বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট ও করণীয়
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ২৭, ২০২৫ ২:৪১ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
শনিবার, নভেম্বর ২৯, ২০২৫ ৩:১৭ অপরাহ্ণ

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার অব্যবহিত পরে বিশেষ করে বাকশাল সরকারের পতনের পর যখন রাজনৈতিক সংকট ও অস্থিরতায় বাংলাদেশ যেমন মেঘাচ্ছন্ন ছিল, ঠিক একইভাবে ২৪শের গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরশাসনের পতনের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সংকটের পর সংকটে একটি রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অবিশ্বাস দেশকে গভীর সংকটে ঠেলে দিয়েছে । তবে এখানে বলে রাখা প্রয়োজন, ৭৫ পরবর্তী সংকট ছিল চূড়ান্ত পর্যায়ে সরকার বনাম সামরিক শক্তির দ্বন্দ্ব ও বিরোধ । তাই সরকার পতনের পর সামরিক বাহিনীর মধ্যে একটা ক্যু পাল্টা ক্যুর মাধ্যমে সিপাহি জনতার অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ধীরে ধীরে স্হিতিশীলতা আসে। এই স্হিতিশীলতা ধরে রাখার জন্যই একটা গণভোটের মাধ্যমে রাজনৈতিক বৈধতার প্রয়োজন ছিল । কিন্তু ২৪ পরবর্তী সংকট হল স্বৈরাচারী আওয়ামী লীগ সরকার বনাম চূড়ান্ত পর্যায়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ঐক্য ও আওয়ামী বিরোধী সকল রাজনৈতিক শক্তি । ফলে স্বৈরাচার শক্তির পতন হলেও জয়ী জনগণ কিংবা রাজনৈতিক শক্তি সরকার গঠন করে নি কিংবা সংবিধান ও স্হগিত করেনি!ফলে সরকার গঠন প্রক্রিয়ায় সংবিধান ও সংবিধানের বাইরে আইনগত প্রজ্ঞার আলোকে সরকার পরিচালিত হচ্ছে ।এখানে সরকার গঠন হয়েছে হবসীয় লেভায়ত্থান (Leviathan ) গ্রন্থের সামাজিক চুক্তির সাদৃশ্যতার ভিত্তিতে! আর সেই চুক্তির বিশ্বস্ততার প্রতীক হলো ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার । সুতরাং এই চুক্তির প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হতে হবে অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে স্বৈরাচারী শাসকদের পথ রোধ করা ।সুতরাং বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হতে হবে জাতীয় নির্বাচনের আয়োজন করে জনগণের ভোটের সরকার প্রতিষ্ঠা করে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা । এখানে জুলাই সনদের পক্ষে গণভোট মূখ্য নয় গৌণ । তবে এই সনদের পক্ষে অবশ্যই আমাদেরকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে । অর্থাৎ রাজনৈতিক দলগুলোর আদর্শ ও কৌশলের ভিন্নতা থাকলেও বিরোধের মধ্যে ঐক্য থাকতে হবে । সেই জন্যই জাতীয় নির্বাচনে জুলাই সনদের ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও ভবিষ্যৎ যে কোনো স্বৈরাচারী বিরোধী মতের দেয়ালস্বরুপ হ্যাঁ/না ভোট হওয়া দরকার।অতএব এই সরকারের পরিচালিত কার্যক্রম হতে হবে বাংলাদেশকে একটি টেকসই গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরিয়ে নিয়ে আসা।
বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের বিভিন্ন পর্যবেক্ষণীয় বিশ্লেষণ করে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য দূর করে জনগণের মধ্যে আস্থা অর্জনের কোনো বিকল্প নাই।
প্রথমত, গণভোটকে কেন্দ্র রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে । কিন্তু গণভোটের উদ্যোগ ও উদ্দেশ্যের বিরোধিতা কেউ করেনি। বরং বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তা জাতীয় নির্বাচনের আগে বা সাথে হবে সেই পরিকল্পনার কৌশলগত পার্থক্য রয়েছে । সুতরাং এই মুহূর্তে সরকার বিষয়টি বিবেচনা ও বিশ্লেষণ করে তা জাতীয় নির্বাচনের সাথে গণভোটের জন্য আয়োজন করার ব্যাপারে ঘোষণা করেছেন । কারণ গণভোটে এই মুহূর্তে রাজনৈতিক স্হিতিশীলতা রক্ষা করা সম্ভব নয় । তাছাড়াও অর্থনৈতিক কৃচ্ছতাসাধনের দিক থেকে ও বিষয়টি যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত ।
