নেতা, কর্মী, নেতৃত্ব এবং অতঃপর - জনতার আওয়াজ
  • আজ রাত ৪:৩৭, শনিবার, ১৮ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩রা শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ৪ঠা সফর, ১৪৪৮ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

নেতা, কর্মী, নেতৃত্ব এবং অতঃপর

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: মঙ্গলবার, জুলাই ১৪, ২০২৬ ১২:১১ পূর্বাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: মঙ্গলবার, জুলাই ১৪, ২০২৬ ১২:১১ পূর্বাহ্ণ

 

সামাজিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে ব‍্যক্তির রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে রাজনৈতিক সচেতনতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে পর্যবেক্ষণ করা হয় ।এ সম্পর্কে এরিস্টটলের বিখ্যাত একটি উক্তি আছে, তা হলো- মানুষ হল রাজনৈতিক জীব, স্বাভাবিকভাবেই সে সংঘবদ্ধ সমাজ ও সম্প্রদায়ে বসবাস করতে অভ্যস্ত ।যে সমাজহীন, নিঃসঙ্গ বা দ্বীপে একাকীত্বভাবে বসবাস করে, সে হয় পশু, না হয় দেবতা। তাই বলা যায় ব‍্যক্তির সাথে পরিবার, পরিবার থেকে সমাজের সম্পর্কে মানুষ ওতপ্রোতভাবে জড়িত । সেই সাথে সমাজের মধ্যে মানুষের সাথে মানুষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংযোগ ও সম্পর্কের উপর ভিত্তি করেই সংগঠনের মধ্যে নেতা, কর্মী এবং নেতৃত্বের প্রতিনিধিত্বের প্রতিফলন লক্ষ্য করা যায় । আর বাস্তবে এই প্রতিনিধিত্ব ব‍্যক্তি কতটুকু সফলতার সাথে সামলাতে বা মোকাবেলা করতে পারে তার উপর ভিত্তি করেই বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব‍্যক্তির নেতৃত্ব ও ব‍্যক্তিত্ব ফুটে উঠে।এবার বৃহৎ অর্থে নেতা, কর্মী, অনুসারী এবং জনগণের মধ্যে তুলনামূলক আলোচনা করা যাক।

একজন রাজনৈতিক নেতা (Political Leader) হতে হলে তাকে অবশ্যই রাজনৈতিক সংগঠনের কর্তৃত্বাধীন সম্পৃক্ত থাকতে হবে। অন্য যেকোনো সংগঠনের ক্ষেত্রেও তা প্রযোজ্য। যাতে করে সংগঠনের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য, বিভিন্ন এজেন্ডা বা সিদ্ধান্ত সম্পর্কে দক্ষতা ও পারদর্শিতা থাকতে হয়। রাজনৈতিক সংগঠন হলে অবশ্যই দলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জনগণকে একত্রিত, সক্রিয় সচেতন করার দক্ষতা থাকতে হবে। উদাহরণস্বরূপ যে কোনো দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, সরকার প্রধান, মন্ত্রীবর্গ, দলীয় প্রধান কিংবা সংসদ সদস্যরা এ জাতীয় শ্রেনীর অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।

রাজনৈতিক কর্মী (Political Activist) রাজনৈতিকভাবে দলের সাথে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। একজন রাজনৈতিক কর্মী সাধারণত যে কোনো রাজনৈতিক দলের দক্ষ, কর্মঠ ও সংগঠক হিসেবে দলের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক যে কোনো সিদ্ধান্তসমূহকে বাস্তবায়নে নিবিড়ভাবে কাজ করে থাকেন। একজন কর্মীর স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের এখতিয়ার না থাকলেও দল ও সংগঠনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তারা সামাজিক প্রকৌশলীদের ন‍্যায় ভূমিকা পালন করেন। যে কোনো রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মানবাধিকার সংগঠনের রেজিস্ট্রিকৃত কর্মীরা এশ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত করা যায়।

রাজনৈতিক অনুসারী (Political Follower) হলো যারা সংগঠনের বিভিন্ন কার্যকলাপ ও ক্রিয়াকলাপকে সমর্থন করেন অথচ দলের সাথে কিংবা সংগঠনের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত নন, তারাই এ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। অনেকেই এ শ্রেণীকে পর্যবেক্ষক (Spectator) হিসেবে মূল্যায়ন করেন। যে কোনো সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের সিদ্ধান্ত যখন নেতা থেকে কর্মীদের কাছে যায়, তখন অনুসারীরা তা ব‍্যাপক আকারে নিজেদের মতামত ও প্রতিক্রিয়া, সমালোচনা কিংবা ভিন্নমত ব্যক্ত করেন। এই শ্রেণীর লোকদের কোন দায়বদ্ধতা নেই। কিন্তু সংগঠনের ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ তাদের মাধ্যমে জনগণের কাছে তা ব‍্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ে।

