গণতন্ত্র সুসংহত করতে নির্বাচনে পরাজয় মেনে নেয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে - জনতার আওয়াজ
  • আজ সন্ধ্যা ৭:০১, শুক্রবার, ১৫ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১লা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৮শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

গণতন্ত্র সুসংহত করতে নির্বাচনে পরাজয় মেনে নেয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: মঙ্গলবার, অক্টোবর ২১, ২০২৫ ২:৫২ পূর্বাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: মঙ্গলবার, অক্টোবর ২১, ২০২৫ ২:৫২ পূর্বাহ্ণ

 

ব‍্যারিস্টার নাজির আহমদ

যে কোনো নির্বাচনে একজন হারবে, অপরজন জিতবে। অথবা একপক্ষ হারবে, অপরপক্ষ জিতবে – এটাই নির্বাচনের নিয়ম। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একটি আসনে একাধিক প্রার্থী থাকে। ক্ষেত্র বিশেষ ডজনের অধিক প্রার্থী থাকতে পারে। একজন জিতবে আর সবাই হারবে, এমনকি অনেকের জামানত বাজেয়াপ্ত হবে। একাধিক প্রার্থী বা সবাই তো আর জয়ী হতে পারবে না বা সবাইকে বিজয়ী ঘোষণা করার সুযোগও নেই। জাতীয়ভাবে এক দল বা একাধিক দল (যদি একটি দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পায়) বা জোট (যদি জোট হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন) সরকার গঠন করবে। অন‍্যান‍্য বিজিত দল বা দলসমূহ বা জোট বিরোধী দলে থাকবে। এটাই স্বাভাবিক ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অনুষ্ঠিত হওয়া নির্বাচন-উত্তর অবস্থা।

আদালতে মামলায় যেমন এক পক্ষ বিজয়ী হন এবং অপরপক্ষ হারেন। নির্বাচনেও কিন্তু একই রকম অবস্থা। মামলায় বা নির্বাচনে দুপক্ষের বিজয়ী হওয়ার সুযোগ নেই। নির্বাচন কিন্তু Mediation বা Arbitration নয় যে উভয় পক্ষের জন্য “win-win” ফলাফল নিয়ে আসা যাবে। এখানে এক পক্ষকে হারতে হবে এবং হারাটা সহজেই মেনে নিতে হবে। কিন্তু নির্বাচনে পরাজয় স্বাভাবিকভাবে মেনে নেয়ার সংস্কৃতি বাংলাদেশে গড়ে ওঠেনি। নিজে বা নিজ দল বা নিজের সংগঠন জয় করলেই নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও ঐতিহাসিক হয়েছে আর নিজে বা নিজ দল বা নিজের সংগঠনের পরাজয় ঘটলে নির্বাচনে ব‍্যাপক কারচুপিসহ নানা ধরনের অভিযোগ তোলা হয় – এমন সংস্কৃতি বাংলাদেশে বিদ্যমান।

১৯৯১ সালে তৎকালীন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি বিচারপতি মুহাম্মদ সাহাবুদ্দিন আহমদ বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন জাতিকে উপহার দিয়েছিলেন। তারপরও ওই নির্বাচনে পরাজয় বরণ করে পতিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন “নির্বাচনে সূক্ষ্ম কারচুপি হয়েছে”! ঠিক অনুরূপভাবে ২০০১ সালে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান বিচারপতি মুহাম্মদ লতিফুর রহমানের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত অবাধ ও সুষ্ঠু জাতীয় নির্বাচনে পরাজিত হয়েও শেখ হাসিনা বলেছিলেন “স্থুল কারচুপি হেয়েছে”, “বেড়ায় আমার ধান খেয়েছে”! হাল আমলেও দেখলাম ডাকসু ও জাকসুতে বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েও পরাজিতরা তাদের পরাজয় মেনে নিতে পারছেন না। বরং হরেক রকমের অভিযোগ তোলার চেষ্টা করেছেন। তবে চাকসু ও রাকসু নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার পর পরাজিতদের প্রতিক্রিয়া ছিল তুলনামূলকভাবে ভালো ও ইতিবাচক।

সত‍্যিকার অর্থে যে কোন ধরনের পরাজয় সহজে মেনে না নেয়া মানুষের ফিৎরাত, সহজাত প্রবৃত্তি। রক্ত মাংসের মানুষের পক্ষে যে কোনো অপমান মেনে নেয়া কঠিন। নির্বাচনে পরাজয়কে রীতিমতো অপমান হিসেবে ধরে নেয়া হয়। বাংলাদেশের সমাজ ও পরিবেশ সেভাবেই গড়ে উঠেছে। অথচ উন্নত গণতান্ত্রিক বিশ্বে নির্বাচনে পরাজয়ের পর ব‍্যর্থতার দায় নিয়ে নেতাদের অথবা সরকারের সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব পালনে ডিপার্টমেন্টের ব্যর্থতা নিজ কাঁধে নিয়ে কর্তাব্যক্তিদের পদত‍্যাগ করে চলে যাওয়াকে অত‍্যন্ত সম্মানজনক প্রস্থান (Dignified exit) হিসেবে দেখা হয়।