দ্বিতীয়ত, অংশগ্রহণ ও রাজনৈতিক বৈধতার সংকট, রাজনীতি বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ অতীব গুরুত্বপূর্ণ ।অর্থাৎ সংকটের ভিতরের সংকটের জন্য দায়ী থাকবেন রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও বিশ্বাসের অভাব । কারণ জামায়াতে ইসলামী ইতিমধ্যেই সরকার ঘোষিত গণভোটের কাঙ্খিত সময়ের সাথে একমত হতে পারেনি । সুতরাং তারা যে যৌক্তিকতায় তা বিরোধিতা করছেন, তা বিবেচনার জন্য রাজনৈতিক দলকে দায়ী না করে জনগণের কাছে যেতে হবে ।তাছাড়া এনসিপি ও যদি বিএনপির সাথে আসন বণ্টন নিয়ে রাজনৈতিক সমঝোতা না হয়, তাহলে গণভোটের প্রশ্নে তাদের রাজনৈতিক কৌশলে দ্বিচারিতা প্রকাশ পাবে। এখন জামায়াত ও এনসিপি’র কৌশল যদি হয়, ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানো! তাহলে সেই সংকটের জন্য তারাই দায়ী থাকবে । কারণ এই মুহূর্তে তাদের সেই বিচার করার অধিকার নাই, সেই অধিকার রাখে একমাত্র জনগণ, কোনো রাজনৈতিক দলের নয়। সুতরাং জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করে কোনো রাজনৈতিক কৌশল অবলম্বন করলে তা জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না । তবে এই বিষয়টি পরিষ্কার করতে, প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে বিশ্বাস অর্জন করতে হবে। অর্থাৎ তারা যে সমস্ত বিষয়ে জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছেন তা তাদের নিজস্ব রাজনৈতিক ও নির্বাচনী ইশতেহারে উল্লেখ থাকতে হবে । যাতে করে নির্বাচিত রাজনৈতিক দল তা বাস্তবায়নের জন্য বাধিত থাকেন।এক্ষেত্রে জনগণ তাদের পছন্দ অনুযায়ী রাজনৈতিক দল নির্বাচন করতে পারেন ।
তৃতীয়ত, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে সকল রাজনৈতিক দলকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে । অর্থাৎ আওয়ামী লীগ আনুষ্ঠানিকভাবে জনগণের কাছে জুলাই হত্যাকাণ্ডের জন্য ক্ষমা না চাইলে তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বিধিনিষেধ আরোপ চলমান থাকতে হবে ।যদি ক্ষমা চান, তারপরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে, জুলাই হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত নয় এমন ব্যক্তিদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ উন্মুক্ত থাকতে হবে এবং হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে ।এবিষয়ে জুলাই আন্দোলন ধারণকারী রাজনৈতিক দল ও জনগণের ঐক্যবদ্ধ ঐক্যমত প্রয়োজন ।
চতুর্থত, বাংলাদেশ প্রশ্নে, শেখ হাসিনা ও ভারতীয় কৌশল এক ও অভিন্ন ।অর্থাৎ শেখ হাসিনা বাংলাদেশের ভিতরে স্যাবোটাজ ও রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে তার রাজনৈতিক সমর্থকদের উসকে দিয়েছেন । অন্য দিকে ভারত বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ত্রিমাত্রিক সংকট ( বাংলাদেশের ভিতরে, সীমান্তে এবং ভারতের অভ্যন্তরে অস্থিতিশীলতার জন্য বাংলাদেশকে দায়ী করে) সৃষ্টি করে বর্তমান সরকারের পতন ঘটাতে চাইছে কিংবা বিজেপি সরকার নিজেদের পতন ঠেকাতে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে একটি সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের পরিকল্পনা থাকতে পারে । অর্থাৎ তারা শেখ হাসিনার মতো শাসক চায় যাতে করে বাংলাদেশকে তাদের স্যাটেলাইট রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে । সুতরাং এক্ষেত্রে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি, এবং সমমনা সকল রাজনৈতিক দলকে এক ও ঐক্যবদ্ধ প্লাটফর্মে থাকতে হবে । তা না হলে বাংলাদেশের উন্নয়ন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, জাতীয় ঐক্য ও শক্তি সুরক্ষা ও সুদৃঢ় হবে না ।
