১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সংসদ নির্বাচন ও কোন দলের জয়ের সম্ভাবনা: একটি নির্মোহ বিশ্লেষণ
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
সোমবার, জানুয়ারি ২৬, ২০২৬ ৫:৩৬ পূর্বাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
সোমবার, জানুয়ারি ২৬, ২০২৬ ৫:৩৬ পূর্বাহ্ণ

ব্যারিস্টার রফিক আহমেদ
নির্বাচনী ইতিহাসের প্রেক্ষাপট: গ্রহণযোগ্যতা, অংশগ্রহণ ও প্রতিযোগিতার ক্রমাবনতি
বাংলাদেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার ইতিহাসে গ্রহণযোগ্যতা, অংশগ্রহণ ও সুষ্ঠু প্রতিযোগিতার প্রশ্নটি একটি ক্রমাগত উত্থাপিত রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিতর্কের বিষয়। স্বাধীনতা-পরবর্তী অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোর মধ্যে ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে তুলনামূলকভাবে সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য ও প্রতিযোগিতামূলক বলে গণ্য করা হয়। সে নির্বাচনে বড় দলগুলো জোটবদ্ধ না হয়ে পৃথকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিল, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা অপেক্ষাকৃত দৃশ্যমান ছিল এবং ভোটার অংশগ্রহণের হারও ছিল উল্লেখযোগ্য (প্রায় ৫৫.৪%)।
পরবর্তী তিন দশকে রাজনৈতিক মেরুকরণ, জোটভিত্তিক কৌশলগত রাজনীতি এবং নির্বাচনকালীন প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ বা প্রভাব—এই ত্রয়ী উপাদান নির্বাচনগুলোর বৈধতা ও গ্রহণযোগ্যতাকে ক্রমশ প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনসমূহের একটি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা:
১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন: বিরোধী দলগুলোর সম্মিলিত বর্জনের মুখে কার্যত একপক্ষীয়ভাবে অনুষ্ঠিত হয়।
১২ জুন ১৯৯৬ সালের নির্বাচন: তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়। তবে এ নির্বাচন দুর্নীতি, প্রচার-প্রাধিকার ও বিরোধীদলগুলোর আন্দোলন ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছিল।
২০০১ সালের নির্বাচন: চারদলীয় জোটের বিপুল বিজয় নিয়ে আসে। তবে বিরোধী দলগুলি নির্বাচনী কারচুপি, সহিংসতা ও প্রশাসনিক পক্ষপাতের অভিযোগ তোলে। ভোটার উপস্থিতি ছিল প্রায় ৭৫%।
২০০৮ সালের নির্বাচন: তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় অনুষ্ঠিত হয়। তবে এটি বিএনপি আমলে রাজনৈতিক হত্যাকন্ডসহ নানা কারণে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত ছিলো। ফলশ্রুতিতে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করে।
২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচন: বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বা সীমিত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচন সম্পন্ন হয়।
এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে একটি স্পষ্ট প্রবণতা দেখা যায়, যখন প্রতিযোগিতা সীমিত হয় বা একপক্ষীয় হয়, তখন ক্ষমতাসীন দল নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে; আর যখন তুলনামূলক প্রতিযোগিতা নিশ্চিত হয়, তখন ফলাফল অনিশ্চয়তা ও উত্তেজনাময় হয়ে ওঠে।
ভোটার আচরণের গতিবিদ্যা: “নীরব ভোটার” ও কৌশলগত ভোট
বাংলাদেশের নির্বাচনী বিশ্লেষণে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু প্রায়শই উপেক্ষিত উপাদান হল “নীরব ভোটার” (Silent Voter)। বিভিন্ন বিশ্বস্ত জরিপে দেখা গেছে, প্রতিটি নির্বাচনের আগে প্রায় ১৯-২৫% ভোটার তাদের পছন্দ প্রকাশ করেন না বা I’mসিদ্ধান্তহীন থাকেন। এই নীরব ভোটাররা প্রায়ই শেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেন এবং তাদের ভোটই অনেক আসনের ফলাফল নির্ধারণ করে দিতে পারে।
