৫০ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে কতটা বদলাবে বাংলাদেশ - জনতার আওয়াজ
  • আজ রাত ১০:০০, বুধবার, ২৭শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১৩ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ১০ই জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

৫০ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে কতটা বদলাবে বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: বুধবার, মে ২৭, ২০২৬ ৮:৪১ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: বুধবার, মে ২৭, ২০২৬ ৮:৪১ অপরাহ্ণ

 

জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ছবিঃ সংগৃহীত
সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম ১০০ দিনেই বড় আকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অর্থনীতিতে গতি ফেরানোর শক্ত বার্তা দেওয়া হয়েছে। এই সময়ে অনুষ্ঠিত তিনটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ২৮টি উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৫০ হাজার ৬২৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকা, অর্থাৎ প্রায় ৫০ হাজার ৬২৫ কোটি টাকা।

প্রথম ১০০ দিনের এই উন্নয়ন কর্মকাণ্ডকে অনেকেই নতুন সরকারের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন। অবকাঠামো উন্নয়ন, পানি নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, যোগাযোগ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গঠনের দিকেই যে সরকার জোর দিচ্ছে— একনেকের সিদ্ধান্তগুলোতে তারই স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছে।

বিশেষ করে প্রায় সাড়ে ৩৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের ‘পদ্মা ব্যারেজ (প্রথম পর্যায়)’ প্রকল্প অনুমোদনের মাধ্যমে সরকার আবারও বড় অবকাঠামো বা মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে হাঁটছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশ্লেষকদের ভাষায়, এটি শুধু একটি পানি প্রকল্প নয়— বরং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, নৌপরিবহন, শিল্প, পরিবেশ ও জলবায়ু নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত বিনিয়োগ।

তিনটি একনেক সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন তারেক রহমান। প্রথম সভায় তুলনামূলক ছোট ও সংশোধিত প্রকল্প অনুমোদনের মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও দ্বিতীয় সভায় অবকাঠামো সম্প্রসারণে বড় গতি আসে। আর তৃতীয় সভায় এসে পদ্মা ব্যারেজ অনুমোদনের মাধ্যমে সরকার উন্নয়নের নতুন মাত্রা যোগ করে।

অর্থনীতিবিদ ও পরিকল্পনাবিদদের মতে, প্রথম তিনটি একনেক সভা বিশ্লেষণ করলে সরকারের উন্নয়ন কৌশলের একটি ধাপে ধাপে অগ্রসরমান চিত্র দেখা যায়। শুরুতে চলমান প্রকল্প পুনর্বিন্যাস ও প্রশাসনিক সক্ষমতা যাচাই, পরে অবকাঠামো ও জনসেবা সম্প্রসারণ এবং সর্বশেষে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত মেগা প্রকল্পে প্রবেশ—এই ধারাবাহিকতাই এখন দৃশ্যমান।

২৮ প্রকল্পে ব্যয় ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি

সরকার গঠনের পর প্রথম একনেক সভা অনুষ্ঠিত হয় ৬ এপ্রিল, দ্বিতীয় সভা ২৬ এপ্রিল এবং তৃতীয় সভা ১৩ মে। এই তিন সভায় ধারাবাহিকভাবে উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আনার চেষ্টা করেছে সরকার।

প্রথম সভায় অনুমোদন পায় পাঁচটি প্রকল্প, যার মোট ব্যয় ছিল ৪৮৩ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। দ্বিতীয় সভায় ১৪টি প্রকল্পের বিপরীতে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১৩ হাজার ৪৪৫ কোটি ৪১ লাখ টাকা। আর তৃতীয় সভায় মাত্র ৯টি প্রকল্প অনুমোদিত হলেও পদ্মা ব্যারেজের কারণে ব্যয় লাফিয়ে বেড়ে দাঁড়ায় ৩৬ হাজার ৬৯৫ কোটি ৭২ লাখ টাকায়। সব মিলিয়ে তিন সভায় মোট ২৮টি প্রকল্পে অনুমোদিত ব্যয় দাঁড়ায় ৫০ হাজার ৬২৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকা।

পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তাদের মতে, এই প্রকল্পগুলোর বড় অংশই দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো ও উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত। ফলে এগুলোর প্রভাব শুধু সরকারি ব্যয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং কর্মসংস্থান, শিল্প উৎপাদন, কৃষি ও সেবা খাতেও এর বহুমাত্রিক প্রভাব পড়বে।

প্রথম একনেক: সীমিত ব্যয়ে সংযত সূচনা

৬ এপ্রিল অনুষ্ঠিত নতুন সরকারের প্রথম একনেক সভাকে অনেকেই ‘সংযত সূচনা’ হিসেবে দেখছেন। কারণ, দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই বড় মেগা প্রকল্পে না গিয়ে সরকার বিদ্যমান প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন পরিস্থিতি পর্যালোচনা ও পুনর্গঠনের দিকে মনোযোগ দেয়। এই সভায় অনুমোদিত পাঁচটি প্রকল্পের মধ্যে ছিল— জেনারেল সোশ্যাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট-২ (জিএসআইডিপি-২), চর উন্নয়ন ও বসতি স্থাপন প্রকল্প-৪, আইটি ট্রেনিং অ্যান্ড ইনকিউবেশন সেন্টার, বিভাগীয় মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালগুলোর ডায়াগনস্টিক ইমেজিং আধুনিকীকরণ এবং গোপালগঞ্জ ডেন্টাল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপন।

এই প্রকল্পগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকার শুরুতেই স্বাস্থ্য, সামাজিক অবকাঠামো ও প্রযুক্তি খাতকে অগ্রাধিকার দিতে চেয়েছে। বিশেষ করে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ডায়াগনস্টিক সুবিধা আধুনিকীকরণ এবং ডেন্টাল কলেজ স্থাপনের মতো প্রকল্প দেশের স্বাস্থ্য অবকাঠামো উন্নয়নের ইঙ্গিত দেয়। অপরদিকে আইটি ট্রেনিং ও ইনকিউবেশন প্রকল্প তরুণদের দক্ষতা উন্নয়ন ও ডিজিটাল অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করার পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

দ্বিতীয় একনেক: অবকাঠামো সম্প্রসারণে বড় গতি

প্রথম সভার মাত্র ২০ দিনের মাথায় ২৬ এপ্রিল অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় একনেক সভায় উন্নয়ন ব্যয়ের পরিমাণ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। সভায় ১৪টি প্রকল্প অনুমোদনের বিপরীতে ব্যয় ধরা হয় ১৩ হাজার ৪৪৫ কোটি ৪১ লাখ টাকা।

এ সভার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল— বড় অবকাঠামো ও জনসেবা প্রকল্পে উচ্চমাত্রার বিনিয়োগ এবং বিদেশি ঋণনির্ভর উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সম্প্রসারণ। মোট ব্যয়ের মধ্যে প্রায় ৫ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা বৈদেশিক ঋণ হিসেবে ধরা হয়।

অনুমোদিত উল্লেখযোগ্য প্রকল্পগুলোর মধ্যে ছিল— নগর জনগোষ্ঠীর জন্য সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, কাস্টমস আধুনিকায়ন ও অবকাঠামো উন্নয়ন, জলবায়ু সহনশীল সেতু নির্মাণ সীমান্ত সড়ক উন্নয়ন, ঢাকা শহরের জরুরি পানি সরবরাহ প্রকল্প, বরিশাল-ভোলা-লক্ষ্মীপুর জাতীয় মহাসড়ক উন্নয়ন এবং রেলপথ পুনর্বাসন ও সম্প্রসারণ।

এই সভার মাধ্যমে স্পষ্ট হয় যে, সরকার শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক উন্নয়ন নয়, বরং আঞ্চলিক সংযোগ ও লজিস্টিক সক্ষমতা বৃদ্ধির দিকেও গুরুত্ব দিচ্ছে।