পঞ্চমত, সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কৌশলগত বিরোধ রাজনৈতিক সংকটের অন্যতম একটি কারণ । এতে করে ফ্যাসিবাদী শক্তি যে কোন সময় হাতছাড়া দিয়ে উঠবে। উদাহরণ হিসেবে ক্রীড়াতত্ত্বের আলোকে যদি বিষয়টি বিশ্লেষণ করা যায়, তা হলো, বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি এবং সমমনা দলগুলো হল ডানপন্হী ধারার রাজনৈতিক দল । এখন মাঠে বিপরীতে বামপন্থী রাজনৈতিক প্রধান শক্তি ২৪শের গণঅভ্যুত্থানে অকেজো হয়ে গেছে! এই অবস্থায় ডানপন্হীরা কৌশলগতভাবে বড় বাম শক্তি হিসেবে প্রকাশ্যে বা গোপনে বামপন্থীদের ভোটের আশায় তাদেরকেই পরোক্ষ ও কৌশলগতভাবে ব্যবহার করতে চায় । অপরদিকে বামপন্থীরা এই কৌশল বুঝতে পেরে উভয়ের মধ্যে সুবিধার দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করতে উৎপেতে আছে! যার কারণে জামায়াত কৌশলগত কারণে নির্বাচনে বিলম্বিত অংশগ্রহণের বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছে এবং বিএনপি আওয়ামী বিরোধী অবস্থান নিয়ে নিরপেক্ষতার কৌশল অনুসরণ করছে ।অপরদিকে এনসিপি’র রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে বলা যায় তারা যে দল সুবিধাজনক অবস্থায় থাকবে নির্বাচনে শেষ মুহূর্তে সেই দলের দিকেই ঝুঁকবে । তবে তাদের প্রধান কৌশল হলো নির্বাচন বিলম্বিত করা ।তাতে করে তাদের স্বার্থের মেয়াদ আরো বৃদ্ধি পাবে ।এক্ষেত্রে জামায়াতের কৌশল ও একই। তার কারণ হলো তারা মনে করেন, নির্বাচন যত বিলম্বিত করা যাবে বিএনপির জনমত তত কমতে থাকবে ।
এই অবস্থায় রাজনৈতিক দর্শনের আলোকে বলা যায়, ফ্যাসিবাদ বিরোধী সকল রাজনৈতিক দলকে এই অপশক্তির সাথে আতাত করা থেকে দূরে থাকতে হবে । বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে একটি গণতান্ত্রিক ও নির্বাচিত সরকার ছাড়া কোনো অবস্থাতেই স্হিতিশীলতা অর্জন করা সম্ভব নয় । যার কারণে ফ্যাসিবাদ আদর্শে ভোটের আশা না হয়ে নিজেদেরকে জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে হবে ।সুতরাং বলা যায় সকল রাজনৈতিক দল যদি নির্বাচনমুখী হয়, তাহলে রাজনৈতিক সংকট অনেকাংশেই হ্রাস পাবে তাতে সন্দেহ নাই ।
পরিশেষে বলা যায়, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যদি নির্বাচন প্রশ্নে রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করা না যায় তাহলে নির্বাচন অনুষ্ঠানের নিশ্চয়তার কোনো নিশ্চিত সম্ভাবনা ক্ষীণ! অপরদিকে ফ্যাসিবাদী শক্তি এই বিলম্বিত সময়কে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সংকট সৃষ্টির মাধ্যমে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার সুযোগ পেয়ে যেতে পারে । তাতে করে বাংলাদেশকে রাজনৈতিক সংকটের পাশাপাশি অর্থনৈতিক সংকটের ও মুখোমুখি হতে হবে । এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতায় দেশে একটি দীর্ঘমেয়াদি অনির্বাচিত সরকারের সম্ভাবনার সুযোগ সৃষ্টি হবে ।
মোঃ শাহজাহান মিয়া
সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট, চিটাগং ইউনিভার্সিটি ডিবেটিং সোসাইটি ।
এম. এস. এস. রাজনীতি বিজ্ঞান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
এম.বি.এ. আলস্টার বিশ্ববিদ্যালয়, ইউ.কে।
ইমেইলঃ shahjahanau.bd@gmail.com
বার্তা প্রেরক,
ইয়াসমিন আক্তার
বিশেষ প্রতিনিধি
জনতার আওয়াজ,লন্ডন।
জনতার আওয়াজ/আ আ