বৃটেনে সরকারি দল পরাজয় করলে তো বটেই, প্রধান বিরোধী দল যদি নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে না পারে তাহলে তাদের নেতা স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে চলে যান। এমন বহু উদাহরণ আছে। শুধু তাই নয়, জয়ী হয়ে ক্ষমতায় যেতে না পারলে তো বটেই যদি পূর্বের নির্বাচন থেকে ভালো ফলাফল করতে না পারে সেক্ষেত্রেও তাদের নেতা ব‍্যর্থতার দায় নিজ থেকে পদত্যাগ করে চলে যান। উদাহরণস্বরূপ, লেবার পার্টির নীল কিনক ও এড মেলিবেন্ড বিরোধী দলের নেতা হিসেবে নির্বাচনে অতীতের চেয়ে ভালো ফলাফল করতে না পারায় পদত্যাগ করে চলে যান। ঠিক অনুরূপভাবে কনজারভেটিভ পার্টির মাইক‍্যাল হাওয়ার্ড, উইলিয়ম হেইগ ও ইয়ান ডানকান স্মিথও বিরোধী দলের নেতা হিসেবে নির্বাচনে অতীতের চেয়ে ভালো ফলাফল করতে না পারায় পদত্যাগ করে চলে যান।

শুধু বড় দল দুটিই নয়, এমনকি বৃটিশ রাজনীতির তৃতীয় ও ছোট দল (যারা এককভাবে কখনোই ক্ষমতায় আসেনি বা অদূর ভবিষ্যতে আসার কোনো সম্ভাবনা নেই) লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির নেতা নিক ক্লেগ, টিম ফারন, জো সোইনসন একইভাবে পদত্যাগ করে চলে যান। এমন সংস্কৃতি বাংলাদেশে গড়ে উঠেনি। নেতা বাংলাদেশে কখনও পদত্যাগ করবে না, ব‍্যর্থতার দায় নেয়ার প্রশ্নই আসে না। তবে বাংলাদেশে এই অবস্থার পরিবর্তন রাতারাতি হবে না। এটির পরিবর্তন করতে হলে সমাজে ক্রমাগতভাবে ও ধারাবাহিকভাবে চর্চার প্রয়োজন সহনশীলতা, ধৈর্য্য, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও ভোটারদের রায় মেনে নেয়ার মানসিকতা প্রদর্শন।

পরাজয় মেনে নেয়ার সংস্কৃতি গড়ে না উঠলে সমাজে ও রাষ্ট্রে সুস্থতা আসে না। আর নির্বাচনে পরাজয় মেনে না নিলে গণতন্ত্র সুসংহত হয় না, কেননা গণতন্ত্রের অবিচ্ছেদ্য প্রাণ নির্বাচনের পরও মনেপ্রাণে ফলাফল মেনে না নিলে পরাজিতদের মনে থেকে যায় অবিশ্বাস, সন্দেহ ও পারস্পরিক শত্রুতা। গণতান্ত্রিক সমাজে পারস্পরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও প্রতিযোগিতা ইতিবাচক দিক হলেও পারস্পরিক শত্রুতা সমাজ ও রাষ্ট্রকে বিষিয়ে তোলে। শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বকে পরাজয়কে সহজে ও স্বাভাবিকভাবে মেনে নেয়ার সংস্কৃতি গড়ে তোলার নেতৃত্ব দিতে হবে, কেননা টিলার উপর থেকেই পানি পড়ে, নিচ থেকে নিশ্চয়ই নয়!

বৃটেনের মূলধারায় নির্বাচনের ফলাফল অতি সহজেই মেনে নেয়া হয়। দশকের পর দশক, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই সংস্কৃতি অব্যাহত আছে। জাতীয় নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে টানটান উত্তেজনা বিরাজ করে। প্রধান দুটি দল তাদের নীতি ও পলিসি নিয়ে গণমাধ্যমে তুমুল বিতর্ক করে, এক দল অপর দলকে আক্রমণ ও পাল্টা আক্রমণ করে। কিন্তু নির্বাচনের ফলাফল যখন ঘোষণা করা হয় তখন পরাজিতদের পক্ষ থেকে ফলাফল অতি সহজেই মেনে নিয়ে বিজয়ীদেরকে অভিনন্দন জানানো হয়। শুধু ঘোষণার পর নয়, বিভিন্ন আসনের ভোট গণনার সময় মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে যায় যে কোন দল সরকার গঠন করার পথে। সেই সময় থেকেই পরাজিত দলের নেতা মানসিকভাবে হাসিমুখে প্রস্তুতি নেন এবং তার নেতাকর্মীদের সান্ত্বনা দেয়া শুরু করেন।

