“সহিংসতা এবং দোষারোপের রাজনীতি”
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ৬, ২০২২ ৭:৪৪ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ৬, ২০২২ ৭:৪৭ অপরাহ্ণ

আগুন-সন্ত্রাস: ক্ষমতা দখলে রাখতে এবং ক্ষমতায় টিকে থাকতে আওয়ামী লীগের দ্বিধারী অস্ত্র
আপনারা নিশ্চয়ই উপলব্ধি করতে পারছেন বাংলাদেশ বর্তমানে এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। গণতান্ত্রিক অধিকার, বিশেষ করে ভোটাধিকার থেকে জনগণকে বঞ্চিত করে আওয়ামী লীগ একদলীয় স্বৈরশাসনের যে পথ বেছে নিয়েছে, মূলত তা থেকেই দেশে আজ এই অচলাবস্থার উদ্ভব।
২০০৮ সালে প্রশ্নবিদ্ধ জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসে। এরপর ২০১১ সালে জোরপূর্বক ক্ষমতায় টিকে থাকার অশুভ উদ্দেশ্যে দলটি সংবিধান অনুমোদিত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার বিধান বাতিল করলে এই সংকটের শুরু হয়। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, এই আওয়ামী লীগই ১৯৯৪-১৯৯৬ সাল পর্যন্ত সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করতে ১৭০ দিনের সহিংস আন্দোলনে লিপ্ত ছিল।
২০১৩ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলসমূহ নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবিতে গণতান্ত্রিক চর্চার অংশ হিসেবে দেশব্যাপী শান্তিপূর্ণ গণআন্দোলনের ডাক দেয়। বিএনপি’র এই ডাকে সাড়া দিয়ে জনগণ শান্তিপূর্ণ হরতাল পালন করে। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার জনগণের ডাকে কোনো কর্ণপাত করেনি। উপরন্তু তারা এই গণদাবি উপেক্ষা করে ২০১৪ সালে রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের অনুপস্থিতিতেই একপেশে প্রহসনের নির্বাচনের আয়োজন করে, যেখানে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আওয়ামী লীগের ১৫৩ জনকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য দেখানো হয়। সরকার গঠনের জন্য দলীয় ১৫১ জন নির্বাচিত সংসদ সদস্যের প্রয়োজন হয়। যা হোক জনগণ সেই প্রহসনের নির্বাচন বর্জন করে। এই নির্বাচনকে আওয়ামী লীগ কেবলমাত্র নির্বাচনী রেওয়াজ মেনে চলার অংশ হিসেবে ঘোষণা দিয়ে পরবর্তীতে গণভবনে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেনে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা শীঘ্রই নতুন নির্বাচন হবে মর্মে প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার সে প্রতিশ্রুতি ভংগ করে এবং নতুন নির্বাচন আর অনুষ্ঠিত হয়নি।
পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনা একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন উপহার দেয়ার অঙ্গীকার করলে ২০১৮ সালে বিএনপিসহ অনেক রাজনৈতিক দল তার অধীনে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। কিন্তু এই নির্বাচনে ব্যাপক ব্যালট কারচুপির ঘটনা ঘটে। নিশিরাতের ভোটডাকাতির নির্বাচন খ্যাত ২০১৮ সালের সেই নির্বাচনের আগের রাতে আওয়ামী লীগের পক্ষে প্রশাসন ও পুলিশ কর্মকর্তাদের ব্যালট বক্স ভর্তির অভিযোগ ওঠে। সকল আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম সেই নির্বাচনকে প্রহসন হিসেবে অভিহিত করে। “গণতন্ত্রের মৃত্যু: বাংলাদেশ” শিরোনামে দি ইকোনমিস্ট লিখেছে, “পরিষ্কারভাবে এটি একটি জালিয়াতির নির্বাচন”।
