তারেক রহমানের জীবন ও রাজনীতি : নাহিদ নজরুল
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ২০, ২০২৫ ৬:০২ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ২০, ২০২৫ ৬:০৩ অপরাহ্ণ

অনেকেই হয়তো চিন্তা করে না কিংবা চিন্তা করার প্রয়োজনও অনুভব করে না যে, একজন তারেক রহমানের জীবন ও রাজনীতি কি খুব সহজ-সরল, শান্তিপূর্ণ? তারেক রহমানের জীবন ও রাজনীতি কি শৌখিন পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে শুরু হয়েছে, নাকি যথেষ্ট জটিল, বন্ধুর ও ভয়ানক কষ্টপীড়িত অবস্থার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল? বাংলা আধুনিক গানের একটি পঙক্তি এরকম—‘ওরে নিন্দুক তুই কী পরেছিস চোখে, সবাই যখন চাঁদ দেখে তুই দেখিস কলঙ্ককে’। চোখের দৃষ্টি যদি নিরপেক্ষ না হয়, পক্ষপাত দোষে দুষ্ট হয় তখন ওই চক্ষু যুগল দিয়ে সত্য ও বাস্তবতা দেখার সৌভাগ্য ও সুযোগ হয় না। তারা সত্য ও বাস্তবতা দেখার দিশা হারিয়ে ফেলে। তারেক রহমানের বিরুদ্ধে দুর্নাম, অপবাদ রটানোর ক্ষেত্রে দেশি ও আন্তর্জাতিক এক্সপার্টদের সমন্বয়ে যে পরিমাণ অপপ্রচার চালানো হয়েছে বিগত সময়ে, তার একটা যথাযথ গবেষণা হওয়া দরকার। একজন রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে আলোচনা-সমালোচনা-পর্যালোচনা হতেই পারে। কিন্তু তারেক রহমানের বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে ঠান্ডা মাথায় যেসব ভিত্তিহীন সস্তা গুজব ছড়ানো হয়েছে, তা রীতিমতো গোয়েবলসকেও হার মানাবে। তারেক রহমানের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে বাস্তবতার যে চালচ্চিত্র, সে বাস্তবতার নিরিখে তার জীবন আদর্শ ও রাজনীতি নিয়ে যদি নিরপক্ষভাবে তাকে মূল্যায়ন করার চেষ্টা করা হয়, তখন বোঝা যাবে সত্যিকার অর্থে তারেক রহমানের জীবন ও রাজনীতি শৌখিন, বিলাসবহুল পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে শুরু হয়নি। বরং তারেক রহমানের রাজনীতির শুরু এবং রাজনৈতিক পাঠের প্রতিটি ধাপই ছিল চরম বাস্তবতার রেশ ধরে। বাংলাদেশের রাজনীতির ঐতিহাসিক মাইলফলক ঘটনাগুলোর সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট ছিলেন তারেক রহমানের পিতা, স্বাধীনতার মহান ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন, বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের প্রবর্তন, অর্থনৈতিক উন্নয়নসহ স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় রাষ্ট্রপতি জিয়ার অবদান ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত ও প্রতিষ্ঠিত। এসব ঘটনা খুব সহজ ও মামুলি বিষয় ছিল না স্বাধীন বাংলাদেশ প্রেক্ষাপটে। বাংলাদেশ গঠন রক্ষা ও উন্নয়ন প্রতিটি ক্ষেত্রে জিয়ার ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা জাতির কাছে শ্রদ্ধা ও সম্মানের চোখে বিবেচিত। স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রাক্কালে তখনকার রাজনৈতিক নেতাদের সীমাহীন ব্যর্থতার কারণে একজন মেজর জিয়াউর রহমান জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চট্টগ্রাম কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন। ‘আমি মেজর জিয়া বলছি, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা করছি।’ জাতির একটি ক্রান্তিকালে জিয়াউর রহমান দেশবাসীকে স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার ঘোষণা দেওয়ার মধ্য দিয়ে দেশমাতৃকার প্রতি, দেশের মানুষের প্রতি তার ভালোবাসা ও দায়িত্ব বোধের চূড়ান্ত স্বাক্ষর রেখেছেন। এ ঘোষণা শুধু একটি ঘোষণাই ছিল না, ছিল দেশের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য আত্মোৎসর্গের মুখোমুখি হওয়ার সাহসী পরীক্ষা। জিয়া সে সময়টায় আরও বলেছিলেন, ‘WE REVOLT’ আমরা বিদ্রোহ করলাম। এমন পরিস্থিতিতে জিয়ার জীবন বিপন্ন হওয়ার ষোলো আনা আশঙ্কা ছিল। তারেক রহমান সে সময় বয়সে ছোট হলেও পিতার দেশপ্রেমের দুঃসাহসিক দায়বদ্ধতা উপলব্ধি করেছেন জীবনের সূচনাকালে। দেশের জন্য পিতার জীবন বাজি রাখা ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনের এ ঘটনা নিঃসন্দেহে তারেক রহমানের চিন্তায় দেশপ্রেমের দীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। এটা কি তারেক রহমানের রাজনীতির যাত্রা শুরুর শুভসূচনা নয়?
