বরিশালে পকেট কমিটি গঠনে তোড়জোড় বিএনপির নেতাদের
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
মঙ্গলবার, জুলাই ১, ২০২৫ ৩:৫৪ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
মঙ্গলবার, জুলাই ১, ২০২৫ ৯:১২ অপরাহ্ণ

জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ফাইল ছবি
কমিটি গঠনে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ উঠেছে পিরোজপুর ও বরগুনা জেলা বিএনপির প্রভাবশালী নেতাদের বিরুদ্ধে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তৃণমূলের ভোটে কমিটি গঠন হওয়ার কথা থাকলেও তা হচ্ছে না। বাছাইয়ের নামে প্রতিপক্ষের সদস্য ফরম গায়েব করে পকেট কমিটি করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
এই অভিযোগে পিরোজপুরের ভান্ডারিয়ায় সংবাদ সম্মেলন হয়েছে। বরগুনার বেতাগী উপজেলা ও পৌর শাখা থেকে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে কাউন্সিল সংক্রান্ত বিভাগীয় সাংগঠনিক টিমের প্রধানকে। ওয়ার্ড পর্যায়ে নিজস্ব লোকজন দিয়ে কমিটি করা গেলে ইউনিয়ন-উপজেলা ও পৌরসভা পর্যায়ে পছন্দের কমিটি এবং ওইসব নেতার ভোটে পদ-পদবি টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে ভেবেই এমনটা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ কর্মীদের।
বর্তমানে দুই জেলার নেতৃত্বে থাকা নেতারা অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। সাংগঠনিক রীতিনীতি মেনেই ওয়ার্ড পর্যায়ে প্রাথমিক সদস্য তথা ভোটার নির্ধারণ এবং তাদের ভোটে কমিটি হচ্ছে বলে জানান তারা।
পাঁচ মাস আগে বরিশালসহ দক্ষিণের ৬ জেলার সব ওয়ার্ড-ইউনিয়ন-উপজেলা এবং জেলা কমিটি গঠনের নির্দেশনা আসে কেন্দ্র থেকে। ওয়ার্ড পর্যায়ে প্রাথমিক সদস্য ফরম প্রদান এবং সদস্যদের ভোটে ওয়ার্ড কমিটি করার নীতিমালা দেয় কেন্দ্র। পরে ওয়ার্ডের ভোটে ইউনিয়ন, ওয়ার্ড-ইউনিয়নের ভোটে উপজেলা-পৌরসভা ও ওয়ার্ড-ইউনিয়ন-উপজেলা-পৌরসভার কাউন্সিলরদের ভোটে হবে জেলা কমিটি।
এসব কমিটি করার ক্ষেত্রে জেলাগুলোয় সমন্বয়ক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয় একজন করে কেন্দ্রীয় নেতাকে। বিভাগীয় সাংগঠনিক টিমের দায়িত্ব পান কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল আউয়াল মিন্টু। পিরোজপুর ও বরগুনা জেলা সমন্বয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয় কেন্দ্রীয় বন ও পরিবেশবিষয়ক সহসম্পাদক কাজী রওনাকুল ইসলাম টিপুকে।
ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনা অনুযায়ী, এভাবে ভোটের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচনের সিদ্ধান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন ওয়ার্ড পর্যায়ের ভোটাররা।
৫ মাস আগে কমিটিগুলো করার দায়িত্ব দেওয়া হলেও পুরো প্রক্রিয়াটি চলতে থাকে ঝিমিয়ে। মাঝেমধ্যে ২ থেকে একটি সভা হলেও কার্যকর উদ্যোগ বলতে গেলে নেওয়া হয়নি কোথাও। এরই মধ্যে চলতি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে কেন্দ্র থেকে আসে নির্দেশ। জুলাইয়ের মধ্যে কাউন্সিল শেষ করার সময় বেঁধে দেয় হাই কমান্ড। শুরু হয় তড়িঘড়ি সম্মেলনের তোড়জোড়। স্বল্পসময়ে সম্মেলন করা নিয়েও দেখা দেয় জটিলতা।
ওয়ার্ড-ইউনিয়ন-উপজেলা কিংবা পৌর কমিটির সম্মেলন শেষ না করেই ২ জুলাই ঘোষণা হয় পটুয়াখালী জেলা সম্মেলনের তারিখ। পিরোজপুরের সম্মেলনের তারিখ হয় ১২ জুলাই। পাশাপাশি বরগুনায় শুরু হয় সম্মেলনের তোড়জোর।
পিরোজপুর ও বরগুনা জেলা বিএনপির ওয়ার্ড পর্যায়ের একাধিক নেতাকর্মী বলেন, ‘প্রথমে যেনতেন সম্মেলন করে কমিটি ঘোষণার চেষ্টা চালান কিছু প্রভাবশালী নেতা। কিন্তু প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীদের চাপের মুখে ব্যর্থ হয় তা। পরবর্তী সময়ে নেওয়া হয় ভিন্ন কৌশল। যাচাই-বাছাইয়ের নামে বাদ দেওয়া হয় প্রতিপক্ষের ভোটারদের। যাতে সহজেই পছন্দের লোক দিয়ে কমিটি করে টিকিয়ে রাখা যায় পদ-পদবি।’
