছেন কমপক্ষে ২,৮৩৪ জন।
অন্যদিকে বিএনপি ও কার্যক্রম নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগের মধ্যে ১০১টি সংঘর্ষে ১৬ জন নিহত ও ৫০২ জন আহত হয়েছেন। বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের মধ্যে ২৬টি সংঘর্ষে দুজন নিহত ও আহত হয়েছেন ২১৬ জন। এ ছাড়া বিএনপি-এনসিপির ১১টি সংঘর্ষে আহত হন ৭৯ জন।
ভারী হচ্ছে বহিষ্কারের পাল্লা
বিএনপির দপ্তরের বাইরেও অন্যায়-অপকর্মে জড়ানো নেতাকর্মীদের বিষয়ে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সার্বক্ষণিক খোঁজখবর রাখছেন। কোথাও কোনো ধরনের শৃঙ্খলাবিরোধী ঘটনা ঘটলে দ্রুতই জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দিচ্ছেন তিনি।
বিএনপির দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, নানা ধরনের অপরাধ ও শৃঙ্খলাবিরোধী কাজে জড়িত হওয়ার দায়ে এখন সাড়ে চার হাজারের মতো নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এসব অপরাধীদের যারা প্রশ্রয় দিচ্ছেন, তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানাচ্ছেন বিএনপি নেতারা।
অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের পতনের পর এখন পর্যন্ত সারা দেশে নানা অপরাধে ছাত্রদলের ৩২৯ জনকে বহিষ্কার ও ৫৪১ জন নেতাকর্মীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। স্বেচ্ছাসেবক দল বহিষ্কার করেছে কমপক্ষে ১০০ জনকে। কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে ১৫০ জনকে। পদ স্থগিত হয়েছে ১০০ জনের। যুবদল থেকেও বহিষ্কার হয়েছেন দেড় শতাধিক নেতাকর্মী। শোকজ করা হয়েছে ৫৬ জনকে। আর পদ স্থগিত হয়েছে পাঁচজনের।
‘ষড়যন্ত্র দেখছে বিএনপি’
সোহাগ হত্যার ঘটনা ঘিরে জামায়াতসহ রাজনৈতিক দলগুলো দেশজুড়ে যে প্রতিবাদ শুরু করেছে, এর পেছনে নির্বাচন পেছানোর ষড়যন্ত্র দেখছে বিএনপি। এসব কর্মসূচি থেকে বিএনপিকে নিয়ে আপত্তিকর স্লোগান দেওয়ার অভিযোগও তুলেছেন তারা। এসব তৎপরতার নেপথ্যে সরকারেরও হাত আছে— এমন ধারণা অনেক বিএনপি নেতার।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী ব্রেকিংনিউজকে বলেন, ‘বিএনপির নাম ভাঙিয়ে যারা অপকর্মে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিকভাবে দল থেকে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঢিলেঢালা ভূমিকা রহস্যজনক। দলের পক্ষ থেকে বারবার অপরাধী ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে বলা হলেও প্রশাসন নির্বিকার।’
এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘মানুষকে বিনা বিচারে হত্যা, এটা কখনো গ্রহণযোগ্য নয়। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সংস্কৃতি ভালো না। কেউ যদি অপরাধ করে থাকে, তার বিচারের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী করবে, আদালত করবে। পাথর দিয়ে যারা হত্যা করল, তাদের প্রশাসন এখনো কেন গ্রেপ্তার করছে না? এ ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কেন ব্যর্থ হচ্ছে? প্রায় এক বছরেও কেন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না? এর পেছনে কারা বাধা দিচ্ছে?’
জনতার আওয়াজ/আ আ