জেনারেল (অব.) আজিজ, আইনের ঊর্ধ্বে নন - জনতার আওয়াজ
  • আজ সন্ধ্যা ৭:৩৬, বৃহস্পতিবার, ১৪ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩১শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৭শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

জেনারেল (অব.) আজিজ, আইনের ঊর্ধ্বে নন

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: শনিবার, মে ২৫, ২০২৪ ৮:৫১ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: শনিবার, মে ২৫, ২০২৪ ৮:৫১ অপরাহ্ণ

 

বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রে একজন নাগরিকও আইনের ঊর্ধ্বে নন। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী পর্যন্ত, অর্থাৎ রাষ্ট্রের যেকোনো নাগরিক সংবিধানের অধীন। শুধু রাষ্ট্রপ্রধানরূপে রাষ্ট্রপতি অন্য সব ব্যক্তির ঊর্ধ্বে স্থান লাভ করবেন, যা সংবিধানের ৪৮-এর (২) অনুচ্ছেদ নিশ্চিত করেছে। রাষ্ট্রপতি সব ব্যক্তির ঊর্ধ্বে কিন্তু আইনের ঊর্ধ্বে নন।
সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।’ সুতরাং রাষ্ট্রের কোনো নাগরিক অপরাধে জড়িত হলে তাকে আইনের আওতায় আনতেই হবে। কারণ রাষ্ট্রের কাছে সব নাগরিক সমান। আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কাউকে পদমর্যাদার ভিত্তিতে রেহাই দেওয়া বা অব্যাহতি দেওয়া কিংবা আনুকূল্য প্রদর্শনের কোনো সুযোগ রাষ্ট্রের নেই।
সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি বা ক্ষমতার অবৈধ ব্যবহারের অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে। তারা উল্লেখ করেছে, দুর্নীতির সঙ্গে ব্যাপক সম্পৃক্ততার অভিযোগে সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ এবং তার পরিবারের সদস্যদের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্র। স্থানীয় সময় গত সোমবার দুপুরে (বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার ভোরে) মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বাইডেন প্রশাসনের ওই সিদ্ধান্তটি প্রকাশ করে।
তার (আজিজ আহমেদ) কর্মকাণ্ডে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অবমূল্যায়ন এবং সরকারি প্রতিষ্ঠান ও প্রক্রিয়ার ওপর জনগণ আস্থাহীন হয়ে পড়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর বলছে, আজিজ আহমেদ তার এক ভাইকে বাংলাদেশে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য জবাবদিহি এড়াতে সহযোগিতা করেন। এটা করতে গিয়ে তিনি নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য দুর্নীতি করেন।
এ ছাড়া অন্যায্যভাবে সামরিক খাতে কনট্রাক্ট পাওয়া নিশ্চিত করার জন্য তিনি তার ভাইদের ঘনিষ্ঠভাবে সহায়তা করেন, সরকারি নিয়োগের বিনিময়ে বিরাট অঙ্কের ঘুষ নেন। জেনারেল আজিজ এবং তার পরিবারকে যুক্তরাষ্ট্রে নিষিদ্ধ করার ঘোষণা এসেছে দেশটির ফরেন অপারেশন অ্যান্ড রিলেটেড প্রোগ্রামস অ্যাপ্রিসিয়েশন অ্যাক্ট ৭০৩১ (সি)-এর আওতায়। যুক্তরাষ্ট্রে তার প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে বাইডেন প্রশাসন। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো জেনারেলের ওপর এমন নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। এতে জনমনে নানা প্রশ্ন ও কৌতূহল যেমন জন্ম নিচ্ছে, তেমনি রাষ্ট্র এবং দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীর মর্যাদাও ক্ষুণ্ন হচ্ছে।
