জনপ্রত্যাশার ইশতেহার’ প্রকাশ করল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
বুধবার, ফেব্রুয়ারি ৪, ২০২৬ ৪:৫৩ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
বুধবার, ফেব্রুয়ারি ৪, ২০২৬ ৪:৫৩ অপরাহ্ণ

জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে। দলটির পক্ষ থেকে এই ইশতেহারের নাম দেওয়া হয়েছে ‘জনপ্রত্যাশার ইশতেহার’।
বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর পুরানা পল্টনে অবস্থিত ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আইএবি মিলনায়তনে আনুষ্ঠানিকভাবে ইশতেহার ঘোষণা করেন দলটির আমির ও চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম।
ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, মহান স্বাধীনতার যুদ্ধ এবং জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে জনপ্রত্যাশার উন্মেষ ঘটেছে, তা রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রতিফলিত করার অঙ্গীকার থেকেই এই ইশতেহারের নামকরণ করা হয়েছে ‘জনপ্রত্যাশার ইশতেহার’। জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানোই এই ইশতেহারের মূল লক্ষ্য।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের মাধ্যমেই রাষ্ট্রের পরিচালক এবং নীতিনির্ধারক নির্ধারিত হয়। আর নির্বাচনের আগে ইশতেহারের মাধ্যমে একটি রাজনৈতিক দল জাতির সামনে তাদের নীতি ভাবনা, দর্শন এবং দেশ গঠনের রূপরেখা তুলে ধরে। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ তাদের নীতি ভাবনা, কর্মসূচি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার রূপরেখা জনগণের সামনে উপস্থাপনের জন্যই এই ইশতেহার পেশ করেছে।
মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে একটি ছাত্র আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় দেশজুড়ে গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। সেই আন্দোলনে দুই হাজারের বেশি মানুষ নিহত হন এবং হাজার হাজার নাগরিক পঙ্গুত্ব ও অন্ধত্বের শিকার হন। এই আত্মত্যাগের বিনিময়েই স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটে। তিনি মহান স্বাধীনতা যুদ্ধ ও জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী শহীদ, আহত ও আত্মউৎসর্গকারীদের প্রতি গভীর সম্মান ও শ্রদ্ধা জানান।
তিনি জানান, ইশতেহারটি তিনটি অধ্যায়ে উপস্থাপন করা হয়েছে। প্রথম অধ্যায়ে রয়েছে রাষ্ট্র গঠনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নীতিগত অবস্থান। দ্বিতীয় অধ্যায়ে রাষ্ট্র সংস্কারে তাদের পরিকল্পনা এবং তৃতীয় অধ্যায়ে খাতভিত্তিক উন্নয়ন পরিকল্পনার বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে।
ইশতেহারের লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, ইসলামকে শুধু প্রচলিত অর্থে ধর্ম হিসেবে দেখলে এর পূর্ণতা উপলব্ধি করা যায় না। বিশ্বাস ও ইবাদতের পাশাপাশি ইসলাম মানুষের জীবন পরিচালনার সব ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও নির্দেশনা প্রদান করে। বিশেষ করে মানুষের সবচেয়ে বড় যৌথ উদ্যোগ রাষ্ট্র পরিচালনা ও শাসন ব্যবস্থার ক্ষেত্রে ইসলামের রয়েছে সুস্পষ্ট, বিস্তৃত এবং বহু শতাব্দী ধরে চর্চিত রীতি নীতি ও বিধিমালা। এসব নীতির আলোকে দীর্ঘ প্রায় তেরো শতাব্দী ধরে মানবসভ্যতা শান্তি ও সমৃদ্ধির সঙ্গে পরিচালিত হয়েছে।
তিনি বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় ইসলামের মৌলিক নীতিমালার মধ্যে রয়েছে ন্যায়বিচার, ইনসাফ, নাগরিক স্বার্থের প্রতি সংবেদনশীলতা, দায়বদ্ধতা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং আইনের শাসন। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে এই মৌলিক নীতিমালার পূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা হবে।
চরমোনাই পীর বলেন, ক্ষমতা হস্তান্তরকে কেন্দ্র করে যে অস্থিরতা বারবার সৃষ্টি হয়, সেখান থেকে দেশকে বের করে আনা হবে। ভোটাধিকার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা নিশ্চিত করা হবে। রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা, ক্ষমতা, জবাবদিহিতা এবং ক্ষমতার ভারসাম্য সাংবিধানিকভাবে স্পষ্ট করা হবে, যাতে নির্বাহী আধিপত্য ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ কমে আসে। জাতীয় স্বার্থ, নাগরিক অধিকার এবং রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করতে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা জোরদার করা হবে।
তিনি আরও বলেন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ দেশের সব মানুষকে সমান অধিকার ও মর্যাদাসম্পন্ন নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করে। ধর্ম বা জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে কাউকে সংখ্যালঘু বা সংখ্যাগুরু হিসেবে দেখা হবে না। সবার ধর্মীয় বিশ্বাস রক্ষা ও পালনের জন্য নিরাপদ এবং উৎসবমুখর পরিবেশ নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করা হচ্ছে। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি হুমকির মুখে পড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব রক্ষায় বিশেষ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে। পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক সহিংসতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে সহনশীলতা ও পরমতসহিষ্ণুতা বজায় রাখতে কার্যকর ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির বলেন, শরীয়াহ অনুযায়ী নারীদের সম্পত্তির উত্তরাধিকার নিশ্চিত করতে আইনগত ও সামাজিক বাস্তবায়ন জোরদার করা হবে। পথশিশু ও বস্তিবাসীদের জন্য সুনির্দিষ্ট সামাজিক সুরক্ষা এবং পুনর্বাসন নীতি গ্রহণ করা হবে। গৃহকর্মী, অনানুষ্ঠানিক এবং অবৈতনিক পরিচর্যা কাজে নিয়োজিত নারীদের শ্রমের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এবং সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করার কথাও ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইশতেহারে দুর্নীতিকে বাংলাদেশের প্রধান সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়, নৈতিক, আইনি এবং প্রাতিষ্ঠানিক বহুমাত্রিক কৌশলের মাধ্যমে দুর্নীতিকে ধীরে ধীরে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা হবে। দুর্নীতিবিরোধী আইন ও নীতিমালা কাগজে সীমাবদ্ধ না রেখে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি প্রতিরোধ, আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং বাজারে ন্যায্য প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করা হবে।
ইশতেহারে আরও বলা হয়, দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা নীতি বাস্তবায়ন করা হবে। সরকারি নিয়োগ ও পদোন্নতিতে ঘুষ, স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দুর্নীতির ক্ষেত্রে দৃষ্টান্তমূলক ও প্রকাশ্য শাস্তি নিশ্চিত করা হবে, যাতে আইনের ঊর্ধ্বে কেউ না থাকে। সেবাখাতে সিন্ডিকেট চক্র বন্ধ করে ঘুষ ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার অঙ্গীকারও করা হয়েছে।
সবশেষে মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম বলেন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ নারীর প্রতি দায়বদ্ধ। দেশের নারীদের বর্তমান পরিস্থিতি সমস্যাজনক বলে স্বীকার করে তিনি বলেন, নারীর মর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় এ দেশের হাজার বছরের বিশ্বাস, বোধ ও ঐতিহ্যের আলোকে প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
জনতার আওয়াজ/আ আ