অন্তর্বর্তী সরকার বিশ্বব্যাপী কতটুকু সমর্থন পেল - জনতার আওয়াজ
  • আজ রাত ৪:৪৯, শুক্রবার, ১৫ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১লা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৮শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

অন্তর্বর্তী সরকার বিশ্বব্যাপী কতটুকু সমর্থন পেল

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: শুক্রবার, ফেব্রুয়ারি ৭, ২০২৫ ৬:০৮ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: শুক্রবার, ফেব্রুয়ারি ৭, ২০২৫ ৬:০৮ অপরাহ্ণ

 

জনতার আওয়াজ ডেস্ক
গণআন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনার পতনের পর অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন হয়। অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর থেকেই বিশ্বব্যাপী বিপুল সমর্থন পেয়ে আসছে ইউনূস প্রশাসন। বিভিন্ন দেশের সাথে জোরদার হয়েছে কূটনৈতিক সম্পর্ক। অন্তর্বর্তী সরকারের এসব অর্জন নিয়ে বাসসের সাথে কথা বলেছেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো: তৌহিদ হোসেন।

উপদেষ্টা বলেন, গত ছয় মাসে বাংলাদেশ বিদেশী দেশগুলোর কাছে এই বিশ্বাস অর্জন করেছে যে- অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে বাংলাদেশ সঠিক পথেই আছে।

তিনি বাসসকে বলেন, ‘আমাদের বিদেশী বন্ধুদের মধ্যে সন্দেহ ছিল। তারা ভাবছিল এখানে কী ঘটছে ও এরপর কী ঘটবে? আমি বিশ্বাস করি যে- আমরা তাদের আশ্বস্ত করতে পেরেছি যে- বাংলাদেশ সঠিক পথেই এগোচ্ছে।’

হোসেন আরো বলেন, গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে এত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর কিছু ‘বাধা’ অনিবার্য ও ব্যাপকভাবে সম্ভাব্য ছিল।

গত ছয় মাসে বৈদেশিক সম্পর্ক সম্পর্কিত সরকারের অর্জন সম্পর্কে মন্তব্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা সেই চ্যালেঞ্জগুলো কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়েছি ও বিশ্বব্যাপী বিপুল সমর্থন পেয়েছি।’

তিনি বলেন, অর্থনীতি হোক বা রাজনীতি, দেশ সঠিক পথে এগিয়ে চলেছে এবং ‘আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এ বিষয়ে সফলভাবে বুঝাতে পেরেছি।’

উপদেষ্টা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ইউনূস গত ছয় মাসে বেশ কয়েকটি হাই-প্রোফাইল আন্তর্জাতিক সমাবেশে যোগ দিয়েছেন এবং যথাযথ সম্মান অর্জন করেছেন।

তৌহিদ হোসেন বলেন, ‘আমাদের কূটনৈতিক কর্মকাণ্ডে আমরা ড. ইউনূসের বিশ্বব্যাপী ভাবমর্যাদাকে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগাতে সক্ষম হয়েছি।’

তিনি আরো বলেন, বাণিজ্য এবং ব্যবসায়িক ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি এগিয়ে চলেছে, যদিও অনেকেই আশঙ্কা করছেন যে- বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের রফতানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তবে ‘আমাদের রফতানি স্থিতিশীল রয়েছে।’

পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশ রেমিট্যান্সের সমস্যায় ভুগছে। কিন্তু সমস্যাগুলোও সমাধান করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘প্রতিটি দেশের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখাই অন্তর্বর্তী সরকারের লক্ষ্য এবং আমরা বিশ্বাস করি, আমরা তা সফলভাবেই করেছি।’

বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্ক
তৌহিদ হোসেন বলেন, পাকিস্তানের সাথে বৈরিতার সম্পর্ক’ বজায় রাখার কোনো কারণ নেই।

পররাষ্ট্র উপদেষ্টা আরো বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক টানাপোড়েনমুক্ত রাখার জন্য ইচ্ছাকৃত প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিল। কিন্তু আমরা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে স্বাভাবিকতা আনার জন্য কাজ করেছি। পাকিস্তান সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগ নিয়েছে এবং আমরা এটিকে স্বাগত জানিয়েছি।’

তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের বিবেচনা অনুসারে দক্ষিণ এশীয় দুটি দেশ বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে এবং এই দৃষ্টিভঙ্গির ফলে দুই দেশের মধ্যে সমুদ্র যোগাযোগ পুনরায় চালু করা উভয়ের জন্যই লাভজনক।

উপদেষ্টা আরো বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫৩ বছর পরও দুই দেশের মধ্যে কিছু সমস্যা অমীমাংসিত রয়ে গেছে। তবে ‘যদি আমরা এই বিষয়গুলিতে স্থির থাকি, তাহলে কোনো পক্ষই লাভবান হবে না।’

তিনি বলেন, ‘আমরা অবশ্যই আমাদের স্বার্থ রক্ষা ও পুনরুদ্ধার করার চেষ্টা করব। তবে একই সাথে আমরা পাকিস্তানের সাথে আমাদের সম্পর্ককে অন্য যেকোনো দেশের মতোই দেখতে চাই।’

তৌহিদ হোসেন বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার ইসলামাবাদের সাথে তার সম্পর্ককে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখতে চায় না, বরং নতুন করে যোগাযোগের মাধ্যমে সর্বাধিক সুবিধা নিশ্চিত করার চেষ্টা করবে।

তিনি আরো বলেন, এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ এক দশক পর পাকিস্তানের বেসরকারি বিমান সংস্থা জিন্নাহ এয়ারকে করাচি-ঢাকা সরাসরি ফ্লাইট পুনরায় চালু করার অনুমতি দিয়েছে।

উপদেষ্টা বলেন, পাকিস্তানের উপ-প্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার এপ্রিল মাসে ঢাকা সফর করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক
তৌহিদ হোসেন স্বীকার করেছেন যে- সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কে অস্বস্তি বিরাজ করছে এবং ‘এটি অস্বীকার করায় কোনো লাভ নেই।’

রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে পদত্যাগের পর ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানের ফলে উদ্ভূত জটিলতাগুলোকেও তিনি স্বীকার করেছেন।

তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কে অস্বস্তির অনুভূতি তৈরি হয়েছে। আমাদের পক্ষ থেকে আমরা নয়াদিল্লির সাথে এই অস্বস্তি দূর করার চেষ্টা করেছি।

তবে উপদেষ্টা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্দেশ্য ছিল ভারতের সাথে এমন একটি সম্পর্ক স্থাপন করা, যা পারস্পরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে পারে এবং উভয় দেশের স্বার্থ সুরক্ষিত করতে পারে এবং ‘সেই প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকে।’

হোসেন বলেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে অধ্যাপক ইউনূসের টেলিফোনে কথোপকথন এবং জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের ফাঁকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সাথে সাক্ষাতসহ দ্বিপক্ষীয় আলাপচারিতা উন্নত সম্পর্কের ক্ষেত্র তৈরি করেছে।

তিনি বলেন, ‘কিছু বাধা আসতে পারে, এটা স্বাভাবিক। উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এলে বাধা আসে। আমরা উভয় পক্ষের সুবিধার জন্য এই বাধাগুলো কাটিয়ে একটি ভালো কার্যকরী সম্পর্ক তৈরি করার লক্ষ্য রাখি।’

বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক
তৌহিদ হোসেন বলেন, সাম্প্রতিক পররাষ্ট্র উপদেষ্টার বেইজিং সফরে দ্বিপক্ষীয় বিষয়, উন্নয়ন প্রকল্প ও বাণিজ্য নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। ঢাকা চীনকে তার নীতিগত অবস্থান সম্পর্কে আশ্বস্ত করতে সক্ষম হয়েছে।

তিনি বলেন, বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে তাদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে এবং আমরা আশাবাদী যে সম্পর্ক সঠিক পথে এগুবে ও অগ্রগতি অব্যাহত থাকবে।

উপদেষ্টা বলেন, পূর্ববর্তী সমস্ত সরকার চীনের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছে এবং ‘এটি অব্যাহত রাখা আমাদের লক্ষ্য’।