একটি নির্মোহ অনুমান হলো, সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও অবাধ পরিবেশে এই নীরব ভোটাররা প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে প্রায় সমানভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েন। তাহলে উভয় দলের প্রকৃত “হার্ডকোর” বা সলিড ভোটার ভিত্তি প্রায় ২০-২২%-এর আশেপাশে অবস্থান করে। বাকি ৪২-৫৩% ভোটার হলো ভাসমান, প্রভাবিতযোগ্য, ইস্যুভিত্তিক বা কৌশলগত ভোটার।
কৌশলগত ভোট (Tactical Voting)-এর প্রবণতা: একপক্ষীয় বা প্রভাবিত নির্বাচনের পরিবেশে “দুই দলের মধ্যে যেকোনো একটি দলকে আটকানো”-এর মনোভাব কাজ করে। ফলে, “বিএনপি ঠেকাও” বা “আওয়ামী লীগ ঠেকাও”—এই যুক্তিতে ছোট দলগুলোর (যেমন: জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি, বিভিন্ন বামদল) সমর্থকরা তাদের পছন্দের দলকে ভোট না দিয়ে কৌশলগতভাবে বড় দলগুলোর মধ্যে যেকোনো একটিকে ভোট দেন। ১৯৯৬, ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনে এটি স্পষ্টভাবে দেখা গেছে।
জামায়াতে ইসলামীর ভোটার ভিত্তি: একটি পুনর্মূল্যায়ন
১৯৯১ সালের নির্বাচন ছিল জামায়াতে ইসলামীর জন্য একটি মাইলফলক। দলটি কোনো জোটে না গিয়ে এককভাবে ১২.১৩% ভোট পেয়েছিল এবং ১৮টি আসনে জয়লাভ করেছিল। তখনও দলটির সাংগঠনিক প্রসার তৃণমূল পর্যায়ে সীমিত ছিল, তাদের ধর্মীয়-রাজনৈতিক এজেন্ডা গ্রাম-গঞ্জের সাধারণ মানুষের কাছে পূর্ণমাত্রায় পৌঁছায়নি।
গত ৩৫ বছরে জামায়াতের রূপান্তর:
১. সাংগঠনিক বিস্তার: দলটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন, সেবামূলক প্রতিষ্ঠান ও তৃণমূল পর্যায়ের নেটওয়ার্কের মাধ্যমে দেশব্যাপী একটি শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তুলেছে। বিশেষ করে ২০০৮-২০২৪ সময়কালে ক্ষমতাসীনদের দমন-পীড়নের সময়েও তাদের বিস্তার ও ভিত্তি সংহত হয়েছে।
২. কর্মী ও সমর্থক বৃদ্ধি: স্থানীয় পর্যায়ে নতুন কর্মী ও সমর্থক তৈরির কাজ অব্যাহত রয়েছে। অনেক বিশ্লেষক অনুমান করেন, তাদের সক্রিয় কর্মী-সমর্থকের সংখ্যা গত তিন দশকে দুই থেকে তিন গুণ বেড়েছে।
৩. সামাজিক সেবা ও গ্রহণযোগ্যতা: দলটি বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও কোভিড-১৯ মহামারীর সময় উল্লেখযোগ্য ত্রাণ ও সেবামূলক কাজ করেছে, যা মানুষের মধ্যে তাদের ব্যাপক প্রতি ইতিবাচক ধারণা তৈরি করেছে।
৪. নেতৃত্বের চরিত্র: সাধারণ মানুষ দলটির “শৃঙ্খলাবদ্ধ ও দুর্নীতিমুক্ত” ইমেজকে একটি বিবেচ্য বিষয় হিসেবে দেখে।
উপরোক্ত বাস্তবতার আলোকে একটি অনুমান করা যায় যে, জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান কঠিন ভোটার ভিত্তি বা সলিড ভোট ২৫-৩০%-এর কাছাকাছি হতে পারে। এটা আওয়ামী লীগ বা বিএনপির হার্ডকোর ভোটার ভিত্তির চেয়ে বেশি। অবশ্য এই অনুমান মাঠপর্যায়ের গভীর গবেষণা ও জরিপ ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
২০২৬ সালের নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রেক্ষাপট ও জয়ের সম্ভাবনা
১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে একটি অত্যন্ত জটিল ও সংবেদনশীল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে:
১. জনমনে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা: দেশের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে পালাবদলের রাজনীতি দেখেছে। অর্থনৈতিক সংকট, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, তরুণদের বেকারত্ব, সুশাসনের ঘাটতি এবং রাজনৈতিক দমন-পীড়নের ফলে “তৃতীয় একটি শক্তি”-র প্রতি মানুষের কৌতূহল ও সমর্থন বৃদ্ধি পেতে পারে।
২. জোট রাজনীতির গতিপ্রকৃতি: জোটের ভোট বিএনপিজোট ও জামাতজোটকে যতটুকু প্রভাবিত করবে, তার চেয়েও নিরব ভোটারদের সিদ্ধান্ত অনেক বেশি প্রভাবিত করবে।
৩. নির্বাচনী পরিবেশের প্রশ্ন: নির্বাচনটি কি সত্যিকার অর্থে অবাধ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক হবে? নীরব ভোটাররা কি নির্ভয়ে ও স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন? ছোট দলগুলোর জন্য নিরাপদ ও সমান প্রচারের পরিবেশ থাকবে কি?
