নড়িয়ায় পদ্মার ভয়াবহ ভাঙন ৪ বছরে ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয়া হয়নি - জনতার আওয়াজ
  • আজ সকাল ৭:১৭, রবিবার, ১৭ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩রা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ৩০শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

নড়িয়ায় পদ্মার ভয়াবহ ভাঙন ৪ বছরে ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয়া হয়নি

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ১, ২০২২ ৩:০০ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ১, ২০২২ ৩:০০ অপরাহ্ণ

 

শরীয়তপুর প্রতিনিধি ॥ শরীয়তপুরের নড়িয়ায় ২০১৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সর্বনাশা পদ্মা নদীর ভয়াবহ ভাঙ্গনে প্রায় ১০ হাজার ৬শ পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হয়। নদীভাঙনে ফসলি জমি ও বসতভিটা বিলীন হয়ে গেছে। কোন রকমে খুপড়ি ঘর বানিয়ে, অন্যের বাগনে, আবার কারও পরিত্যাক্ত জমিতে বাস করছেন গৃহহীন ,ভুমিহীন পরিবার গুলো ।তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণের পর শরীয়তপুরের নড়িয়ায় পদ্মার ভাঙন থেমেছে বটে। তবে ঐ ভাঙনের শিকার গৃহহীন পরিবারগুলো মহাকষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। গত ৪ বছরেও তাদের পুনর্বাসনের কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ৩ হাজার পরিবার খুপড়ি ঘরে বসবাস করছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
শরীয়তপুরের পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় সুত্রে জানা যায়, পদ্মা নদীর তীরে নড়িয়া উপজেলার মোক্তারের চর, নড়িয়া পৌরসভা, কেদারপুর, ঘড়িসার, চরআত্রা ও নওপাড়া ইউনিয়ন অবস্থিত। ২০১৫ সাল থেকে নড়িয়ার বিভিন্ন এলাকায় পদ্মা ভয়াবহ ভাঙনের কবলে পড়ে। ২০১৫ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ভাঙনে অন্তত ১০ হাজার ৬ শ পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে যায়। এর মধ্যে ২০১৮ সালের ভাঙন ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ। ঐ বছরই প্রায় সাড়ে ৫ হাজার পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়ে। সে বছর পদ্মা নদীতে বিলীন হয় তিনটি বাজারের সাড়ে ৬ শ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। আরও বিলীন হয় নড়িয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স মূল ভবন সহ তিনটি দ্বিতল ভবন। ২০১৯ সালে ভাঙন রোধে প্রকল্পের কাজ শুরু করে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। ১ হাজার ৯৭ কোটি টাকায় ৮ কিলোমিটার পদ্মা নদীর ডান তীর রক্ষা বাঁধ ও ১১ কিলোমিটার এলাকা ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে চর খননের কাজ শুরু করে। ওই প্রকল্পের ব্যয় ও সময় বেড়ে হয়েছে ১ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা। আর পদ্মা নদীর উত্তর তীরের চরআত্রা ও নওপাড়া এলাকায় ২০২০ সালে ৫৫০ কোটি টাকার আরেকটি প্রকল্পের কাজ শুরু হয় । নড়িয়া উপজেলা সদরে আরেকটি হাসপাতাল নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে। নানা অনিয়মের কারনে সে কাজ ও বর্তমানে বন্ধ রয়েছে।
