লুটেরাদের জন্য নয়, বাজেট হতে হবে জনবান্ধব - জনতার আওয়াজ
  • আজ রাত ১:৩১, শুক্রবার, ২২শে মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৮ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ৫ই জিলহজ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

লুটেরাদের জন্য নয়, বাজেট হতে হবে জনবান্ধব

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: বৃহস্পতিবার, মে ২১, ২০২৬ ১১:৩৮ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: বৃহস্পতিবার, মে ২১, ২০২৬ ১১:৩৮ অপরাহ্ণ

 

জনতার আওয়াজ ডেস্ক
ছবিঃ সংগৃহীত
সরকারের বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে পুরোনো ধারাবাহিকতা রক্ষা না করে জনবান্ধব বাজেট প্রণয়ন করতে হবে। বাজেট যেন লুটেরাদের জন্য না হয়। কর ব্যবস্থাপনাকে শক্তিশালী করা, কর নেওয়ার ক্ষেত্রে অনলাইনে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া, ফেসলেস ব্যবস্থা চালুসহ একাধিক পদক্ষেপ নিয়ে আয় বাড়াতে হবে।

বৃহস্পতিবার (২১ মে) জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ছায়া বাজেট কমিটি আয়োজিত ‘বৈশ্বিক অনিশ্চয়তায় বাংলাদেশের বাজেট: কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও সংস্কারে অগ্রাধিকার এবং জনপ্রত্যাশার বৈষম্যহীন সমৃদ্ধ বাংলাদেশ’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠানের প্রথম সেশনে এসব কথা বলেন বক্তারা। ‘অর্থনৈতিক সংস্কার ও মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তর’ শিরোনামে এই সেশনটির আয়োজন করা হয়।

অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন। স্বাগত বক্তব্য দেন ছায়া বাজেট প্রণয়ন কমিটির প্রধান সংসদ সদস্য ড. আতিক মুজাহিদ। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ছায়া বাজেট কমিটির উপ প্রধান আব্দুল্লাহ আল ফয়সাল।

অনুষ্ঠানে সাবেক অর্থ সচিব এবং সোনালী ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী, কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ ড. খান জহিরুল ইসলাম এবং সিপিডির অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিকুল ইসলাম খান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। সঞ্চালনা করেন এনসিপির ঢাকা মহানগর উত্তরের ভারপ্রাপ্ত সদস্য সচিব সাদিয়া ফারজানা দিনা।

এনসিপির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, “আওয়ামী লীগের সময়ে বাজেট মুখ্য বিষয় ছিল না। সেটি একটি কাগজে দলিল ছিল। সে সময় দেশকে পরিচালনা করতো একটি করপোরেট গোষ্ঠী। তারা দেশের পয়সাগুলোর মালিক ছিল। তাদের হাত ধরেই দেশের পয়সা বিদেশে পাচার হয়েছিল। তারা যে বাংলাদেশের নাগরিক, এখন তারা তাও শিকার করতে চায় না। এখন যখন জবাবদিহিতার সময় এসেছে, তখন তারা দেশের কাছেও জবাবদিহিতা করতে চায় না। তারা নাগরিকত্ব ছেড়ে দিতে চায়। সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা, এবারের বাজেট যেন লুটেরাদের বাজেট না হয়। বাজেট যেন সাধারণ মানুষের জন্য হয়।”

তিনি বলেন, “বাজেট সংসদে সবচেয়ে রুটিন এবং গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা, যার সঙ্গে নাগরিক সম্পৃক্ততা সবচেয়ে বেশি। প্রতিবছর বাজেট আসলে আমরা একটি কথা শুনি, বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য গুরুত্ব দেওয়া হবে এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য বাজেট করা হবে। কিন্তু, পাস হয়ে গেলে আমরা দেখি গতানুগতিক ধারাবাহিকতায় একটি বাজেট হয়েছে।”

ড. আতিক মুজাহিদ বলেন, “আমরা আজকের বাজেট সভা করার আগে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি। আশুলিয়ার শ্রমিক, কাওরান বাজার ও চট্টগ্রামের খাতুন বাজারের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন জায়গার ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলেছি আমরা। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গেও কথা বলেছি। কথা বলে বুঝেছি, দেশের মানুষ সরকারের কাছে দয়া চায় না, তারা একটা ফেয়ারনেস চায়।”

বাংলাদেশের আসন্ন বাজেটের বড় আকার নিয়ে আপত্তি না থাকলেও এর অর্থায়ন ও কাঠামোগত সংস্কারে বড় ধরনের সংকট দেখছেন সাবেক অর্থসচিব মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী। তিনি বলেন, “দেশের কর-জিডিপি অনুপাত অত্যন্ত কম। সরকার যদি স্থানীয় বাজার থেকে ঋণ নেয়, তাহলে নিশ্চিতভাবেই বেসরকারি খাতে ঋণ নেওয়ার খরচ বেড়ে যাবে। ফলে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়ানো খুব কঠিন। যদি সরকার বেসরকারি খাতের জন্য টাকা রাখতে চান, তাহলে বাজারে টাকা ছাপিয়ে ছাড়তে হবে। কম মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে এটা করা যেত। কিন্তু অনেকদিন ধরে আমাদের মুদ্রাস্ফীতির অবস্থা খুব বেশি। ফলে এটা অর্থনীতিতে আরও বেশি বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে।”

