পুনর্লিখন নয়, সংশোধন-এই নীতিতে এগোচ্ছে সরকার
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
মঙ্গলবার, এপ্রিল ১৪, ২০২৬ ১:১৩ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
মঙ্গলবার, এপ্রিল ১৪, ২০২৬ ১:১৩ অপরাহ্ণ

জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ছবি সংগৃহীত
বাংলাদেশের সংবিধান সংশোধন নাকি আমূল সংস্কার হবে–এই প্রশ্নকে ঘিরে বিতর্ক বেড়েই চলেছে। চলমান সংসদ অধিবেশনের পাশাপাশি রাজনৈতিক অঙ্গনেও বিরোধী দল ও সরকারি দলের মধ্যে চলছে যুক্তি-তর্কের যুদ্ধ। জামায়াত-এনসিপি জোটের দাবি–গণভোটে অনুমোদিত জুলাই সনদের পূর্ণ বাস্তবায়ন। এ ক্ষেত্রে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ অনুযায়ী এই সরকারকে আলাদা সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে। বিপরীতে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকার বলছে, সংবিধানে এমন কোনো প্রতিষ্ঠানের উল্লেখ নেই; তাই সংশোধনের একমাত্র বৈধ পথ হলো নির্বাচিত সংসদ। তবে বিরোধী দলের নেতাদের মতে, গণভোটের রায় মেনে সংস্কার পরিষদ গঠন না করে জাতির সঙ্গে প্রতারণা করছে এই সরকার।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন ছাড়াই জুলাই সনদের বিষয়গুলোও সংশোধন করা সম্ভব।
সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে সরকারি দলের একাধিক সূত্র বলছে, সংবিধান পুনর্লিখন নয়, বরং বিতর্কিত ধারাগুলো সংশোধন বা বাতিল করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি বিষয় হলো পঞ্চদশ সংশোধনীর বিতর্কিত অংশ পুনর্বিবেচনা, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনর্বহাল, নির্বাচন কমিশনের কাঠামো শক্তিশালী করা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, সংসদের উচ্চকক্ষ গঠনের প্রস্তাব, এ ছাড়া সংবিধানের ঐতিহাসিক বর্ণনা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির কিছু বিষয় ।
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক দলগুলোর আলোচনার ভিত্তিতে প্রণীত হয় ‘জুলাই জাতীয় সনদ’। এতে রাষ্ট্র সংস্কারের বিভিন্ন প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং পরে গণভোটের মাধ্যমে জনগণের মতামত নেওয়া হয়। এই সনদে মোট ৮৪টি প্রস্তাবের মধ্যে ৪৮টি সরাসরি সংবিধান সংশ্লিষ্ট। এর মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রকাঠামোর পুনর্বিন্যাস, নির্বাচনব্যবস্থার পরিবর্তন, সংসদীয় সংস্কার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার মতো বিষয়। সনদের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া হিসেবে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের ধারণা দেওয়া হয়। কিন্তু সংবিধানে এমন কোনো পরিষদের বিধান না থাকায় শুরু থেকেই এর আইনি বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
গণভোটের রায় অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচিত সদস্যদের সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার কথা। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি জামায়াত–এনসিপি জোটের সংসদ সদস্যরা সেই অনুযায়ী শপথ গ্রহণ করেন। কিন্তু বিএনপি ও স্বতন্ত্র সদস্যরা এমপি হিসেবে শপথ নিলেও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। আর সেই থেকেই দ্বন্দ্বের সূত্রপাত, যা নিয়ে সংসদের ভেতরে-বাইরে এখনো চলছে তুমুল বিতর্ক। প্রশ্ন উঠেছে, সংসদের বিরোধী জোটের এমপিরা যার কাছে শপথ নিয়েছেন সেই প্রধান নির্বাচন কমিশনারেরই এই পদে শপথ পড়ানোর কোনো এখতিয়ার সংবিধানে নেই। এ ঘটনায় বর্তমান সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিনের বিরুদ্ধে শপথ ভঙ্গের অভিযোগও তুলেছে বিএনপি। কারণ সরকারি দলের মতে, সংবিধানে স্বীকৃত নয়, এমন একটি প্রতিষ্ঠানের শপথ গ্রহণ করা সাংবিধানিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়। তবে বিরোধী দলগুলো বলছে, জুলাই সনদের ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত গণভোট জনগণের প্রত্যক্ষ ম্যান্ডেট দিয়েছে; তাই সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা সরকারের দায়িত্ব।