৪. আন্তর্জাতিক চাপ ও পর্যবেক্ষণ: বৈশ্বিক গণতন্ত্র সূচকে বাংলাদেশের অবনতির প্রেক্ষাপটে পাশ্চাত্য দেশগুলো গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় কতটুকু ভূমিকা রাখে, সেটাও বিবেচ্য বিষয়।
সম্ভাব্য ফলাফলের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ:
যদি তুলনামূলক অবাধ ও সুষ্ঠু প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন হয়
সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় কোনো কোনো বিশ্লেষক মনে করেন, জামাতজোট নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা (১৫১+ আসন)-ও অর্জন করতে সক্ষম হতে পারে, যদি তারা একটি দক্ষ প্রচারণা চালায় এবং “পরিবর্তনের প্রতীক” হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করতে পারে।
উপসংহার: নির্মোহ বাস্তবতা
একটি নির্মোহ বিশ্লেষণের শর্ত হলো, সবকিছুই পরিবর্তনশীল এবং বহু বিষয়ই অনিশ্চিত। ২০২৬ সালের নির্বাচনের ফলাফল নির্ভর করবে নিম্নলিখিত কয়েকটি চূড়ান্ত নিয়ামকের উপর:
১. নির্বাচনী ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা: নির্বাচন কমিশন কি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ভূমিকা রাখতে পারবে?
২. শান্তিপূর্ণ ও সহিংসতামুক্ত পরিবেশ: ভোটাররা কি ভয় ও উৎকণ্ঠা ছাড়াই ভোটকেন্দ্রে যেতে পারবেন?
৩. জোট গঠনের নাটক: শেষ মুহূর্তে কোন দল কার সাথে জোট বাঁধবে, তা অনেক আসনের ফল উল্টে দিতে পারে।
৪. তরুণ ভোটারদের মনোভাব: প্রথমবারের ভোটাররা (১৮-২৫ বছর বয়সী) কোন ইস্যুতে ভোট দেবেন? তারা কি প্রচলিত দলগুলোর বাইরে নতুন কোনো বিকল্প খুঁজবেন?
৫. অর্থনৈতিক পরিস্থিতি: ২০২৬ সালের শুরুতে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা (মুদ্রাস্ফীতি, রিজার্ভ, কর্মসংস্থান) ভোটারের মনোভাবকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করবে।
চূড়ান্ত কথা: বাংলাদেশের নির্বাচনী রাজনীতি একটি জটিল ও গতিশীল প্রক্রিয়া। অতীতের প্রবণতা ভবিষ্যতের গ্যারান্টি দেয় না। জামায়াতে ইসলামীর উত্থানের সম্ভাবনা তাত্ত্বিকভাবে থাকলেও, বাস্তবে তা নির্ভর করবে দলটির কৌশলগত সিদ্ধান্ত, প্রচার-কার্যকারিতা এবং সর্বোপরি সাধারণ মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা ও ভোটের উপর। ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে ভোটাররাই হবে চূড়ান্ত রায়দাতা। বিশ্লেষকদের দায়িত্ব হলো সম্ভাব্য সকল দৃশ্যপট উপস্থাপন করে জনসচেতনতা বাড়ানো, যাতে দেশ একটি শান্তিপূর্ণ, গণতান্ত্রিক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে অগ্রসর হতে পারে।
জনতার আওয়াজ/আ আ