গণতন্ত্রের গভীরতর সংকটকে উন্মোচন করেছে বাংলাদেশ - জনতার আওয়াজ
  • আজ রাত ১:৪২, শুক্রবার, ১৫ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১লা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৮শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

গণতন্ত্রের গভীরতর সংকটকে উন্মোচন করেছে বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারি ১২, ২০২৬ ১২:৪৩ পূর্বাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারি ১২, ২০২৬ ১২:৪৪ পূর্বাহ্ণ

 

জনতার আওয়াজ ডেস্ক
সংগৃহীত ছবি
দেড় বছর আগে মনে হচ্ছিল, বৈশ্বিক গণতান্ত্রিক পশ্চাদপসরণের ধারার বিপরীতে বাংলাদেশ যেন একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ হতে চলেছে। অর্থনৈতিক হতাশায় ভোগা তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে গণবিক্ষোভ ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দীর্ঘস্থায়ী স্বৈরশাসনের পতন ঘটায়। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে সংকুচিত রাজনৈতিক পরিসর ও ভীতি প্রদর্শনের রাজনীতির অবসান ঘটে।

সেই মুহূর্ত শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্ব জুড়েও আশার সঞ্চার করেছিল- যখন বিশ্বে গণতন্ত্র চাপে, তখনো নাগরিকরা স্বৈরতন্ত্রকে হটিয়ে নতুন সূচনা ঘটাতে পারে। আজকের (বৃহস্পতিবার) জাতীয় নির্বাচন হবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক রূপান্তরের প্রথম বড় পরীক্ষার মঞ্চ। কিন্তু গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের যে উচ্চ প্রত্যাশা ছিল, তা এখন অনেকটাই ম্লান। আরোগ্যের সময় আসার বদলে, শেখ হাসিনার পতনের পর দেশ জুড়ে স্থায়ী সহিংসতা, আমলাতান্ত্রিক ও শিল্প খাতে ধর্মঘট, বিক্ষোভ এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। এই অভিজ্ঞতা একটি কঠিন সত্য উন্মোচন করেছে- যার প্রভাব উন্নয়নশীল বিশ্ব থেকে শুরু করে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের আমেরিকা পর্যন্ত বিস্তৃত: গণতন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যখন ভেতর থেকে ফাঁপা হয়ে যায়, তখন গণতান্ত্রিক পুনর্জাগরণ অধরা হয়ে পড়ে। বাংলাদেশ এখন তারই এক কেস স্টাডি।
১৯৯০-এর দশকের শুরু থেকে বাংলাদেশের রাজনীতি ঘুরপাক খেয়েছে আওয়ামী লীগের শেখ হাসিনা ও বিএনপি’র খালেদা জিয়ার তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে কেন্দ্র করে। আদর্শিক বা নীতিগত পার্থক্য খুব গভীর না হলেও দুই নেত্রী ও তাদের দলগুলো বছরের পর বছর তিক্ত নির্বাচনী লড়াইয়ে লিপ্ত থেকেছে। তবুও একসময় ক্ষমতা শান্তিপূর্ণভাবে হস্তান্তর হতো, কারণ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার নির্বাচন পরিচালনা ও ক্ষমতা হস্তান্তর তদারক করতো। কিন্তু ২০১১ সালে শেখ হাসিনা ক্রমশ কর্তৃত্ববাদী হয়ে উঠলে সেই ব্যবস্থা বাতিল করেন।

এরপর শুরু হয় নির্বাচনী অনিয়ম, প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন, স্বজনপ্রীতি ও লুটতরাজের বিস্তার। সরকার আদালত, পুলিশ ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় সংস্থাকে ব্যবহার করে বিরোধীদের দমন করে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান অনেক বাংলাদেশির কাছে স্থিতিশীলতা ও জবাবদিহিতা ফেরানোর আশা জাগিয়েছিল। সেই আশার বড় উৎস ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেয়া। ২০০৬ সালে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের জন্য নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়া ড. ইউনূস আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ও সম্মানিত মুখ। কিন্তু গভীরভাবে রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত ও ভাঙাচোরা রাষ্ট্রযন্ত্রে শৃঙ্খলা ও স্থিতি ফেরাতে ইউনূস হিমশিম খাচ্ছেন। তার প্রশাসনের সুস্পষ্ট গণম্যান্ডেট নেই। পুলিশ ও ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার মতো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতেও তিনি হিমশিম খেয়েছেন। শেখ হাসিনার পতনের পর অতীত অপব্যবহারের ভয়ে বহু জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা পদত্যাগ করায় প্রতিষ্ঠানগুলো আরও দুর্বল হয়ে পড়ে। বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, দুর্বল মজুরি প্রবৃদ্ধি ও অন্যান্য অর্থনৈতিক চাপ বহু পরিবারকে চাপে ফেলেছে। বৃহস্পতিবারের নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতাও এখন দেখার বিষয়। রাজনৈতিক সহিংসতা, ভোট কেনাবেচার অভিযোগ, নানা অনিয়ম এবং আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ নিতে নিষিদ্ধ করা- সবমিলিয়ে নির্বাচন ঘিরে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। এই মুহূর্তে এগিয়ে রয়েছে বিএনপি, যার নেতৃত্বে এখন তারেক রহমান। তিনি খালেদা জিয়ার ছেলে। তবে ২০০৮ সালের পর থেকে প্রকৃত অর্থে প্রতিযোগিতামূলক সাধারণ নির্বাচন হয়নি। ফলে ভোটের ফলাফল অনুমান করা কঠিন। নতুন প্রজন্মের ভোটাররা এবার বড় ভূমিকা রাখছে। মোট ভোটারের ৪৩ শতাংশের বয়স ১৮ থেকে ৩৭ বছরের মধ্যে। জরিপ বলছে, তারা অতীতের দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে আইনশৃঙ্খলা, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরপেক্ষ শাসনব্যবস্থার মতো বাস্তব ইস্যুকে।

