দীর্ঘ ১৭ বছর পর রাষ্ট্রক্ষমতায় আসা নানা চ্যালেঞ্জে বিএনপি - জনতার আওয়াজ
  • আজ দুপুর ২:৩৪, বৃহস্পতিবার, ১৪ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩১শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৭শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

দীর্ঘ ১৭ বছর পর রাষ্ট্রক্ষমতায় আসা নানা চ্যালেঞ্জে বিএনপি

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: বুধবার, এপ্রিল ৮, ২০২৬ ৩:১৯ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: বুধবার, এপ্রিল ৮, ২০২৬ ৩:১৯ অপরাহ্ণ

 

মো. শফিকুল ইসলাম
ছবি সংগৃহীত
দীর্ঘ ১৭ বছর পর রাষ্ট্রক্ষমতায় আসা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সামনে এখন দেশীয় ও বৈশ্বিক নানা চ্যালেঞ্জ দেখছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন; সংবিধান সংস্কার বা সংশোধন; সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন; যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, চীনসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করা; দলীয় নেতা-কর্মীদের নিয়ন্ত্রণে রাখা; নির্বাচনের আগে ও পরে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে গড়ে ওঠা ঐক্য ধরে রাখা; আওয়ামী লীগের অদৃশ্য তৎপরতা মোকাবিলা; দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও বিনিয়োগ বাড়ানো; দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির অবসান ঘটানো এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে পুরোদমে সক্রিয় করাই দলটির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাব। এই কারণে দেশে জ্বালানিসংকট দেখা দিয়েছে। দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের দেড় মাসের মাথায়ই নানা ইস্যুতেই চাপের মুখে পড়েছে বিএনপি।

বিএনপির একাধিক নীতিনির্ধারক বলছেন, জুলাই জাতীয় সনদে বিএনপি রাষ্ট্র সংস্কারের যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সেগুলো তারা অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করবে। এ ছাড়া আগামী দিনের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য দল ও সংগঠনকে পুনর্গঠন করার প্রস্তুতি চলছে। এ ছাড়া সারা দেশে দলকে সক্রিয় করতে নতুন কর্মসূচি দেওয়া হতে পারে।

জানা গেছে, জুলাই জাতীয় সনদের গণভোটের চারটি প্রশ্নে বিএনপির সুনির্দিষ্ট আপত্তি রয়েছে। বিশেষ করে ভোটের সংখ্যানুপাতিক হারে উচ্চকক্ষ গঠন এবং একই ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী ও দলীয়প্রধান থাকবেন কি না, এমন প্রশ্নে বিএনপির ‘নোট অব ডিসেন্ট’ রয়েছে। এ ছাড়া সাংবিধানিক নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়েও বিএনপির আপত্তি রয়েছে। কিন্তু গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত হয়েছে। আবার বিএনপি তার নির্বাচনি ইশতেহারে উল্লেখ করেছে, নিম্নকক্ষের আসন অনুপাতে সংসদে উচ্চকক্ষ গঠন করবে। এতে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে সংসদে তর্ক-বির্তক চলছে।

এমন পরিস্থিতিতে গণভোট রায়ের আলোকে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন ডাকার দাবিতে রাজপথে বৃহত্তর আন্দোলনে যাওয়ার হুঙ্কার দিচ্ছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্য। ইতোমধ্যে গণভোট রায় বাস্তবায়নের দাবিতে সাত দিনের নতুন কর্মসূচি দিয়েছে তারা। সব মিলিয়ে আগামী দিনে জুলাই সনদ কীভাবে বাস্তবায়ন হবে এবং সংবিধান সংশোধন কীভাবে হবে, তা বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবেই মোকাবিলা ও সমাধান করতে হবে বলে মনে করছে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সিনিয়র সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন খবরের কাগজকে বলেন, ‘জুলাই সনদের পক্ষে সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে বিরোধী দল কর্মসূচি পালন করছে। সংসদেও বিরোধী দল তাদের বক্তব্য তুলে ধরছে। সংসদের ভেতর ও বাইরে চাপ সৃষ্টি করতে চাইছে। এসব কর্মসূচিতে বিএনপি তেমন কোনো সমস্যা দেখছে না। এটিই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপি উচ্চকক্ষে আসন বণ্টন চায় সংসদে প্রাপ্ত আসনের ভিত্তিতে। আর জামায়াত-এনসিপি চায় প্রাপ্ত ভোটের ভিত্তিতে। এটি নিয়ে একটি রাজনৈতিক সংকট হতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশগুলো বাতিল করলে দেশে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।