২০১৯ সালের পর নড়িয়ায় পদ্মার ভাঙন থেমেছে বটে। কিন্তু ১০ হাজার ৬ শ গৃহহীন পরিবারকে পুনর্বাসনের কোনো উদ্যোগ নেয়নি স্থানীয় প্রশাসন। গৃহহীন পরিবারগুলোর মধ্যে অনেকে এলাকা ছেড়ে চলে গেছে অন্যত্র। কারও কারও আশ্রয় হয়েছে ঢাকার বিভিন্ন বস্তিতে। অনেকে বিভিন্ন ফসলি জমি ভাড়া নিয়ে খুপড়ি ঘর তুলে বসবাস করছে।সরে জমিনে গিয়ে জানা যায়, নড়িয়ার বিভিন্ন সড়কের পাশে, ফসলি জমিতে ও বাগানে প্রায় ৩ হাজার পরিবার জমি ভাড়া নিয়ে ছুপড়ি ঘর বানিয়ে বসবাস করছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান বলেন, নদীভাঙনের পর অনেক পরিবারকে ঘর নির্মাণের টিন দেওয়া হয়েছিল। মানুষ তো জমি হারিয়েছে, জমি না পেলে তারা ঘর তুলবে কোথায় ? স্থানীয় প্রশাসন গৃহহীনদের খাসজমি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কিন্তু তা এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
কেদারপুর ইউনিয়নের চর জুজিরা গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন আলামিন আকন ও সুফিয়া আক্তার আক্তার দম্পতি। তাদের ১৪০ শতাংশ ফসলি জমি ও ২০ শতাংশের বসতবাড়ি ছিল। কৃষিকাজ ও গবাদিপশুর খামার করে তাদের সংসার চলত। ২০১৫-১৮ সাল পর্যন্ত তিন দফা ভাঙনে তাদের ফসলি জমি ও বসতবাড়ি বিলীন হয়ে যায়। পরিবারের ৬ সদস্য নিয়ে তারা আশ্রয় নেন কেদারপুরের লস্কর বাড়ির বাগানে।
সুফিয়া আক্তার বলেন, স্বামী-সন্তান নিয়ে সুখেই ছিলাম। পদ্মার ভাঙনে নিঃস্ব হয়ে রাস্তায়-রাস্তায় ঘুরছি। স্বামী মাটি কাটার শ্রমিকের কাজ করেন। আর আমি গ্রামে ঘুরে সেলাইয়ের কাজ করি। পরিবারের ৬ সদস্য নিয়ে অনেক কষ্টে দিন কাটাচ্ছি।
কেদারপুরের বাসিন্দা মকবুল বাছার স্থানীয় মুলফতগঞ্জ বাজারের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ছিলেন। ২০ শতাংশ জমির ওপর ছিল তার বসতবাড়ি। ২০১৯ সালের ভাঙনে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়ি পদ্মায় বিলীন হয়। নিঃস্ব মকবুল গ্রামের একটি বাগানে আশ্রয় নেন। হাটবাজারে ঝালমুড়ি বিক্রি করে পরিবারের পাঁচ সদস্য নিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন।
মকবুল হোসেন বলেন, জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে এমন অসহায় হয়ে পড়বো ভাবতেও পারিনি। কেউ আমাদের পাশে দাড়ায় না। আমাদের কথা ভাবে না। মরার পর একটু মাটিও পাব না।
কেদারপুর ইউনিয়ন পরিয়দের চেয়ারম্যান মিহির চক্রবর্তী বলেন, আমার ইউনিয়নের ১ নং ও ২ নং ওয়ার্ড পুরোপুরি ও ৩ নং ওয়ার্ডেও আংশিক পদ্মা নদীর ভয়াবহ ভাংগনের কবলে পড়ে বিলীন হয়ে গেছে। লস্করদের বাগানে ৩০ টি পরিাবার সহ তারা বিভিন্ন জায়গায় আশ্রয় নিয়েছে। পূর্নবাসনের জন্য সরকারী খাস জমি না থাকায় তাদের পূর্নবাসন করা যাচ্ছে না।
মোক্তারের চর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন বাদশা শেখ বলেন, আমার ইউনিয়নের ঈশ^রকাঠি,চেরাগআলী বেপারী কান্দি ও শেহের আলী মাদবর কান্দি গ্রামের অধিকাংশ জায়গা-জমি পদ্মা নদীর ভাংগনে বিলীন হয়ে গেছে। সেখানে প্রায় সাড়ে ৫ শ পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়েছে। তারা বিভিন জায়গায় আশ্রয়কেন্দ্রের মত অন্যদের জমি নিয়ে খুপড়ি ঘর করে কষ্ট করে বসবাস করছেন। সাবেক চেয়ারম্যানের আমলে ১৪৫ টি ঘর বরাদ্ধ দেওয়া হয়ে ছিল। তার মধ্যে ৪৫ টি ভাংগনের ক্ষতিগ্রস্থদের দেওয়া হয়েছিল।
নড়িয়া উপজেলার প্রকল্প বাসÍবায়ন কর্মকর্তা মোঃ আহাদী হোসেন বলেন, নদী ভাংগনে গৃহহীন সাড়ে ৫ হাজার পরিবারকে পূর্নবাসন করা সম্ভব না। যারা একেবারেই হতদরিদ্র, গরীব তাদেরকে টিন ও গৃহ নির্মানের জন্য নগদ টাকা প্রদান করা হয়েছে।
নড়িয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ রাশেদুজ্জামান বলেন, ভাঙনে যারা ভ’মিহীন হয়েছে, তাদের যাছাই বাছাই করে টিন ও প্রধানমন্ত্রীর আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর দেওয়া হবে। তবে কত লোক ভাঙ্গনে গৃহহীন হয়েছে, তা আমি এখন বলতে পারবো না।
মোঃ আবুল হোসেন সরদার

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