ইসলামপন্থি শক্তিও একটি অনিশ্চিত উপাদান। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হলেও বাংলাদেশে ইসলামপন্থিরা দীর্ঘদিন রাজনীতির একপ্রান্তে অবস্থান করছিল। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যতার সুযোগ নিয়ে তারা আরও সক্রিয় হয়েছে, যা দেশের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা নীতি ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এক সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, প্রথমবার ভোট দিতে যাওয়া ভোটারদের ৩৭ শতাংশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের ভোট দিতে চায়। দলটি তুলনামূলকভাবে মধ্যপন্থি ইসলামের কথা বলে এবং সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ও প্রচলিত দুই দলের বিকল্প হিসেবে সমর্থন পেয়েছে। তবে ২০২৪-এর পর কিছু প্রান্তিক ইসলামপন্থি গোষ্ঠী নারীদের পোশাক-আচরণে কঠোরতা, ধর্ম অবমাননার জন্য মৃত্যুদণ্ড এবং এমনকি একটি ইসলামী খেলাফত প্রতিষ্ঠার দাবিও তুলেছে। বাংলাদেশ এখন তার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে।
নভেম্বরে সুপ্রিম কোর্ট ভবিষ্যৎ নির্বাচনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের রায় দিয়েছে, যদিও তা এই সপ্তাহের নির্বাচনে কার্যকর হচ্ছে না। পাশাপাশি বৃহস্পতিবারের ব্যালটে একটি নতুন জাতীয় সনদ নিয়ে গণভোটও রয়েছে; যাতে সুষ্ঠু নির্বাচন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং নির্বাহী ক্ষমতার সীমা নির্ধারণের অঙ্গীকার অন্তর্ভুক্ত থাকবে। কিন্তু এই উচ্চাকাঙক্ষাকে বাস্তবে রূপ দেয়া কঠিন হবে।

বিএনপি এই সনদের কয়েকটি মূল প্রস্তাবের বিরোধিতা করছে, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা সীমিত করা ও তদারকি সংস্থাগুলোর অধিক স্বাধীনতা দেয়ার বিষয়ে। আরও কয়েকটি দলও আপত্তি তুলেছে। গণভোটে সনদ পাস হলেও তা বাস্তবায়নে প্রয়োজন হবে আইন প্রণয়ন, সংবিধান সংশোধন এবং টেকসই রাজনৈতিক সহযোগিতা- যা বর্তমানে অপ্রত্যাশিত মনে হচ্ছে। বাংলাদেশের জন্য ঝুঁকি বড়।

অতীতে দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও বাণিজ্য রাজনৈতিক অকার্যকারিতার ক্ষতি কিছুটা প্রশমিত করেছিল। কিন্তু গণ-অভ্যুত্থানের পর অর্থনীতি দুর্বল হয়েছে। কিছুটা স্থিতিশীলতার লক্ষণ দেখা গেলেও নতুন নেতৃত্বকে মোকাবিলা করতে হবে এক কঠিন বৈশ্বিক বাস্তবতা- যেখানে বাড়ছে বৈশ্বিক সুরক্ষাবাদ, সরবরাহ শৃঙ্খলের ভাঙন এবং জলবায়ুজনিত চাপ। ভারতের সঙ্গেও টানাপড়েন দেখা দিয়েছে, যা বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক সম্পর্ক। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেয়ায় অন্তর্বর্তী সরকার ও আন্দোলনকারীরা ক্ষুব্ধ। তারা চান হাসিনা দেশে ফিরে বিচারের মুখোমুখি হোন। অন্যদিকে, ভারত অভিযোগ করেছে, বাংলাদেশ হিন্দু সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতা ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে। এই উত্তেজনা ইতিমধ্যে ভিসা স্থগিত ও বাণিজ্য বিঘ্নে রূপ নিয়েছে। বাংলাদেশের অভ্যুত্থানের শিক্ষা সীমান্তের অনেক দূর পর্যন্ত প্রযোজ্য।

২০১০-এর দশকের আরব বসন্ত থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক শ্রীলঙ্কা, নেপাল, দক্ষিণ আমেরিকা ও অন্যান্য অঞ্চলের আন্দোলন-জনতার শক্তি রাজনৈতিক পরিসর খুলে দিয়েছিল। কিন্তু নিরপেক্ষ ও কার্যকর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ছাড়া সেই অর্জন টেকেনি বা ভঙ্গুর থেকে গেছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু পদক্ষেপ আদালত, আইনি কর্তৃপক্ষ ও সরকারি সংস্থাগুলোকে দলীয় সংঘাতে জড়িয়ে এবং নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন তুলে আমেরিকান গণতন্ত্রের স্তম্ভগুলোকে ধীরে ধীরে ক্ষয় করার ঝুঁকি তৈরি করেছে।

স্বৈরশাসকদের উৎখাত করা সম্ভব। কিন্তু তারা যে ক্ষতি করে যায়, তা মেরামত করাই হয়তো গণতন্ত্রের আরও দীর্ঘস্থায়ী ও কঠিন চ্যালেঞ্জ।

(জাহিদ হোসেন, বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ বিষয়ক সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ এবং টম ফেলিক্স জ্যোন্‌?ক, দ্য ইকোনমিস্টের সাবেক বাংলাদেশ প্রতিনিধি। তাদের এ লেখাটি অনলাইন নিউ ইয়র্ক টাইমস থেকে অনুবাদ)

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