ডলার সঙ্কট ছাপছে টাকা : আমিরুল ইসলাম কাগজী - জনতার আওয়াজ
  • আজ রাত ১২:১৮, শনিবার, ১৬ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২রা জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ২৯শে জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি
  • jonotarawaz24@gmail.com
  • ঢাকা, বাংলাদেশ

ডলার সঙ্কট ছাপছে টাকা : আমিরুল ইসলাম কাগজী

নিজস্ব প্রতিবেদক, জনতার আওয়াজ ডটকম
প্রকাশের তারিখ: রবিবার, জানুয়ারি ৮, ২০২৩ ১১:২৬ অপরাহ্ণ পরিবর্তনের তারিখ: রবিবার, জানুয়ারি ৮, ২০২৩ ১১:২৬ অপরাহ্ণ

 

এক।
ডলার সঙ্কটে ভুগছে দেশ অথচ বাংলাদেশ ব্যাংক ছাপছে টাকা। ইংরেজি দৈনিক The Business Standard সংবাদ পরিবেশন করেছে যার শিরোনাম ‘Central Bank goes for printing money to support budget’। খবরের ভেতরে মোদ্দা কথা, তারল্য সঙ্কট মোকাবিলায় সরকার ৫০ হাজার কোটি টাকা ছেপেছে। জুলাই থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে এই টাকা ছাপা হয়েছে। কোনো একক বছরে এটা রেকর্ড টাকা ছাপানোর ঘটনা। কত সহজ হিসাব, ‘মাথা ব্যথা করছে অতএব মাথা কেটে ফেলো, ঝামেলা শেষ’। ডলার ছাপতে পারলে তো বুঝতাম চলমান ২০২৩ সালের আমদানি ব্যয় মেটানো সহজ হতো। কিন্তু সেটা যেহেতু সম্ভব নয় তাই টাকা দিয়ে জোড়াতালি দিয়ে দেখানোর চেষ্টা চলছে সব ঠিকঠাক আছে, অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। বাজারে টাকার যোগান বেশি হলে নিত্যপণ্যের বাজারে উর্ধ্বমুখী প্রবণতা বাড়বে। অথচ এই ৫০ হাজার কোটি টাকা মানুষের ঘরে আছে, ব্যাংকিং চ্যানেলে নেই। কোন ঘরে কত টাকা আছে সেটাও জানে বাংলাদেশ ব্যাংক কিন্তু মুখে বলতে পারে না।
দেশের বেশির ভাগ মানুষ জানে একটি পরিবারের কাছে জিম্মি বাংলাদেশ ব্যাংক। পরিবারটির পক্ষ থেকে লক্ষ কোটি টাকা লুটপাটের কারণে ইসলামী ব্যাংকসহ অন্যান্য ব্যাংকে তারল্য সঙ্কট দেখা দিয়েছে। সেটা মোকাবিলায় ৫০ হাজার কোটি টাকা ছেপেছে এই কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ইসলামী ব্যাংকসহ অন্যান্য ব্যাংক চড়া সুদে সেখান থেকেই ধার নিচ্ছে। আপাতদৃষ্টিতে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ব্যাংকটি আমানতকারীদের সামাল দিতে সক্ষম হচ্ছে। কিন্তু বাজারে যে অতিরিক্ত টাকার হাতবদল হবে, পণ্যমূল্য আরেক দফা বৃদ্ধি পাবে, খেটে খাওয়া মানুষের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি হবে সেটা সামাল দেবে কে?
অবশ্য এই পণ্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে সরকারের সুবিধাভোগীদের কোনো ঝক্কিঝামেলা পোহাতে হবে না। কারণ তারা সব বিশাল অর্থবিত্তের মালিক।
দুই।
বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে যে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী সাইফুল আলম তথা এস আলম পরিবার ইসলামী ব্যাংক, আল আরাফা ব্যাংক, সোস্যাল ইসলামীসহ কয়েকটি ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর থেকে নামে বেনামে ভূয়া কাগজপত্র জমা দিয়ে প্রায় এক লক্ষ কোটি টাকা তুলে নিয়েছে।এ টাকার সিংহভাগ ডলারে কনভার্ট করে মালয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুরে ফাইভ স্টার হোটেল ও শপিং মল ক্রয় করা হয়েছে। সেখান থেকে জানা যায় এস আলম গ্রুপ সিঙ্গাপুরে লিটল ইন্ডিয়ার সেরাঙ্গুন প্লাজায় ১৩৮৭ কোটি টাকায় (১৩৫ মিলিয়ন ডলার) সেন্ট্রিয়াম স্কোয়ার নামের মার্কেট ক্রয় করেছে। আইরিস নভেনা হোটেল এবং হোটেল গ্রান্ড চ্যান্সেলরসহ কয়েকটি হোটেল কিনেছে ৬, ৩৪৫ কোটি টাকায়। কুয়ালালামপুরে কিনেছে ১, ৭৮৮ কোটি টাকায় ফাইভ স্টার রেনেসাঁ হোটেল।