এদিকে সংবিধান সংস্কার নয়, সংশোধনের মাধ্যমে পরিবর্তন আনার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে সরকার। গত ৫ এপ্রিল জাতীয় সংসদ অধিবেশনে এ বিষয়ে আলোচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সংবিধান কখনো ‘সংস্কার’ হয় না, এটি সংশোধন, স্থগিত বা রহিত হতে পারে। তাই সংবিধান পুনর্লিখনের প্রশ্নই আসে না। তিনি জানান, সংবিধানের বিতর্কিত ও অগণতান্ত্রিক ধারাগুলো সংসদের মাধ্যমেই সংশোধন করা হবে। বিশেষ করে পঞ্চদশ সংশোধনীর কিছু অংশ ৫, ৬ ও ৭ নম্বর তফসিলে থাকা ঐতিহাসিক বর্ণনা, নির্বাচনব্যবস্থার কাঠামো এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার প্রশ্নে পরিবর্তনের আলোচনা চলছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, সংবিধান সংশোধনের বিষয়ে সংসদে একটি সর্বদলীয় বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যেখানে সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যরা একসঙ্গে কাজ করবেন।
অন্যদিকে বিরোধী দলের দাবি, জামায়াত-এনসিপি জোট এবং তাদের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক শক্তিগুলো বলছে, সংসদীয় প্রক্রিয়ায় সংশোধনের মাধ্যমে জুলাই সনদের মৌলিক লক্ষ্য পূরণ সম্ভব নয়। সম্প্রতি জাতীয় প্রেসক্লাবে অনুষ্ঠিত একটি সেমিনারে জামায়াতের নেতারা বলেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন না করা হলে তা গণভোটে দেওয়া জনগণের রায়ের অবমাননা হবে। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ অভিযোগ করেন, সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে জুলাই সনদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন থেকে সরে আসছে। অন্য বক্তারাও দাবি করেন, রাষ্ট্রকাঠামোর মৌলিক পরিবর্তনের জন্য একটি স্বাধীন সাংবিধানিক পরিষদ প্রয়োজন, যা সংসদের বাইরে থেকেও কাজ করতে পারে।
এ বিষয়ে চলমান বিতর্ক প্রসঙ্গে বিশ্লেষকরা বলছেন, সংসদীয় প্রক্রিয়ায়ও সম্ভব জুলাই সনদের ইস্যুগুলো বাস্তবায়ন সম্ভব। গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম খবরের কাগজকে বলেন, ‘সংবিধানে এমন কোনো পরিষদের অস্তিত্ব নেই। জুলাই সনদের যেসব বিষয় সংবিধান সংশোধনের সঙ্গে সম্পর্কিত, সেগুলো সংসদে বিল আকারে উত্থাপন করে আলোচনা ও দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে অনুমোদনের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা সম্ভব। সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন অপরিহার্য নয়।’ তিনি আরও বলেন, এসব প্রস্তাব সরকারি বিলের পাশাপাশি বেসরকারি সদস্যদের বিল হিসেবেও উত্থাপন করা যেতে পারে। এতে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে এবং রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরির সুযোগও বাড়বে।
সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিকের মতে, সংবিধান সংশোধনের একমাত্র বৈধ পথ সংসদীয় প্রক্রিয়া। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা সংসদের। সংসদে বিল উত্থাপন করে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সমর্থনে তা পাস হলেই সংশোধন কার্যকর হয়। আলাদা কোনো পরিষদের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ আইনি প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে। সংবিধানের বাইরে গিয়ে নতুন কোনো কাঠামো তৈরি করলে তা সাংবিধানিক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।’
বিশ্লেষকদের মতে, সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে বিতর্ক শুধু আইনি নয়; এর পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক কৌশলও। সরকার যেখানে সংসদীয় সংশোধনের পথে এগোতে চাইছে, সেখানে বিরোধী দলগুলো বৃহত্তর সংস্কারের দাবিকে রাজনৈতিক আন্দোলনের ইস্যুতে পরিণত করার চেষ্টা করছে। ইতোমধ্যে কয়েকটি রাজনৈতিক দল রাজপথে কর্মসূচির ইঙ্গিত দিয়েছে। অন্যদিকে সরকার সংসদীয় আলোচনার মাধ্যমে ধাপে ধাপে সংশোধন আনার কৌশল গ্রহণ করেছে। তবে রাজনৈতিক ঐকমত্য ছাড়া বড় ধরনের সাংবিধানিক পরিবর্তন টেকসই হবে না। এ পর্যায়ে সবচেয়ে প্রশ্ন হলো, নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় এ দেশের রাষ্ট্রকাঠামো কোন পথে এগোবে–সে সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে সংসদের বিতর্ক, আদালতের ব্যাখ্যা এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক সমঝোতার ওপর।
জনতার আওয়াজ/আ আ