তারা বলছেন, চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানকে ধারণ করেই বিএনপি জুলাই সনদের সংলাপে বসেছিল। এখন জুলাইয়ের স্পিরিট অস্বীকার করে সবকিছু করতে গেলে তা হিতে বিপরীত হয়ে দাঁড়াবে। ফলে বিরোধী দলের সঙ্গে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও সংবিধান সংশোধন বিষয়টির সমঝোতা অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে করতে হবে বিএনপিকে। এ জন্য সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইন বিশেষজ্ঞ ও বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে সমাধান করতে পারে বিএনপি। জুলাই স্পিরিট ও দলের নির্বাচনি ইশতেহার–দুটি এক করে বিএনপিকে সমাধানে যাওয়ার পরামর্শ দেন কেউ কেউ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, ‘বিএনপিকে জুলাই সনদ ও গণভোট মেনে নিতে হবে। কারণ তারা গণভোটের ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রচার করেছে, জুলাই সনদেও স্বাক্ষর করেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশগুলোকে তাদের মেনে নিতে হবে এবং বাতিল করা থেকে সরে আসতে হবে। গণভোটের অধ্যাদেশ বাতিল করলে দেশে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘বিএনপি নিম্নকক্ষের আসন অনুপাতে উচ্চকক্ষ গঠন করার পক্ষে। কিন্তু পৃথিবীর কোনো দেশের পার্লামেন্টে এভাবে উচ্চকক্ষ গঠন হয়েছে বলে তার জানা নেই। দেশের জনগণ সংখ্যানুপাতিক হারে উচ্চকক্ষ চায়। সে জন্য তারা ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে ভোট দিয়েছে। তা না হলে উচ্চকক্ষের দরকার নেই। বিএনপি যদি তাদের ইচ্ছামতো সবকিছু করতে যায়, তাহলে বিপদে পড়তে পারে।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ খবরের কাগজকে বলেন, ‘বিএনপি বলছে, জুলাই সনদে তারা অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করবে। বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে বিএনপি জোর দিয়েছে সংবিধানের ওপর। আর রাজপথের বিজয়ের গণভোটের ওপর জোর দিয়েছে জামায়াতসহ বিরোধী দল। এটি নিয়ে আরও বির্তক চলতে পারে।’

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ পুরোপুরি সাংবিধানিকভাবে চলছে না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সংবিধান মেনে চলছে, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংবিধান মানা হচ্ছে না। মিশ্রভাবে চলছে। ফলে সব দলই সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করছে।’

মাহবুব উল্লাহ আরও বলেন, ‘জামায়াতসহ বিরোধী দলগুলোর এত দ্রুত রাজপথে আন্দোলনে যাওয়া সমীচীন হয়নি। এটি কারও জন্য ভালো হয়নি। আরও পাঁচ থেকে ছয় মাস অপেক্ষা করা উচিত ছিল। জুলাই সনদ বাস্তবায়নে বিএনপির পদক্ষেপগুলো শেষ পর্যন্ত দেখা উচিত ছিল। রাজপথেই যদি সবকিছুর সমাধান হয়, তাহলে ভবিষ্যতে দেশের জন্য ভালো কিছু হবে না।’

