নিতান্তই সহজ-সরল কথা : মারুফ কামাল খান - জনতার আওয়াজ
  • আজ রাত ২:৫৭, শুক্রবার, ১৫ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১লা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৮শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

নিতান্তই সহজ-সরল কথা : মারুফ কামাল খান

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: বুধবার, জুন ১৮, ২০২৫ ৯:০১ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: বুধবার, জুন ১৮, ২০২৫ ৯:০১ অপরাহ্ণ

 

কিছু সংলাপ ও টুকরো কিছু কথা আমার অনুভূতিকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে।

  • আম্মা আপনাকে সালাম দিয়েছেন।
  • তোমার আম্মা এক অসাধারণ মানুষ। তাঁকেও আমার সালাম জানিও।
    সম্প্রতি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান, নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস লন্ডন সফরকালে তাঁর হোটেল স্যুটে বৈঠক হয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল – বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, যুক্তরাজ্য প্রবাসী তারেক রহমানের সঙ্গে। সেই বৈঠকের সূচনায় দু’জনের মধ্যে বিনিময় হওয়া ছোট ছোট কিছু সূচনা সংলাপের অন্তর্গত দু’টি বাক্য আমি উল্লেখ করেছি।
    এরপর ছোট্ট আরো তিনটি বাক্য আমাকে অভিভূত করেছে। বৈঠক থেকে বেরিয়ে এসে হাস্যোজ্জ্বল তারেক রহমান বাইরে অপেক্ষমান উৎসুক সাংবাদিক ও স্লোগানে মুখর সমর্থকদের উদ্দেশে বলেন : বৈঠকটি ছিল ঐতিহাসিক।….. আমাদের দু’জন মুরুব্বি আছেন বেগম খালেদা জিয়া ও ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তাঁরা জাতিকে নির্দেশনা দেবেন।
    আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘিরে দু’পক্ষ অর্থাৎ অন্তর্বর্তী সরকার ও বিএনপির মধ্যে সৃষ্ট উত্তেজনা চলাকালে সরকারের পক্ষ থেকে ড. ইউনূসের যুক্তরাজ্য সফরের সময় তারেক রহমানের সঙ্গে একটি বৈঠকের প্রস্তাব করা হয়। বিএনপি প্রথমে এই প্রস্তাব নাকচ করলেও বেগম খালেদা জিয়ার হস্তক্ষেপে কট্টর অবস্থান থেকে সরে এসে আলোচনায় সমস্যা সমাধানের পথ অবলম্বন করে। বিএনপির এই অবস্থান বদল বিপুলভাবে জনসমর্থিত হয়। বৈঠকটি হয়ে ওঠে প্রবলভাবে প্রত্যাশিত। দেশপ্রেমিক, শান্তিবাদী ও গণতন্ত্রমনা প্রতিটি মানুষ এ বৈঠকের সাফল্য কামনা করতে থাকে। বৈঠকের পর দুই পক্ষের যৌথ ঘোষণা এবং লন্ডন ও ঢাকায় বিভিন্ন মহলের উচ্ছ্বসিত প্রতিক্রিয়ায় বৈঠকটি সফল বলেই প্রতিভাত হচ্ছে।
    লন্ডন বৈঠকের পর রাজনৈতিক নিম্নচাপ অনেকটাই লঘু হয়ে ঘূর্ণিঝড়ের আশংকা দূর করেছে। এ বৈঠক ঘিরে অনেক রকম প্রতিবেদন ও বিশ্লেষণ এখনো চলছে। বৈঠকের সময় ড. ইউনূস ও তারেক রহমানের শরিরী ভাষা ও দেহভঙ্গিমাও মানবীয় পর্যবেক্ষণ রাডারের আওতায় এনে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। আগামীর বাংলাদেশে ইউনূস-তারেক সমঝোতার প্রভাব-প্রতিক্রিয়া নিয়েও আসছে নানামুখি বয়ান। তবে সব কিছু ছাপিয়ে আমার চৈতন্যে নাড়া দিয়ে চলেছে দুই নেতার সংলাপের ওই ছোট ছোট বাক্যগুলো।
    রাজনীতির জটিল কুটিল নানান দিক থাকে। গলা কাঁপিয়ে ক্রুদ্ধ কণ্ঠের উত্তেজিত বক্তৃতা আমাদের রাজনীতির এক অপরিহার্য উপাদান। আধা শতাব্দিরও বেশি সময় আগে স্বাধীনতা অর্জন করে আমরা আমাদের এই জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত করলেও রাজনীতি এখনো ঔপনিবেশিক আমলের সেই ধারা, রীতি ও শৈলী থেকে বেরিয়ে বুদ্ধিদীপ্ত, যুক্তিবাদী ও মেধাচর্চিত হতে পারেনি। পেশীশক্তির প্রদর্শনই এখনো রাজনীতিতে প্রাধান্য বিস্তারের একমাত্র পথ। নষ্ট ও স্থূল এই ধারা অবলম্বন করেই হাসিনার ফ্যাসিবাদী রেজিম টানা প্রায় সাড়ে পনেরো বছর ধরে প্রলম্বিত হয়েছিল। দীর্ঘ সময়ে রাজনীতির নামে এই বিকৃত সংস্কৃতির অনুশীলনকেই প্রায় সকল দলীয় অ্যাক্টিভিস্টের কাছে সাফল্য অর্জনের পন্থা বলে বিবেচিত হয়েছে। এই অপসংস্কৃতি সংক্রমিত হয়েছে প্রতিটি দলের নেতা-কর্মীর মধ্যে। হাসিনার ফ্যাসিবাদী রেজিমের পতনের পর ছোট বড় সবাই ফ্যাসিবাদী হয়ে উঠে বিজয় করায়ত্ত করতে চাইছে।
