যশোর ৫-বিএনপিতে প্রার্থীজট নিশ্চিন্তে জামায়াত - জনতার আওয়াজ
  • আজ সন্ধ্যা ৭:৪১, বৃহস্পতিবার, ১৪ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩১শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৭শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

যশোর ৫-বিএনপিতে প্রার্থীজট নিশ্চিন্তে জামায়াত

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ২৩, ২০২৫ ১:৫১ পূর্বাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ২৩, ২০২৫ ১:৫১ পূর্বাহ্ণ

 

নূর ইসলাম, যশোর থেকে
ছবি : প্রতিনিধি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যশোর-৫ মণিরামপুর আসনে বিএনপি’র মনোনয়ন কে পাবেন, তাই এখন আলোচনার প্রধান বিষয়বস্তু হয়ে উঠেছে। বিএনপি যদি এককভাবে নির্বাচন করে তাহলে এখানে দলীয় প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন চাইতে পারেন এমন অন্তত ছয়জন নেতার নাম শোনা যাচ্ছে। আর যদি জোটগতভাবে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেয়, তাহলে জোটের শরিক কোনো দলকেও এই আসনটি ছেড়ে দেয়া হতে পারে বলে শোনা যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে এই আসনটিতে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রার্থীকে ধানের শীষ প্রতীকে মাঠে দেখা যেতে পারে। অন্যদিকে, আসনটিতে জামায়াতে ইসলামী ঘোষিত প্রার্থী এড. গাজী এনামুল হক নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। যশোরের বৃহত্তম মণিরামপুর উপজেলার ১৭টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে যশোর-৫ নির্বাচনী আসনটি গঠিত। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি’র মনোনয়ন লড়াইয়ে যারা এগিয়ে রয়েছেন তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন, দলের উপজেলা কমিটির সভাপতি এড. শহীদ ইকবাল হোসেন।

এর আগে তিনি দলের থানা কমিটির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ছিলেন মণিরামপুর সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান এবং মণিরামপুর পৌরসভার দুইবারের চেয়ারম্যান। ১৯৯১ এবং ১৯৯৬ সালে দলীয় মনোনয়নে সংসদ নির্বাচন করারও অভিজ্ঞতা রয়েছে এই নেতার। তবে, বিজয়ী হতে পারেননি। এবার দলীয় মনোনয়ন পেলে সেই অপূর্ণতা দূর করতে ব্যাপক সক্রিয় হয়েছেন তিনি। তিনি দলের প্রায় প্রতিটি কর্মসূচিতে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ছুটে যাচ্ছেন সাধারণ ভোটারদের কাছে। তবে, জুলাই বিপ্লব পরবর্তী সময়ে নানাবিধ বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের কারণে শহীদ ইকবালের আপন দুই ছোট ভাইকে দল থেকে বহিষ্কার হতে হয়েছে। যে কারণে তার পজিশন কিছুটা নড়বড়ে হয়ে গেছে বলে মনে করেন বিএনপি’র মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা। ফলে দলীয় মনোনয়ন পেতে শহীদ ইকবাল হোসেনকে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পড়তে হবে দলের জেলা কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মুনির আহমেদ সিদ্দিকী বাচ্চুর ও সাবেক ছাত্রনেতা বিশিষ্ট কৃষি উদ্যোক্তা ইফতেখার সেলিম অগ্নির। বাচ্চুর পিতা ভাষাসৈনিক আফসার আহমেদ সিদ্দিকী এই আসনে ধানের শীষ প্রতীকের এমপি ছিলেন। মরহুম আফসার আহমেদ সিদ্দিকী ছিলেন মণিরামপুরবাসীর অন্তঃপ্রাণ। মুনির আহমেদ সিদ্দিকী বাচ্চুও তৃণমূলের নেতাকর্মী ছাড়াও সাধারণ মানুষের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত। তিনি ধানের শীষ প্রতীক পেতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। মুনির আহমেদ সিদ্দিকী বাচ্চু স্বৈরাচার এরশাদ ও হাসিনাবিরোধী আন্দোলনের একজন সামনের সারির যোদ্ধা।

