জোহরান মামদানির নাগরিকত্ব বাতিলে রিপাবলিকানদের প্রচেষ্টা কি সফল হবে?
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
সোমবার, নভেম্বর ১০, ২০২৫ ৫:০৫ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
সোমবার, নভেম্বর ১০, ২০২৫ ৫:৩৫ অপরাহ্ণ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
জোহরান মামদানি নিউইয়র্ক সিটির মেয়র নির্বাচনে জয়ী হয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। তিনি শহরটির প্রথম মুসলিম এবং প্রথম দক্ষিণ এশীয় মেয়র। এই ঐতিহাসিক জয়ের পর ওয়াশিংটনে তার রিপাবলিকান বিরোধীরা বলেছেন, তারা তাকে এই পদে বসতে দেবেন না।
এর আগে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দিয়েছিলেন, মামদানি জিতলে তিনি নিউইয়র্ক সিটির ফেডারেল তহবিল আটকে দেবেন। তিনি মামদানির নাগরিকত্ব নিয়ে বিভ্রান্তিকর প্রশ্নগুলোকে আরো উস্কে দেন এবং উগান্ডায় জন্মগ্রহণকারী এই ৩৪ বছর বয়সী নেতাকে একজন কমিউনিস্ট বলে মিথ্যা অভিযোগে অভিযুক্ত করেন।
এদিকে, কিছু রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা মামদানির নাগরিকত্ব নিয়ে তদন্তের অনুরোধ করেছেন এবং তার মার্কিন নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়ার ও তাকে নির্বাসনের দাবি জানিয়েছেন। তারা প্রমাণ ছাড়াই তাকে কমিউনিস্ট ও ‘সন্ত্রাসবাদী’ কার্যকলাপে জড়িত থাকার অভিযোগে অভিযুক্ত করেছেন।
রিপাবলিকান পার্টির প্রতিনিধি অ্যান্ডি ওগলস ২৯ অক্টোবর এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেন, ‘যদি মামদানি তার নাগরিকত্বের নথিতে মিথ্যা কথা বলে থাকেন, তাহলে তিনি এ দেশের নাগরিক না, এবং তিনি অবশ্যই নিউইয়র্ক সিটির মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না। যুক্তরাষ্ট্রের একটি মহান শহর একজন কমিউনিস্টের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ার পথে, যিনি প্রকাশ্যে সন্ত্রাসবাদী মতাদর্শ গ্রহণ করেছেন।’
মামদানির যুক্তরাষ্ট্রে থাকার সময়কালকে ভুলভাবে উপস্থাপন করেন ফ্লোরিডার রিপাবলিকান প্রতিনিধি র্যান্ডি ফাইন। তিনি ২৭ অক্টোবর নিউজম্যাক্সে বলেন, ‘বর্বররা আর দরজার বাইরে নেই, তারা ভেতরে ঢুকে পড়েছে। আট বছর আগে আসা মামদানি এর একটি দারুণ উদাহরণ। আমি যা পড়েছি তার থেকে এটাই স্পষ্ট যে তিনি নাগরিকত্ব অর্জনের শর্তগুলো পূরণ করেননি।’
পলিটিফ্যাক্ট এমন কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পায়নি যে মামদানি তার নাগরিকত্বের আবেদনে মিথ্যা বলেছেন। উগান্ডায় জন্মগ্রহণকারী মামদানি ১৯৯৮ সালে সাত বছর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রে চলে আসেন এবং ২০১৮ সালে মার্কিন নাগরিক হন। প্রাপ্তবয়স্কদের মার্কিন নাগরিক হওয়ার জন্য সাধারণত পাঁচ বছর ধরে বৈধ স্থায়ী বাসিন্দা হিসেবে দেশে অবিচ্ছিন্নভাবে বসবাস করতে হয়, অথবা মার্কিন নাগরিকের সাথে বিবাহিত হলে তিন বছর থাকতে হয়।
একজন ব্যক্তির নাগরিকত্ব বাতিলের প্রক্রিয়া শুধুমাত্র বিচারিক আদেশের মাধ্যমেই করা যেতে পারে। তবে এটি খুব কমই ব্যবহার করা হয়েছে, যেমন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে আসা নাৎসিদের বিতাড়ন বা ’সন্ত্রাসবাদে’ দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে। অভিবাসন আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মামদানির আবেদন সম্পর্কে ওগলেস ও ফাইনের দাবির সমর্থনে তারা কোনো প্রমাণ পাননি।
অভিবাসন আইনজীবী জেরেমি ম্যাককিনি বলেন, ‘নাগরিকত্ব বাতিলের জন্য সরকারকে প্রমাণ করতে হবে যে আবেদনকারী বেআইনিভাবে নাগরিকত্ব নিয়েছেন বা ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করেছেন। আমি এমন কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ দেখিনি যে তিনি শপথ নেয়ার সময় অযোগ্য ছিলেন।’
