টিকার বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারকে ১০ বার সতর্ক, ৫ বার চিঠি দেওয়া হয়েছিল: ইউনিসেফ
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
বুধবার, মে ২০, ২০২৬ ১০:৪৬ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
বুধবার, মে ২০, ২০২৬ ১০:৪৬ অপরাহ্ণ

জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
হামের টিকাসংকট নিয়ে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারকে ১০ বার সতর্ক করেছিল ইউনিসেফ। পাশাপাশি সংস্থাটি ৫ থেকে ৬ বার আনুষ্ঠানিক চিঠিও দিয়েছিল। আর বাজেটে পর্যাপ্ত বরাদ্দ থাকার পরও সরকারের ক্রয়সংক্রান্ত জটিলতার কারণে চাহিদা অনুযায়ী টিকা কেনা হয়নি। ফলে দেশে হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে এবং বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব তৈরি হয়।
বুধবার (২০ মে) সংবাদ সম্মেলনে জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স এ তথ্য জানান।
এদিন দুপুরে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ইউনিসেফের কার্যালয়ের জেপিজি কনফারেন্স রুমে ‘হামের প্রাদুর্ভাব পরিস্থিতি ও চলমান প্রতিরোধ কার্যক্রম’ বিষয়ে ওই সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
ইউনিসেফ জানিয়েছে, ২০২৪ সাল থেকেই তারা সরকারকে টিকার সংকট নিয়ে ১০ বার সতর্ক করেছে। এ ছাড়া ৫ থেকে ৬ বার আনুষ্ঠানিক চিঠিও দেওয়া হয়। কিন্তু পর্যাপ্ত টিকা না আসায় পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল রূপ নেয়।
গত ১৫ মার্চ থেকে দেশে হঠাৎ হামের প্রকোপ বাড়তে থাকে। এতে প্রায় ৭০ হাজার মানুষ আক্রান্ত হয়েছে এবং ৪০৪টি শিশু মারা গেছে। ইউনিসেফের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ৭ কোটি (৭০ মিলিয়ন) হামের টিকার প্রয়োজন হয়। অথচ ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত দেশে মাত্র ১ কোটি ৭৮ লাখ টিকা আসে, যা মোট চাহিদার মাত্র এক-তৃতীয়াংশ। এর বাইরে আর কোনো টিকাই আসেনি। দীর্ঘদিন রুটিন টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় অনেক শিশু টিকার বাইরে থেকে যায়, যা বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে।
টিকা কেনায় গাফিলতির অভিযোগ প্রসঙ্গে সম্প্রতি একটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য সংশোধন করেন রানা ফ্লাওয়ার্স। তিনি জানান, নির্বাচনের দুই দিন আগে নয়, বরং ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কয়েক দফায় সরকারকে সতর্ক করা হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কেও এ বিষয়ে অবহিত করা হয়েছিল।
রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, শেষ চিঠিটি নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ঠিক আগে পাঠানো হয়েছিল। তিনি নিজে অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা এবং কর্মকর্তাদের সঙ্গে অন্তত ১০ বার বসে এই সংকট নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন।
এক প্রশ্নের জবাবে ইউনিসেফ প্রতিনিধি বলেন, অর্থসংকটের কারণে টিকা কেনা যায়নি, বিষয়টি তেমন নয়। তৎকালীন বাজেটে টিকা কেনার জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ ছিল। তবে বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে টিকা কেনার বিষয়ে মন্ত্রিসভার একটি সিদ্ধান্তের কারণে এই ক্রয়-প্রক্রিয়ায় বিলম্ব ঘটে। তিনি মন্তব্য করেন, বাংলাদেশে এর আগে কখনো টিকার ক্ষেত্রে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে তার মনে হয় না। তবে বিষয়টি তদন্তে নিশ্চিত হওয়া যাবে এবং সব আসল কারণ বেরিয়ে আসবে।
টিকা কেনার প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, উন্মুক্ত দরপত্র সবচেয়ে স্বচ্ছ পদ্ধতি হলেও টিকার মতো বিশেষায়িত পণ্যের ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। এখানে কম দামের চেয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) অনুমোদিত, কার্যকারিতা প্রমাণিত এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন টিকা নিশ্চিত করা জরুরি। ইউনিসেফ বিশ্বজুড়ে সরাসরি প্রস্তুতকারকদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণে টিকা কেনে বলে সবচেয়ে সাশ্রয়ী দামে তা সরবরাহ করতে পারে। এর চেয়ে কম দামে দরপত্র পাওয়া সম্ভব নয়।
সংবাদ সম্মেলনে রানা ফ্লাওয়ার্স আরও জানান, এ মাসে দেশে আবার হামের রুটিন টিকা এসেছে। এখন দ্রুত টিকাদান কার্যক্রম জোরদার ও আক্রান্ত এলাকায় বিশেষ নজরদারির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব থেকে শিক্ষণীয় অনেক বিষয় আছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে ‘আফটার অ্যাকশন রিভিউ’ বা পরবর্তী পর্যালোচনার মাধ্যমে খতিয়ে দেখা হবে কেন প্রতিবছর প্রায় ৫ লাখ শিশু টিকাদান কর্মসূচি থেকে বাদ পড়ে যাচ্ছে। এখন কাউকে দোষারোপ না করে ভবিষ্যতে যাতে আর কোনো শিশু প্রতিরোধযোগ্য রোগে মারা না যায়, সেভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে পোলিও পরিস্থিতি নিয়েও নিজের উদ্বেগের কথা প্রকাশ করেন ইউনিসেফ প্রতিনিধি।
জনতার আওয়াজ/আ আ