প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্রসহ বৈশ্বিক অন্য পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা বিএনপির জন্য বড় পরীক্ষা। ভারত-পাকিস্তান, চীন এবং বৃহত্তর পরিসরে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর নিযুক্ত ঢাকার কূটনীতিকদের তৎপরতা বেড়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, ভূ-রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কীভাবে ভারসাম্য রাখবে, সেটি বিএনপির সামনে এখন আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ। দেশের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করে আন্তর্জাতিক মহলের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক তৈরি এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে হবে। যদিও বিএনপি তার নির্বাচনি ইশতেহারে বলেছে, পররাষ্ট্রনীতি হবে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কূটনৈতিক দক্ষতা ও পেশাদারত্ব এখানে বড় বিষয়। সবাইকে বোঝাতে হবে সবার সঙ্গে সম্পর্ক থাকলে সবারই লাভ। তোমার সঙ্গে আমার সম্পর্ক, তোমার বন্ধু আমার বন্ধু, তোমার শত্রু আমার শত্রু। সব দেশের সঙ্গে আমরা আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য করি। তবে অন্য দেশের ক্ষতির করার জন্য বাংলাদেশকে তৃতীয় কোনো পক্ষকে ব্যবহার করতে দেব না। দেশের স্বার্থ রক্ষা করে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বৃদ্ধি করতে হবে।’

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ আরও দীর্ঘ হলে জ্বালানিসংকট আরও বাড়তে পারে। তেলের মূল্যবৃদ্ধির গুঞ্জন রয়েছে বিভিন্ন মহলে। তেলের মূল্যবৃদ্ধি পেলে এর প্রভাব পড়বে শিল্প খাতসহ সব সেক্টরে। উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পেলে নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে। কলকারখানা বন্ধ হলে রপ্তানি আয় কমে যেতে পারে এবং বেকারত্ব বাড়তে পারে, যা জনমনে ক্ষোভ তৈরি করবে। এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়া এখন বিএনপির আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু খবরের কাগজকে বলেন, জ্বালানি তেলের কোনো সংকট নেই। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহেও অস্থিরতা দেখা দিলেও সরকার তা মোকাবিলা করার চেষ্টা করছে। সরকার সম্ভাব্য সব উৎস খুঁজে দেশে সব ধরনের জ্বালানি তেলের স্বাভাবিক সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী প্রয়োজন হলে মন্ত্রিসভায় আলোচনা করে চিন্তা করা হবে বলে জানান তিনি।

এ ব্যাপারে দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের কারণে দেশের পরিস্থিতি সামনে আরও খারাপ হতে পারে। জ্বালানি, বিদ্যুৎসহ উৎপাদন খাতে প্রভাব পড়বে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিএনপির সামনে থাকা চ্যালেঞ্জগুলো জনগণকে সঙ্গে নিয়ে মোকাবিলা করতে হবে। বিরোধী দলসহ সব রাজনৈতিক দলকে সঙ্গে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। বিভাজনের রাজনীতি থেকে সরে আসতে হবে। জনগণ যেটি চায়, তার আলোকে রাষ্ট্র সংস্কার করলে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা ধারণ করে সব দলকে নিয়ে কাজ করতে হবে।’

১৭ বছর পর সরকার গঠনের পর দলীয় নেতা-কর্মীদের দখল, চাঁদাবাজিমুক্ত রাখাসহ বিতর্কিত কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখাও বিএনপির জন্য চ্যালেঞ্জ। জুলাই অভ্যুত্থানের পর দেশের প্রশাসন পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। প্রশাসনের কোথাও কোনো কিছু যেন ঠিকঠাকমতো কাজ করছে না। ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুনরুদ্ধার করা এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে বিএনপি সরকারকে। প্রয়োজনে সমাধানের জন্য সব পক্ষের কথা শোনা এবং প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বসার পরামর্শ দেন কোনো কোনো বিশ্লেষক।

এ ব্যাপারে ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘ক্ষমতায় আসার পর নেতা-কর্মীদের দখল চাঁদাবাজি থেকে দূর রাখাই বিএনপির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। দেশে মব ভায়োলেন্স বেড়ে গেছে। স্বাভাবিকভাবে মব ভায়োলেন্স থাকলে ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগ করবেন না। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করতে হবে। জনগণ আশা করছে, বিএনপি যেহেতু আগে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে ছিল, তাই তাদের সামনে আসা চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করতে সক্ষম হবে।’

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