তিনি আরও বলেন, “সরকারের কিছু সেফটি নেট প্রোগ্রাম আছে, এটা ভালো। এতে টাকার পরিমাণও সিগনিফিকেন্টলি বেশি। আমাদের ২০টি মন্ত্রণালয়ে এরকম একশোর ওপর প্রোগ্রাম আছে। এই কর্মসূচিগুলোকে যদি একটি ছাতার নিচে এনে ডিজিটালাইজড করা হয়, তাহলে প্রশাসনিক ব্যয় সাশ্রয় হবে এবং উপকারভোগী ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ বাড়ানো যাবে।”

দেশের দেউলিয়া ব্যাংকগুলো বন্ধ বা অবসায়নের মাধ্যমে ব্যাংকের সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনা এবং কর আদায়ে সম্পূর্ণ ‘ফেসলেস’ বা ডিজিটাল ব্যবস্থা চালুর তাগিদ দেন তিনি।

সিপিডির অতিরিক্ত পরিচালক (গবেষণা) তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, “সরকারি অর্থ ও বাজেট ব্যবস্থাপনা আইন-২০০৯ অনুযায়ী, বাজেট শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, এটি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি উপস্থাপন করে। এই আইনের অধীনে অর্থমন্ত্রীর প্রতি তিনমাস পর বাজেটের অগ্রগতি কি হচ্ছে তা পেশ করবেন। এই আইনের ১২(২) ধারা অনুযায়ী যথাসম্ভব মার্চ মাসের মধ্যে সংশোধিত বাজেট পেশ করার নিয়ম থাকলেও তা করা হয় না, যা একটি বড় আইনি ব্যত্যয়।”

বর্তমান সংকটের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, “২০২৩-২৪ অর্থবছরে সরকারের আবর্তক বা চলতি ব্যয় মোট রাজস্ব আয়ের চেয়ে ৪০ হাজার কোটি টাকা বেশি ছিল। এ ঘাটতির কারণে স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতের উন্নয়ন ব্যয় ২৫ শতাংশ কমিয়ে দিতে হয়েছে। এছাড়া বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ কমে চার শতাংশে নেমে এসেছে।” কর ফাঁকি রোধে তিনি এনআইডির মাধ্যমে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, ভূমি ও গাড়ি রেজিস্ট্রেশন যুক্ত করে একটি সমন্বিত ডিজিটাল কর ব্যবস্থার প্রস্তাব করেন।

তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, “গত দুই দশক ধরে এনবিআর সংস্কারের কথা শুনছি। কিন্তু, মূল হলো বাস্তবায়ন। এনবিআর সংস্কার যে পিছিয়ে যাচ্ছে, আমার মনে হয় তা আবার সংসদে আসবে। তার বড় কারণটাই হলো, এনবিআরের সংগ্রহ ও পলিসি জায়গা একইসঙ্গে। ফলে এখানে স্বার্থের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়।”

অর্থনীতিবিদ ড. খান জহিরুল ইসলাম বলেন, “পৃথিবীর যেকোনো দেশের ব্যাংকিং সেক্টর অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। আমাদের দেশের ব্যাংকিং খাত ধ্বংসপ্রাপ্ত। এর সমস্যাগুলো কী? আমাদের আগামী বছরের প্রস্তাবিত বাজেট ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। বাংলাদেশে বাংলাদেশে কেবল খেলাপি ঋণের পরিমাণই ছয় লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। তাহলে খেলাপি ঋণ না থাকলে আমাদের বাজেট বাস্তবায়ন কোথায় নিয়ে যাওয়া যেত, ভাবুন।”

তিনি আরও বলেন, “কেবল এস আলম গ্রুপ দেশ থেকে মোট এক লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা পাচার করেছে। আগামী বাজেটে সরকার এডিপিতে যে বাজেট রেখেছে, তার সমান। বর্তমান সরকার ব্যাংক রেজ্যুলেশন অ্যাক্ট সংশোধন করে পুরোনো মালিকদের আবার মালিকানা ফেরত নেওয়ার সুযোগ দিয়েছে। সরকার আবার লুটেরাদের সুযোগ করে দিচ্ছে। দ্বিতীয়ত কেন্দ্রীয় ব্যাংকিং, প্রধানমন্ত্রী একজন অ্যাকাউন্টেন্টকে নিয়ে গভর্নরের পদে বসিয়েছেন। পৃথিবীর কোথাও এটা নেই। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একজন অ্যাকাউন্টেন্টের কোনও কাজ নেই।”

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