নানা ‘কৌশলে’ উপজেলা নির্বাচনে সম্পৃক্ত বিএনপি নেতারা - জনতার আওয়াজ
  • আজ সকাল ৬:৫৭, শুক্রবার, ১৫ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১লা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৮শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

নানা ‘কৌশলে’ উপজেলা নির্বাচনে সম্পৃক্ত বিএনপি নেতারা

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: বৃহস্পতিবার, মে ২৩, ২০২৪ ১২:৪৬ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: বৃহস্পতিবার, মে ২৩, ২০২৪ ১২:৪৬ অপরাহ্ণ

 

নির্দেশনা মানছেন না তৃণমূল নেতাকর্মীর একাংশ, কেন্দ্রে অসংখ্য অভিযোগ

জনতার আওয়াজ ডেস্ক

নির্বাচন নিয়ে কেন্দ্রের নির্দেশনা মানছেন না বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীর একাংশ। নানা ‘কৌশলে’ ভোটের সঙ্গে সম্পৃক্ত হচ্ছেন তারা। কেউ লোভ-টোপে, কেউ চাপে পড়ে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে নির্বাচনে সম্পৃক্ত থাকছেন। কেউ সরাসরি ভোটে দাঁড়িয়েছেন, কেউ প্রচারে থাকছেন। অনেকে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর নির্বাচনী দায়িত্বেও আছেন। কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পরও জেলা-উপজেলা নেতাদের নির্বাচনী কার্যক্রম থেকে দূরে রাখতে পারছে না দলটি। প্রতিদিনই এ রকম হাজারো অভিযোগ জমা পড়ছে বিএনপির কেন্দ্রীয় দপ্তরে। সেসব অভিযোগ যাচাই-বাছাই শেষে নেতাকর্মীকে সতর্ক করা হচ্ছে, বহিষ্কারও করা হচ্ছে।

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের পর ষষ্ঠ উপজেলা পরিষদের নির্বাচনও দলীয়ভাবে বর্জন করছে বিএনপি। দলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এই সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে তারা কোনো নির্বাচনে যাবে না। সেই অনুযায়ী, দলের নেতাকর্মীকে নির্বাচন থেকে দূরে থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, সাধারণ মানুষকেও এ নির্বাচন থেকে দূরে রাখতে ভোট বর্জনের নানা কর্মসূচি পালন করছে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো। এর মধ্যে তারা এই সরকারের অধীনে ভোটাধিকার হরণের নানা দিক উল্লেখ করে লিফলেট ছেপে বিতরণের কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছে। লিফলেটে জনগণকে ‘একতরফা ও পাতানো নির্বাচন’ বর্জনের আহ্বান জানানো হয়েছে। অন্যদিকে, নেতাকর্মীকে এ নির্বাচন থেকে দূরে রাখতে কর্মিসভা কর্মসূচিও চলছে।

অবশ্য এসব কর্মসূচির প্রতিফলন অনেক ক্ষেত্রেই হচ্ছে না। উপজেলা নির্বাচনের প্রথম ধাপের তুলনায় দ্বিতীয় ধাপে ভোটের হার বেশি। প্রথম ধাপের ভোটের হার ৩৬.১ শতাংশ। দ্বিতীয় ধাপে ৩৭.৫৬ শতাংশ। দলের নেতাকর্মীকে ভোট কার্যক্রম থেকে নিবৃত করতে না পারলে আগামীতে ভোটের হার আরও বেশি হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট নেতারা।

যদিও বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচন হওয়ায় বেশির ভাগ স্থানে মামলা-হামলার চাপে পড়ে নির্বাচন কার্যক্রমে সম্পৃক্ত হতে বাধ্য হচ্ছেন নেতাকর্মীরা। এর পরও দলের সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