এই বক্তব্যের সত্যতা মেলে শুক্রবার পিরোজপুরের ভান্ডারিয়ায় অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে। প্রাথমিক বাছাইয়ের নামে ওয়ার্ড পর্যায়ের বহু কর্মীকে ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার অভিযোগ করা হয় সেখানে।
কেন্দ্রীয় নির্দেশনা উপেক্ষা করে জেলার সদস্য সচিব ওয়াহিদুজ্জামান লাভলু কী করে ভান্ডারিয়ার সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির টিম লিডার হলেন, সেই প্রশ্নও তোলা হয়। লিখিত বক্তব্যে উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক জালাল উদ্দিন সিকদার বলেন, ‘মাসখানেক আগে উপজেলা ও পৌর মিলিয়ে ৬৩ ওয়ার্ডের প্রাথমিক সদস্য ফরম দেওয়া হয়। কেন্দ্রীয় নেতা রওনাকুল ইসলাম টিপুর উপস্থিতিতে বাছাই শুরু হলে আমাদের ফরমগুলো বাতিলের জন্য চাপ দেন উপজেলা আহ্বায়ক সুমন মঞ্জুরের লোকজন। এ নিয়ে বাগ্বিতণ্ডায় বন্ধ হয়ে যায় বাছাই। সুবিধাজনক সময়ে দুপক্ষকে নিয়ে আবার বাছাই করার আশ্বাস দিয়ে ফরম নিজের কাছে রাখেন টিপু। ’
তিনি আরও বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আশ্বস্ত থাকলেও হঠাৎ করেই গত সপ্তাহে ঘোষিত ভোটার তালিকায় দেখা যায় ওয়ার্ড পর্যায়ের সদস্য তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন আমাদের প্রায় সব কর্মী। অথচ, তারা প্রত্যেকে বহু বছর ধরে বিএনপি করেন। অন্যদিকে যাদের নাম তালিকায় এসেছে, তারা একদিকে যেমন সুমন মঞ্জুরের অনুসারী, তেমনই অনেকেই ছিলেন ফ্যাসিস্ট দলের ঘনিষ্ঠ। আমরা এ তালিকা মানি না।’
উপজেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আলমগীর হোসেন ও যুগ্ম-আহ্বায়ক মোস্তফা শরীফসহ অন্য নেতারা সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।
অভিযোগ বিষয়ে সুমন মঞ্জুর বলেন, ‘সংবাদ সম্মেলন যারা করেছে, তাদেরই অধিকাংশই বহিষ্কৃত। অভিযোগগুলোও সত্য নয়। নিয়মনীতি মেনেই প্রাথমিক সদস্য নির্ধারণ করা হয়েছে।’
ভান্ডারিয়ার মতো প্রাথমিক সদস্য নির্বাচনে পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ উঠেছে বরগুনা জেলার বেতাগী উপজেলায়। কাউন্সিল প্রশ্নে বরিশাল বিভাগীয় সাংগঠনিক টিমের প্রধান আব্দুল আউয়াল মিন্টুর কাছে বুধবার একটি লিখিত অভিযোগ দেন বেতাগী উপজেলা ও পৌর বিএনপির এক পক্ষের নেতারা। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এবং মহাসচিবসহ অন্যদেরও দেওয়া হয় চিঠির অনুলিপি।
লিখিত অভিযোগের সূত্র ধরে বরগুনা জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান শাহজাহান কবির বলেন, ‘ওয়ার্ড পর্যায়ে প্রাথমিক সদস্য নির্বাচন প্রশ্নে দলের ত্যাগী-পরীক্ষিত অনেক কর্মীকে বাছাইয়ের নামে বাদ দেওয়া হয়েছে। বেতাগী উপজেলা বিএনপির বর্তমান আহ্বায়ক হুমায়ুন কবিরের লোকজনকেই কেবল সদস্য করা হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন ওয়ার্ড পর্যায়ে ভোটের নিরপেক্ষতা থাকবে না, তেমনই এ ওয়ার্ড কমিটি দিয়ে বর্তমান নেতারাই পদ-পদবিতে ফিরবেন। তাছাড়া যাদের প্রাথমিক সদস্যের তালিকায় রাখা হয়েছে, তাদের অনেকেই বিগত সময়ে আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। বিষয়টি নিয়ে দলের সাধারণ কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। সমস্যার সমাধান না করে কমিটি হলে তা নেতাকর্মীরা মানবেন না।’
দুই জেলা থেকে আসা এসব অভিযোগের বিষয়ে রওনাকুল ইসলাম টিপু বলেন, ‘কারও অভিযোগ থাকলে আমাকে লিখিতভাবে জানাক। প্রয়োজনে আবার প্রাথমিক সদস্য ফরম যাচাই-বাছাই করা হবে। আমরা সবাইকে সঙ্গে নিয়ে দলকে আরও শক্তিশালী করতে চাই।’
বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক (বরিশাল বিভাগ) আকন কুদ্দুসুর রহমান বলেন, ‘সব পক্ষকে সমন্বয় করে কাউন্সিল করার লক্ষ্যেই প্রতি জেলায় একজন করে কেন্দ্রীয় নেতাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তারপরও যদি অভিযোগ ওঠে এবং অভিযোগের সত্যতা মেলে তবে প্রয়োজনে বিভাগীয় সাংগঠনিক টিম সেখানে গিয়ে সমস্যার সমাধান করবে। দরকার হলে আমাদের টিমপ্রধান আব্দুল আউয়াল মিন্টু সরাসরি দায়িত্ব নিয়ে ওইসব এলাকার সমস্যা সমাধান করে কাউন্সিল সম্পন্ন করবেন।’
জনতার আওয়াজ/আ আ