সরকার পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে অপতথ্যের ভয়াবহ রূপ
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
রবিবার, আগস্ট ১৮, ২০২৪ ৫:৪০ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
রবিবার, আগস্ট ১৮, ২০২৪ ৫:৪০ অপরাহ্ণ

জনতার আওয়াজ ডেস্ক
বাংলাদেশের সরকার পরিবর্তনের পর অপতথ্য ছড়িয়ে পড়েছে। এসব অপতথ্যের বিষয়ে গতকাল শনিবার একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে তথ্য যাচাইকারী বা ফ্যাক্ট চেকার প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানার। সেখানে ‘সরকার পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে সাম্প্রদায়িক অপতথ্যের ভয়াবহ রূপ’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।

গত ১১ থেকে ১৭ আগস্ট পর্যন্ত ভুল তথ্য শনাক্তের পর ফ্যাক্টচেক হিসেবে ৩৫টি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে রিউমর স্ক্যানার। এরমধ্যে জাতীয় বিষয়ে ১৮টি ভুল তথ্য শনাক্তের কথা বলা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে। সেখানে সপ্তাহের আলোচিত তিন বিষয় নিয়ে বলা হয়েছে।

১.
জহির রায়হানকে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর মন্তব্য দাবিতে ইত্তেফাকের সংবাদের ছবি এডিট করে প্রচার হয়। রিউমর স্ক্যানারের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বছর থেকেই ‘জহির রায়হান গুম হয়নি, বাড়ি থেকে পালিয়েছে-শেখ মুজিব’ শিরোনাম সম্বলিত দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার একটি ছবি ইন্টারনেটে প্রচারিত হচ্ছিল। সম্প্রতি ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ছবিটি আবারও ভাইরাল হয়েছে।
রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা গেছে, আলোচিত শিরোনামে দৈনিক ইত্তেফাক এ কোনো প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি। বরং, ১৯৭১ সালের ১৮ মার্চ তারিখের দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার একটি খবরকে বিকৃত করে আলোচিত ছবিটি তৈরি করা হয়েছে।
২.
ক্ষমতাচ্যুতি নিয়ে শেখ হাসিনার লেখা ভুয়া খোলা চিঠি ভাইরাল হয়। চিঠিটি বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণির সব গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। বিষয়টি নিয়ে রিউমর স্ক্যানারে প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের গণআন্দোলনের মুখে গত ৫ই আগস্ট পদত্যাগ করে দেশ ছেড়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
এরপরই ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়েছে যে শেখ হাসিনা জনগণের উদ্দেশে একটি খোলা চিঠি দিয়েছেন। গত ৭ই আগস্ট দিল্লি থেকে এই চিঠি পাঠানো হয় বলে দাবি করা হচ্ছে। কথিত এই চিঠিতে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেন বলে উল্লেখ রয়েছে।

রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করে কোনো খোলা চিঠি দেননি বরং ফেসবুক থেকে ভারতীয় গণমাধ্যম হয়ে বাংলাদেশের গণমাধ্যমে ভুয়া এই চিঠির তথ্য প্রচার করা হয়েছে। এ বিষয়ে সামাজিক মাধ্যমে চিঠিটির উৎস অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখা যায়, গত ৫ আগস্ট বিকেল ৪ টা ৩৫ মিনিটে মো. রাকিব আকন নামে এক ব্যক্তি কর্তৃক এ বিষয়ে করা সম্ভাব্য প্রথম পোস্টটি খুঁজে পাওয়া যায়।

পরবর্তীতে ভারতের আগরতলা ভিত্তিক দৈনিক পত্রিকা ‘ত্রিপুরা ভবিষ্যত’ এর প্রিন্ট সংস্করণেও এটি চিঠি আকারে তারিখ উল্লেখসহ প্রকাশের পর প্রিন্ট সংস্করণের স্ক্রিনশট ব্যাপকভাবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে বলে ওই অনুসন্ধানে বলা হয়।
৩.
সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানায় হামলায় গর্ভবতী নারী পুলিশ সদস্য নিহতের গুজব দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি নিয়ে রিউমর স্ক্যানারে প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ৩ আগস্ট বিকালে সরকারের পদত্যাগের দাবিতে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের পক্ষ থেকে দেশব্যাপী অসহযোগ আন্দোলন ডাক দেয়া হয়। এর সূত্র ধরে পরদিন ৪ আগস্ট দেশব্যাপী বিভিন্ন জায়গায় সংঘর্ষে লিপ্ত হয় ছাত্র-জনতা ও পুলিশ। ঐদিনই সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুর থানায় হামলায় ১৩ পুলিশ সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনায় দেশব্যাপী চাঞ্চল্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এরই প্রেক্ষিতে সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুরে ১৩ জন নিহত পুলিশ সদস্যের মধ্যে একজন গর্ভবতী নারী পুলিশ সদস্য ছিলেন এবং তাকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে শীর্ষক দাবিতে এক নারী পুলিশ সদস্যের ছবিসহ ফেসবুকে প্রচার করা হয়েছে।

রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুরে নিহত ১৩ জন পুলিশ সদস্যের মধ্যে কেউ নারী ছিলেন না এবং প্রচারিত ছবিটি ভিন্ন এক নারী পুলিশ সদস্যের। তিনি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশে কর্মরত।

বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক হামলা নিয়ে ভারতের গণমাধ্যমে অপতথ্য
সরকার পতন ঘিরে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক হামলা নিয়ে ভারতের মূলধারার কিছু গণমাধ্যম ও দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের কেউ কেউ অপতথ্য ছড়াচ্ছেন বলে বেরিয়ে এসেছে রিউমর স্ক্যানারের প্রতিবেদনে।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাবলির মধ্যেই সাম্প্রদায়িক ভুল তথ্য এবং অপতথ্যের ব্যাপক প্রচারের মাধ্যম হয়ে ওঠেছে এক্স (সাবেক টুইটার)। এক্সে এমন ৫০টি অ্যাকাউন্ট খুঁজে বের করেছে রিউমর স্ক্যানার। যেগুলোর প্রতিটির অন্তত একটি পোস্টে সাম্প্রদায়িক অপতথ্য ও ভুল তথ্য প্রচারের প্রমাণ পেয়েছে রিউমর স্ক্যানার। এসব অ্যাকাউন্টে গত ৫ থেকে ১৩ আগস্টের মধ্যে প্রচারিত পোস্টগুলো ১ কোটি ৫৪ লাখের বেশি বার দেখা হয়েছে। ভুয়া ও অপতথ্য ছড়ানো এসব অ্যাকাউন্টধারীর ৭২ শতাংশই ভারতে থাকেন।