গত ৮ মে থেকে উপজেলা পরিষদ নির্বাচন শুরু হয়। সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত ২১৭ জনকে বহিষ্কার করা হয়েছে। নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার পাশাপাশি ভোটে কেউ সহযোগিতা করলেও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে বিএনপি। এর পরও মাঠ থেকে সরানো যাচ্ছে না তৃণমূল নেতাদের। প্রথম ধাপের ভোটে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করার অভিযোগে কেন্দ্রীয় সাত নেতার বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। স্থানীয় অনেক নেতার বিরুদ্ধে কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেওয়ার অভিযোগের তদন্তও শুরু করেছে দল। অনেকের বিরুদ্ধে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর কাছ থেকে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। আওয়ামী লীগ প্রার্থীর পক্ষে বিএনপি নেতাদের ভোট চাওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ছে।

দ্বিতীয় ধাপে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে কুমিল্লার বরুড়া উপজেলা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। এ উপজেলায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর শ্যালক হামিদ লতিফ ভূঁইয়া বিজয়ী হয়েছেন। তাঁর নির্বাচনকে কেন্দ্র করে উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের বিএনপি নেতাকর্মীরা প্রকাশ্যে কাজ করেছেন। এর মধ্যে একটি ওয়ার্ডে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের কোন নেতাকে কত টাকা দেওয়া হয়েছে, তার একটি তালিকা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। স্থানীয় নেতাকর্মীর লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, বিএনপির কর্মসংস্থানবিষয়ক সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য জাকারিয়া তাহের সুমনের ইশারায় স্থানীয় নেতাকর্মীরা মাঠে নামতে বাধ্য হয়েছেন।

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতার পক্ষে ভোট চেয়েছেন বিএনপির এক নেতা। উপজেলার জগন্নাথপুর ইউনিয়নের রসুলপুর এলাকায় বিএনপির নেতা মোস্তাফিজুর রহমান ওরফে লিটন। তিনি ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পবিষয়ক সম্পাদক।

গাজীপুরের কালিয়াকৈর উপজেলায় বিএনপির কিছু নেতা প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগ নেতার পক্ষে গণসংযোগ করে ভোট চান। ফুলবাড়িয়া ইউনিয়নে নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দেন জেলা বিএনপির সহসভাপতি মোখলেছ মাস্টার ও আইনবিষয়ক সম্পাদক জাকিরুল ইসলাম। তারা দু’জনই চেয়ারম্যান প্রার্থী যুবলীগ নেতা সেলিম আজাদের পক্ষে ভোট চান।

কেন্দ্রীয় বিএনপির কয়েকজন নেতা সমকালকে জানান, বেশ কয়েকটি উপজেলায় কমিটির নেতাদের কারণে তৃণমূল নেতাকর্মীরা বিভক্ত হয়ে নির্বাচনে সম্পৃক্ত হয়েছেন। কমিটির লোকজন চাপ ও লোভে আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়ায় তৃণমূল নেতাকর্মী দল থেকে বহিষ্কৃতদের পক্ষে অবস্থান নেন। এতে দলের বৃহৎ একটি অংশই নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত হচ্ছে। বিগত দিনে বিভিন্ন পকেট কমিটি গঠন করায় তারা মামলা-হামলার চাপে, আবার অনেকে প্রলোভনে স্থানীয় আওয়ামী লীগ প্রার্থীকে সমর্থন দিচ্ছেন। আর এর বিপরীতে ক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা দল থেকে বহিষ্কৃতদের পক্ষে অবস্থান নিতে বাধ্য হচ্ছেন। এর মধ্যে নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলা বিএনপি নেতারা ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী আসলামের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মী দল থেকে বহিষ্কৃত প্রার্থী জাহাঙ্গীর হোসেন মানিকের পক্ষে প্রকাশ্যে মাঠে নামেন। ফলস্বরূপ মানিক বিজয়ী হন।