এখন সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত সম্পন্ন করা। এটা সরকারের জন্য সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। এ ধরনের উচ্চমাত্রার অভিযোগের সঙ্গে রাষ্ট্রের ওপর জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস জড়িত। সেটার নিষ্পত্তি অবশ্যই প্রয়োজন। এটা নিছক কোনো ঘটনা নয়। কারও অপরাধ বা অপরাধ সম্পৃক্ততা বা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হয়ে আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ডে জড়িত হওয়ার প্রশ্ন যখন বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে উত্থাপিত হচ্ছে এবং নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসছে, তখন প্রজাতন্ত্রের পক্ষে এটা উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই।
দেশের একজন সাধারণ নাগরিকের বিরুদ্ধে যদি যুক্তরাষ্ট্র এই অভিযোগ উত্থাপন করত, তাহলে সঙ্গে সঙ্গেই সরকার সারা দেশে অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করত। কিন্তু বিশেষ বিশেষ ব্যক্তির বেলায় সরকারের নীরবতা বা নিষ্ক্রিয়তা কোনোক্রমেই সংবিধানের শ্রেষ্ঠত্বকে সুরক্ষা দেয় না। রাষ্ট্রের কোনো নাগরিক বা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত কোনো ব্যক্তি অনুপার্জিত আয় ভোগ করতে সমর্থ হবে না, এটা সংবিধান ২০ (২) অনুচ্ছেদে নির্দেশনা দিয়েছে।
সুতরাং অনুপার্জিত আয়, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, স্বজনপ্রীতি বা পদের কর্তব্য পালনের নামে সংবিধান লঙ্ঘনে জড়িতদের বিরুদ্ধে সরকার আইন অনুযায়ী তদন্ত করবে। অপরাধী হলে শাস্তির আওতায় আসবে, নিরপরাধী হলে অভিযোগ থেকে মুক্তি পাবে। সাবেক সেনাপ্রধান অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল আজিজ আহমেদের বিরুদ্ধে বহুদিন ধরে দেশে এবং দেশের বাইরে বেআইনি কাজে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠছে। এনআইডিতে ভুল তথ্য দেওয়ার প্রশ্ন উত্থাপিত হচ্ছে। অপরাধীদের সহযোগিতা করার প্রমাণ হাজির করা হচ্ছে, কিন্তু সরকার কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করছে না। কেউ অপরাধে জড়িত থেকে তদন্তের মুখোমুখিও হবে না, আর কাউকে বিচার-প্রক্রিয়ার সুযোগ না দিয়ে অহেতুক কারাগারে দিনের পর দিন অন্তরীণ রাখা হবে- এটা প্রজাতন্ত্রের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না।
কোনো ব্যক্তিই রাষ্ট্রের চেয়ে শক্তিশালী নন। জেনারেল (অব.) আজিজ কোনো দায়মুক্তির আওতায় নন যে, তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করা সংবিধান বারিত করেছে। সরকার যদি উত্থাপিত অভিযোগের বিরুদ্ধে আইনি কোনো ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব প্রশ্নের মুখে পড়বে এবং রাষ্ট্র ও সেনাবাহিনী কলঙ্কের কালিমা বহন করতে থাকবে; যা রক্তের তলদেশ থেকে উত্থিত মুক্তিসংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত রাষ্ট্রের জন্য সম্মানজনক নয়।
