বিদায়ী ২০২২ সালে বিচার বহির্ভূতভাবে ১৯ জন হত্যার শিকার : আসক
নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ:
শনিবার, ডিসেম্বর ৩১, ২০২২ ৭:১৮ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ:
শনিবার, ডিসেম্বর ৩১, ২০২২ ৭:১৮ অপরাহ্ণ

বিদায়ী ২০২২ সালে সারা দেশে বিচার বহির্ভূতভাবে ১৯ জন হত্যার শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছে আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)। এর মধ্যে র্যাব সদস্যদের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে প্রাণ গেছে চারজনের। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে প্রাণ হারিয়েছেন ১৫ জন।
আসক বলছে, হেফাজতে মৃত্যুর মধ্যে গ্রেপ্তারের পর শারীরিক নির্যাতনে চারজন, হার্ট অ্যাটাকে একজন, গ্রেপ্তারের আগে শারীরিক নির্যাতনে চারজন, থানা হেফাজতে আত্মহত্যা করেছেন দুজন এবং অসুস্থ হয়ে মারা গেছেন চারজন।
আজ শনিবার রাজধানীর লালমাটিয়ায় আসক কার্যালয়ে ২০২২ সালে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে পর্যবেক্ষণ বিষয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনের লিখিত বক্তব্যে এসব তথ্য জনানো হয়।
আসকের প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকার গুমের ঘটনা বারবার অস্বীকার করলেও ২০২২ সালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে অপহরণ, গুম ও নিখোঁজের শিকার হয়েছিলেন পাঁচজন। এর মধ্যে পরবর্তী সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী চারজনকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে এবং ফিরে এসেছেন একজন।
বছরজুড়ে ২২৬ জন সাংবাদিক বিভিন্নভাবে নির্যাতন, হয়রানি ও হুমকির মুখে পড়েছেন। কুমিল্লায় দুর্বৃত্তের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন এক সাংবাদিক। পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় হামলা হয়েছে ৭৯ জন সংবাদকর্মীর ওপর। এ ছাড়া হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে ১২টি। সারা দেশে ধর্ষণ ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৯৩৬ জন নারী। এর মধ্যে ধর্ষণ-পরবর্তী হত্যার শিকার হয়েছেন ৪৭ জন। ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছেন ৭ জন।
২০২২ সালে নির্যাতনে মারা গেছে ৫১৬ জন শিশু, ধর্ষণের শিকার হয়েছে ৫৬০ জন শিশু। এবং বলাৎকারের শিকার হয়েছে ৫২ জন ছেলেশিশু। এর মধ্যে ৩৪ জন ছেলেশিশু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে (মাদ্রাসা) বলাৎকারের শিকার হয়েছে। এ বছর বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে ১৬ জনসহ মোট ২৩ বাংলাদেশির প্রাণ গেছে। গণপিটুনিতে নিহত হয়েছেন ৩৬ জন।
বিদায়ী বছরে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহারের বিষয়ে আসক বলছে, বছরের শুরুতে আইনমন্ত্রী বলেছিলেন, কারো বিরুদ্ধে মামলা হলে তদন্তের জন্য নির্ধারিত সেলে পাঠাতে হবে এবং কোনো সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা হলে সঙ্গে সঙ্গে গ্রেপ্তার করা যাবে না। তবুও এ আইনে মামলা ও গ্রেপ্তার অব্যাহত আছে। বিভিন্ন সময়ে সংশোধন আনার আশ্বাস দেয়া হলেও এখনো কোনো অগ্রগতি নেই।
আট বিভাগের মধ্যে শুধু ঢাকা, রাজশাহী ও চট্টগ্রামে ডিজিটাল আইনে দুই হাজার ২৪৯ টি মামলা হয়েছে জানিয়ে আসকের মত- এ আইনের অপব্যবহার মত প্রকাশের ক্ষেত্রে রীতিমতো আতঙ্ক তৈরি করছে। এছাড়া সমবেত হওয়া এবং প্রতিবাদ করার সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে বলে আসকের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।
শান্তিপূর্ণ সভা- সমাবেশ করার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দল ও সাধারণ মানুষকে নানামুখী প্রতিকূলতার শিকার হতে হচ্ছে। এ বছর সারা দেশে ৩৬ বার ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে, যার মধ্যে শুধু চট্টগ্রামেই ১২ বার। বিএনপির নেতা-কর্মীরা সমাবেশ করতে বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন বলেও সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
বিদায়ী বছরে স্থানীয় সরকার নির্বাচনসহ রাজনৈতিক ৪৭৯টি সহিংসতার ঘটনায় নিহত হয়েছে ৭০ জন, আহত প্রায় ছয় হাজার ৯১৪ জন। সবচেয়ে বেশি নিহতের ঘটনা ঢাকা জেলায়। এ ছাড়া ১ থেকে ১৫ ডিসেম্বর সারা দেশে পুলিশের ৩৩ হাজার ৪২৯টি অভিযানের ২৩ হাজার ৯৬৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই অভিযানে বিএনপির বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মীর নামে গায়েবি মামলা দেওয়া হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয় সংখ্যাগত দিক থেকে ২০২১ সালের চেয়ে ২০২২ সালে মানবাধিকার পরিস্থিতি ভালো মনে হলেও ভেতরে বিভীষিকাময় পরিস্থিতি। এ সময় দেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি উন্নতির জন্য আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পক্ষ থেকে ১৪টি সুপারিশ জানানো হয়। যার মধ্যে আছে- এ পর্যন্ত সংঘটিত সব বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ তদন্তে নিরপেক্ষ কমিশন গঠন করে ন্যায় বিচার নিশ্চিত করতে হবে। শান্তিপূর্ণ সভা-সমাবেশের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া এবং সংশোধন না হওয়া পর্যন্ত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা গ্রহণ না করার নির্দেশনা দেয়া।
এ সময় সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের গুমের শিকার বিএনপির নেতার বাসায় মার্কিন রাষ্ট্রদূতের যাওয়ার বিষয়টিকে আসকের পক্ষ থেকে ইতিবাচক হিসেবে দেখা হচ্ছে বলে জানানো হয়। আরও বলা হয়, যেসব গোপন কারাগারের কথা শোনা যাচ্ছে, সেগুলো অবিলম্বে বন্ধ করা উচিত এবং যারা যারা এ কাজের সঙ্গ যুক্ত তাদের বিচারের মুখোমুখি করা প্রয়োজন।
প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক নুর খান লিটনের উপস্থিতিতে ‘বার্ষিক মানবাধিকার পরিস্থিতি’ উপস্থাপন করেন পরিচালক (প্রোগ্রাম) নীনা গোস্বামী ও জ্যেষ্ঠ সমন্বয়ক আবু আহমেদ ফয়জুল কবির। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারিত সংবাদ এবং আসকের তথ্যানুসন্ধানের ভিত্তিতে প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।
জনতার আওয়াজ/আ আ