গণমিছিলের বার্তা : আমিরুল ইসলাম কাগজী - জনতার আওয়াজ
  • আজ রাত ১১:২৮, বুধবার, ১৩ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৩০শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৬শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

গণমিছিলের বার্তা : আমিরুল ইসলাম কাগজী

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: রবিবার, জানুয়ারি ১, ২০২৩ ৬:১৮ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: রবিবার, জানুয়ারি ১, ২০২৩ ৬:১৮ অপরাহ্ণ

 

সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
এক।
তিরিশে ডিসেম্বর ঢাকার রাজপথ ছিলো জনতার দখলে। জনতার ঘাড়ে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসা অবৈধ সরকার পতনের শপথ নিতে নগরী জেগে ওঠে প্রাণের স্পন্দনে। মোড়ে মোড়ে ‘হঠাও হাসিনা, বাঁচাও দেশ, স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক, ঠাই নাই ঠাই নাই ভোট চোরের ঠাই নাই, ,এই মুহুর্তে দরকার তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ — এমন সব শ্লোগানে মুখোরিত ছিলো গণমিছিল। রাজধানীর নয়াপল্টন, শাপলাচত্বর, পল্টন মোড়, কাকরাইল, মালিবাগ, মগবাজার, যেদিকে দুচোখ যায় কেবল মানুষ আর মানুষ। এ যেন গণমিছিল নয়, এটা ছিলো জনতার সুনামি। নারী-পুরুষ, যুবা-বৃদ্ধ, তরুন-তরুনী, রিকশাচালক, ভ্যানচালক, মুটে-মজুর, শ্রমিক-কৃষক, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ রঙবেরঙের ব্যানার-ফেস্টুন নিয়ে সবাই এসেছিলো তাদের প্রাণের দাবি নিয়ে। ভোটের অধিকার চাই। এখানে বিএনপি কেবল বংশীবাদকের ভূমিকা পালন করেছে। মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জেলখানায়, কি আসে যায় তাতে, ড. মোশাররফ হোসেন আছেন, আছেন গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, নজরুল ইসলাম খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, আমান উল্লাহ আমান তাতেই চললো মিছিল। আগামীতে তারাও হয়তো চলে যাবেন কারাগারে কিন্তু যে জনতা আজ জেগে উঠেছে তাদের দমাবে কে? এ গণমিছিল যেন সেই বার্তাই দিলো যাতে আছে পরিবর্তনের আভাস।
দুই।
তিরিশ ডিসেম্বর ঢাকার রাজপথের গণমিছিলের মুখগুলো দেখে আমার মনে পড়ে গেল হার্ভাড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এরিকা চেনোওয়েথ এবং তার সহযোগী গবেষক মারিয়া স্টেফান-এর একটি গবেষণার কথা । তারা দুজন ১৯০০ সাল হতে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিশ্বে যেসব প্রতিবাদ-বিক্ষোভ হয়েছে, যেগুলোর তথ্য উপাত্ত নিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন। এই গবেষণার শেষে তারা এমন উপসংহারে পৌঁছেছেন যে, সহিংস আন্দোলনের চাইতে অহিংস গণআন্দোলনের সাফল্যের সম্ভাবনা দ্বিগুণ।
অধ্যাপক চেনোওয়েথ বলছেন, যখন কোন আন্দোলনে সহিংসতা হয় তখন সেটা সে আন্দোলনের ভিত্তি দুর্বল করে দেয়।
অহিংস আন্দোলনে অনেক বেশি মানুষ যোগ দিতে আগ্রহী হয়। কারণ অহিংস আন্দোলনে ঝুঁকি কম। এরকম আন্দোলনে যোগ দেয়ার জন্য খুব বেশি শারীরিক সক্ষমতা দরকার হয় না। এর জন্য কোন প্রশিক্ষণও দরকার হয় না। এরকম আন্দোলনের জন্য সময় দিতে হয় কম এবং এসব কারণে অহিংস আন্দোলন সবসময় অনেক বেশি মানুষকে আকর্ষণ করে। যেমন নারী, শিশু, বয়স্ক এবং প্রতিবন্ধীরাও এরকম আন্দোলনে যোগ দেয়।
তিন।
ইতিহাসের পাতা থেকে দেখা যায়, ১৭৮৯ সালে এমনই এক স্বতঃস্ফূর্ত গণমিছিলে পতন ঘটেছিল বাস্তিল দূর্গের। সেদিন ফ্রান্সের গ্রামের কৃষক শহরের নিম্ন আয়ের মানুষ যারা স্বৈরশাসকের জাতাকলে নিষ্পেষিত তাদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠে সেই আন্দোলন। ১৯৯০ সালে এমন গণমিছিলে পতন ঘটেছিলো রুমানিয়ার ২০ বছরের স্বৈরশাসক চচেস্কু সরকারের। একই বছর মস্কোর লেনিনগ্রাদের নিয়ন্ত্রন চলে যায় জনতার হাতে। রশি দিয়ে টান মেরে নামানো হয় লেনিনের মূর্তি। ১৯৮০’র দশকে কমিউনিস্ট শাসনামলের পোল্যান্ডে হয়েছিল লেস ওয়ালেসের নেতৃত্বে সলিডারিটি আন্দোলন। এর নেতৃত্বে ছিল শ্রমিকদের ইউনিয়নগুলো। দক্ষিণ আফ্রিকায় দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে কারাবন্দি জাতীয়তাবাদী নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার নেতৃত্বে চলেছে বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলন। চিলির স্বৈরশাসক অগাস্তো পিনোশের পতন ঘটেছিল গণআন্দোলনের মুখে। সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট স্লোবোদান মিলোসেভিচকে ক্ষমতা থেকে সরানো হয় সফল আন্দোলনের মাধ্যমে। একেবারে অতি সাম্প্রতিককালের উদাহারণও আছে। তথাকথিত আরব বসন্তের সূচনা হয়েছিল তিউনিশিয়ায় স্বৈরশাসক জিনে আল-আবেদিন বেন আলীকে ক্ষমতা থেকে সরানোর মাধ্যমে। সেখানে এই গণঅভ্যুত্থানের নাম দেয়া হয়েছিল ‘জাসমিন বিপ্লব।’
চার।
দেখা যাচ্ছে গণসমাবেশ,গণঅবস্থান ধর্মঘট,গণমিছিলের মতো অহিংস আন্দোলনে সাফল্যের হার দ্বিগুণ। বলতে দ্বিধা নেই বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সুদূর প্রবাসে বসে সরকার পতনের লক্ষে আন্দোলনের তেমন পথটি বেছে নিয়েছেন। তার নির্দেশে নিত্যপণ্য ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদ, সীমাহীন দুর্নীতি-লুটপাটের বিরুদ্ধে জনমত গঠন এবং জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালীন দলনিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন নবপর্যায়ে শুরু হয়। সেই আন্দোলনের শুরুতেই ৩১ জুলাই ভোলায় শান্তিপূর্ণ মিছিলে গুলি চালিয়ে ছাত্রদল নেতা নূরে আলম ও স্বেচ্ছাসেবক দলের আবদুর রহিমকে হত্যা করে। এর কয়েকদিন পর বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে নারায়ণগঞ্জে শোভাযাত্রায় উদ্দেশ্যমূলকভাবে গুলি চালিয়ে শাওন প্রধানকে হত্যা করে। মুন্সীগঞ্জে গুলি করে হত্যা করে আরেক শাওনকে। বরিশালে সাবেক সংসদ সদস্য শাহজাহান খানকে হত্যা করা হয়েছে। ব্রাহ্মনবাড়ীয়ায় পোস্টার লাগাতে গিয়ে বিনা কারণে নয়ন মিয়াকে গুলি করে মারে পুলিশ। ঢাকায় বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে ৭ ডিসেম্বর গুলি করে হত্যা করে মকবুল হোসেনকে। প্রতিটি ঘটনার পেছনে সরকারের উদ্দেশ্য ছিলো নেতাকর্মীদের পুলিশের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলা যাতে বিএনপির গায়ে জঙ্গীবাদের তকমা লাগিয়ে দেওয়া। কিন্তু নেতৃবৃন্দের বিচক্ষণ দিকনির্দেশনায় নেতাকর্মীরা অসীম ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার পরিচয় দিয়েছে যার ফলশ্রুতিতে দশ বিভাগীয় মহাসমাবেশগুলো উৎসবে রূপ নেয়।
এ আন্দোলনে বিজয় একদিন আসবেই কিন্তু কখন কী প্রক্রিয়ায় আসবে সেটা ভবিষ্যতই বলে দেবে। সামরিক স্বৈরাশাসক এরশাদবিরোধী আন্দোলন শুরু হয়েছিল ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি শিক্ষাভবন ঘেরাওর মধ্য দিয়ে। সেই আন্দোলনে শহিদ হন জয়নাল, মোজাম্মেল, কাঞ্চন, দিপালী শাহসহ অনেকেই । ১৯৮৬ সালে এরশাদের পতন যখন দ্বারপ্রান্তে ঠিক তখনই শেখ হাসিনা নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে সেটা বিলম্বিত করে। আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া থাকলেন আন্দোলনের মাঠে। নূর হোসেন, জেহাদ শহিদ হলেন। অবশেষে ১৯৯০ সালের ২৭ নভেম্বর টিএসসিতে ডা. শামসুল আলম মিলনকে হত্যার পর আন্দোলন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। শেষ চেষ্টা হিসেবে ওই রাতে এরশাদ ফের জরুরি অবস্থা জারি করে নিজকে রক্ষা করতে পারে নাই।
বর্তমান বিনাভোট এবং নিশিরাতের ভোটের সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন চলছে। এর সাফল্য কোন পথে আসবে আমরা জানি না। শেখ হাসিনা ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে শেষ চেষ্টা চালিয়ে যাবেন। তাতে আন্দোলন দমাতে ম্যাসাকার কারতে পারেন আবার যেনতেন প্রকারে আরেকটি নির্বাচনও করিয়ে নিতে পারেন। কিন্তু তারপর কী? ক্ষমতা থেকে বিদায় নেওয়ার রাস্তা কোথায়?
শেষ করি ওবায়দুল কাদেরের একটি বক্তব্য দিয়ে। আওয়ামীলীগ ৩০ ডিসেম্বর ‘শান্তি সমাবেশ’ ডেকে ওবায়দুল কাদেরকে প্রধান অতিথি করা হয়। সেখানে তিনি উপস্থিত হয়ে বললেন, ‘আওয়ামীলীগের আজ এই দশা? পাঁচ হাজার লোক জড়ো করতে পারে না?’

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