হাফিজুর রহমান হাফিজ স্মরণে৯৮ সালের ১৫ এপ্রিল পার্বত্য কালো চুক্তিবাতিলের দাবিতে হরতাল প্রসঙ্গে - জনতার আওয়াজ
  • আজ ভোর ৫:০৭, বৃহস্পতিবার, ১৪ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩১শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৭শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

হাফিজুর রহমান হাফিজ স্মরণে৯৮ সালের ১৫ এপ্রিল পার্বত্য কালো চুক্তিবাতিলের দাবিতে হরতাল প্রসঙ্গে

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: বুধবার, এপ্রিল ১৬, ২০২৫ ৪:৪৩ পূর্বাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: মঙ্গলবার, এপ্রিল ২২, ২০২৫ ৩:০৩ পূর্বাহ্ণ

 


সায়েক এম রহমান

আজ থেকে প্রায় ২৭বৎসর আগে পার্বত্য কালো চুক্তি আইন করে, আওয়ামীলীগ সরকার সারা
দেশে অশান্তির যেই আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল, তা করো জন্যই শুভ ছিল না। দেশের স্বাধীনতা
ও সার্বভৌমত্বের জন্যে তো মোটেও নয়।
তাই পার্বত্য চুক্তি বাতিলের দাবিতে ৯৮ সালের ১৫ এপ্রিল সারা দেশে বিএনপির ডাকে হরতাল
পালিত হয়েছিল। সেই হরতাল যখন শান্তিপূর্ণ ভাবে সারা দেশে চলছিল, তখন আওয়ামীলীগ
সরকারের চিহ্নিত সন্ত্রাসীরা হরতালকারীদের উপর হামলা চালিয়ে নির্মম ভাবে ৩ জনকে হত্যা
করেছিল।
যার একজন হলেন বৃহত্তর সিলেটের সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার সাবেক ছাত্রদল
নেতা ও থানা যুবদলের সহ-সভাপতি হাফিজুর রহমান হাফিজ। আজ তাহার কথা গভীরভাবে
স্মরণ করছি- তাকে আমি ব্যাক্তিগত ভাবে জানতাম কারন আমরা একই এলাকার।
হাফিজ ছিলেন খুবই ভদ্র বিনয়ী এবং শান্তি প্রিয় যুবদল নেতা। তিনি জগন্নাথপুর পৌরসভার
হবিবপুর গ্রামের এক সম্ভান্ত্র মুসলিম পরিবারের সন্তান। আজ ১৫ এপ্রিল ২০২৫ সাল। হাফিজুর
রহমানদের ২৭তম মৃত বার্ষিকীতে আল্লার দরবারে তাঁহার এবং তাদের রুহের মাগফেরাত কামনা করি।
পাঠক উল্লেখ্য ৯৮ সালে আমার আব্বা-আম্মা হজ্ব করতে যাবেন
মক্কায়। তাই তাঁদেরকে হজ্বে বিদায় দেয়ার জন্য আমি ঐ বৎসর মার্চের প্রথম দিকে যুক্তরাজ্য
থেকে দেশে গিয়েছিলাম। যার জন্য ১৫ এপ্রিলের কালো চুক্তি বাতিলের দাবীতে হরতাল দেখার
শুভাগ্য আমার হয়েছিল। সারা দেশের ন্যায় জগন্নাথপুরেও শান্তিপূর্ণ হরতাল চলছিল। হরতালকারীরা
পিকেটিং করছিল জগন্নাথপুরের হবিবপুর মাদ্রাসা পয়েন্টের সামনে। হটাৎ করে একটি
মাইক্রোবাস যুগে কিছু সন্ত্রাসী এসে পিস্তল, বন্দুক ড্যাগার ইত্যাদি নিয়ে হরতাল কারীদের