    এই পরিস্থিতির শিকার বিএনপিও হতে যাচ্ছিল। বেগম খালেদা জিয়ার প্রজ্ঞা, অভিজ্ঞতা ও সহজাত ঔদার্য তাদেরকে সেই অসহিষ্ণু ও সাংঘর্ষিক ধারা থেকে সমঝোতার টেবিলে ফিরিয়ে এনেছে। আমার কাছে তাই হিসেবি দরকষাকষি, জটিল আলোচনা, রাজনীতির কুটিল মারপ্যাঁচের চাইতে সারল্য, সৌন্দর্য ও বিনয় মেশানো ছোট ছোট সংলাপই খুব বেশি আকর্ষণীয় মনে হয়েছে। এর মাধ্যমে অন্তর্গত সৌজন্য ঠিক্‌রে বেরিয়েছে বলেই আমার কাছে মনে হয়।
    আমাদের রাজনৈতিক রীতি ও সংস্কৃতিতে পরিবর্তন দরকার। গণতন্ত্রের যে সৌন্দর্য তার অনুশীলন দরকার। মতামতের বৈচিত্রের মধ্যে জাতীয় ঐক্য দরকার। রাজনীতিতে দম্ভ ও শক্তির প্রদর্শনীর বদলে মেধা, যুক্তি ও বুদ্ধির দীপ্তি দরকার। সহনশীলতা ও পারস্পরিক মর্যাদাবোধ দরকার। দলীয় অ্যাক্টিভিস্টের চাইতে সকল শ্রেণী-পেশার মানুষের হৃদয়ের ভাষা ও আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতি বেশি গুরুত্ব দেওয়া দরকার। লন্ডন বৈঠকের ছোট ছোট সংলাপের মধ্য দিয়ে তার প্রকাশ ঘটেছে। এই নম্রতা, ভদ্রতা, সৌজন্য, বিনয়, সহিষ্ণুতা, নবীনের প্রতি ভালোবাসা, প্রবীণের প্রতি শ্রদ্ধাবোধই তো আমাদের রাজনীতিকে মহত্তর করে তুলতে পারে।
    তারেক রহমান বৈঠকে ড. ইউনূসকে বই ও কলম উপহার দিয়েছেন। এই প্রতিকী উপহারের মধ্য দিয়ে জ্ঞানচর্চা ও শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টিই পরিস্ফুটিত করা হয়েছে বলে আমার মনে হয়। ভবিষ্যতে সমাজ ও রাজনীতির ভিত্তি হতে হবে শিক্ষা, গবেষণা ও জ্ঞান। যোগ্যতা ও মেধাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। আমরা বিত্তশালী জাতি নই। তাই আমাদেরকে সে অভাব পূরণ করতে হবে চিত্তে বড় হয়ে। আমাদের দেশ ছোট, সমরশক্তিতে আমরা পিছিয়ে তাই একুশ শতকের পরিবর্তনশীল বিশ্বে আমাদেরকে কাছের ও দূরের সকলের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হবে জ্ঞান, প্রজ্ঞা, মেধা ও যোগ্যতার বলে। বাংলাদেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের প্রধান ও আগামীর সম্ভাব্য রাষ্ট্রপরিচালক হিসেবে তারেক রহমান সে ব্যাপারেই তার সচেতন উপলব্ধির আভাস দিয়েছেন বলে আমার বিশ্বাস।
    ইদানিং অযাচিত পরামর্শ ও উপদেশ দেওয়ার একটা বাতিক তৈরি হয়েছে আমার মধ্যে। এটা সকলে ভালো ভাবে নেয়না। তবুও এই বাতিক তাড়িত হয়ে তারেক রহমানের উদ্দেশে তিনটা কথা বলবো।
    এক. দল ও রাজনীতির দ্রুত সংস্কার করুন। দলকে প্রযুক্তিনির্ভর ও তথ্যসমৃদ্ধ করুন। দলে রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ শুরু এবং পার্টি লিটারেচার ও প্রকাশনার ওপর গুরুত্ব দিন। ওপর থেকে চাপিয়ে না দিয়ে সকল স্তরে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নেতা ও প্রার্থী নির্বাচন বাধ্যতামূলক করুন।
    দুই. জামায়াত ও এনসিপির মতো দলগুলোর সাথে বৈরিতা ও তিক্ততা এড়িয়ে চলুন। তাদেরকে অ্যাকোমডেট করুন কিংবা আগামীর সম্ভাব্য বিরোধী দল-জোট হিসেবে প্রস্তুতি নিতে বলুন।
    তিন. ফ্যাসিবাদী অপরাধীদের বিচার ত্বরান্বিত করে বড় অপরাধের সাথে জড়িত নয় এমন আওয়ামী লীগারদের ভুল স্বীকার, ক্ষমা প্রার্থনা ও আগামীতে গণতান্ত্রিক রীতিনীতি অনুসরণের অঙ্গীকারে সামাজিক চুক্তির আওতায় পূর্ণ নাগরিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার পথ বের করুন। সবাই একমত হলে তাদেরকে আগামীর অন্ততঃ তিনটি জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহনের অযোগ্য রাখা যায়। তবে, দীর্ঘকাল ধরে যে-কোনো দলমতের অবদমন ও নিষিদ্ধকরণ কোনো সুফল বয়ে আনেনা। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এটা কোনো রাষ্ট্রনায়কোচিত সিদ্ধান্তও হতে পারে না।▪️
    লেখক পরিচিতি : মারুফ কামাল খান – সিনিয়র সাংবাদিক, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার সাবেক প্রেসসচিব।
    ই-মেইল : mrfshl@gmail.com
 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