ফিরে দেখা ১/১১: কামানের ভয় দেখানো হয়েছিল ড.ইয়াজউদ্দিনকে - জনতার আওয়াজ
  • আজ সন্ধ্যা ৭:৩৮, বৃহস্পতিবার, ১৪ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩১শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৭শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

ফিরে দেখা ১/১১: কামানের ভয় দেখানো হয়েছিল ড.ইয়াজউদ্দিনকে

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: শনিবার, আগস্ট ২, ২০২৫ ৮:১৩ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: বৃহস্পতিবার, আগস্ট ৭, ২০২৫ ১:১৪ পূর্বাহ্ণ

 

বিশেষ প্রতিনিধি: ওয়ান-ইলেভেনের দিন কামানের ভয় দেখানো হয়েছিল প্রেসিডেন্ট প্রফেসর ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদকে। বাধ্য করা হয়েছিল ওয়ান-ইলেভেনের হোতাদের কথামতো কাজ করতে। জরুরি অবস্থা ঘোষণা ও প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে পদত্যাগের প্রস্তাব শুনে প্রথমে তিনি প্রতিবাদ করেন। ( দৈনিক মানবজমিন ১০ জানুয়ারি ২০১১ সংখ্যা থেকে নেয়া)।
তখন প্রস্তাবকারীদের একজন বলেন, এভাবে কাজ হবে না। ওই কামানটা নিয়ে আয়। এই কথা শুনে ঘাবড়ে যান প্রেসিডেন্ট। আজও সেই দিনের কথা মনে হলে ড. ইয়াজউদ্দিনের বুক কেঁপে ওঠে, ভয় লাগে। তিনি ভাবেন, ওই দিন তিনি যদি পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারতেন তাহলে কত খারাপ হতো দেশের পরিস্থিতি। তিনিও মারা যেতে পারতেন। ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ তার ঘনিষ্ঠজনদের কাছে বলেছেন ওয়ান-ইলেভেনের সেদিনের কথা। তার লেখা বইতেও থাকবে সে বর্ণনা। বঙ্গভবনের রুমে কামান ঢোকানো সম্ভব নয় সে চিন্তাও সে সময় তার মাথায় আসেনি।

ওয়ান-ইলেভেনের দিন বঙ্গভবনে গিয়েছিলেন গুরুত্বপূর্ণ সেনা কর্মকর্তারা। গিয়েছিলেন ওই সময়ের সেনা প্রধান জেনারেল মইন উ আহমেদ, বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল ফখরুল আজম, নৌবাহিনী প্রধান রিয়ার এডমিরাল এমএ হাসান আলী খান, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও) মেজর জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, ডিজিএফআই-এর ওই সময়ের ভারপ্রাপ্ত মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল চৌধুরী ফজলুল বারী, ডিজিএফআই-এর আরেক পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ড. এটিএম আমিন ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। তবে ঘটনার সময় প্রথম পাঁচ জন প্রফেসর ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের সঙ্গে একই রুমে ছিলেন। অপারেশন শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেখানেই ছিলেন তারা। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আমিন ও জেনারেল মাসুদ ছিলেন বঙ্গভবনের অন্য রুমে। নিকটজনদের কাছে ড. ইয়াজউদ্দিনের দেয়া বর্ণনা অনুযায়ী সেদিন যেসব কর্মকর্তা বঙ্গভবনে এসেছিলেন তাদের সবাইকে চিনতেন না তিনি। তিন বাহিনী প্রধান ও পিএসওকে আগে থেকে চিনতেন। বাকিদের নাম পরে জেনেছেন। যারা এসেছিলেন সবার সঙ্গেই অস্ত্র ছিল।