বিএনপির সূত্র জানিয়েছে, উপজেলা নির্বাচনে প্রথম ধাপের মতো দ্বিতীয় ধাপের ফল নিয়েও বিএনপির হাইকমান্ড পর্যালোচনা শুরু করেছেন। কোন কোন এলাকায় ভোটের হার বেশি, সেসব এলাকায় দলের নেতাকর্মীর অবস্থান কী ছিল– তা নিয়ে তারা চুলচেরা বিশ্লেষণ করছেন। এর মধ্যে বেশ কিছু জেলা ও উপজেলার স্থানীয় নেতাদের বিষয়ে গুরুতর অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের সঙ্গে আঁতাত করে, অর্থনৈতিক সুবিধা নিয়ে ভোট বিক্রিতে জড়িত ছিলেন। যার ফলশ্রুতিতে দলের ভোট বর্জনের আহ্বান ও কর্মসূচিকে তারা গুরুত্ব না দিয়ে অনেক ক্ষেত্রে দায়সারা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে ভোটের মাঠ ছেড়ে দিয়েছেন।

দলটির নেতাকর্মীর অভিযোগ, স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে অনেক স্থানে কেন্দ্রীয় নেতাদের নিষ্ক্রিয়তায় ভোটের হার অস্বাভাবিক হয়েছে। অনেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের কাছে সুবিধা নিয়ে দলের নেতাকর্মীকে নির্বাচন কার্যক্রমে সম্পৃক্ত থাকতে ইন্ধন দিয়েছেন। ভোটদানে বিরত রাখতে তারা কোনো ভূমিকা পালন করেননি। যার কারণে দেশের বিভিন্ন উপজেলায় ভোটের হার অনেক বেশি ছিল। এমনকি গড় ভোটেরও অনেক বেশি ভোট পড়েছে ওইসব অঞ্চলে। এরই মধ্যে সেসব অঞ্চলে বিএনপির সাংগঠনিক দায়িত্বশীলদের ভূমিকা নিয়ে দলের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে ৫৬.০৬; দিনাজপুরের কাহারোলে ৬২.২৪; বোচাগঞ্জে ৬৫.৮৭; চাঁপাইনবাবগঞ্জের সাপাহারে ৫৬.৫৭; নওগার পোরশায় ৬৪.৪৩; ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডুতে ৫১.৩১; মাগুরার মহম্মদপুরে ৫৩.২৮; কিশোরগঞ্জের নিকলীতে ৫৫.৮৩; মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ে ৫৬.৭১ শতাংশ ভোট পড়েছে। এ রকম আরও অনেক উপজেলায় গড় ভোটের চেয়ে দ্বিগুণের বেশি ভোট পড়েছে।

বিএনপির নেতাকর্মীরা জানান, ভোট বর্জনের আন্দোলনে তেমন কোনো প্রভাব পড়ছে না তৃণমূলে। দলের সিনিয়র নেতারা ঢাকায় বসে ভোট বর্জনের লিফলেট বিতরণ করলেও তাঁর নিজ এলাকায় কর্মসূচি বাস্তবায়নে এগিয়ে আসেন না। নেতাকর্মীর খোঁজ রাখেন না। অনেক সাংগঠনিক সম্পাদক এলাকায় না গিয়ে ঢাকায় বসে শুধু বহিষ্কারের তালিকা নিয়েই ব্যস্ত সময় পার করছেন। ভোট বর্জনে মাঠ পর্যায়ে তাদের কোনো ভূমিকা নেই বলে ভোট বয়কট আন্দোলন তেমন সাড়া জাগাচ্ছে না।

যদিও এসব বিষয় মানতে নারাজ ঢাকা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবদুস সালাম। তিনি জানান, যেখানে ভোটের অধিকারই নেই, সেখানে ভোটের হার নিয়ে জনগণের কোনো মাথাব্যথা নেই। এত ভোট কোথাও পড়েনি। ভোটের হার লেখার কলমটা কার হাতে, সেটা আগে চিন্তা করতে হবে।
সূত্রঃ সমকাল

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