অবৈধ সরকারের পদত্যাগ, নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং একটি অংশগ্রহণমূলক স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের দাবিতে ২০১৪ ও ২০১৫ সালে বিরোধী রাজনৈতিক জোট বিএনপি’র নেতৃত্বে শান্তিপূর্ণ হরতাল পালন করে। এই হরতালের সময় আওয়ামী লীগ সরকার ভয়াবহ নাশকতার আশ্রয় নেয়, নিজেরাই গণপরিবহনে বোমাবাজি ও আগুন সন্ত্রাস করে। এর দায় বিএনপি’র ওপর চাপাতে চেষ্টা করে। গণমাধ্যমে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন থেকে এটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট যে এই আগুন সন্ত্রাসের মূল হোতা আওয়ামী লীগ নিজেই। এ বিষয়ে প্রকাশিত পুস্তিকায় এসব ঘটনার সচিত্র তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। পুস্তিকাটি ইতোমধ্যে আপনাদের হাতে পৌঁছেছে বলে আমার বিশ্বাস।
আওয়ামী লীগ নেতারাই স্বীকার করেছেন যে দলীয়প্রধান শেখ হাসিনার অনুগ্রহ লাভে কিছু নেতা মানুষ পুড়িয়ে হত্যা করে বিএনপি’র ওপর এর দায় চাপায়। ২০১৭ সালের ২৩ মে মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বরিশাল জেলা । পরিষদ প্রশাসক মাইদুল ইসলাম এমন একটি ঘটনার কথা জানান। মাইদুল বলেন, ২০১৩ সালের ২ ডিসেম্বর, ঢাকার শাহবাগে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা ও বরিশাল- ৪ হিজলা, মেহেন্দিগঞ্জ আসনের সংসদ সদস্য পংকজ দেবনাথ ‘বিহঙ্গ পরিবহন’ নামে নিজস্ব বাসে আগুন দিলে বাসের চালকসহ ১১ জন নির্মমভাবে আগুনে পুড়ে মারা যান। কিন্তু এ ঘটনায় আওয়ামী লীগের কোনো নেতা-কর্মীকে আসামী করা হয়নি। উল্টো বিএনপির ওপর এর দায় চাপিয়ে বিএনপির অনেক নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়।
বলা বাহুল্য, আওয়ামী লীগ যখন বিরোধী দলে ছিল তখনও এর নেতাকর্মীরা নিরপরাধ শিশু, নারী- পুরুষদের আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করে; লাঠি দিয়ে পিটিয়ে সাপের মতো হত্যা করে বিরোধী রাজনৈতিক কর্মীদের লাশের ওপর নৃত্য করে নিজেদের পৈশাচিক অভিলাশ চরিতার্থ করতে।
শুক্রবার, ৪ জুন, ২০০৪, রাত ৮:৩০ টায়, রাজধানী ঢাকার শেরাটন হোটেলের সামনে, পরের দিন নির্ধারিত বিরোধী রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের হরতাল কর্মসূচি উপলক্ষ্যে, বিআরটিসির একটি যাত্রী ভর্তি ডাবল ডেকার বাসে আগুন ধড়িয়ে দেয়া হয়। এতে শিশু, নারী ও পুরুষসহ ১১ জন যাত্রী তাৎক্ষণিকভাবে পুড়ে ছাই হয়ে যায়। অন্যরা জীবনের জন্য পংগু বা ভয়ঙ্কর স্মৃতি বহন করে। পরে তদন্তে জানা যায়, গান পাউডার ছিটিয়ে বাসটিতে আগুন লাগানো হয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন বর্বরতা আগে কখনো দেখা যায়নি। আওয়ামী লীগের কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা এই ঘটনার সাথে জড়িত ছিলেন। এক এগারোর সরকারের সময় আওয়ামী লীগ এর প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ সেলিম তাদের কয়েকজন নেতার এ ধরনের নৃশংসতায় সংশ্লিষ্টতার কথা স্বীকার করেন।
এ ঘটনাপ্রবাহ থেকেই প্রতীয়মান হয় যে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ আগুন সন্ত্রাসকে দ্বিধারী তরবারি হিসেবে ব্যবহার করছে। যখন বিরোধী দলে ছিল তখন আগুন সন্ত্রাসের মাধ্যমে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করে রাজনৈতিক ফায়দা লুটে দলটি। আর যখন ক্ষমতায়, তখন দলীয় নেতা ও রাষ্ট্রীয় বাহিনী কর্তৃক এ আগুন সন্ত্রাসের দায় বিএনপি’র ওপর চাপিয়ে বিএনপি’র ভোটাধিকার আদায়ের গণতান্ত্রিক সংগ্রামকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে মরিয়া দলটি। গণতন্ত্রের সপক্ষের কর্মীদের দমন করতে এরা মিথ্যা মামলা, গণগ্রেফতার, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে কেবল নিজেদের ফ্যাসিস্ট শাসনকে দীর্ঘায়িত করতে।