রাষ্ট্র যদি পদ-পদবি দেখে অপরাধীকে রেহাই দেয়, তাহলে আইন সবার জন্য সমান- এটা সমাজে চিহ্নিত করার কোনো জায়গা থাকবে না। ন্যায্যতা খোঁজার প্রক্রিয়া অনুপস্থিত হয়ে পড়বে। কোনো দেশের প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী বা নাগরিক যদি দেশের ভেতর এবং দেশের সীমানা ছাড়িয়ে মানুষের ওপর ক্ষতিকারক প্রভাব ফেলে, তা না দেখার ভান করা রাষ্ট্রের কর্তব্য হতে পারে না। প্রকৃত অপরাধীকে আদালত বা ট্রাইব্যুনালের অধীনে এনে দণ্ড দিতেই হবে। তারপর সরকার চাইলে দণ্ড মওকুফ, স্থগিত বা হ্রাস করতে পারবে কিন্তু অপরাধীকে আইনের আওতায় আনতেই হবে।
যারা অপরাধী তাদের বিচারের আওতায় আনা, যারা অপরাধী নন তাদের অভিযোগ থেকে মুক্ত করা- এটা রাষ্ট্রের কর্তব্য ও দায়িত্ব। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তির কাছ থেকে উত্থাপিত অভিযোগ- আত্মসর্বস্ব সংকীর্ণতায় অস্বীকার করা হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে অপরাধ প্রবণতার দিকে ঠেলে দিতে পারে। এতে রাষ্ট্র বা সমাজে আইনের শাসন, নৈতিকতা ও সৎ গুণ আহরণ ক্রমাগতভাবে বিলীন হয়ে যাবে।
বিদেশি রাষ্ট্র যেখানে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উত্থাপন করছে, সেই প্রশ্নে সরকার কেন দ্বিধাগ্রস্ত বা সরকার কেন প্রয়োজনীয় কর্তব্য পালন করতে পারছে না! সরকার কারও প্রতি বিরাগভাজন হয়ে কাজ করবে না কিন্তু সরকার আইন ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে নির্দিষ্ট এবং সুস্পষ্ট নিয়ম অনুসরণ করে দ্বন্দ্বহীনভাবে কর্তব্য পালন করবে। সমাজকে অন্যায় ও অপরাধপ্রবণ করে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের মহাবিপ্লবী বা অসাধারণ কথা সমাজের কোনো কাজে আসবে না।
অন্যায়ের কোনো অনুসন্ধান থাকবে না, অপরাধের জন্য কোনো হুমকি থাকবে না, অনাচার ও অবিচার, ক্ষুধা-দারিদ্র্য, দমনমূলক আচরণ, অকারণ বন্দিত্বের প্রতিকার থাকবে না, তাহলে রাষ্ট্রের প্রয়োজনও ফুরিয়ে যাবে। আমরা ক্ষমতার মোহে রাষ্ট্রকে অসম্ভাব্যতার পরিণামের দিকে নিয়ে যাচ্ছি, নৈরাশ্যকে আরও গভীরে নিয়ে যাচ্ছি।
যে আওয়ামী লীগ জনগণের মনে নিরপেক্ষ নির্বাচন, ভোটাধিকার ও গণতন্ত্রের প্রশ্নে সম্ভাবনা জাগিয়ে তুলেছিল, এখন তারাই জনগণের সম্মতিবিহীন অবাধ ক্ষমতা প্রয়োগ করে যাচ্ছে। এখন নির্বাচনের নামে তামাশা বা ভোটাভুটির কূটাভ্যাস (Voting Paradox) তাদের চরিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। ক্ষমতা ধরে রাখার প্রশ্নকেই তারা অগ্রাধিকার দিচ্ছে। গণতন্ত্রের অনুপস্থিতিতে একটি সমাজে কী ভয়ংকর সংস্কৃতি দাঁড়াচ্ছে, সরকার তা বিবেচনায়ই নিচ্ছে না। একটি প্রজাতন্ত্রে সরকার আছে, অথচ তার কাছে ন্যায্যতার কোনো অস্তিত্ব নেই।
সরকারের এমন কোনো নৈতিক অবস্থান নেই, যা আমাদের ন্যায্য সমাজ প্রতিষ্ঠার দিকে নিয়ে যাবে, আর রাষ্ট্র শাসকদের অপরিণামদর্শিতায় এক চরম অনিশ্চয়তার পরিমণ্ডলে ঢুকে পড়ছি আমরা। আইনের শাসন ও ন্যায্যতার অভাবে সমাজ ক্রমাগত ভয়ংকর হয়ে উঠছে। সর্বনাশা ক্ষমতার রাজনীতি অগণিত মানুষের আত্মদানকে ব্যর্থতায় পর্যবসিত করে দিচ্ছে।
দর্শনের শিক্ষক সক্রেটিস বলেছিলেন- ‘যে রাষ্ট্রে আইন থাকে অথচ আইনের প্রয়োগ হয় না, আইন বাস্তবায়নের অভাব বা অগ্রাহ্যতা দেখা যায়, সেই রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব নস্যাৎ হয়ে যায় এবং পরিশেষে রাষ্ট্রটি ধ্বংস হয়’।
লেখক: শহীদুল্লাহ ফরায়জী/ গীতিকবি ও সংবিধান বিশ্লেষক

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