জুলাই বিপ্লবেও তিনি পেছন থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতাকর্মীদের সাহস জুগিয়েছিলেন এবং সাধ্যমতো সহায়তা করেছিলেন। এ ছাড়া এ আসনে দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী বিএনপি’র অন্য নেতাদের মধ্যে অন্যতম দাবিদার হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রদল নেতা ও বর্তমানে স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় নেতা ইফতেখার সেলিম অগ্নি। তিনি বিগত স্বৈরাচার এরশাদ ও হাসিনাবিরোধী রাজপথের আন্দোলনে একজন লড়াকু সৈনিক। যশোর জেলা ছাত্রদলের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ইফতেখার সেলিম অগ্নি এ প্রসঙ্গে বলেন, রাজনীতি করি মানুষকে কিছু দেবো বলে। মানুষের কাছ থেকে কিছু নেয়ার কোনো প্রত্যাশা আমার নেই। আল্লাহ আমাকে যথেষ্ট দিয়েছেন। বিগত করোনাকালে আল্লাহ আমাকে সুযোগ দিয়েছিলেন এলাকার মানুষের জন্য কিছু করার। আমি সাধ্যমতো ব্যক্তি উদ্যোগে তাদের জন্য যা পেরেছি, তাই করেছি। তিনি বলেন, চাঁদাবাজ, জুলুমবাজ, ঠকবাজ, নির্যাতনকারী, হামলা-মামলাকারীদের সঙ্গে কোনো আপস নয়। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের নির্দেশে ৩১ দফা নিয়ে মানুষের কাছে যাচ্ছি তাদের মুক্তির দিশা দেখাচ্ছি। দল যদি আমাকে মূল্যায়ন করে তাহলে এলাকাবাসীর ভালোবাসা নিয়ে আমি এই আসনের ধানের শীষের হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার করতে পারবো এই বিশ্বাস আমার আছে। এ ছাড়া উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট আসাদুজ্জামান মিন্টু ও বিএনপি’র কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক (নার্সেস) জাহানারা সিদ্দিকীও এবার দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন।

জাহানারা সিদ্দিকী বিএনপি’র কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক দপ্তর সম্পাদক প্রয়াত আফসার আহমদ সিদ্দিকীর দ্বিতীয় স্ত্রী। তবে মাঠে গুঞ্জন রয়েছে জোট ছাড়া বিএনপি এককভাবে নির্বাচন করলে এবং স্থানীয়ভাবে বিএনপির মধ্যকার বিবদমান সমস্যার সমাধান করা না গেলে জেলা বিএনপি’র সভাপতি এডভোকেট সৈয়দ সাবেরুল হক সাবু এই আসনে প্রার্থী হওয়ার দৌড়ে শামিল হতে পারেন। তখন বিএনপি’র নির্বাচনী ময়দানের খেলা অন্যরকম হয়ে যেতে পারে বলে দলের দায়িত্বশীল একজন নেতা জানিয়েছেন। বিএনপির এই দলীয় মনোনয়ন লড়াইয়ের মধ্যে ঘুরেফিরে আসছে মুফতি আব্দুর রশিদের নাম। তিনি জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব। তবে, যশোর-৫ আসন তথা মণিরামপুরবাসীর কাছে তার সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি ‘ওয়াক্কাস হুজুরের’ ছেলে। তার পিতা মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাস এই আসন থেকে তিনবার এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। জাতীয় সংসদের হুইপ ছাড়াও তিনি ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছেন। এলাকার মসজিদ, মাদ্রাসাসহ অবকাঠামোগত উন্নয়নে মুফতি ওয়াক্কাসের অসামান্য অবদান রয়েছে। সে কারণে প্রয়াত এই নেতাকে এখনো স্মরণে রেখেছে মণিরামপুরবাসী। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মহাসচিব ড. গোলাম মহিউদ্দিন ইকরামের একটি ঘোষণা। চলতি বছরের ৫ জুলাই ড. মহিউদ্দিন ইকরাম মণিরামপুর উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে যশোর-৫ আসনে বিএনপি জোটের প্রার্থী হিসেবে মুফতি আব্দুর রশিদের নাম ঘোষণা করেন। এর পর থেকেই শুরু হয়েছে আব্দুর রশিদকে নিয়ে নানা জল্পনা কল্পনা।