১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমানকে সপরিবারে গ্রেপ্তার করা হয় ক্যান্টনমেন্টে। ৩ থেকে ৭ নভেম্বরের প্রত্যুষ পর্যন্ত এ সময়টুকু জিয়া পরিবারের জন্য কতটা ভয়ানক অস্বস্তিকর পরিস্থিতি হিসেবে আরোপিত হয়েছিল, তা ঐতিহাসিকভাবে উপলব্ধি করার মতো। যে কোনো মুহূর্তে যে কোনো পরিস্থিতিতে নিহত হতে পারতেন জিয়া সপরিবারে। সে সময়টায় একজন তারেক রহমান নিশ্চয়ই উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন ঘটনার ভয়াবহতা। নিশ্চয়ই তিনি মনে রেখেছেন বেদনার্ত সময়ের উপাখ্যান। ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক তাৎপর্য সিপাহি-জনতার বিপ্লব ও সংহতির রাজনৈতিক উপলব্ধি কি তারেক রহমানকে রাজনৈতিকভাবে দীক্ষিত করে তোলেনি?
১৯৮১ সালের ৩০ মে। চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে নির্মমভাবে নিহত হলেন স্বাধীনতার মহান ঘোষক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তারেক রহমান তখন কিশোর যুবা। শেরেবাংলা নগরে অর্ধকোটি মানুষের সঙ্গে পিতার লাশের পাশে একজন তারেক রহমানকে দেখা গেছে শোকার্ত অবস্থায়। পৃথিবীর বৃহত্তর জানাজা হয়েছিল একজন স্বাধীনতার ঘোষক, একজন সফল রাষ্ট্রপতির কফিনকে সামনে রেখে। পিতার আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তার নেপথ্যে নেতৃত্বের যে সুদক্ষতা এবং দেশপ্রেম একাকার হয়েছিল পুত্র হিসেবে তারেক রহমানের, সে উপলব্ধি কি আজকে তার জনপ্রিয়তার উপকরণ নয়?