তিনি বলেন, পশ্চিমা দেশগুলোর সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক বেইজিংয়ের সাথে তার সম্পর্কের উপর কোনো প্রভাব ফেলবে না।

চীন দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা জোরদার করার এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতি বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে।

পররাষ্ট্র উপদেষ্টা আরো বলেন, চীন ঢাকার নিকটতম কুনমিংয়ে দুটি থেকে তিনটি হাসপাতাল আমাদের জন্য মনোনীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কারণ বাংলাদেশী রোগীরা ভারতের চিকিৎসা ভিসা পেতে অসুবিধার সম্মুখীন হচ্ছেন।

তিনি বলেন, ‘ভারতের সাথে ভিসা সমস্যা অব্যাহত থাকায়, আমরা চিকিৎসার জন্য একটি বিকল্প গন্তব্য খুঁজছিলাম। আমরা বিশ্বাস করি যে- ভারতীয় ভিসার সমস্যা বিবেচনা করে এটি একটি কার্যকর বিকল্প হবে।’

তৌহিদ হোসেন তার চীনা প্রতিপক্ষ ওয়াং ইয়ের আমন্ত্রণে ২০-২৪ জানুয়ারি বেইজিং সফর করেন। এই সময় তিনি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন ও চীনা ব্যবসায়ী নেতাদের সাথে যোগাযোগের জন্য সাংহাই সফর করেন।

তিনি বলেন, ‘আমরা উন্নয়ন প্রকল্প ও বাণিজ্যসহ আমাদের সকল দ্বিপক্ষীয় বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছি। আমি বেইজিংকে ঋণের সুদের হার কমাতে এবং ঋণ পরিশোধের সময়কাল ২০ বছর থেকে ৩০ বছর বাড়ানোর অনুরোধ করেছি।’

উপদেষ্টা বলেন, চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ‘ঋণ পরিশোধের সময়কাল বাড়ানোর বিষয়ে আমাকে আশ্বস্ত করেছেন এবং সুদের হার কমানোর অনুরোধটি খতিয়ে দেখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।’

বাংলাদেশ-মার্কিন সম্পর্ক
হোসেন বলেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণের গ্রহণের পর বাংলাদেশ-মার্কিন সম্পর্কের ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে বলে ঢাকা মনে করে না।

আমাদের অনুমান করার কিছু নেই উল্লেখ করে তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, ওয়াশিংটনের সাথে সম্পর্ক স্থিতিশীল থাকবে।

ট্রাম্পের সাহায্য হ্রাসের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে বলতে গিয়ে উপদেষ্টা এটিকে ‘প্রত্যাশিত’ বলে বর্ণনা করেছেন এবং সকলকে মনে করিয়ে দিয়েছেন, ইউএসএইড-এর অস্থায়ী সাহায্য স্থগিতাদেশ কোনো নির্দিষ্ট দেশকে লক্ষ্য করে নয়।

তিনি বলেন, ‘নতুন মার্কিন প্রশাসন এমন নীতি চালু করেছে, যা তার পূর্বসূরীর থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে ভিন্ন। আমাদের চূড়ান্ত ফলাফল দেখতে হবে এবং সেই অনুযায়ী মানিয়ে নিতে হবে।’

উপদেষ্টা আরো বলেন, ‘যখন নতুন চ্যালেঞ্জ দেখা দেয়, তখন আমাদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য কৌশলগতভাবে কাজ করতে হয়।’

ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশকে ভারত, চীন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। কারণ তিনটি দেশই আমাদের জন্য কৌশলগত গুরুত্ব বহন করে।

তিনি ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা সত্ত্বেও ভারত ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্ক, সেইসাথে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা তুলে ধরেন, যাতে তিনটি দেশের সাথেই বাংলাদেশের সুসম্পর্ক বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দেয়া যায়।

তিনি বলেন, ‘ভারত, চীন ও আমেরিকার সাথে আমাদের সম্পর্ক খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমরা অবশ্যই আমাদের নিজস্ব স্বার্থ রক্ষা করে এই তিনটি দেশের সাথে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখব।’
সূত্র : বাসস

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