তা যেমন বিএনপি’র মধ্যে, তেমনি অন্যান্য দল এবং সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও। এই যখন পরিস্থিতি তখন আসনটিতে নির্ভার জামায়াতে ইসলামী। এই আসনে তাদের প্রার্থী দলের জেলা কর্মপরিষদ সদস্য এডভোকেট গাজী এনামুল হক। কবি, লেখক ও সজ্জন ব্যক্তি এবং ইসলামী বক্তা হিসেবে তার সুপরিচিতি রয়েছে গোটা এলাকাজুড়ে। তিনি ২০১৪ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। সেসময় আওয়ামীলীগ ক্ষমতায়। দলীয় প্রভাব ও প্রশাসনিক প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও সেবার এডভোকেট গাজী এনামুল হক প্রচুর ভোট পেয়েছিলেন। ফলে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তিনি যে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় শক্ত অবস্থান নিয়ে হাজির হচ্ছেন তা এখনই বোঝা যাচ্ছে। প্রতিদিনই তিনি ছুটে যাচ্ছেন সাধারণ মানুষের কাছে। সবথেকে বড় কথা জামায়াতে ইসলামী এই আসনটিতে ইতিমধ্যে নির্বাচনকে সামনে রেখে দলের যাবতীয় সাংগঠনিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। এখন যেসব কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে তা নির্বাচনী প্রচার প্রচারণার ছক অনুযায়ী। এদিকে, যশোর-৫ আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ প্রার্থী ঘোষণা করেছে। দলের মণিরামপুর উপজেলা কমিটির প্রধান উপদেষ্টা জয়নাল আবেদীন টিপু মাস্টারকে এই আসনে প্রার্থী ঘোষনা করেছে দলটি। খেলাফত মজলিসের প্রার্থী দলের মণিরামপুর উপজেলা কমিটির সভাপতি মাওলানা তবিবর রহমান। জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি জাগপা থেকে প্রার্থী হচ্ছেন দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য, যশোর জেলা কমিটির সভাপতি এবং খুলনা বিভাগীয় প্রধান সমন্বয়ক নিজামদ্দিন অমিত। তিনি এই আসন থেকে দলের প্রার্থী হিসেবে ২০১৮ সালের নির্বাচনেও অংশ নিয়েছিলেন।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, ভবদহের জলাবদ্ধতা কিছু কর্মকর্তা আর রাজনৈতিক নেতার অনৈতিক টাকা উপার্জনের মাধ্যম হয়ে উঠেছে। যুগের পর যুগ এই এলাকায় হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। যার সিংহভাগই গেছে এসব ব্যক্তির পকেটে। আর বিপন্ন ভবদহপাড়ের মানুষ নিজেদের জীবন বাঁচানোর পাশাপাশি গবাদিপশুর রক্ষণাবেক্ষণ, পরিবেশ রক্ষার সংগ্রামে প্রাণপাত করে চলেছেন। তার সঙ্গে আছে মাদক, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, সামাজিক সমপ্রীতির অভাব ইত্যাদি জটিল সমস্যা। এ সবই আগামী নির্বাচনে স্থানীয় ইস্যু হিসেবে সামনে আসবে বলে সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলে জানা গেছে।

মণিরামপুর উপজেলায় সংখ্যালঘু সমপ্রদায়ের ভোট রয়েছে ২০ শতাংশের ওপর। এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ মতুয়া সম্প্রদায়ের। ভবদহ এলাকার একটা অংশ সম্পূর্ণ সংখ্যালঘু অধ্যুষিত যা স্থানীয়ভাবে ছিয়ানব্বই গ্রাম নামে পরিচিত। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, বিগত দিনগুলোতে এই এলাকায় যেসব সামপ্রদায়িক সন্ত্রাসের ঘটনা ঘটেছে তার সিংহভাগই ছিল আওয়ামী সন্ত্রাসীদের দ্বারা সংঘটিত। বিশেষ করে একবার উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান এবং দুইবার এমপি হওয়ার পর আওয়ামী লীগ নেতা স্বপন ভট্টাচার্য ও তার স্ত্রী-সন্তান সংখ্যালঘুদের পুঁজি করে টাকার পাহাড় গড়েছেন। কিন্তু, তারা এই এলাকার সংখ্যালঘুদের অচ্ছুৎ হিসেবে ঘৃণা করতেন। তাদের বাড়িতে পর্যন্ত সংখ্যালঘু সমপ্রদায়ের মানুষ প্রবেশ করতে পারতেন না। যার খেসারত হিসেবে ২০২৪-এর পাতানো নির্বাচনেও স্বপন ভট্টাচার্যের পক্ষে আওয়ামী লীগ, প্রশাসন এবং সরকারের জোটবদ্ধ ভূমিকার বিরুদ্ধে তারা ‘জনতার ঐক্য’ গড়ে তুলে স্বতন্ত্র প্রার্থী এসএম ইয়াকুব আলীকে বিজয়ী করেছিলেন। এর প্রভাব আগামী নির্বাচনেও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিএনপি-জামায়াতের কর্মী, সমর্থক ও সাধারণ ভোটারা।

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