এবার আসা যাক সাধারণ জনগণ প্রসঙ্গে! জনগণ হলো একটি রাজনৈতিক ব‍্যবস্হায় উল্লিখিত নেতা, কর্মী ও সমর্থকদের উপর আস্থা রেখে বার বার পরাজিত কিন্তু বাস্তবিক অর্থে বৃহৎ শক্তি! জনগণ এখানে বিভিন্ন নেতার ভিন্ন ভিন্ন প্রতিশ্রুতিতে আকৃষ্ট হয়ে বিভাজিত হয় এবং দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলশ্রুতিতে নেতা ও কর্মীরা এ সুযোগে রাজনৈতিক ব‍্যবস্হা করায়ত্ত করে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করে শাসন ক্ষমতা চালিয়ে যায়। নেতাদের দীর্ঘ শাসনের উপর ভিত্তি করেই রাজনৈতিক ব্যবস্থায় যে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয় তার উপর নির্ভর করে রাজনৈতিক কিংবা যে কোনো সংগঠনের নেতৃত্বের ধরন ও বৈশিষ্ট্য। তৎপরবর্তী রাজনৈতিক সক্ষমতার মাধ্যমে একটি দেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, রাজনৈতিক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর উন্নয়ন তথা দেশের সার্বভৌমত্বের ভিত্তি তৈরি হয়। মোদ্দাকথা হল, নেতৃত্ব হলো এমন একটি চক্রাকার প্রক্রিয়া তা যদি বাস্তবিক (Pragmatic) লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে তাহলে সেখানে নেতৃত্ব ফুটে উঠে এবং জনগণের কাঙ্ক্ষিত ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটে। সেক্ষেত্রে নেতাকে অবশ্যই তার নেতৃত্বের জন্য একটি ইতিবাচক চক্র (Virtuous Cycle) প্রতিষ্ঠা করতে হবে।নেতৃত্বের মাধ্যমে যদি একটি ইতিবাচক চক্র গড়ে উঠে তাহলে সেখানে রূপান্তরী নেতৃত্ব (Transformation Leadership) প্রকাশ পায়। এজাতীয় নেতৃত্ব যেকোনো দেশের জন্য আশীর্বাদ হিসেবে বিবেচিত হয়।মালয়শিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মাদ এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে এজাতীয় নেতৃত্বের অন্তর্ভুক্ত করা যায়। অপরদিকে নেতৃত্বের মধ্যে যদি অতিমাত্রায় ব‍্যক্তিকেন্দ্রীক আদর্শ, বিশ্বাস লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে প্রাধান্য দেয়া হয় তাহলে সেই নেতৃত্বের মধ্যে একটি দুষ্ট চক্র (Vicious Circle) তৈরি হয়। রাজনৈতিক ব্যবস্থায় এ জাতীয় নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা হলে তা দেশের মধ্যে বিভাজন, বিভক্তি, বিশৃঙ্খলা, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে। অর্থাৎ এজাতীয় নেতৃত্বে সবকিছুই একক নেতৃত্বাধীন পরিচালিত হয়। এজাতীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সরকারের বৈশিষ্ট্যের মধ্যে স্বৈরাচারী একনায়কত্ব (Autocratic Dictatorship) মনোভাব ফুটে ওঠে। ফলে এই বৈশিষ্ট্য দীর্ঘদিন রাজনৈতিক ব্যবস্থায় চলতে থাকলে এক পর্যায়ে তা ফ‍্যাসীবাদী (Fascist) রূপ ধারণ করে।এশ্রেণীর সরকার অনেক শক্তিশালী হয় এবং জনগণের চরম ইচ্ছা শক্তির বিস্ফোরণ না ঘটলে এজাতীয় শাসন থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন। বাংলাদেশে ২০২৪ সালে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে সদ‍্য বিতাড়িত স্বৈরাচারী সরকার এজাতীয় নেতৃত্বের প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

