হাওরের বুকজুড়ে নীরব আর্তনাদ, উৎসবের ভিড়েও লুকিয়ে কান্না - জনতার আওয়াজ
  • আজ রাত ৩:১২, শুক্রবার, ১৫ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১লা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৮শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

হাওরের বুকজুড়ে নীরব আর্তনাদ, উৎসবের ভিড়েও লুকিয়ে কান্না

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: রবিবার, মে ৩, ২০২৬ ৩:৩৬ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: রবিবার, মে ৩, ২০২৬ ৩:৩৬ অপরাহ্ণ

 

জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ছবি সংগৃহীত
গত কয়েকদিনের টানা বৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানিতে ধীরে ধীরে তলিয়ে যাচ্ছে সোনালি স্বপ্ন। কৃষকের চোখের সামনে ডুবে যাচ্ছে তার পরিশ্রমের ফল, বছরের একমাত্র ভরসা। চোখে নেই ঘুম, মনে নেই শান্তি, শুধু আছে হারানোর শঙ্কা।

বলছি, মৌলভীবাজার সদর উপজেলার কাউয়াদীঘি হাওরপাড়ের কথা।

সকালের গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি যেন দিনের শুরুতেই এক অশনিসংকেত দিয়েছিল। দুপুরে আকাশ কিছুটা পরিষ্কার হলেও বিকেল গড়াতেই আবার মেঘের ঘনঘটা। চারপাশ ধীরে ধীরে অন্ধকারে ঢেকে যায়। বিদ্যুতের ঝলকানি, মেঘের গর্জন আর ঝোড়ো বাতাস, সব মিলিয়ে প্রকৃতি যেন অস্থির হয়ে ওঠে।

শনিবার (২ মে) বিকেলে কাউয়াদীঘি হাওরপাড়ের বিরইমাবাদ এলাকায় গিয়ে দেখা যায় এমনই এক ভিন্ন দৃশ্য।

দূর থেকে মনে হয় যেন উৎসব চলছে। মানুষ ব্যস্ত, নৌকা আসছে-যাচ্ছে, ধান তোলা হচ্ছে দ্রুতগতিতে। কিন্তু কাছে গেলেই বোঝা যায়, এ কোনো উৎসব নয়! এ এক নীরব আর্তনাদ, যেখানে প্রতিটি হাসির আড়ালে লুকিয়ে আছে কান্না, আতঙ্ক আর হতাশা।

এ সময় আরও দেখা যায়, হাওরের বুকজুড়ে ছোট ছোট নৌকা ভেসে আসছে পাড়ের দিকে। নৌকা ভিড়তেই কৃষকরা তাড়াহুড়ো করে ধানের আঁটি নামাচ্ছেন। কেউ শুকনো জায়গায় স্তূপ করছেন, আবার কেউ ভেজা ধান বস্তায় ভরছেন। কেউ সেই বস্তা মাথায় তুলে নিয়ে যাচ্ছেন বাড়িতে। যেন সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ফসলটুকু বাঁচানোর শেষ চেষ্টা।

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করছে কৃষি বিভাগ। তখন ক্ষতির আসল পরিমাণ জানা যাবে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জেলার ৭টি উপজেলার হাওরের ২২০০ হেক্টরের বেশি জমির ফসল বিনষ্ট হয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন অন্তত ২০ হাজার কৃষক।

বিরইমাবাদ গ্রামের কৃষক দুলাল মিয়া বলেন, ‘ধান কাটার জন্য এখন শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। একজন শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকা। মজুরি ছাড়াও প্রত্যেক শ্রমিককে ১৫০ টাকা করে যাওয়া-আসার ভাড়া, ধানের আঁটি পাড়ে আনতে নৌকা ভাড়া দিতে হচ্ছে ৫০০ টাকা।’

বিরাইমাবাদ গ্রামের খোকন মিয়া বলেন, ‘কাউয়াদীঘি হাওরের কালাপানি বিল এলাকায় প্রায় ৩০ কিয়ার (১ কিয়ারে ৩০ শতক) জমিতে ব্রি-৯২ জাতের ধান আবাদ করেছিলাম। এখন জমিতে বুকসমান পানি। চাষ, চারা লাগানো, সার, বীজতলার খরচসহ ওই জমি চাষে ৮০ হাজার টাকা খরচ হয়েছিল। সব পানিতে ভেসে গেছে।’

খোকন মিয়ার মতো পারভেজ মিয়ার ২৫ কিয়ার, বাবুল সূত্রধরের ৬ কিয়ার, জয়কুমারের ১০ কিয়ার, শিপন মিয়ার ১৫ কিয়ার পানিতে তলিয়ে আছে।

কৃষক জয়কুমার নৌকা থেকে ধানের আঁটি নামাতে নামাতে বলেন, ‘এই ধান যদি ঘরে তুলতে না পারি, সব শেষ হয়ে যাবে। যা পাইতেছি, তাও ভেজা। শুকাইতে পারব কিনা জানি না।’

জুমাপুর গ্রামের সাহেদ মিয়া জানান, তিনি এ বছর ৩০ কিয়ার জমিতে ধান চাষ করে মাত্র ১০ কিয়ার জমির ধান কাটতে পেরেছেন।

তিনি বলেন, ‘সব ধান পানিতে ডুবে গেছে। প্রতিদিন হাওরে পানি বাড়ছে। এ ছাড়া এমন আবহাওয়ায় বেশি টাকায়ও কেউ পানিতে ধান কাটতে রাজি হচ্ছে না।’

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, ‘হাওরে ঢলের পানি নামছে। পানি কিছু বাড়ছে। এ পর্যন্ত হাওরে ৮৩ শতাংশ এবং হাওরের বাইরে ২৩ শতাংশ ধান কাটা হয়েছে।’

মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খালেদ বিন অলীদ বলেন, ‘জেলার নদনদীর পানি অনেক কমছে। বিপৎসীমার অনেক নিচে। হাওরে অল্প কিছু বাড়ছে। আর ভারী বৃষ্টি না হলে পানি অনেক কমে যাবে। হাওরের নিচের দিকে চার-পাঁচ ফুট পানি। ওপরের দিকে সমস্যা নেই। বৃষ্টি না হলে ধান ওঠানো যাবে।’

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