ড. ইয়াজউদ্দিনের ভাষায়, যদিও তারা বলার চেষ্টা করেন তারা নিরস্ত্র ছিলেন, কিন্তু এর চেয়ে বড় মিথ্যা আর হতে পারে না। তৎকালীন প্রেসিডেন্টের বর্ণনায়, তখন আমার মিনিস্টার স্টেটাসের এডভাইজার ও প্রেস সেক্রেটারি মোখলেসুর রহমান চৌধুরী এবং, সেক্রেটারি (সিরাজুল ইসলাম) কেউ আমার কাছে নেই। তাদেরকে থাকতে দেয়া হয়নি। আমি ছিলাম একা। আর আমার সামরিক সচিব মেজর জেনারেল আমিনুল করিম সেদিন সাহসী ভূমিকা রাখতে পারতেন। তাদের বঙ্গভবনের ভেতরে প্রবেশ করতে না দিলে ভিন্ন প্রেক্ষাপট তৈরি হতে পারতো। কিন্তু আমার সঙ্গে তিনি বিশ্বাসঘাতকতা করেন। তিনি আমার সঙ্গে বঙ্গভবনে চাকরি করলেও আগতদের অপারেশন সফল করতে সহযোগিতা করেন। পরে শুনেছি অপারেশনে সহায়তা করলে তাকে এক ধাপ পদোন্নতি দেয়া হবে এমনটাই কথা হয়েছিল। তিনি চাকরি থেকে পুরস্কারস্বরূপ বিদায়ের আগে ওই র্যাঙ্ক পেয়েছিলেন। দেরিতে হলেও তিনি পুরস্কার থেকে বঞ্চিত হননি। তার বেঈমানি আমাকে আজও কষ্ট দেয়। খারাপ লাগে এটা ভাবলে আমি যখন তাদের প্রস্তাব শুনে ও তাদের সঙ্গে আলোচনার পর কাজ করার আগ মুহূর্তে আমার স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার জন্য সময় চাইলাম তারা তো সময় দিলই না উল্টো ভয় দেখালো। আমাকে কামানের ভয় দেখানোর পর পরই আমিনুল করিমের উচিত ছিল শৃঙ্খলা ভঙ্গের জন্য তাদেরকে আমার সামনে থেকে বের করে দেয়া। কিন্তু তিনি তা করেননি। প্রফেসর ইয়াজউদ্দিনের মতে, ওই সময়ে দেশে যে পরিস্থিতি ছিল এবং ওই দিন যে পরিস্থিতি হয়েছিল তাতে জরুরি অবস্থা জারি না করে উপায় ছিল না। তা না করলে দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারতো। জাতিসংঘের ওই চিঠি দেখে ভাবলাম দেশে লাখ লাখ সৈন্য ফেরত আসবে। তারা ফিরে এলে ক্ষেপে যাবে, সেনাবাহিনীতে বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে, কেবল তাই নয়, দেশে গোলমাল হতে পারে, মারামারি, কাটাকাটি হবে, মানুষ মারা যাবে, এটা সহ্য করা যাবে না। আরও অনেক কিছুই ঘটতে পারতো। জরুরি অবস্থা জারির আগেও মনে হয়েছে আমি প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে পারবো। কিন্তু ওই সময়ে পরিস্থিতি এমন হলো যে, এর বিকল্প ছিল না। জরুরি অবস্থা জারি করতেই হলো। আমি কোনদিন ভাবিনি আমাকে কোন দিন ওই ধরনের একটি দিনের মুখোমুখি হতে হবে। তার বর্ণনায়, আমি দুপুরে ভাত খেয়েছি। এরপর অফিস রুমে ঢুকে দেখি তিন বাহিনী প্রধান ও আরও কয়েকজন আমার অফিসে বসে আছেন। তারা আমাকে সম্মান জানালেন। দেশের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করলেন। বললেন, স্যার জরুরি অবস্থা জারি করা প্রয়োজন। যে কোন ভাবেই হোক স্যার দেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হতে হবে। যদি তা না হয়, চলমান অবস্থা অব্যাহত থাকলে জাতিসংঘ বাংলাদেশের সকল ফোর্স ফেরত পাঠাবে। বলেই আমার টেবিলের ওপর একটি চিঠি রাখলেন। দেখালেন জাতিসংঘের চিঠি। আমি চিঠিটি দেখলাম। জেনারেল মইনের কথা শুনে, চিঠি দেখে বিমানবাহিনী প্রধান ও নৌবাহিনী প্রধানের কাছে মতামত চাইলাম। তারাও একই মত দিলেন। আমি তাদের প্রস্তাবটি ভেবে দেখার জন্য সময় নিতে চাইলাম। তখন বললাম, আপনারা আমাকে একটু সময় দিন- আমি আমার ওয়াইফের সঙ্গে একটু আলোচনা করে নেই। তারা বললেন, স্যার সময় দেয়া যাবে না। যা করার এখনই করতে হবে। না হলে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়ে যাবে। আমরাও ফিরে যেতে পারবো না। আমি তাদের কথা বিশ্বাস করলাম। ভাবলাম, দেশকে রক্ষা করতে হবে। আমাকে বেঁচে থেকেই যা করার করতে হবে। আমাকে জেলে নিয়ে যাওয়া হতে পারতো। এই ভয় তো ছিলই। দেশে দু’জন প্রেসিডেন্ট মারা গেছেন, আমি চাইনি মারা যেতে। আমি চেয়েছি যে করেই হোক দেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠুু, নিরপেক্ষ নির্বাচন হতে হবে। এজন্য তিন বাহিনী প্রধান যে প্রস্তাব নিয়ে এসেছেন তাতে আলোচনা করে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে। ওই দিন দেশে যদি কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতো তাহলে এর দায়দায়িত্ব কে নিতো? আমাকেই নিতে হতো। কিন্তু জরুরি অবস্থা জারি করলে তেমন কিছুই ঘটবে না মনে করেই করেছি। তাছাড়া আমি কোন অসাংবিধানিক কাজ করিনি।

ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছর সময়ে বঙ্গভবনে একটি দিনও নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারেননি। সারাক্ষণ একটা আতঙ্ক তাকে তাড়া করে ফিরতো। তিনি এতটাই ভীতসন্ত্রস্ত থাকতেন যে এক পর্যায়ে অত্যন্ত অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার হাত-পা কাঁপতো। তিনিও মাঝে মাঝে শুনেছেন দেশে মার্শাল ল’ জারি হতে পারে, কিন্তু তা হলে তার কিছুই করার ছিল না। কারণ, মার্শাল ল’ জারি করার জন্য বঙ্গভবনের যাকে দরকার ছিল সেই সামরিক সচিব মেজর জেনারেল আমিনুল করিমকে তারা আগেই ম্যানেজ করে নিয়েছিল। তবে জেনারেল মইন মার্শাল ল’ জারি করতে চাননি। চাইলেও পারতেন না। কারণ ওয়ান-ইলেভেনে যারা সমর্থন দিয়েছেন তারাও মার্শাল ল’ জারি হোক তা চাননি। মানবজমিন।

নোট: বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস জানার স্বার্থে ১০ জানুয়ারি ২০১১ দৈনিক মানবজমিনে প্রকাশিত বিশেষ অনুসন্ধানমূলক রিপোর্টটি পাঠকদের জন্যে জনতার আওয়াজে ছাপা হলো। – প্রধান সম্পাদক।

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