যতদূর তথ্য পাওয়া গেছে তাতে দেখা যায় সাইফুল আলম এবং তার স্ত্রী ফারজানা পারভিন সাইপ্রাসের নাগরিকত্ব নিয়ে সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় কোম্পানি তালিকাভুক্ত করেছেন। তাঁরা ভূয়া কাগজপত্র দিয়ে বাংলাদেশ থেকে ডলার নিয়ে এসব প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। এসব প্রতিষ্ঠানে কতজন বাংলাদেশি নাগরিক চাকরি করেন তার তথ্য পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশের মানুষের আমানত তুলে নিয়ে বিদেশে ব্যবসা জমানোকে সরকার উৎসাহিত করছে বলে ধারণা করা যায়। দেশে ৩ কোটি শিক্ষিত যুবক বেকার, তাদের প্রতি এই পরিবারের দায়বদ্ধতা কতটুকু সেটা সরকার ভেবে দেখেছে কিনা জানি না। তবে তারা যে ডলার পাচার করেছে সেটা তো বলা যায়। তারা যে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে সেটাতো বলা যায়। তাদের কর্মকাণ্ড রাষ্ট্রদ্রোহিতার পর্যায়ে পড়ে কিনা সরকারকে সেটা ব্যাখ্যা দিতে হবে।
তিন।
সরকার এই পরিবারের প্রতি কত সহানুভূতিশীল তার আরেকটি নমুনা তুলে ধরা যেতে পারে। অনলাইন নিউজপোর্টাল বার্তাটোয়েন্টিফোরডটকম ও জাগোনিউজে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, এস আলম গ্রুপের প্রতিষ্ঠান এসএস পাওয়ার-১ লিমিটেডকে স্ট্যাম্প ডিউটি (কর) বাবদ ৩ হাজার ১৭০ কোটি ৮৭ লাখ ৪৫ হাজার ৮০১ টাকা মওকুফ করেছে সরকার। চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে ৬১২ মেগাওয়াটের দুটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের জন্য ল্যান্ড লিজ অ্যাগ্রিমেন্ট এবং ফাইনান্সিং ডকুমেন্টসের অন্তর্ভুক্ত দলিল রেজিস্ট্রেশনের ওপর আরোপিত স্ট্যাম্প ডিউটি বাবদ এ টাকা মওকুফ করা হয়। ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনে এ সুবিধা দেয়া হয়। যে অর্থের ওপর দেশের ১৭ কোটি মানুষের হক নিহিত সেই টাকা প্রজ্ঞাপন জারি করে এই পরিবারকে দেওয়া হলো। কতটা আস্থাভাজন হলে সরকার এত বড় ঝুঁকি নিতে পারে?
চার।
এই যে ৫০ হাজার কোটি টাকা কেন্দ্রিয় ব্যাংক ছাপলো এবং বাজারে ছাড়লো-এটা কি চাইলে সরকার ছাপতে পারে?
এরফলে তো মূদ্রাস্ফীতির একটা আশঙ্কা সৃষ্টি হতে পারে যা কিনা দূর্ভিক্ষের পূর্বলক্ষণ। চলমান ২০২৩ সালে দূর্ভিক্ষ হতে পারে বলে যে আশঙ্কার কথা বলা হচ্ছে সেটার পেছনে কি এই লুটপাট এবং টাকা ছাপানো অন্যতম অনুঘটক?
এই টাকা ছাপানো নিয়ে স্পেনের একটি টিভি সিরিজ খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলো। ‘লা কাসা দে পাপেল’ তথা মানি হেইস্ট নামের ওই টিভি সিরিজে দেখে যায়, একদল ডাকাত একটা ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে ঢুকে কিছু মানুষকে জিম্মি করে টাকা লুট করছে। তবে তাদের লুট করার পদ্ধতি একটু ভিন্ন। তারা ব্যাংকের টাকা লুট না করে, বরং ব্যাংকের টাকা প্রিন্ট করার মেশিন ব্যবহার করে তৈরি করে নিচ্ছে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার।
পাঁচ।
একটি ব্যতিক্রমী খবর
এক হাজার কোটি টাকা ঋণ খেলাপের মামলায় চট্টগ্রামের সিলভিয়া গ্রুপের চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান মিলনকে সিঙ্গাপুর থেকে দেশে ফিরিয়ে আনতে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
সিলভিয়া গ্রুপের কর্ণধার মুজিবুর রহমান মার্কেন্টাইল ব্যাংক, ইস্টার্ণ ব্যাংক, সিটি ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংক ও ব্যাংক এশিয়া থেকে ঋণ নিয়ে খেলাপি হয়েছেন। তিনি বর্তমানে সিঙ্গাপুরে পলাতক থাকায় ঋণ আদায় কার্যক্রম ব্যর্থ হচ্ছে, যা সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের অর্থনীতির ওপর।
বুঝুন ঠ্যালা। এক লক্ষ কোটি টাকা লুট করলে অর্থনীতির ওপর চাপ পড়ে না। চাপ পড়ে এক হাজার কোটি টাকার ঋণ খেলাপি হলে।

 
 
জনতার আওয়াজ/আ আ
 
 

জনপ্রিয় সংবাদ

 

সর্বোচ্চ পঠিত সংবাদ