মামদানির নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলা শুরু হয় গ্রীষ্মে, যখন তিনি ডেমোক্রেটিক মেয়র মনোনীত হন। জুন মাসে মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডিকে লেখা এক চিঠিতে ওগলস বিচার বিভাগকে মামদানির বিরুদ্ধে নাগরিকত্ব বাতিলের মামলা চালানোর জন্য অনুরোধ করেছিলেন।
ওগলস অভিযোগ করেন, মামদানি ২০১৭ সালে তার লেখা একটি র্যাপ গানে ‘হোলি ল্যান্ড ফাইভ’কে সমর্থন করেছিলেন। এটি ছিল একটি মুসলিম দাতব্য সংস্থার পাঁচজন সদস্যের প্রতি ইঙ্গিত, যারা ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী হামাসকে আর্থিক সহায়তা দেয়ার অভিযোগে ২০০৮ সালে দোষী সাব্যস্ত হন।
ওগলেস ও ফাইনের আরেকটি অভিযোগ হলো, মামদানি নাগরিকত্বের আবেদনের তার ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্টস অফ আমেরিকা (ডিএসএ) সদস্যপদ প্রকাশ করেননি। তাদের মতে, এটি একটি কমিউনিস্ট সংগঠন এবং মামদানির জড়িত থাকার কারণে তাকে নাগরিকত্ব থেকে অযোগ্য ঘোষণা করা হতে পারে।
কিন্তু ডেমোক্রেটিক সোশ্যালিস্টস অফ আমেরিকা কোনো কমিউনিস্ট পার্টি নয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কমিউনিজমের বিকল্প হিসেবেই আবির্ভূত হয়েছিল। আইনজীবী ম্যাককিনির মতে ‘ডিএসএর সদস্যপদ নাগরিকত্বের পথে কোনো বাধা নয় এবং হোলি ল্যান্ড ফাইভ নিয়ে লেখা গানটি বাকস্বাধীনতার অংশ।’
নির্বাচনী প্রচারণার সময় মুসলিমবিরোধী বক্তব্য কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস (সিএআইআর), এমনকি ডেমোক্রেটিক পার্টির সমালোচনার মুখে পড়ে। মুসলিম অ্যাডভোকেসি গ্রুপ সিএআইআর মামদানির বিরুদ্ধে নাগরিকত্ব বাতিলের দাবিকে বর্ণবাদী ও ইসলামবিদ্বেষী বলে অভিহিত করেছে।
মামদানি অক্টোবরে এমএসএনবিসি’র সাথে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমি মনে করি ইসলামবিদ্বেষ এমন একটি বিষয় যা এই দেশের রাজনীতিতে একটি রোগের মতো।’
অন্যদিকে, নিউইয়র্ক ইয়ং রিপাবলিকান ক্লাব ভিন্ন কৌশল নিয়েছে। তারা ১৪তম সংশোধনীর উদ্ধৃতি দিয়ে বলছে, ‘বিদ্রোহ বা বিদ্রোহে জড়িত’ অথবা দেশের ‘শত্রুদের সাহায্য’ প্রদানকারী কোনো ব্যক্তি এই পদে বসতে পারবেন না। তাদের অভিযোগ, মামদানি ‘হামাসপন্থী’ গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন করে মার্কিন শত্রুদের ‘সহায়তা’ করেছেন। তিনি ইমিগ্রেশন ও কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট (আইসিই) অ্যাজেন্টদের প্রতিরোধ করার আহ্বানের মাধ্যমে গ্যাংগুলোকে সমর্থন করেছেন।
মামদানিকে মেয়র পদের জন্য অযোগ্য ঘোষণা করার জন্য কংগ্রেসের পক্ষে এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী চাপ হবে। এর জন্য প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট উভয়েরই দুই-তৃতীয়াংশ ভোটের প্রয়োজন হবে। যদি এটি পাস হয়, তবে এটি মার্কিন সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ করা যেতে পারে।
বিচার বিভাগ ফৌজদারি মামলা বা দেওয়ানি মামলার মাধ্যমে নাগরিকত্ব বাতিল করতে পারে। তবে উভয় ক্ষেত্রেই সরকারকে প্রমাণ করতে হবে যে আবেদনকারী মিথ্যা বিবৃতি বা তথ্য দিয়েছেন, যা আবেদনের ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারত।
কেস ওয়েস্টার্ন রিজার্ভ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অধ্যাপক ক্যাসান্ড্রা বার্ক রবার্টসন বলেছেন, ‘মামদানির বিরুদ্ধে মামলার কোনো প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা খুবই কম। তবে সবথেকে বড় ঝুঁকি হলো, সাধারণ মানুষ সরকারের বিরুদ্ধে কথা বলতে ভয় পেতে পারে।’
সূত্র : আল জাজিরা
জনতার আওয়াজ/আ আ