২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারেক রহমান সারা দেশে নেতাকর্মীদের বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের ভোটারদের ধানের শীষ মার্কায় ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে উদ্বুদ্ধ করেছেন তার সুদক্ষ নেতৃত্বের মাধ্যমে। তিনি নেতৃত্বের ঢাকঢোল পেটাননি; কিন্তু কাজ করেছেন সময় উপযোগী মেধা ও মননের গুণগত রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার আলোকে।
তারেক রহমান নিঃসন্দেহে তারুণ্যের প্রতীক। তবে এ কথাও আজ দেশ ও জাতির কাছে সত্য যে, তারেক রহমানের মনন, মেধা, চিন্তা, সহনশীলতা, ধৈর্য, বিচক্ষণতা ও সাবলীল রাজনৈতিক নেতৃত্ব এখন পরিশীলিত পরিশুদ্ধ সময়ের কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। পরিকল্পিত ও ফরমায়েশি অপপ্রচারের প্রতিনিয়ত বিস্ফোরণ তার ধীরস্থির সময় উপযোগী নেতৃত্বের মসৃণ পথকে রুদ্ধ করে দেওয়ার, তাকে বিভ্রান্ত করার কোনো অপকৌশলই এখন আর ধোপে টিকবে না। বাস্তবতাও সত্যের অনির্বাণ জ্যোতি বিবর্তনের ধারায় কখনো নিঃশেষ হয়ে যায় না, বিমলিন হয় না। বরং সফলতার আলোকবর্তিকা হয়ে জীবনকে হিরণ্ময় করে তোলে। অপপ্রচারের রেশ ধরে কেউ কেউ হয়তো ভাবতে পারে যে, তারেক রহমান যেহেতু সেনাবাহিনী প্রধানের পুত্র, রাষ্ট্রপতির পুত্র, প্রধানমন্ত্রীর পুত্র—কাজেই অতিশয় সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও বিলাসবহুল জীবনব্যবস্থার মধ্যে জীবন বেড়ে উঠেছে। প্রকৃতপক্ষে বিষয়টি সম্পূর্ণই বিপরীত। যথেষ্ট মিতব্যয়ী ও সাদামাটা জীবনে অভ্যস্ত পিতার পুত্র হিসেবে তারেক রহমান শিশুকাল থেকেই পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করে জীবন পরিচালনা করে আসছেন। জৌলুসপূর্ণ জীবনের পরিপাটি তারেক রহমানকে স্পর্শ করতে পারেনি। রাষ্ট্রপতির পুত্র হিসেবে কিংবা প্রধানমন্ত্রীর পুত্র হিসেবে প্রচলিত সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্তির আড়ম্বর তাকে কাবু করতে পারেনি। জিয়াউর রহমান তার পুত্রকে নীতিনৈতিকতা, আদর্শ মূল্যবোধ, শিষ্টাচার আদব-কায়দা সবকিছুই শিখিয়েছেন সহজ-সরল জীবনের দর্শন থেকে। জিয়াউর রহমানের ভাবনায় ছিল ‘High thinking simple living’। এ দীক্ষাই পেয়েছেন তারেক রহমান ছোটকাল থেকে। পিতার প্যান্ট কেটে পুত্রের প্যান্ট বানানোর নজির সৃষ্টি করেছেন জিয়াউর রহমান। এটা ঐতিহাসিক সত্যের উদাহরণ। বাড়িতে কর্মরত স্টাফদের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করতে হয়, তাও শিক্ষা দিয়েছেন জিয়া তার পুত্রকে। এটা শুধু রাজনীতিবিদের জন্য একজন আদর্শবান মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে সবার জন্যই অনুকরণীয় অনন্য উদাহরণ।
ডিজিটাল বাকশাল ও নিকৃষ্ট স্বৈরতন্ত্রের নির্যাতনে যখন চারদিকে ক্রান্তিকাল; সে দুঃসময়ে তারেক রহমান পরিশীলিত ও বিচক্ষণ রাজনীতির মাধ্যমে মানুষকে জাগিয়ে তুলেছেন নতুন প্রত্যাশার দীপ্ত অঙ্গীকারে। তার অপরিসীম ধৈর্য তারুণ্যেভরা সম্ভাবনা ও নেতৃত্বের দক্ষতা ১৮ কোটি মানুষকে নতুন আশার ব্যঞ্জনায় কাঙ্ক্ষিত স্বপ্নের আলোর উদ্ভাসিত করেছে। ১৭ বছরের দুঃশাসনে তামাটে হয়ে যাওয়া এ বিরানভূমি তারেক রহমানের সাহসী উদ্যোগে আবার পুনর্জাগরণের পাপড়িতে প্রস্ফুটিত হবে—এ প্রত্যাশায় বুক বেঁধেছে মানুষ। তারেক রহমান গণতন্ত্র পুনর্জাগরণের মহানায়ক। হেমন্তের ধানের সুগন্ধ যেমন কৃষককে আশায় প্রাণবন্ত করে তোলে, তারেক রহমান তেমনি মানুষের আগামী দিনের স্বপ্ন ও সম্ভাবনার হরিৎ বীজতলা।
লেখক: গীতিকার, সাংবাদিক ও কলামিস্ট
জনতার আওয়াজ/আ আ