অতর্কিত ধাওয়া করলে, তারা ছত্র ভঙ্গ হয়ে যায় এবং এক পর্যায়ে যুবদল নেতা হাফিজকে ধরে ফেলে।
প্রথমে তাকে ছুরি দিয়ে বুকে সজোরে আঘাত করে, পড়ে পিস্তল দিয়ে গুলি করে চলে যায়।
ঘটনা¯’স্তলেই হাফিজ মৃত বরন করেন। এই হত্যা কান্ডের পর নিহত হাফিজের বড় ভাই মোঃ
হারুনুজ্জামান বাদী হয়ে থানা আওয়ামীলীগ নেতা সিদ্দিক মিয়া সহ ১৭ জনের নামে সুর্নিদিষ্ট
হত্যা মামলা জগন্নাথপুর থানায় দায়ের করেন যার নম্বর ০৫/৩৭ তারিখ ১৫/০৮/১৯৯৮।
পাঠক উল্লেখ্য সিদ্দিক মিয়া ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদের আশীর্বাদ পুষ্ট থানা
আওয়ামীলীগ নেতা। ১২ মার্চ ৯৮ সালে জগন্নাথপুর থানা আওয়ামীলীগের সিদ্দিক গ্রুপের সভায়
আব্দুস সামাদ আজাদ বললেন ” জগন্নাথপুরে আমার প্রতিনিধি সিদ্দিক মিয়া। আপনাদের
সমস্যার কথা সিদ্দিক মিয়াকে বলবেন, সিদ্দিক মিয়া যেই সমাধান দিবেন সেটাই আমার
সমাধান। সিদ্দিক মিয়ার কাজ মানি আমার কাজ।”
পাঠক লক্ষণীয় ব্যাপার হল ” হাফিজ হত্যাকান্ডের পর আসামীদের গ্রেপ্তার না করে ¯
প্রশাসন মামলার সাক্ষী ও আন্দোলনরত নেতাকর্মীদের বিরোদ্ধে মিথ্যা ও ষড়যন্ত্র মূলক মামলা
দায়ের করে অযথা হয়রানি শুরু করল উপরের ইশারায়। মামলাগুলুর মধ্যে অন্যতম মামলা ছিল
আওয়ামীলীগ অফিস ভাংচুর, থানা টি অ্যান্ড টি অফিস তছনছ ও জাতিয় পতাকা পুড়ানো।
পাঠক মজার ব্যাপার ছিল থানা আওয়ামীলীগ সভাপতি জনাব হারুনুর রশিদ (হিরন মিয়া) বৈধ
কমিটি খ্যাত ১৭ এপ্রিল ৯৮ সাল পত্রপত্রিকায় বক্তব্য দেন ” তাদের আওয়ামীলীগ অফিস ভাংচুর
হয় নাই বলে।” তাতেই প্রমান ছিল এটি একটি ষড়যন্ত্র মূলক মামলা।
এদিকে যখন হাফিজ হত্যা কান্ডের বিচার ও খুনিদের দৃষ্টান্ত মূলক শাস্তি দাবি করে, সুনামগঞ্জ ও
জগন্নাথপুরে অনেকগুলি নিয়ম তান্ত্রিক কর্মসূচী পালন করে যাচ্ছিল বিএনপি, যুবদল ও
ছাত্রদল। তখন থেকে আন্দোলন কারীরা আর বাড়িতে থাকতে পারে নাই, সরকারের বিভিন্ন
বাহিনীর যন্ত্রণায়। প্রতি রাতেই আন্দোলন কারীদের বাড়িতে পুলিশ হানা দিত, এমনকি আত্নীয়
স্বজনদের বাড়িতেও হানা দিত। শুধু হানা দিয়েই শেষ নয় দরজা জানালা গ্রিল ভেঙ্গে আসত
ডাকাতের মত করে এবং বাড়িতে থাকা লোকজনদেরও বিভিন্ন প্রকার হয়রানির শিকার হতে
হত।

