“মোঃ” বা “মোহাম্মদ” – নামের আগে একটি সামাজিক রীতির ইতিহাস ও বর্তমান
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
বুধবার, এপ্রিল ৩০, ২০২৫ ২:০২ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
বুধবার, এপ্রিল ৩০, ২০২৫ ২:০২ অপরাহ্ণ

ব্যারিস্টার রফিক আহমেদ
প্রারম্ভিক ইতিহাস: ব্রিটিশ আমলের প্রভাব
বাংলাদেশে নামের শুরুতে “মোঃ” বা “মোহাম্মদ” লেখার প্রচলন একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে গড়ে উঠেছে। কথিত আছে, ব্রিটিশ শাসনামলে হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে পার্থক্য করতে নামের আগে “মোহাম্মদ” বা “মোঃ” যুক্ত করার রীতি চালু হয়। এটি শুধু একটি পরিচয় নির্দেশক ছিল না, বরং প্রশাসনিক ও সামাজিক বিভাজনেরও একটি হাতিয়ার।
মজার বিষয় হলো, ব্রিটিশ আমলের পুরনো জমি দলিলে দেখা যায়, মুসলিমদের নামের আগে “শ্রী” (যা সাধারণত হিন্দুদের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হতো) ব্যবহার করা হত। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে “মোঃ” বা “মোহাম্মদ” নামের অংশ হয়ে যায়, যা আজও বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে প্রচলিত।
নামের বিভ্রান্তি: একটি আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা
ব্রিটেনে আসার পর আমি প্রথমবারের মতো অনুভব করলাম যে, “Md” বা “মোহাম্মদ” নামের আগে বসানো আমার আসল নামকে ঢেকে দিচ্ছে। ব্রিটিশরা সাধারণত নামের প্রথম ও শেষ অংশ ব্যবহার করে, মাঝের অংশ প্রায়ই বাদ পড়ে। ফলে আমার নামের মূল অংশ (যেমন “রফিক”) অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছিল।
একবার জিপি সার্জারিতে ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্টে আমার নাম স্ক্রিনে উঠেছিল “Mohammed Ahmed”। আমি অপেক্ষা করছিলাম, কিন্তু যখন ডাক্তার “Mohammed Rafique Ahmed” ডাকলেন, তখনই বুঝতে পারলাম যে আমিই সেই ব্যক্তি! অপেক্ষারত সবাই হাসতে শুরু করল, কেউ কেউ বলল, “নিজের নামই জানেন না!”
অন্য আরেকটি অফিসেও একই ঘটনা ঘটেছিল। তখনই সিদ্ধান্ত নিলাম নাম থেকে “Md” বাদ দেবার। আমি স্পষ্ট করে বললাম, “মোহাম্মদ” আমার নাম নয়, এটি একটি ধর্মীয় উপাধি মাত্র।
বর্তমান প্রেক্ষাপট: পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা
বাংলাদেশে নাম পরিবর্তন করা প্রায় হিমালয় জয় করার মতো কঠিন। কিন্তু ঐতিহাসিক যে প্রেক্ষাপটে “মোঃ” বা “মোহাম্মদ” নামের সাথে যুক্ত হয়েছিল, তা এখন আর প্রাসঙ্গিক নয়। আজকের বিশ্বে ব্যক্তির স্বতন্ত্র পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ, এবং নামের একটি অংশকে জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়ার রীতি প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
কী করা যেতে পারে?
১. নামের স্বাধীনতা: সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে নাম নিবন্ধনের সময় ব্যক্তির পূর্ণ নাম গ্রহণ করা উচিত, অপ্রয়োজনীয় উপাধি বাদ দিয়ে।
২. সচেতনতা বৃদ্ধি: মানুষ যেন বুঝতে পারে যে “মোঃ” বা “মোহাম্মদ” নামের বাধ্যতামূলক অংশ নয়।
৩. আইনি সুযোগ:নাম পরিবর্তনের প্রক্রিয়া সহজলভ্য করা, যাতে কেউ চাইলে সহজেই তার পছন্দমতো নাম নিবন্ধন করতে পারে।
উপসংহার
নাম শুধু একটি পরিচয় নয়, এটি ব্যক্তির স্বকীয়তার প্রতীক। ব্রিটিশ আমলের একটি বিভাজনমূলক রীতি আজও আমাদের নামের সাথে জড়িয়ে আছে। সময় এসেছে এই রীতি নিয়ে পুনর্বিবেচনা করার এবং ব্যক্তির নিজস্ব নামকে প্রাধান্য দেওয়ার।
লেখক – Rafique Ahmed Barrister and Solicitor, Principal of Raiyad Solicitors, Social Analyst, Former Employee at Reuters Head Office. London, 30 April 2025
জনতার আওয়াজ/আ আ