আগুন সন্ত্রাসের মতো আওয়ামী নেতাকর্মীরা দেশব্যাপী সংখ্যালঘুদের ওপরও নৃশংস হামলা চালায়, তাদের উপাসনালয়ে অগ্নিসংযোগ করে, জমি এবং ঘরবাড়ি দখল করে শুধু বিএনপি’র ওপর এর দায় চাপানোর রাজনৈতিক হীন উদ্দেশ্যে। বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে কক্সবাজারের রামু, ব্রাম্মনবাড়িয়ার নাসিরনগর ও গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের সাঁওতাল পল্লীসহ সারাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর ও উপাসনালয়ে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের নাম সামনে এসেছে।
বাংলাদেশ হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের নেতা এ্যাডভোকেট রানা দাস গুপ্ত এবং মানবাধিকার নেত্রী সুলতানা কামাল যে ২০১৫ সালে সংবাদ সম্মেলন করেছিলেন তাতে তারা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জমি, ব্যবসা এবং বাড়িঘর দখলে সরকারি ব্যক্তিদের যোগসাজসের অভিযোগ করেন। অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন শেখ হাসিনার মেয়ে পুতুলের শশুর ও আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ঠাকুরগাঁও-২ আসনের আওয়ামী লীগ সংসদ সদস্য দবিরুল ইসলাম, পিরোজপুর-১ আর আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য এ কে এম আওয়ালসহ অন্যান্যরা। বিরোধী মতাবলম্বী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা, জোরপূর্বক গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড চালিয়ে এবং তাদের অপকর্মের দায় বিরোধী দলের ঘাড়ে চাপিয়ে গণতন্ত্র ও ভোটাধিকারের সংগ্রামকে বাধাগ্রস্ত করা আওয়ামী লীগের পুরাতন খেলা ।
আমাদের আশঙ্কা, দেশব্যাপী বিএনপি’র শান্তিপূর্ণ ব্যাপক প্রতিবাদ সমাবেশ দেখে এই ফ্যাসিস্ট সরকার তাদের সেই পুরনো কাপুরুষোচিত খেলার পুনরাবৃত্তি করতে আবারও মরিয়া হয়ে উঠেছে। এরই মধ্যে নিজেদের দলীয় কার্যালয়ে ভাংচুর, অফিসের সামনে বোমা পেতে রেখে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে থানায় থানায় মিথ্যা ও বানোয়াট মামলা দায়ের করতে শুরু করেছে। আগষ্ট ২০২২ হতে ০৫ ডিসেম্বর ২০২২ পর্যন্ত সারা বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় এধরনের গায়েবী ও মিথ্যা মামলা দায়ের হয়েছে ৩২৮ টি, গ্রেফতার করেছে ৯৯৭ জনকে এবং মোট আসামী করা হয়েছে ৩৪,৫৫৩ জনকে (যেখানে নাম ধরে আসামী করা হয়েছে ১০,৩৮০ জনকে এবং বেনামে আসামী করা হয়েছে ২৪,১৭৩ জনকে)। এছাড়া হাজার হাজার বিএনপি’র নেতাকর্মী এখনো জেলে ধুকে ধুকে মরছে।
এই আন্দোলন যত বেগবান হবে তাদের এই ফ্যাসিস্ট কর্মকান্ড আরো বেশি বেগবান হবে বলে আমাদের আশংকা। আওয়ামী লীগের হোতারা ২০১৪-১৫ সালের মতো আবারও অগ্নিসংযোগ চালিয়ে চলমান গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামকে বাধাগ্রস্ত করে। বিএনপি’র কাঁধে তার দায় চাপাতে আবারও তৎপর হয়ে উঠেছে। এ বিষয়ে আমরা দেশবাসী, গণমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সতর্ক ও সজাগ দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
আওয়ামী সন্ত্রাসীরা যাতে কোনো ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বা কোনো ধরনের নাশকতা করে জনগণের জানমালের ক্ষতি না করতে পারে সেজন্য আমরা বিএনপি নেতাকর্মী ও সমর্থকদের সদা সজাগ থাকার আহবান জানাচ্ছি। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপি এখন গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রামে লিপ্ত রয়েছে। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের কোনো ষড়যন্ত্রই জনগণের ভোটাধিকারের অধিকার প্রতিষ্ঠার এ আন্দোলনকে স্তিমিত করতে পারবে না ইন-শা- আল্লাহ। ষড়যন্ত্র কখনোই সফল হয় না। জনতার বিজয় অনিবার্য।
জনতার আওয়াজ/আ আ