নব্বই দশকে বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী জন মেজর তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা টনি ব্লেয়ারের কাছে ভূমিধ্বস পরাজয় থেকে শুরু করে হাল আমলের প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক বিরোধী দলের নেতা কেয়ার স্টারমারের কাছে শোচনীয় পরাজয় পর্যন্ত তিন দশকের উপর সমান সংস্কৃতি দেখে আসছি। এই দীর্ঘ সময়ের মধ‍্য কত জাঁদরেল নেতা নির্বাচনে ধরাশায়ী হলেন, কত দলের ভূমিধস বিজয় ও পরাজয় হলো কিন্তু সবাই পরাজয়কে অত‍্যন্ত‍ স্বাভাবিকভাবে মেনে নিয়েছেন। এটাই গণতন্ত্রের সুতিকাগার বৃটিশ গণতান্ত্রিক রাজনীতির সৌন্দর্য।

তবে বৃটেনে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে বেশ ব‍্যতিক্রম লক্ষ‍্য করেছি। সম্ভবত: নিজ দেশের সংস্কৃতি তারা লালন করে চলছেন, ভুলতে যেন তারা পারছেন না! বিলেতে বাংলাদেশিদের বিভিন্ন কমিউনিটি, সামাজিক ও চ‍্যারিটি সংগঠনের অন্তত ৬০টি নির্বাচন পরিচালনা করার সুযোগ হয়েছে আমার নির্বাচন কমিশনার বা প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে। কয়েকটি ব‍্যতিক্রম ছাড়া প্রায় সবকটি নির্বাচনে পরাজিতদের ফলাফল গ্রহণ করানোতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয়েছে। ফলাফল ঘোষণার আগে আধ ঘণ্টা থেকে শুরু করে ক্ষেত্র বিশেষ ঘণ্টাব‍্যাপী বক্তৃতা দিয়ে পরাজিতদের মানসিকভাবে প্রস্তুত করা লাগে ফলাফল সহজে মেনে নেয়ার জন্য।

বাংলাদেশের মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে জাতীয় নির্বাচনের। গত তিন তিনটি নির্বাচনে নির্বাচন ও ভোটকে তামাশার বস্তু বানিয়ে ফেলেছিল পতিত সরকার। এবার আমরা আশা রাখি আসন্ন জাতীয় নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য হবে। নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যে তাদের দৃঢ় প্রত্যয়ের কথা জাতিকে জানিয়েছেন। প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস তো ইতিহাসের সেরা নির্বাচন উপহার দেয়ার অঙ্গীকার ব‍্যক্ত করেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো- নির্বাচনের পর পরাজিতরা ফলাফল সহজেই মেনে নেবেন নাকি প্রচলিত সংস্কৃতি অনুসরণ করে হরেক রকমের অভিযোগ নিয়ে আবির্ভূত হবেন?

তবে হ্যাঁ, ফলাফল নি:সংকোচে মেনে নেয়ার পূর্বশর্ত হচ্ছে নির্বাচন সত্যিকার অর্থে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠিত করা। শুধু অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন করলেই হবে না বরং করা হয়েছে বলে ভোটার ও প্রার্থীদের কাছে দৃশ্যত প্রতিয়মান হতে হবে। Lord Hewart বলেছেন “Justice must not only be done, but must also be seen to be done” (অর্থাৎ “ ন্যায়বিচার কেবল করা হলেই হবে না, বরং তা করা হচ্ছে বলেও দেখাতে হবে”)। তাঁর সাথে সুর মিলিয়ে বলতে চাই “Election must not only be free, fair and credible but it must be seen to be free, fair and credible” অর্থাৎ “নির্বাচন কেবল অবাধ, সুষ্ঠু এবং বিশ্বাসযোগ্য হলেই হবে না, বরং তা অবাধ, সুষ্ঠু এবং বিশ্বাসযোগ্য হয়েছে বলেও দেখাতে হবে”)। আর এমন নির্বাচন হলে পরাজয় মেনে না নেয়ার কোনো উপায় থাকে না। প্রথমে যে কোনো পরাজয়ে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখালেও আস্তে আস্তে তা মেনে নিতে হয়, মেনে নিতে হবে। আর এভাবেই ধীরে ধীরে পরাজয় মেনে নেয়ার সংস্কৃতি গড়ে উঠবে।

নাজির আহমদ: বিশিষ্ট আইনজীবী, রাষ্ট্রচিন্তক, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এবং ইংল্যান্ডের প্র্যাকটিসিং ব্যারিস্টার।

Email: ahmedlaw2002@yahoo.co.uk

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