বগুড়ায় জুলাই হত্যা মামলার পলাতক আসামিদের পুনরায় সক্রিয়
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
শনিবার, নভেম্বর ২২, ২০২৫ ৭:০৫ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
শনিবার, নভেম্বর ২২, ২০২৫ ৭:০৫ অপরাহ্ণ

জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ছবি: সংগৃহীত
বগুড়ায় জুলাই হত্যা মামলার পলাতক আসামিরা পুনরায় সক্রিয় হয়ে উঠেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি থাকা সত্ত্বেও তাদের একটি অংশ জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে বিচরণ করছে এবং ওই সকল আসামিরা একাধিক স্থানে আগুন সন্ত্রাসে জড়িত রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। এই সন্ত্রাসী কার্যক্রমে রয়েছে বিপুল অর্থ সহায়তা, প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে চার্জশিটে প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা এবং পুরনো রাজনৈতিক শক্তির পুনর্গঠন—এমনই অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কয়েকজন ভুক্তভোগী, এলাকাবাসী এবং আইনজীবীরা।
গত [১৯ আগস্ট ২০২৫] বগুড়া সদর ও শাজাহানপুর থানায় স্মারক নং ৪৫১৬ (৩)/১ এবং স্মারক নং ৬২৯৩ (৩)/১ অনুসারে দায়ের হওয়া মামলাগুলো এ বছরের সবচেয়ে আলোচিত মামলার তালিকায় রয়েছে। স্থানীয়দের মতে, পলাতক আসামিদের মধ্যে শেরপুর উপজেলার মৃত ওয়াসীম উদ্দিনের ছেলে আলাল আহমেদকে অন্যতম সংগঠক হিসেবে উল্লেখ করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, তিনি মামলার অন্যান্য আসামিদের একত্রিত করে জেলার বিভিন্ন স্থানে পুনরায় সহিংসতা ছড়িয়ে দিচ্ছেন।
এদিকে গত কয়েক সপ্তাহে বগুড়ার শেরপুর, শাজাহানপুর, ধুনট ও শহরের উপকণ্ঠে ছোট-বড় অগ্নিসংযোগ এবং নাশকতার ঘটনা বেড়েছে। রাতের অন্ধকারে মোটরসাইকেলযোগে এসে অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা দোকানপাট, গুদামঘর ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিভিন্ন স্থাপনায় আগুন ধরিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান। এসব ঘটনার ধরন ও কৌশল গত বছরের সহিংসতার সঙ্গে মিল খুঁজে পাচ্ছে পুলিশও।
স্থানীয় কয়েকজন ব্যবসায়ী নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক থেকে জানিয়েছেন, মামলার আসামিদের এলাকায় নিয়মিত দেখা যায়। একজন ব্যবসায়ী বলেন, “তাদের বিরুদ্ধে মামলা চলমান। কিন্তু তারা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আবারও আগুন লাগার ভয়ে আমরা রাত জেগে দোকান পাহারা দিচ্ছি।”
বগুড়া পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আব্দুল বাছেদ গণমাধ্যমকে বলেন, জুলাই আন্দোলনের ঘটনায় জেলায় ৬৬টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ৯টি হত্যা মামলা। ৭টি মামলায় চার্জশিটের জন্য তিনি মতামত দিয়েছেন। বাকি মামলাগুলোর কিছুতে সমস্যা থাকায় তা সমাধানের জন্য পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, বিচারিক কার্যক্রম শেষ করার জন্য তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পুলিশকে নিয়মিত তাগিদ দেওয়া হচ্ছে।
এদিকে একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, পলাতক আসামিপক্ষ প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে। চার্জশিটে নাম বাদ দেওয়ার জন্য “বড় অঙ্কের অর্থ প্রস্তাব” দেওয়া হচ্ছে—এ কারণে সংশ্লিষ্টরা চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিতে গড়িমসি করছে। এই তদবির ও অর্থ লেনদেনের নেতৃত্ব দিচ্ছেন আলাল আহমেদ নামের এক বড় ব্যবসায়ী। তার সঙ্গে বিগত স্বৈরাচারী আওয়ামী সরকারের সিনিয়র নেতাদের গভীর সম্পর্ক ছিল বলে দাবি করা হয়। বিশেষ করে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মজিবুর রহমান মজনুর এলাকার মানুষ হওয়ায় ব্যবসায়িক সুবিধাও পেয়েছেন বলে অভিযোগ সূত্রটির।
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের পিপি অ্যাডভোকেট মোজাম্মেল হক বলেন, “এই সকল মামলা দ্রুত শেষ করতে হলে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া জরুরি। বেশি বিলম্ব হলে আসামিরা আরও সক্রিয় হয়ে উঠবে এবং বিচার প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়বে। আমরা চাই—শহীদদের বিচার হোক।”
বগুড়া জেলা পুলিশের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “জুলাই হত্যার মামলাটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। পলাতক আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।” তবে আসামিদের প্রকাশ্যে বিচরণের বিষয়ে তিনি সুনির্দিষ্ট মন্তব্য করতে রাজি হননি।
বগুড়া পুলিশ সুপার জেদান আল মুসা বলেন, বগুড়ায় জুলাই-সংক্রান্ত মামলা রয়েছে ৩৭টি এবং হত্যা মামলা ৯টি। এর মধ্যে ৩৭টি মামলার ১২টির চার্জশিট হয়েছে এবং ৯টি হত্যা মামলার মধ্যে ৭টির চার্জশিট দেওয়া হয়েছে; বাকি দুটি প্রক্রিয়াধীন। তিনি বলেন, “প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ নেই। অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”
এদিকে গত বছরের সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। শেরপুর উপজেলার এক ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী বলেন, “গত বছর আমার দোকান পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। এখনও মামলার অগ্রগতি নেই। এখন আবার তারা এলাকায় ঘোরাফেরা করছে—এতে আমরা আরও ভয় পাচ্ছি।”
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, পলাতক আসামিদের প্রকাশ্য সক্রিয়তা ও নতুন করে সহিংসতা—দুটিই গুরুতর নিরাপত্তা ঝুঁকি নির্দেশ করে। তারা স্বচ্ছ তদন্ত ও নজরদারি বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছে।
বগুড়ায় জুলাই হত্যা মামলার আসামিদের ফের সক্রিয় হয়ে ওঠা এবং তাদের বিরুদ্ধে আগুন সন্ত্রাসে জড়িত থাকার অভিযোগ জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে নতুন করে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। স্থানীয়রা দ্রুত গ্রেপ্তার ও বিচার প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
জনতার আওয়াজ/আ আ