অ্যাকাউন্টধারীদের মধ্যে দায়িত্বশীল অনেক ব্যক্তিও রয়েছেন। এমনকি ভারতের একাধিক মূল ধারার গণমাধ্যমেও এসব ভুয়া তথ্য প্রচার করা হয়েছে বলে ওই প্রতিবেধনে বলা হয়।
১.
গত ৭ জুলাই বগুড়ায় জগন্নাথ দেবের রথযাত্রায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে পাঁচজনের মৃত্যু হয়। এই ঘটনারই একটি ভিডিও সাম্প্রতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে গত ৯ আগস্ট ভারতের একটি এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্ট করে দাবি করা হয়, ‘বাংলাদেশের হিন্দু নারী ও শিশুদের একটি ক্যাম্পে জিহাদিরা বোমা দিয়ে হামলা চালিয়ে শত শত নারীকে হত্যা করার দৃশ্য।’
বিষয়টি নিয়ে রিউমর স্ক্যানারের প্রতিবেদনে বলা হয়, রিউমর স্ক্যানার ইনভেস্টিগেশন ইউনিট যে ৫০টি অ্যাকাউন্টের একটি করে পোস্টকে এই গবেষণায় নমুনা হিসেবে গ্রহণ করেছে, তার মধ্যে ১৩টি পোস্টেই ভিন্ন ঘটনাকে এমন সাম্প্রদায়িক রূপ দেওয়া হয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি ঘটেছে মুসলিম ব্যক্তিকে হিন্দু দাবিতে প্রচারের ঘটনা। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বাংলাদেশের অভিনেত্রী আজমেরী বাঁধনের প্রসঙ্গ। তাকে হিন্দু দাবি করে একটি ভিডিওর মাধ্যমে প্রচার করা হচ্ছে, বাংলাদেশে হিন্দু নারীর কান্না করে বক্তৃতা দেওয়ার দৃশ্য। বাঁধন নিজেই বিষয়টির প্রতিবাদ জানিয়েছেন। এমন আরো ১৭টি ঘটনার প্রমাণ পেয়েছে রিউমর স্ক্যানার ইনভেস্টিগেশন ইউনিট, যা ধরণ অনুযায়ী সর্বোচ্চ (৩৬ শতাংশ)।
এছাড়া ভিন্ন ঘটনার পুরোনো ভিডিও, মুসলিমদের স্থাপনায় সাম্প্রতিক হামলাকে হিন্দুদের স্থাপনায় হামলা দাবি, ভিন্ন স্থাপনায় অগ্নিসংযোগের ঘটনাকে হিন্দুদের স্থাপনায় হামলার দাবি, রাজনৈতিক স্লোগানের বক্তব্যকে ভিন্ন দাবি, স্ক্রিনশট বিকৃতি, ভুয়া বক্তব্য, বিএনপির নামে ভুয়া টেলিগ্রাম অ্যাকাউন্টের বরাতে ভুল তথ্য এবং হিন্দু নিহতের সংখ্যা নিয়ে ভুয়া দাবির মাধ্যমে এসব অর্ধশতাধিক ভুয়া তথ্যের ব্যাপক প্রচার লক্ষ্য করেছে রিউমর স্ক্যানার।
প্রচারিত পোস্টগুলোর ক্ষেত্রে ভুয়া তথ্যের প্রচারে ৮০ শতাংশ (৪০টি) ক্ষেত্রেই ব্যবহার হয়েছে ভিডিও ফুটেজ। এসব ভিডিও ফুটেজের মধ্যে ১৫টি ০৫ আগস্টের পূর্বের ভিন্ন ঘটনার। বাকিগুলো সরকার পতন পরবর্তী সময়ে ভিন্ন ভিন্ন ঘটনার হলেও এসব ফুটেজকে সাম্প্রতিক সাম্প্রদায়িক ভুয়া তথ্যের প্রচারে ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়া ১৬ শতাংশ ক্ষেত্রে ছবি ও স্ক্রিনশট এবং বাকি চার শতাংশ ক্ষেত্রে ব্যবহার হয়েছে ছবি/ভিডিও বিহীন স্ট্যাটাস।
২.
সম্প্রতি এক হিন্দু ব্যক্তি তার নিখোঁজ পুত্রের সন্ধান দাবিতে মানববন্ধন করছে এমন দৃশ্য দাবি করে একটি ভিডিও ভারতের মূলধারার অন্তত তিন গণমাধ্যম এশিয়ান নিউজ ইন্টারন্যাশনাল (ANI), এনডিটিভি, মিরর নাউ এর এক্স অ্যাকাউন্টে প্রচার করা হয়। তবে রিউমর স্ক্যানার যাচাই করে দেখেছে, উক্ত ব্যক্তি মুসলিম। বাবুল হাওলাদার নামে এই ব্যক্তি ২০১৩ সাল থেকে নিখোঁজ থাকা তার ছেলের সন্ধান দাবিতে এই মানববন্ধনে অংশ নিয়েছিলেন৷ সাম্প্রদায়িক অপতথ্যের এমন প্রচারে ভারতীয় আরো একাধিক গণমাধ্যম এবং গণমাধ্যমের সাথে যুক্ত ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতা পেয়েছে রিউমর স্ক্যানার৷ এই তালিকায় আরো আছে জি নিউজ মধ্যপ্রদেশ এবং নিউজ টুয়েন্টিফোর নামে গণমাধ্যমের এক্স অ্যাকাউন্ট।
রিউমর স্ক্যানারের প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারতের আরেক সুপরিচিত গণমাধ্যম অপিইন্ডিয়া এর প্রধান সম্পাদক নুপুর শর্মাকেও তার এক্স অ্যাকাউন্টে নিয়মিত বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাবলির প্রেক্ষিতে সাম্প্রদায়িক অপতথ্য ছড়াতে দেখেছে রিউমর স্ক্যানার ইনভেস্টিগেশন ইউনিট। ১১ আগস্ট প্রকাশিত তার একটি এক্স পোস্টকে ভুয়া তথ্য হিসেবে চিহ্নিত করে তাকে জানানোর পর তিনি রিউমর স্ক্যানারের একজন টিম মেম্বারকে এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে ব্লক করেন৷
সাম্প্রদায়িক গুজব প্রচারে ভারতের বাইরেও বিভিন্ন দেশের একাধিক দায়িত্বশীল ব্যক্তিদেরও ভূমিকা থাকার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। ইরাকি বংশোদ্ভূত সালওয়ান মোমিকা একাধিকবার প্রকাশ্যে ইসলাম ধর্মের প্রধান ধর্মগ্রন্থ কোরআন পুড়িয়ে বিতর্ক ও সমালোচনার সৃষ্টি করেন, হয়েছেন গণমাধ্যমের শিরোনাম। এই ব্যক্তিকে তার এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে নিয়মিত বাংলাদেশকে জড়িয়ে সাম্প্রদায়িক অপতথ্য প্রচারের প্রমাণ মিলেছে। এছাড়া, পাকিস্তান জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক লেগ স্পিনার দানিশ কানেরিয়াকে তার এক্স অ্যাকাউন্ট থেকে ক্রিকেটার লিটন দাসের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে দাবিতে একটি ভিডিও ফুটেজ শেয়ার করতে দেখা গেছে। আদতে এটি ছিল মাশরাফির বাড়িতে অগ্নিসংযোগের ফুটেজ। লিটনের বাড়িতে কোনো হামলার ঘটনা ঘটেনি বলে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়।
বিষয়টি নিয়ে ফ্যাক্টচেকার ইয়ুশা রহমান রিউমর স্ক্যানারকে বলেন, এই অপতথ্যগুলো প্রচার করছে মূলত ধর্মীয় উগ্রবাদীরা। তাদের মাধ্যমে এসব অপপ্রচার বাড়ছে। তারা সাম্প্রদায়িক প্রচারকে মুসলিম বিরোধী আখ্যান প্রচারের উপায় হিসেবে দেখছে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে ৫ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে পালান শেখ হাসিনা। কোটা সংস্কার আন্দোলন ও সরকারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে ১৬ জুলাই থেকে এ পর্যন্ত ৬২৪ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
আন্দোলন ঘিরে সরকার পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এসব অপতথ্যের ভয়াবহ রূপ ছড়িয়ে পড়ে।সূত্রঃমানবজমিন
জনতার আওয়াজ/আ আ