বিশেষ করে সড়ক ও রেল অবকাঠামো উন্নয়নকে ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পায়নের পূর্বশর্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নত হলে পণ্য পরিবহন ব্যয় কমবে, আঞ্চলিক বাণিজ্য বাড়বে এবং বিনিয়োগ পরিবেশও শক্তিশালী হবে।

এই সভায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ছিল তিনটি সড়ক প্রকল্পের মেয়াদ বারবার বৃদ্ধির কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত কমিটি গঠন। সংশ্লিষ্টদের মতে, এর মাধ্যমে সরকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে জবাবদিহিতা ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণের বার্তা দিতে চেয়েছে।

তৃতীয় একনেক: পদ্মা ব্যারেজে মেগা প্রকল্প যুগে প্রবেশ

১৩ মে অনুষ্ঠিত তৃতীয় একনেক সভাকে নতুন সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন বৈঠক হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই সভায় অনুমোদিত হয় নয়টি প্রকল্প। কিন্তু ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩৬ হাজার ৬৯৫ কোটি ৭২ লাখ টাকা।

এই বিপুল ব্যয়ের মূল কারণ ‘পদ্মা ব্যারেজ (প্রথম পর্যায়)’ প্রকল্প। একাই এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা। পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে। জুলাই ২০২৬ থেকে জুন ২০৩৩ পর্যন্ত সাত বছরে শতভাগ সরকারি অর্থায়নে এটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

পদ্মা ব্যারেজে বদলে যাবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল

নীতিনির্ধারকদের মতে, পদ্মা ব্যারেজ শুধু একটি পানি নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো নয়; এটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, পরিবেশ ও অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি পুনর্জাগরণের কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে। সরকারের বৃহৎ অবকাঠামো পরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রস্তাবিত এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের পানি ব্যবস্থাপনায় এক মৌলিক পরিবর্তন আসবে বলে মনে করা হচ্ছে।

নদী পুনরুজ্জীবন ও পানি প্রবাহ নিশ্চিতের পরিকল্পনা

প্রকল্প নথি অনুযায়ী, পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের মাধ্যমে গড়াই-মধুমতি, হিসনা-মাথাভাঙ্গা, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতীসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলোর শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ব্যারাজের মাধ্যমে পানি নিয়ন্ত্রণ ও সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমে এসব নদীতে প্রায় ৮০০ কিউসেক পানি সরবরাহ সম্ভব হবে। এতে নদী অববাহিকায় কৃষি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যে উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।

২৯ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা বৃদ্ধির লক্ষ্য

প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে যশোর, খুলনা, কুষ্টিয়া, মাগুরা, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, নড়াইল, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, পাবনা, রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও পিরোজপুরসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলের প্রায় ২৮ দশমিক ৮০ লাখ হেক্টর কৃষিজমিতে সেচ সুবিধা সম্প্রসারিত হবে।

সরকারি অনুমান অনুযায়ী, এতে বছরে প্রায় ২৪ লাখ টন অতিরিক্ত ধান এবং প্রায় আড়াই লাখ টন মাছ উৎপাদন বৃদ্ধি পেতে পারে, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।

কৃষি, মৎস্য ও পরিবেশে বহুমাত্রিক প্রভাব

পানিসম্পদ খাত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা গেলে কৃষি উৎপাদনের পাশাপাশি মৎস্যসম্পদ, জীববৈচিত্র্য ও নদীনির্ভর অর্থনীতিতেও ইতিবাচক পরিবর্তন ঘটবে। বিশেষ করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা হ্রাস, সুন্দরবন সংলগ্ন পরিবেশের সুরক্ষা এবং ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণে এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বিদ্যুৎ উৎপাদন ও নগরায়নের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা

প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপে ২০৩৩ সালের পর ব্যারাজ কেন্দ্রিক তিনটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে সাতটি স্যাটেলাইট শহর গড়ে তোলার বিষয়টিও সরকারের দীর্ঘমেয়াদি নগর উন্নয়ন কৌশলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সরকারি সূত্রে জানা গেছে, এই অবকাঠামোর মাধ্যমে আঞ্চলিক শিল্পায়ন ও নগরায়নের নতুন কেন্দ্র গড়ে উঠবে, যা স্থানীয় অর্থনীতিকে আরও গতিশীল করবে।

লবণাক্ততা হ্রাস ও পানি নিরাপত্তা

প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নদীগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততার বিস্তার কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। পাশাপাশি সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ এবং সেচ-নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটবে।

এছাড়া গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জিকে) সেচ প্রকল্প, উত্তর রাজশাহী সেচ প্রকল্প, গোদাগাড়ী পাম্প হাউস এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রেও পানিসরবরাহে সহায়তা মিলবে বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

২৪ জেলায় প্রায় ৭ কোটি মানুষের উপকারের সম্ভাবনা

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবায়িত হলে দেশের অন্তত ২৪টি জেলার পানিসংকট উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। এতে প্রায় সাত কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে উপকৃত হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

পানি সম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি বলেন, “এই প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষ কৃষি, পরিবেশ ও সুন্দরবন সংরক্ষণসহ বহুমাত্রিক সুবিধা পাবে। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সমাধান।”

তিনি আরও বলেন, ‘‘সরকার এই প্রকল্পকে ‘মাস্টারমাইন্ড উন্নয়ন উদ্যোগ’ হিসেবে বিবেচনা করছে, যা নির্বাচনি অঙ্গীকারের অংশ হিসেবেও বাস্তবায়িত হচ্ছে।’’

বছরে ৮ হাজার কোটি টাকার আর্থ-সামাজিক সুবিধার হিসাব

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প সম্পন্ন হলে বছরে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ আর্থ-সামাজিক সুবিধা সৃষ্টি হতে পারে। এর মধ্যে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, মৎস্যসম্পদ উন্নয়ন এবং পরিবেশগত সুফল অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

আগামী অর্থবছরেই কাজ শুরুর পরিকল্পনা

প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, আগামী অর্থবছর থেকেই পদ্মা ব্যারাজের প্রাথমিক কাজ শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি এই প্রকল্পকে দেশের পানি ব্যবস্থাপনা ও কৃষি অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।

ব্যারাজের প্রযুক্তিগত কাঠামো

পরিকল্পনা কমিশনের নথি অনুযায়ী, রাজবাড়ীর পাংশা এলাকায় পদ্মা নদীর ওপর প্রায় ২.১ কিলোমিটার দীর্ঘ ব্যারাজ নির্মাণ করা হবে। এতে থাকবে ৭৮টি স্পিলওয়ে গেট, ১৮টি আন্ডারস্লুইস, দুটি ফিশ পাস এবং একটি নেভিগেশন লক। এছাড়া গড়াই-মধুমতি নদীতে ১৩৫ কিলোমিটারের বেশি ড্রেজিং এবং হিসনা নদী ব্যবস্থায় ২৪৬ কিলোমিটারের বেশি পুনঃখনন করা হবে। প্রায় ১৮০ কিলোমিটার অ্যাফ্লাক্স বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে।

প্রকল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো জলবিদ্যুৎ উৎপাদন। মূল ব্যারাজ ও গড়াই অফটেক মিলিয়ে মোট ১১৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।

জাতীয় অর্থনীতিতে সম্ভাব্য অবদান

সরকারি বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে— প্রায় ২৮ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা বৃদ্ধি পাবে, সুন্দরবনে মিঠাপানির প্রবাহ নিশ্চিত হব, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা হ্রাস পাবে, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ বাড়বে, জলাবদ্ধতা কমবে এবং নৌপথের নাব্যতা উন্নত হবে।

এছাড়া প্রকল্পটি জাতীয় জিডিপিতে প্রায় ০.৪৫ শতাংশ পর্যন্ত অবদান রাখতে পারে এবং বছরে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক সুবিধা সৃষ্টি করতে সক্ষম হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ফারাক্কা ব্যারাজের প্রভাব মোকাবিলার কৌশল

