কুমিল্লায় শিশু নির্যাতন মামলা উঠিয়ে নিতে ৫ লাখ টাকা দিতে চান বিবাদী!
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
বৃহস্পতিবার, জানুয়ারি ১২, ২০২৩ ২:২০ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
বৃহস্পতিবার, জানুয়ারি ১২, ২০২৩ ২:২০ অপরাহ্ণ

নিউজ ডেস্ক
গৃহকর্মীকে নির্যাতন করে গরম পানি ঢেলে শরীর ঝলসে দেয়ার মামলায় কারাগারে আছেন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষের স্ত্রী তাহমিনা তুহিন। এদিকে মামলা তুলে নিতে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত দাম হাঁকাচ্ছেন ওই নারীর স্বজনরা। এমন অভিযোগ করেছেন আহত গৃহকর্মীর মামা হাফেজ ইব্রাহিম খলিল। একইসঙ্গে জানান অবহেলা আর নির্যাতনের কথা।
বুধবার (১১ জানুয়ারি) সকালে নিজ বাসা থেকে অভিযুক্ত তাহমিনা তুহিনকে আটক করে পুলিশ। ওইদিন বিকেলে তাহমিনা তুহিনের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে শিশুটির মামা ইব্রাহীম খলিল বাদী হয়ে মামলা করেন। নির্মম নির্যাতনের ঘটনায় সমালোচনার ঝড় উঠেছে পুরো কুমিল্লায়।
এর আগে মঙ্গলবার (১০ জানুয়ারি) রাতে কুমিল্লা নগরী লাগোয়া ধর্মপুর পূর্ব দৌলতপুর এলাকায় সাবেক অধ্যক্ষ মো. আবু তাহেরের বাসা এসআরটি প্যালেসে গরম পানি ঢেলে নির্যাতনের সময় প্রাণ বাঁচাতে মেয়েটি দোতলা থেকে লাফিয়ে পড়ে। মঙ্গলবার রাত ১০টার দিকে স্থানীয় লোকজনের মাধ্যমে খবর পেয়ে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে। বর্তমানে সে কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন। ভুক্তভোগী শিশুটির বাড়ি কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলার তেবাড়িয়া গ্রামে।
বাদী ইব্রাহীম খলিল বলেন, ‘ভাগনির বাবা নেই। পরে আমরা তার মাকে অন্যত্র বিয়ে দেই। বিয়ের কিছুদিন পর পাশের বাড়ির এক লোক এসে আমাকে বলেন, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের অধ্যক্ষ আবু তাহেরের মেয়ের বাচ্চাদের খেলার কোনো বন্ধু নেই। যদি আমার ভাগনিকে দেই তাহলে তারা বাচ্চাদের সঙ্গে খেলাধুলা করবে আর তাদের সঙ্গে পড়াশোনাও করবে। প্রথমে আমি রাজি হইনি। পরে ওই মেয়ে আসে এবং আমাদের অনুরোধ করে বলেন, আমার ভাগনিকে নিজের মেয়ের মত করে রাখতে চান।’
তিনি আরো বলেন, ‘আর্থিক অনটনের পরিবারের বুকে পাথর বেঁধে ভাগনিকে দিয়ে দেই। দেওয়ার দুই তিন মাস আমার বোনের সঙ্গে কথা হয়েছে। এরপর থেকে চার বছর সে কুমিল্লায়। কোনোদিন আমার সঙ্গে কথা হয়নি। শুনেছি আমার বোনের সঙ্গেও তার তেমন কথা হয়নি।’
চার বছরে কোনোদিন ভাগনির সঙ্গে কথা বলতে চাননি এমন প্রশ্নে ইব্রাহিম বলেন, ‘আমার ভাগনি আমার কত কাছের, যারা আমাকে চেনেন তারা জানেন। আমি প্রতি সপ্তাহে কল দিতাম। ওই নারীর (তাহমিনা তুহিন) মেয়ে বলতো, আপনার ভাগনি কথা বললে কান্না করবে। তাই কথা বলতে দিতো না।’
মামলা তুলে নিতে কোনো হুমকি আসছে কিনা এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘মামলা করার আগে থেকেই টাকা দিয়ে তারা সমাধানের চেষ্টা করে যাচ্ছে। মামলার পরে আমাদের স্থানীয় নেতারা এসেছেন মিমাংসা করতে। প্রথমে এক লাখ টাকা দেবে বলেছে। আমি রাজি না হওয়ায় তা পাঁচ লাখ পর্যন্ত উঠেছে। গরিবের সংসার। না খেয়ে থাকবো কিন্তু ভাগনিকে যারা এত কষ্ট দিয়েছে, তাদের বিচার হোক। আমি আদালতের কাছে বিচার চাই।’
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শিশুটি জানায়, শিক্ষক আবু তাহেরের মেয়ে ফাহমিদা তিমুর ঢাকার বাসা এবং আবু তাহেরের কুমিল্লার বাসায় চার বছর ধরে কাজ করছে সে। কোনো কারণে কাজে একটু দেরি হলেই তাহেরের স্ত্রী ও মেয়ে জালি বেত দিয়ে তাকে মারধর করতেন দীর্ঘদিন ধরে। এক পর্যায়ে নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়ে শরীরে গরম পানি ঢালা শুরু করেন তাঁরা। এ ছাড়া নির্যাতনের কথা কাউকে বললে মেরে ফেলার হুমকিও দেওয়া হয় তাকে।
ভাগনি এখন কেমন আছে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘শরীরের ব্যান্ডেজগুলো একবার চেঞ্জ করেছে ডাক্তার। তার অবস্থা আগের মতোই। এখনো শোয়ায় আছে। ডাক্তার বলেছে, সুস্থ হতে সময় লাগবে।’
এদিকে ৯ জানুয়ারি গ্রেফতার তাহমিনা তুহিনের জামিন নামঞ্জুর করেছে আদালত। কুমিল্লা জেলা ও দায়রা জজ মো. হেলাল উদ্দিন এ আদেশ দেন।
তবে ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ আবু তাহের বলেন, ‘মেয়েটি আমাদের আত্মীয়ের মধ্যে। আমার মেয়ের শ্বশুরবাড়ি দেবিদ্বারে তার বাড়ি। আমার স্ত্রী জানিয়েছেন, তাকে মারধর করেননি। সে পাপশে পিছলে পড়ে পায়ে একটু গরম পানি পড়েছে।’ পাশের হোস্টেলের একটি মেয়ে বিষয়টিকে বড় করেছে বলে দাবি করেন তিনি।
কুমিল্লার কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আহমেদ সনজুর মোর্শেদ মিন্টু বলেন, ‘ঘটনার পর মামলা করেন ওই গৃহকর্মীর মামা। পরে অভিযুক্তকে আমরা গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠিয়েছি। এ ঘটনায় তদন্ত চলমান।’
জনতার আওয়াজ/আ আ