ঐ সময়ে ঐ আন্দোলনের যারা অগ্রণী ভূমিকায় ছিলেন এবং বিভিন্ন ভাবে হয়রানির শিকার হয়ে ছিলেন তাদের নাম লিখতেই হয়,,,
তারা হলেন,,,, মির্জা সিরাজ মিয়া, আবুহুরার সাদ মিয়া মাস্টার, এডভোকেট মঈনউদ্দীন সোহেল, আক্তারুজ্জামান আক্তার,
হাজি আবুল হুসাইন, মির্জা জুয়েল, আস্কির মিয়া, এম এ মতিন, অ্যাডভোকেট শাহিন, মির্জা স্বপন মিয়া,
মোঃ কয়ছর আহমেদ, মিসবাউজ্জামান সুহেল, সুজাতুর রেজা, ডালিম মিয়া, জামাল মিয়া,
মির্জা নিক্সন, আবুল হোসেন, কবির আহমেদ ও আরও অনেকে যাদের নাম এই মুহূর্তে স্মরণ
হচ্ছে না।
পাঠক,,, মজার ব্যাপার হল উপরের ইশারায় ¯ প্রশাসন যে মামলা গুলি করেছিল, সেই
মামলায় আমাকেও আসামি দেওয়া হয়েছিল। আমি কিন্তু কোন দলের সদস্য পর্যন্ত নাই, ঠিক আমার
মত আরও দুই জনকে আসামি করা হয়েছিল, তাদেরও কোন দলের সদস্য পদ বা দলের সাথে
কোন সম্পর্ক নাই। এখন প্রশ্ন হলো, আমাদের অপরাধ কি ছিল? হ্যাঁ আমার অপরাধ ছিল আমার ছোট দুই
ভাই থানা ছাত্রদলের অগ্রনী ভূমিকায় ছিল। একজন জগন্নাথপুর থানা ছাত্রদলের সাধারন সাধারণ সম্পাদক
কয়সর আহম্মদ, আরেকজন জগন্নাথপুর কলেজ শাখা ছাত্রদলের সাধারন সম্পাদক কবির আহম্মদ।
দ্বিতীয় জন ছিলেন ব্যাংকার মির্জা চুনু মিয়া, তাহার অপরাধ ছিল – তাহার ভাতিজা মির্জা স্বপন
ছিলেন জগন্নাথপুর থানা ছাত্রদলের সভাপতি আর তৃতীয় জন ছিলেন ব্যাবসায়ী হাজি সিদ্দিক
আলী। তাহার অপরাধ ছিল তাহার সন্তান মেসবাউজ্জামান সোহেল ছিলেন সিলেট সরকারি
কলেজের ছাত্রদল সভাপতি এবং সিলেট শহর ছাত্রদলের সাংগঠনিক স¤পাদক। উল্লেখ্য সোহেল
জগন্নাথপুরের সন্তান হওয়ায় ঐ আন্দোলনের সাথে জড়িত ছিলেন। পাঠক, এপ্রিলের শেষের
দিকে পত্রিকায় খবর ছাপা হল “পররাষ্ট্র মন্ত্রী আব্দুস সামাদ আজাদ তাহার নির্বাচনী এলাকা এবং
জন্মস্হান জগন্নাথপুর আসছেন। এই খবর শোনার পর সুনামগঞ্জ জগন্নাথপুর বিএনপি, যুবদল,
ছাত্রদল বিবৃতি দিয়ে বলল, হাফিজ হত্যাকান্ডের আসামীদেরকে গ্রেপ্তার না করা পর্যন্ত এবং সুষ্ঠ
বিচার না হওয়া পর্যন্ত মন্ত্রীর আগমন রুখে দেওয়ার, ফলে ¯’মাননীয় প্রশাসন মন্ত্রীকে আসার গ্রিন
সিগন্যাল দিতে ব্যর্থ হয়। তাই মন্ত্রী কোন পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই হটাৎ হেলিকপ্টার যোগে ১০ মে
জগন্নাথপুর চলে আসেন। মন্ত্রী এসে বললেন ” বিএনপি অভ্যান্তরীন কোন্দলের জন্য এই হত্যা
কান্ড হয়েছে। সে দিন এলাকাবাসী ক্ষুব্দ হয়েছিল। তিনি হাফিজুর রহমানের কবর জিয়ারত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এলাকাবাসি তা করতে দেয়নি।