মূল‍্যায়ন বিশ্লেষণে বলা যায়, নেতা কিংবা কর্মী যে কেউ নিজ নিজ নেতৃত্বের দর্শন (Vision) এবং লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের (Mission) মধ্যে যদি সমন্বয় সাধন করতে পারেন তাহলে সেখানে পদ্মফুল ফুটবেই। উদাহরণ হিসেবে বিভিন্ন সংগঠনের কর্মী হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র, পাকিস্তানের শিক্ষা কর্মী ও চলচ্চিত্র প্রযোজক মালালা ইউসুফজাই এবং সুইডিশ পরিবেশ ও মানবাধিকার কর্মী গ্রেটা থানবার্গের নাম উল্লেখযোগ্য। অন‍্যদিকে যে কোন সংগঠনের অনুসারী কিংবা সাধারণ জনগণের রাজনৈতিকভাবে বিখ্যাত হবার সম্ভাবনা ক্ষীণ। যতক্ষণ না দেশের সার্বিক পরিস্থিতির চরম অবনতি ও জনগণের ইচ্ছা শক্তির (General will) বিস্ফোরণ না ঘটে। যুগে যুগে ইতিহাসের বিপর্যয়ের মুখে সাধারণ জনগণ এবং অনুসারীরাও জীবন দিয়ে নজির স্থাপন করে গেছেন। বাংলাদেশের ২৪ শের গণঅভ্যুত্থানে শহীদ আবু সাঈদসহ যারা নিহত হয়েছেন তাদের নাম এখানে উল্লেখযোগ্য। তাছাড়াও এরশাদের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে শহীদ নূর হোসেন এবং শহীদ ডাক্তার মিলনের নামও উল্লেখ করা যায়। আবার দেখা যায়, নেতার দর্শন ও লক্ষ্য সফলভাবে বাস্তবায়ন হবার পরও তা বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল অবধি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) যখন সার্বিকভাবে শোষণের স্বীকার হয়েছিল, তখন শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে এক জাতীয় সম্মোহনী নেতৃত্ব (Charismatic Leader) সৃষ্টি হয়েছিল। কেননা ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে জনগণের ভোটে বিজয়ী হলেও সরকার গঠন করতে দেয়া হয়নি। সুতরাং দেখা যায় গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করার কারণে ১৯৭১ সালে পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ নামক নতুন রাষ্ট্র গঠিত হয়। মোদ্দা কথা হলো, যে গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য শেখ মুজিব সম্মোহনী নেতা হিসেবে পরিচিত হয়েছিলেন তার মাত্র চার বছরের মধ্যেই তিনি গণতান্ত্রিক অধিকার রহিত করে বাকশাল গঠন করেন এবং তার সম্মোহনী ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। ফলশ্রুতিতে তার রাজনৈতিক ক্ষমতা ও জীবনের অবসান ঘটে।

তবে বর্তমানে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষণে দেখা যায় নেতা কিংবা কর্মীর খুব কমই রাজনৈতিক লক্ষ্যের চেয়ে ব‍্যক্তি স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠতে পারেন। যার কারণে অতি দ্রুত যেমন উত্থান হয় তেমনি পতন ঘটছে। অতি মাত্রায় সেলটিক্সের (Selfie+Politics= Seltics যার মর্মার্থ হলো রাজনীতিতে সস্তা উপস্থাপন) কারণে ও রাজনৈতিক দুষ্টচক্র গড়ে উঠতে পারে।বাংলাদেশের বিগত দুদশকের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এজাতীয় চক্র রাজনীতিকে কলুষিত করেছে। অতএব বর্তমান নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় নেতা ও কর্মীদের অবশ্যই যে সমস্ত কারণে সরকার স্বৈরাচার হয়, সে সমস্ত কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে কর্মী যেমন নেতার উপর নির্ভর করে তেমনি একজন নেতারও প্রধান কাজ হলো কর্মীদের সঠিকভাবে মূল্যায়ন ও পরিচালনার ক্ষেত্রে দক্ষতা অর্জন করা।নতুবা নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় নেতা ও কর্মীদের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের মধ্যে জাতীয় ঐক্য ও স্বার্থ রক্ষা করতে ব্যর্থ হলে রাজনৈতিক পরিবেশ আবারও বিপন্ন হতে পারে।

আলোচনার পরিসমাপ্তিতে বলা যায়, শুধু মাত্র কয়েকজন নেতার নেতৃত্বে দেশ এগিয়ে যাবে না । এজন্য দরকার দক্ষ জনবলের সৃষ্টির পাশাপাশি, দক্ষ রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, সাংস্কৃতিক, মানবাধিকার ও সামাজিক কর্মী। তাছাড়াও রাজনীতিতে প্রয়োজন অসহিষ্ণু ও গুজবমুক্ত পরিবেশ। সেজন্য সকল রাজনৈতিক দলকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে জাতীয় স্বার্থ সমন্বয় করতে হবে।এজাতীয় পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারলে নেতাকর্মীদের কর্মমূল‍্যায়নের উপর সরকার পরিচালিত , পুনর্মূল্যায়ন ও পরিবর্ করা যাবে।কেননা নেতার প্রধান কাজ হলো সঠিক পরিকল্পনা করা, আর তার বাস্তবায়নে প্রয়োজন দক্ষ কর্মী, অনুসারী ও জনগণের মধ্যে সার্বিক সমন্বয় সাধন করা। আর এটা যে বুদ্ধিমত্তা, দক্ষতা , সততা ও সক্ষমতার সাথে সমন্বয় সাধন করতে সক্ষম, অতঃপর ইতিহাস তাদেরই স্মরণ রাখবে!

মোঃ শাহজাহান মিয়া
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাবেক জাতীয় বিতার্কিক
(বর্তমানে লন্ডনে বসবাসরত)
ই-মেইলঃ shahjahanau.bd@gmail.com

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