পরিকল্পনা কমিশনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণের পর শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা-গঙ্গা অববাহিকায় পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে কৃষি, মৎস্য ও পরিবেশে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

এর ফলে খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদীর নাব্যতা সংকট এবং মিঠাপানির অভাব একটি বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।

সরকার মনে করছে, পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই দীর্ঘস্থায়ী পানি সংকটের একটি কাঠামোগত ও টেকসই সমাধান পাওয়া সম্ভব হবে।

সরকারের উন্নয়ন অগ্রাধিকার কী বলছে?

প্রথম তিনটি একনেক সভা বিশ্লেষণ করলে সরকারের উন্নয়ন মঅগ্রাধিকারের কয়েকটি প্রধান দিক স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

১. পানি ও জলবায়ু নিরাপত্তা

পদ্মা ব্যারেজ, জরুরি পানি সরবরাহ এবং জলবায়ু সহনশীল সেতু প্রকল্পগুলো দেখায় যে সরকার পানি ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু অভিযোজনকে কৌশলগত অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

২. স্বাস্থ্য অবকাঠামো সম্প্রসারণ

ডায়াগনস্টিক সুবিধা আধুনিকীকরণ, নগর স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ এবং নতুন চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান স্থাপনের মাধ্যমে স্বাস্থ্য খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।

৩. যোগাযোগ ও আঞ্চলিক সংযোগ

সড়ক, রেল ও সীমান্ত অবকাঠামোতে বড় বিনিয়োগ দেশের অভ্যন্তরীণ বাজার সম্প্রসারণ এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনার অংশ।

৪. ডিজিটাল অর্থনীতি ও প্রযুক্তি

আইটি ইনকিউবেশন, কাস্টমস আধুনিকায়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পগুলো ডিজিটাল অর্থনীতির দিকে সরকারের ঝোঁককে তুলে ধরছে।

অর্থনীতিবিদদের সতর্কতা

অর্থনীতিবিদদের মতে, বড় উন্নয়ন প্রকল্প অর্থনীতিতে কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও চাহিদা সৃষ্টি করতে সহায়ক হবে। নির্মাণ, পরিবহন, সিমেন্ট, ইস্পাত, বিদ্যুৎ ও সেবা খাতে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে তারা সতর্ক করে বলেছেন, বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, স্বচ্ছতা এবং সময়মতো কাজ শেষ করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।

অতীতে অনেক উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি, দীর্ঘসূত্রতা এবং বাস্তবায়ন জটিলতার অভিযোগ ছিল। ফলে নতুন সরকারের জন্য প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।

বিশেষ করে পদ্মা ব্যারেজের মতো বড় প্রকল্পে পরিবেশগত প্রভাব, আন্তঃদেশীয় নদী ব্যবস্থাপনা, পুনর্বাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় নিয়েও ইতোমধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে।

সামনে আরও বড় প্রকল্প

একনেক সূত্রগুলো বলছে, আগামী মাসগুলোতে আরও কয়েকটি বড় অবকাঠামো, জ্বালানি ও পানি ব্যবস্থাপনা প্রকল্প অনুমোদনের প্রস্তুতি চলছে। সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে— উন্নয়ন ব্যয় বাড়িয়ে অর্থনীতিকে আবার উচ্চ প্রবৃদ্ধির ধারায় ফিরিয়ে আনা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।

প্রথম ১০০ দিনের এই ২৮ প্রকল্পকে তাই শুধু প্রশাসনিক অনুমোদন হিসেবে নয়, বরং আগামী কয়েক বছরের উন্নয়ন দর্শনের ভিত্তিপ্রস্তর হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, বাস্তবায়ন সঠিকভাবে হলে অবকাঠামো, কৃষি, পানি ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবা এবং যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আসতে পারে— যার সরাসরি সুফল পাবে দেশের সাধারণ মানুষ।

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