রমজানে দ্রব্যমূল্যে লাগাম টানতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
সোমবার, ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০২৬ ৪:৩৩ পূর্বাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
সোমবার, ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০২৬ ৪:৩৩ পূর্বাহ্ণ

সংযম, আত্মশুদ্ধি ও সহমর্মিতার এই মাসে মানুষের মনোযোগ থাকার কথা ইবাদত ও নৈতিক পরিশুদ্ধির দিকে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঊর্ধ্বগতি বহু পরিবারের জন্য রমজানকে বাড়তি আর্থিক চাপের মাসে পরিণত করেছে। ইফতার ও সেহরির অপরিহার্য পণ্য চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, চিনি, ছোলা, খেজুর, ডিম, মাংস, সবজি অনেক ক্ষেত্রেই উচ্চমূল্যে বিক্রি হচ্ছে। ফলে সীমিত আয়ের মানুষের জন্য দৈনন্দিন ব্যয় সামাল দেয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে রমজানে দ্রব্যমূল্যে লাগাম টানতে এখনই কার্যকর, সমন্বিত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।
রমজানে চাহিদা বৃদ্ধি পায় এটি অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু চাহিদা বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। বরং এ সময় সরবরাহব্যবস্থা আরও সক্রিয় ও দক্ষ হওয়া উচিত। দুঃখজনকভাবে দেখা যায়, রমজান শুরু হওয়ার আগেই বাজারে মূল্যবৃদ্ধির প্রবণতা তৈরি হয় এবং মাস চলাকালেও তা নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি কিংবা ডলারের বিনিময় হার এসব বাস্তব কারণ থাকলেও অভ্যন্তরীণ বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও অসাধু মজুতদারি বড় ভূমিকা রাখে।
বিশেষত সরবরাহ শৃঙ্খলের বিভিন্ন স্তরে অস্বচ্ছতা মূল্যবৃদ্ধিকে উসকে দেয়। উৎপাদক থেকে ভোক্তা পর্যন্ত দীর্ঘ পথে একাধিক মধ্যস্বত্বভোগীর উপস্থিতি পণ্যের দাম বাড়িয়ে তোলে। অনেক ক্ষেত্রে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে বাজারে আতঙ্ক ছড়ানো হয়, যার প্রভাব সরাসরি পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর। এই প্রবণতা রোধে শুধু খুচরা পর্যায়ে অভিযান চালালেই হবে না; পাইকারি ও আমদানিকারক পর্যায়ে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে।
প্রথমত, বাজার তদারকি হতে হবে ধারাবাহিক, পরিকল্পিত ও তথ্যভিত্তিক। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নিয়মিতভাবে বড় আড়ত, গুদাম ও সরবরাহকেন্দ্র পরিদর্শন করতে হবে। মজুতের পরিমাণ, ক্রয়মূল্য ও বিক্রয়মূল্যের মধ্যে অস্বাভাবিক ব্যবধান থাকলে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। অনিয়ম প্রমাণিত হলে কেবল অর্থদণ্ড নয়, প্রয়োজনে লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিলের মতো কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে হবে। দৃশ্যমান শাস্তির দৃষ্টান্ত তৈরি হলে বাজারে ইতিবাচক বার্তা যাবে।
দ্বিতীয়ত, সরকারি সরবরাহব্যবস্থা জোরদার করা অপরিহার্য। খোলা বাজারে বিক্রয় (ওএমএস), টিসিবির পণ্য বিতরণ এবং ন্যায্যমূল্যের দোকান কার্যক্রম রমজানজুড়ে সম্প্রসারণ করতে হবে। শুধু শহরকেন্দ্রিক নয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়েও এই কার্যক্রম সক্রিয় রাখতে হবে। বিশেষভাবে নিম্নআয়ের মানুষের জন্য সুলভমূল্যে পণ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা গেলে বাজারে অতিরিক্ত চাপ কমবে।
তৃতীয়ত, তথ্যস্বচ্ছতা ও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। নিত্যপণ্যের পাইকারি ও খুচরা দামের দৈনিক তালিকা অনলাইনে প্রকাশ করলে ভোক্তা ও প্রশাসন উভয়ের জন্য পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ সহজ হবে। একই সঙ্গে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ ব্যবস্থাকে সক্রিয় ও দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল করতে হবে। অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তির প্রক্রিয়া সহজ হলে বাজারে জবাবদিহি বাড়বে।
চতুর্থত, দীর্ঘমেয়াদে সরবরাহ শৃঙ্খল সংস্কার প্রয়োজন। কৃষক ও উৎপাদক যেন ন্যায্যমূল্য পান এবং ভোক্তা যেন সাশ্রয়ী দামে পণ্য কিনতে পারেন এমন ভারসাম্যপূর্ণ কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। কৃষিপণ্যের সংরক্ষণ ও হিমাগার সুবিধা বৃদ্ধি, আধুনিক পরিবহনব্যবস্থা ও সরাসরি বাজারসংযোগ প্রতিষ্ঠা করলে মৌসুমি মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হবে।
এখানে ব্যবসায়ী সমাজের দায়িত্বও অনস্বীকার্য। রমজান সহমর্মিতার মাস; এ সময়ে নৈতিক ব্যবসায়িক আচরণ সমাজে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। স্বল্পমেয়াদি অতিরিক্ত মুনাফার পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদি আস্থা অর্জনই টেকসই ব্যবসার ভিত্তি। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর উচিত নিজস্ব পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা শক্তিশালী করা, যাতে সদস্যরা অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধিতে জড়িত না হন।
রাষ্ট্রের জন্য বিষয়টি কেবল অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নও। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি মানুষের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করে, যা সামগ্রিক জনমনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই রমজান চলাকালেই কার্যকর সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয় ছাড়া এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সম্ভব নয়।
সবশেষে বলা যায়, রমজান সংযমের মাস হলেও তা জনদুর্ভোগের মাস হতে পারে না। বাজারে শৃঙ্খলা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব এবং সমাজেরও নৈতিক কর্তব্য। কথার চেয়ে কাজে প্রমাণের সময় এখনই। রমজানে দ্রব্যমূল্যে লাগাম টানতে দ্রুত, দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের বিকল্প নেই। মানুষের স্বস্তিই হতে হবে নীতিনির্ধারণের মূল লক্ষ্য।
লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
জনতার আওয়াজ/আ আ