মন্ত্রী এলাকার সন্তান হওয়ার পরও জনসাধারন তাকে রুখে দিয়েছিল এবং ঐদিন সাথে সাথে সমগ্র
জগন্নাথপুরে কালো পতাকা উত্তোলিত হয়েছিল। সেদিন কালো পতাকা সরানোর জন্য
থানার ওসি বেলায়েত হোসেন চৌধুরী সাড়াশি অভিযান চালান। এক পর্যায়ে জগন্নাথপুর
বিএনপি কার্যালয়ে গিয়ে কালো পতাকা ও দলীয় পতাকা ছিড়ে ফেলেন এবং জাতীয় পতাকা
পদ দলিত করেন। এই ঘটনার পর জগন্নাথপুরের আন্দোলন খুবই গরম হতে থাকে। তখন বুঝতেই পারছেন আন্দোলন কোথায় দাড়িয়ে ছিল। এদিকে বাংলা বাজার পত্রিকায়
প্রথম পাতায় পীর হাবিবুর রহমান খবর ছাপালেন “হাফিজের রক্তের দাগ শুকাতে না শুকাতেই
সুনামগঞ্জ বিএনপি নেতারা আঁতাতের খেলায় মেতে উঠেছে”।
ঐদিকে আমাকে লন্ডন আসতে
অনেক ঝামেলা পুহাতে হয়। যদিও আমার টিকেট ছিল সিলেট থেকে, আমি সিলেট বিমান বন্দর
থেকে ফ্লাই না করে অনেক যোগাযোগের মাধ্যমে ঢাকা থেকে ফ্লাই করে লন্ডন চলে আসি।
আসার পূর্ব মুহুর্তে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর সাথে দেখা হয়। তখন আন্দোলনকারী কয়েক
জন ছাত্রদল নেতাকর্মীদের উদ্দেশ্য করে ইলিয়াস ভাই বলেছিলেন “তোমরা যে ভাবে গাড়িতে
করে ঢাকা সিলেট দৌড়াদৌরী করতেছে এটা ঠিক না। কারন আওয়ামীলীগ কি করতে পাড়ে
তোমরা জান না। আঃ লীগ কি জিনিস তা ও তোমরা জান না!
তোমাদেরকে ট্রাকের চাক্কার নীচে ফেলে মেরে ফেলবে। তোমাদের জানা থাকা দরকার এটা আঃ লীগ! এটা সামাদ
আজাদের নির্বাচনী এলাকা! অতএব সতর্কতার সাথে তোমরা চলা ফেরা করিও। পাঠক যে
নেতা আওয়ামীলীগকে এত ভাল করে চেনার জানার পরেও সেই আওয়ামীলীগ সরকারের হাতেই তাকে
গুম হতে হল ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল, দিবা গত রাতে তাহার বাসার সামনে থেকেই। আজ
তের বৎসর হয়ে গেলেও তাহার কোন হদিস মিলেনি। যাক, আজ আর এ দিকে যাবনা। পাঠক
আপনারা সহজেই অনুমেয় – তখন জগন্নাথপুর আন্দোলন কারীদের উপর কি পরিমান হয়রানি
চালানো হয়েছিল। শেষ পর্যায়ে কয়েক জন যুবদল, ছাত্রদল নেতা জীবন বাঁচানোর তাগিদে
যুক্তরাজ্যে এসে বিভিন্ন ভাবে সেটেল হন। কেউ কেউ রাজনৈতিক আশ্রয়ের মাধ্যমে হন। তারা
হলেন,,, মির্জা জুয়েল আমিন, মিসবাউজ্জামান সোহেল, কয়সর আহমেদ, সুজাতুর রেজা, আবুল
হোসেন ও মির্জা নিক্সন।

ওরা কিন্তু বিলেতে এসেও রাজনীতির হাল ছারেনি, লন্ডনে এসে তারা বসে থাকেননি, হাফিজ
হত্যার বিচারের জন্য অনেক গুলি সাংবাদিক সম্মেলন করেছেন এবং বাংলাদেশ আন্দোলনের সাথে
তারা ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। যার ফলে আজ তারা একেক জন যুক্তরাজ্য বিএনপি এবং
যুবদলের বিভিন্ন শহর কমিটি থেকে শুরু করে যুক্ত রাজ্যের কেন্দ্রীয় কমিটির গুরুত্ব পূর্ণ দায়িত্বে
আছেন।
পাঠক আজ ২৭বৎসর হয়ে গেলেও হাফিজ হত্যার বিচার কিন্তু‘ হয় নাই। প্রতি বৎসরই ১৫ এপ্রিল একবার আসে এবং
এলাকাবাসী প্রশ্ন করে হাফিজের বিচার কেন হল না? মানুষ বলে ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায়
আসলো তারপরেও কেন বিচার হয় নাই? আগামীতে হয়তো বিএনপি ক্ষমতায় আসবে। তখন কি
হাফিজ হত্যার বিচার হবে? না আবারও বিএনপি নেতারা আঁতাতের খেলায় মেতে উঠবে।।

উপদেষ্টা সম্পাদক
জনতার আওয়াজ ডটকম
১৫। ০৪। ২৫

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