বিবিসির প্রতিবেদন : তারেক রহমানের সামনে ‘পরিবর্তনের’ চ্যালেঞ্জ
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
রবিবার, ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২৬ ৪:১৩ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
রবিবার, ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২৬ ৪:১৩ অপরাহ্ণ

জনতার আওয়াজ ডেস্ক
সংগৃহীত ছবি
মাত্র দুই বছর আগেও কল্পনা করা কঠিন ছিল যে শেখ হাসিনার ১৫ বছরের ক্ষমতার দাপট এত দ্রুত ভেঙে পড়বে। আরও ভাবা কঠিন ছিল যে কার্যত কোণঠাসা হয়ে পড়া একটি বিরোধী দল এত শক্তিশালীভাবে ফিরে আসবে। কিন্তু তা-ই হয়েছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের দেখা পেয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।
বিবিসির প্রতিবেদন বলছে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দীর্ঘদিন ধরেই পালাক্রমে ক্ষমতায় এসেছে। তবে এবার হিসাব কিছুটা ভিন্ন। এই প্রথমবারের মতো বিএনপির নতুন নেতা তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে দলের নেতৃত্বে থেকে নির্বাচন করেছেন এবং এটিই তার প্রথম নির্বাচনি লড়াই।
তার মা খালেদা জিয়া চার দশক ধরে দলের নেতৃত্বে ছিলেন। তিনি গত বছরের শেষ দিকে মারা যান। তার স্বামী ও বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের অন্যতম নেতা। স্বামী হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার পর খালেদা জিয়া দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন।
মায়ের শাসনামলে স্বজনপ্রীতির সুবিধাভোগী হওয়ার অভিযোগ এবং দুর্নীতির নানা অভিযোগের মুখোমুখি হয়েছেন তারেক রহমান। মায়ের মৃত্যুর পাঁচ দিন আগে তিনি লন্ডনে ১৭ বছরের স্বেচ্ছা নির্বাসন শেষে দেশে ফেরেন।
৬০ বছর বয়সী রহমান মাঝে মাঝে দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করলেও বিশেষত যখন তার মা কারাবন্দি ছিলেন বা অসুস্থ, তাকে অনেকেই তখনো পরীক্ষিত নন–এমন নেতা হিসেবে দেখেন। রাজনৈতিক বিজ্ঞানী নাভিনে মুরশিদ বলেন, ‘তার পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকাটাই বরং তার জন্য সুবিধা হতে পারে, কারণ মানুষ পরিবর্তনকে একটি সুযোগ হিসেবে দেখতে চায়। তারা বিশ্বাস করতে চায় যে নতুন ও ভালো কিছু সম্ভব। তাই আশার জায়গা অনেক।’
দলটি বলছে, তাদের প্রথম অগ্রাধিকার হলো বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। নির্বাচন ঘোষণার পর পরই বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিবিসিকে বলেন, ‘গত এক দশকে যেসব গণতান্ত্রিক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করা হয়েছে, সেগুলোকে আগে সঠিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হবে।’
বাংলাদেশে এমন প্রতিশ্রুতির দীর্ঘ ইতিহাস আছে এবং ক্ষমতায় গিয়ে দলগুলো আরও কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠার অভিযোগও রয়েছে। তবে এবার ২০২৪ সালের ‘জুলাই অভ্যুত্থান’-এ অংশ নেওয়া তরুণ প্রজন্ম আগের মতো পরিস্থিতি মেনে নিতে কম আগ্রহী।
আন্দোলনে অংশ নেওয়া ১৯ বছর বয়সী তাজিন আহমেদ বলেন, ‘আমরা আবার লড়াই করতে চাই না। আগের প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগই চূড়ান্ত বিজয় নয়। যখন দুর্নীতিমুক্ত ও ভালো অর্থনীতির দেশ পাব, সেটাই হবে আমাদের আসল বিজয়।’
তার চাচাতো বোন তাহমিনা তাসনিম (২১) বলেন, ‘আমরা প্রথমে চাই মানুষের মধ্যে ঐক্য। একটি স্থিতিশীল দেশ ও অর্থনীতি আমাদের অধিকার। আমরা আন্দোলনে ছিলাম এবং লড়াই করতে জানি। তাই যদি আবার একই পরিস্থিতি শুরু হয়, আমরা আবারও লড়ার অধিকার রাখি।’
হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের শাসনামলে সহিংসতা পরিস্থিতিকে জটিল করেছে। আইনশৃঙ্খলাকে নিয়ন্ত্রণে আনা নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে। পাশাপাশি অর্থনীতির পুনরুত্থান, খাদ্যের দাম কমানো এবং বৃহৎ তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করাও বিশাল চ্যালেঞ্জ।
সমাজবিজ্ঞানী সামিনা লুৎফা বলেন, সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতার ঘাটতি প্রায় সব দলের ক্ষেত্রেই রয়েছে। ইসলামপন্থি জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের ইতিহাসে দুবার নিষিদ্ধ হয়েছে। এবার তারা ইতিহাসে সর্বোচ্চসংখ্যক আসন পেয়েছে। তাদের জোটসঙ্গী জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) প্রথমবার অংশ নিয়েই ছয়টি আসন জিতেছে। লুৎফা বলেন, ‘সংসদে এমন অনেক নেতা থাকবেন যারা আগে কখনো সংসদে ছিলেন না। এনসিপির তরুণদের অনেক কিছু শেখার আছে। অন্যরা অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ হলেও দেশ পরিচালনার অভিজ্ঞতা নেই। তাই সামনে পথ কঠিন।’
জামায়াতের নির্বাচনি ইশতেহার ছিল ধর্মনিরপেক্ষ ও উন্নয়নমুখী, সেখানে শরিয়াহ আইনের উল্লেখ ছিল না। তবে তাদের ওয়েবসাইটে বলা আছে, ‘রাজনৈতিক শক্তি ছাড়া ইসলামি আইন বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।’ ফলে দলটি ক্ষমতায় গেলে কী করবে তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
মুরশিদ বলেন, জামায়াতের ফলাফল বিস্ময়কর নয়। তারা অত্যন্ত সংগঠিত রাজনৈতিক দল। কয়েক দশক ধরে তৃণমূল পর্যায়ে নিরলসভাবে কাজ করেছে। তবে তার মতে, ‘সমস্যাজনক দিক হলো–তারা অন্তর্নিহিতভাবে অগণতান্ত্রিক, নারীবিদ্বেষী ও পিতৃতান্ত্রিক।’
লুৎফার মতে, বাংলাদেশের নারী উন্নয়নের ক্ষেত্রে সব দলই ব্যর্থ হয়েছে। এবারের নির্বাচনে মোট প্রার্থীর মাত্র ৪ শতাংশের কিছু বেশি ছিলেন নারী।
তিনি বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানে অংশ নেওয়া আমরা নারীরা, কোনো রাজনৈতিক দলই আমাদের সম্মিলিত শক্তিকে আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক অঙ্গনে রূপ দিতে পারেনি। এখন সংসদ সদস্যদের দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে সংরক্ষিত নারী আসনে দক্ষ, সৎ ও যোগ্য প্রার্থী আনতে হবে।’
গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের দাবি করা বিএনপি ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় ফেরানোর পক্ষে থাকবে কি না–এমন প্রশ্নে বিএনপির নেতা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘এটি আমাদের সিদ্ধান্ত নয়।’
তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগের নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় ফিরতে সময় লাগবে, কারণ তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ। যখন নিজের জনগণকে হত্যা, নির্যাতন ও নিপীড়নের অভিযোগ ওঠে, তখন ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে তাদের অবস্থান জনগণই নির্ধারণ করবে।’
ভারতে অবস্থানরত হাসিনা গত বৃহস্পতিবারের নির্বাচনকে ‘প্রতারণা ও প্রহসনের নির্বাচন’ বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং আওয়ামী লীগকে অংশ নিতে দিয়ে নতুন নির্বাচন আয়োজনের আহ্বান জানিয়েছেন।
বিবিসির প্রতিবেদন বলছে, এই মুহূর্তে তার দলের বিরুদ্ধে জনরোষ তীব্র। তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বিবেচনায় আওয়ামী লীগ আর কখনো রাজনৈতিক অঙ্গনে ফিরবে না–এমনটিও বলা যাচ্ছে না। সূত্র: বিবিসি
জনতার আওয়াজ/আ আ